অন্ধকারের ভিজ্যুয়াল কিংবা মায়োপিক বিষণ্নতার ইশতেহার

অন্ধকারের ভিজ্যুয়াল কিংবা মায়োপিক বিষণ্নতার ইশতেহার

আমি অন্ধকার দেখতে পাই! অন্ধকারের ভিজ্যুয়াল কেমন হয়, আমার সেটা জানা! অনেকক’টা বছর আগে- প্রথম যখন আমার রুমমেটকে কথাটি বলেছিলাম, ও ধরেই নিয়েছিলো, আমার মাথাটা বোধহয় গেছে। তারপর থেকে বহুজনকে বলেছি এই অদ্ভূত ক্ষমতার কথা। খুব ব্যতিক্রম ছাড়া প্রায় সবাই নানাভাবে এড়িয়ে গিয়েছে। কেউ হয়তো বিশ্বাস করতে চেয়েছে। আবার কেউ অনিশ্চিত চেহারা দেখিয়ে বিদায় নিয়েছে।  সত্যি বলতে কী, আসলেই আমি অন্ধকার দেখতে পাই। অন্ধকারের নিজস্ব ভাষা আছে। জমাট দেখালেও সেখানে গতি আছে। রঙতুলির মতো অন্ধকার দিয়েও দৃশ্য আঁকা যায়। প্রতিটি অন্ধকার অন্যদের চাইতে আলাদা। কী অদ্ভূত,তাই না?

আমার অন্ধকার দেখার ক্ষমতার শুরু হয় কৈশোরে। গ্রাম থেকে ঢাকাতে তখন নতুন এসেছি। হোস্টেলে থাকার সব বন্দোবস্ত করা হয়ে গেছে। সদরঘাটে ফায়ার সার্ভিসে বাবা তখন চাকরী করেন। কাছেই বেশ পুরনো এক মসজিদের উপরের তলায় আমার অস্থায়ী আবাস। নিজের খুব প্রিয় সবুজ ট্রাঙ্ক নিয়ে নতুন জামা-কাপড়ে প্যাকেট হয়ে এক সকালে আমি গিয়ে উঠলাম ওখানে। বাড়ি ছেড়ে এই প্রথম আমার অন্যকোথাও আসা হলো। নতুন পরিবেশ, লোকজন সবমিলে একরকমের উত্তেজনা কাজ করছিলো। সবার আগে মাথায় ঘুরছিলো, এখন থেকে রোজ সকালে আমার আর কষ্ট করে লাল আটার রুটি , দুধ আর আখের গুড় দিয়ে ভিজিয়ে নাস্তা অন্তত করতে হবে না। আমার জন্য বাড়িতে সবসময় সকালে এই মেনুটাই বরাদ্দ থাকতো।

হোস্টেলে সারাদিন ভালোই কাটিয়ে দিলাম। রাতে নিজের হাতে বিছানা রেডি করে ফেললাম। এতো বছর পর এসে সেদিনের সেই পাতা বিছানার চেহারা মনে পড়লে ফিঁক করে হাসি চলে আসে। যাইহোক। সবকাজ শেষ করে ঘুমাতে গেলাম। সবার শোয়ার পর্ব শেষ হতেই হোস্টেলের বাতিগুলো নিভিয়ে দেয়া হলো। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার! ঠিক সেই মুহুর্তে আমি সম্পূর্ণ পরিসরে বুঝতে পেরেছিলাম, আমার একা থাকার জীবন শুরু হয়ে গেলো! বাবা-মা, চাচাতো ভাই গিট্টু, আন্টি, আরিফের মা, আনিস ভাই, রুকু, এরা কেউ নেই কাছেপিঠে। আসবেও না। এই উপলব্ধি কিশোর আমার মনের খুব গভীরের কোথাও ছাঁপ ফেলে দিয়েছিলো। নিজের অজান্তেই চোখ দিয়ে তখন ঝরঝর পানি পড়ছিলো। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠার শব্দ শুনতে পেয়ে হোস্টেল সুপার ধমকে উঠে বলেছিলেন, এ্যাই! কে কান্দে রে!! কাঁদতে ইচ্ছা করলে বালিশে মুখ গুজে কান্না কর! নাহলে ওয়াশরুমে গিয়ে ভ্যা ভ্যা চালাতে পারিস। এখানে এমন মেয়েদের মতো কাঁদা যাবে না! লোকটির বাঁজখাই গলার ধমকে আমার আরো কষ্ট হচ্ছিলো।

