অসমাপ্ত আত্মজীবনী; একজন শেরপার সংক্ষিপ্ত উপাখ্যান (বুক রিভিউ)

“বন্ধুবান্ধবরা বলে তোমার জীবনী লেখো। সহকর্মীরা বলে রাজনৈতিক জীবনের কাহিনীগুলো লিখে রাখো, কাজে লাগবে।” এভাবেই শুরু হয়েছে এই অসমাপ্ত আত্মজীবনী। মধুমতি তীরের জনপদ থেকে উঠে আসা একজন মানুষের গল্প, একজন রাষ্ট্রনায়কের আত্মজীবনী তার বংশীয় পরিচয় এবং নাটকীয় কথনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় পাঠকের যাত্রা।  প্রথমেই যে প্রশ্নটি চলে এসেছিলো, বইটি কি আদৌ শেখ মুজিবুর রাহমানের লিখা? তাহলে এতোদিন কোথায় ছিলো? কিংবা, এর আবিষ্কারের নেপথ্যকাহিনী কী ছিলো? শুরু ভূমিকাতে সেই প্রশ্নর উত্তর মিলে যায়। উদ্ধৃত করছি।

“২০০৪ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা চারটি খাতা আকস্মিকভাবে তাঁর কন্যা শেখ হাসিনার হস্তগত হয়। খাতাগুলি অতি পুরানো, পাতাগুলি জীর্ণপ্রায় এবং লেখা প্রায়শ অস্পষ্ট। মূল্যবান সেই খাতাগুলি পাঠ করে জানা গেল এটি বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী, যা তিনি ১৯৬৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে অন্তরীণ অবস্থায় লেখা শুরু করেছিলেন, কিন্তু শেষ করতে পারেননি। জেল-জুলুম, নিগ্রহ-নিপীড়ন যাঁকে সদা তাড়া করে ফিরেছে, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে উৎসর্গীকৃত-প্রাণ, সদাব্যস্ত বঙ্গবন্ধু যে আত্মজীবনী লেখায় হাত দিয়েছিলেন এবং কিছুটা লিখেছেনও, এই বইটি তার সাক্ষর বহন করছে। ”

সামনে এগুতে থাকি। দেখতে থাকি কাগজের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে থাকা স্থির সেলুলয়েডে গড়িয়ে চলা বঙ্গবন্ধুর জীবন।  বইটির ভাষা কিংবা বিষয় আত্মজীবনীধর্মী হলেও, লেখকের কলমের আঁচড়ে ‍উঠে এসেছে তৎকালীর সময়ের নানান প্রেক্ষাপট।

সাথে পেয়ে যাই লেখকের বংশ পরিচয়,  জন্ম,  শৈশব, স্কুল  ও কলেজের শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি  সামাজিক ও  রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, দুর্ভিক্ষ, বিহার ও কলকাতার দাঙ্গা, দেশভাগ, কলকাতাকেন্দ্রিক প্রাদেশিক মুসলিম ছাত্রলীগ ও মুসলিম লীগের রাজনীতি, দেশ বিভাগের পরবর্তী সময় থেকে ১৯৫৪ সাল অবধি পূর্ব বাংলার রাজনীতির সংক্ষিপ্ত খতিয়ান।

কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক মুসলিম লীগ সরকারের অপশাসন, ভাষা আন্দোলন, ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা, যুক্তফ্রন্ট গঠন ও নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন, আদমজীর দাঙ্গা, পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের বৈষম্যমূলক শাসন ও প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের বিস্তৃত বিবরণ এবং এসব বিষয়ে লেখকের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বর্ণনায় সমৃদ্ধ হয়েছে ৩৪৫ পৃষ্টার এই বইটি।

এতে  আছে লেখকের কারাজীবন, পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি ও সর্বোপরি সর্বংসহা সহধর্মিণীর কথা, যিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবনে সহায়ক শক্তি হিসেবে সকল দুঃসময়ে অবিচল পাশে ছিলেন। একইসঙ্গে লেখকের চীন, ভারত ও পশ্চিম পাকিস্তান ভ্রমণের বর্ণনাও বইটিকে বিশেষ মাত্রা দিয়েছে।