সেই রাত আমার কাছে অনেক লম্বা মনে হয়েছিলো। অন্ধকারের মধ্যে একাকী শুয়ে থাকা নিরুপায় কিশোরের মনের সুকোমল অনেক জানালাতেই হয়তো সেদিন শেষ বারের মতো খোলা পৃথিবীর হাওয়া প্রবেশ বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। সেদিন থেকেই আমি নিজের ভয় তাড়ানোর জন্য নানা চেষ্টা চালিয়ে যেতাম। অনভ্যস্ত পরিবেশে ঘুম আসতে সময় লাগতো। তাকিয়ে থাকলে চোখের সামনে তখন কেবলই জমাট অন্ধকার। সেই অন্ধকারকে সয়ে নিতেই হয়তো আমার মস্তিষ্ক নিজের মতো করে ছবি, দৃশ্য, পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনী তৈরী করতে থাকলো অন্ধকারের স্টেজে। পেজা তুলো কিংবা উড়ন্ত ফেদারের মতো অন্ধকার আমার সামনে রূপ পাল্টায়। জানি, এটাকে কল্পনা কিংবা ইচ্ছাকৃত ইল্যুশন বলবেন অনেকেই। আসলেই এটা এক ধরণের কল্পনাই। কিন্তু, যে কল্পনা আমার  হোস্টেল লাইফের অসংখ্য রাতগুলোতে অন্ধকারেও সঙ্গ দিয়ে গেছে বিশ্বস্ত বন্ধুর মতো, তাকে আমি সাবকনসাস মাইন্ডের প্রোটেক্টিভ গার্ডিয়ান না বলে বরং জীবন্ত অনুষঙ্গ বলতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবো।

বহুবছর পেরিয়ে গেছে। আমার হোস্টেল লাইফ শেষ হলেও স্বেচ্ছা নির্বাসনের সময় চলছে। চকচকে শহুরে সময়ে অন্ধকারের সাথে সখ্যতা কমেছে আমার। রাতে একা ঘুমাতে গেলে ঘরের সব লাইট জ্বেলে নিয়ে তারপর ঘুমোতে যাই। কারণ, অন্ধকারের ভিজ্যুয়াল আর আমি দেখতে চাই না। বুঝতে চাই না। যে ভিজ্যুয়াল কল্যাণকামী বন্ধুর মতো আমাকে মনে করিয়ে দেয়, আমি ছিটকে পড়া কোন আত্মার অংশ, আমি এইখানে আমার প্রিয় মানুষদের মাঝে বিলং করি না, তখন কৈশোরের পুরনো একাকীত্ব, শূন্যতার ভয় আমাকে গ্রাস করে। তাই আমি আর ভিজ্যুয়াল খুঁজতে যাই না।

২০০৩ সালে হঠাৎ একদিন আমি চোখে দেখতে পাচ্ছিলাম না। চোখে ব্যথা। কিছুক্ষণ পর ঠিক হয়ে গেলেও মনে হচ্ছিলো কেমন যেনো ঝাপসা দেখছি।  সদরঘাটের কাছে ফরাশগঞ্জে মওলা বখশ মেমোরিয়াল হাসপাতালে প্রথম চোখের ডাক্তার দেখালাম। ডাক্তার আমাকে চশমা দিয়ে দিলেন। মায়োপিয়া। সেদিন থেকে নাকের উপর বসানো টোল প্লাজার সাহায্য ছাড়া আমার দেখতে পাওয়ার কোনই সুযোগ নেই। চশমা যারা পড়েন , তাদের পৃথিবীটা অন্যদের চেয়ে অনেক আলাদা। ঘষা কাঁচের মতোন ঝাপসা, তরলরঙা। চলমান সবকিছুকে রেখার মতো নড়াচড়া করতে দেখি। বিয়েবাড়ি কিংবা উৎসবের মরিচাবাতির লাইটিং যখন খালি চোখে দেখি, কেমন মুক্তোর মতো সারি সারি ছড়িয়ে থাকা আলোর ফুল মনে হয়।

ইদানিং অনেক বেশি সময় কম্পিউটারের স্ক্রিণে তাকিয়ে থাকতে হয় সিরিয়াস ভঙ্গিতে। দায়িত্বপূর্ণ একটা জব করি। সেই সুবাদে কম্পিউটারের সাথে সখ্যতা বেড়েছে অসহ্য রকমের। যার ফলে শুরু হয়েছে নতুন ঝামেলা। হঠাৎ হঠাৎ আমার মায়োপিক ভিজ্যুয়ালও ভ্যানিশ হয়ে যায়। অন্ধকার হয়ে যায় সবকিছু। যেনো সিনেপ্লেক্সের জায়ান্ট স্ক্রিণ থেকে ধুম করে সবকিছু মুছে যাওয়া। ডাক্তার বলেছেন, আমার বাম চোখের ভেতরকার ফ্লুইড খুব কম তৈরী হচ্ছে। তাই, চোখ শুকিয়ে যায়। সেকারণেই এমন লোডশেডিং! আমি হাসি চোখমুখ কঠিন করে উপদেশ দেয়া ডাক্তারের চোখ-মুখের সিরিয়াস ভঙ্গি দেখে। তার কথা, ভঙ্গি, চোখের কোণের ভাঁজ, নাক-মুখ, হাতের নড়াচড়া, কপালের কুঞ্চন সবকিছুই আমার কাছে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দৃশ্যের অংশ মনে হয়। যে দুশ্যগুলো জোড়া দিয়ে আঁকা যাবে বৃহৎ কোন কাহিনী। যে কাহিনীতে ডাক্তারের শৈশব, কৈশোর, একাডেমিক লাইফ, ভালোবাসা , হতাশা, চাপাকান্নার শব্দ, প্রিয়জনদের পাওয়ার আনন্দ কিংবা তাদের হারিয়ে ফেলার অসহায়ত্ব ফুঁটে উঠবে।

আপাত দেখতে খুব শান্ত সুন্দর মানুষের ভেতরের বাক্সবন্দি কান্না, হতাশা, কষ্ট আমরা কখনো কি দেখতে পাই? কিংবা, সেসব নিয়ে একটু ভাবার, একটু আন্তরিক হওয়ার সক্ষমতা কি আর মানুষের আছে? সৃষ্টিকর্তা কখনো অবিচার করেন না। কারো একটা ক্ষমতা কিংবা কোন যোগ্যতা নষ্ট হলে , ক্ষয়ে গেলে সেটার ব্যালেন্স করতে অন্যকোন যোগ্যতার সৃষ্টি হয়। অন্ধের চোখ ক্ষমতাহীন হলেও তার শ্রবনেন্দ্রিয় কাজ করে দ্বিগুণ সক্ষমতা নিয়ে। হয়তো তেমনভাবেই মায়োপিক আমার আছে  অন্ধকার দেখা শক্তি। সেই হোস্টেলের প্রথম রাতে যে যোগ্যতার জন্ম হয়েছিলো, সেটা এখন সময়ের উড়ানে ভর করে অনেক তীব্রতা পেয়েছে। সঠিক-বেঠিকের হিসেবের বাইরে গিয়ে আমি আমার এই নৈঃশব্দের অনুবাদ করার অনুভূতিকে নিজের বন্ধু হিসেবে মেনে নিয়েছি। হয়তো সেজন্য আমার কনভার্সেশনে কথার চেয়ে আমি বুঝতে চেষ্টা করি শূন্যতায় ভেসে বেড়ানোর নিরাকার কথাদের ভাষা। যে ভাষা কখনো মিথ্যে বলে না।

ঝাপসা চোখের দৃষ্টি নিয়ে আমি হেঁটে বেড়াই। পড়াশোনা চালিয়ে যাই। সংসার করি। বন্ধু, প্রিয়জন সবাই আছে চারপাশে। সংখ্যায় খুব সীমিত হলেও। কিন্তু তারপরও  হোস্টেলের প্রথমরাতে তৈরী হওয়া শূন্যতার বোধটুকু কখনো পূরণ হয় না। উন্ডেড সৌল বা আহত আত্মার মতো বোধের খুব গভীরে যে স্থায়ী ক্ষত সেদিন হয়েছিলো, তার কোন এলাজ আমি খুঁজে পাই নি।  সেইসব পুরনো অন্ধকার বারবার ফিরে আসে। বালিশে মুখ গুজে ভয়ংকর কষ্টে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকা কিশোরটিকে আজও আমি দেখতে যাই। তার সেদিনের কষ্টটুকু কখনো কি সে কাউকে বুঝাতে কিংবা বলতে পেরেছিলো? মায়োপিক বিষণ্নতা আমার বর্তমানকে আটকে দিয়েছে সেই কিশোরের সাথে একই বাক্সে। স্বজনহীন সেই বোকা বাচ্চাটার বেদনা আমি বহন করে চলি। অন্ধকারের যে ভিজ্যুয়াল সে জমিয়ে রেখেছিলো তার স্মৃতিতে, আমি সেসব দেখতে পাই।

শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত, সফল এইসব সামাজিক প্যারামিটারের চেয়ে নিজের প্রিয়জন, বন্ধুদের নিয়ে আনন্দে বেঁচে থাকাটা সেদিন সেই বোকা বাচ্চাটার বড়ো বেশি দরকার ছিলো। তাহলে হয়তো আজকে মায়োপিক বিষণ্নতার জন্ম হতো না। হয়তো আমিও ঘুমোতে পারতাম পরম শান্তিতে..। হয়তো।

  1. ‘চশমা যারা পরেন, তাদের পৃথিবীটা অন্যদের চেয়ে অনেক আলাদা।’ আমি এটা অন্যভাবেও বলি যাঁরা চশমা পরেন তাঁরাও পৃথিবীর সাধারণ মানুষগুলার চাইতে একটু আলাদা।

    1. এভাবে কখনো ভাবি নি। হবে হয়তো। তবে, দৃষ্টিহীনতা কিংবা ক্ষীণদৃষ্টির পৃথিবী সত্যিই অন্যরকম। বলে বুঝানো যাবে না। সবসময়ই চাই, আমার শত্রুরও যেনো চোখের সমস্যা না হয়। 🙂 ধন্যবাদ ভাই! এই আকালের সময়ে নিয়মিত ব্লগে আসার জন্য। 🙂

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

* ছবির অক্ষরগুলো উপরের ঘরে লিখুন