বইটা শেষ করতে হলো বেশ ভালো রকমের অতৃপ্তি নিয়ে। অতৃপ্তির কারণ আসলে নামেই বোঝা যায় – অসমাপ্ত আত্মজীবনী। কোনো পরিকল্পনা ছাড়া, কোনো উপসংহার ছাড়া, লেখকের অসমাপ্ত জীবনের মতোই একেবারেই হুট করে শেষ হয়ে গেল বইটা।  এটা থেকে বঙ্গবন্ধুর পরিনত বয়সের রাজনৈতিক দর্শনের কোন খোঁজ পাওয়া যায় না । যে বিবর্তন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের রূপকার হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছিলেন তার শুরুর সময়টার কিছু ধারনা পাওয়া যাবে মাত্র। গোপালগঞ্জের ডানপিটে সাহসী সমাজ সচেতন কিশোর শেখ মুজিবের পরিণত বলিষ্ঠ নেতা হয়ে ওঠার কিছুটা আভাস পাই। কিন্তু সেখান থেকে বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠার গল্পের প্রায় কিছুই আমরা পাই না।

তবে বইটা পড়ে ব্যক্তি মুজিবকে হয়তো অনেকখানিই উদ্ধার করা যায়। তার রাজনৈতিক চিন্তা ভাবনা, সংগ্রাম সবকিছুরই অনেক ধারনা পাওয়া যায়। যে পাকিস্তান সৃষ্টির জন্য যেই মুসলিম লীগে সমর্থন করে আন্দোলন করেছিলেন পরে সেই মুসলিম লীগের অত্যাচার এবং দুঃশাষনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে বিরোধী দল গঠন করলেন এবং হয়ে গেলেন মুসলিম লীগ আর পাকিস্তানের সর্বোচ্চ শত্রু!

আমি বইটি থেকে মূলত সেই সময়ের শেখ মুজিবের রাজনৈতিক দর্শন বুঝতে চেষ্টা করেছি। পাতার পর পাতা থিসিস লিখে আর গবেষণা করে মাঠের রাজনীতিতে যারা কিছুই করতে পারেন নি তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেন নি তিনি। তিনি কাজ করতে করতে শিখেছেন, ভুল হলে স্বীকার করেছেন, সংশোধনের চেষ্টা করছেন। বলেছেন এভাবে, ‌‌”আমার যদি কোনো ভুল হয় বা অন্যায় করে ফেলি, তা স্বীকার করতে আমার কোনোদিন কষ্ট হয় নাই। ভুল হলে সংশোধন করে নেব, ভুল তো মানুষেরই হয়ে থাকে। … … আমি অনেকের মধ্যে দেখেছি, কোনো কাজ করতে গেলে শুধু চিন্তাই করে। চিন্তা করতে করতে সময় পার হয়ে যায়, কাজ আর হয়ে ওঠে না। … … আমি চিন্তা ভাবনা করে যে কাজটা করব ঠিক করি, তা করেই ফেলি। যদি ভুল হয় সংশোধন করে নেই। কারণ যারা কাজ করে তাদেরই ভুল হতে পারে, যারা কাজ করে না তাদের ভুলও হয় না।”

আন্দোলন আর সংগ্রামের ইতিহাসের মধ্যে দিয়ে সেই সময়কার গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব নেতার সাথে বিভিন্ন তাঁর মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে সেইসব নেতাদের কিছু পরিচয় পাওয়া যায়। বইয়ে ঘুরে ফিরে এসেছে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের কথা, যাঁর হাত ধরে তিনি রাজনীতি শিখেছেন। লেখক একেবারে শুরুর দিকেই বলছেন, ‌‌”ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ছোট্ট কোঠায় বসে জানালা দিয়ে আকাশের দিকে চেয়ে চেয়ে ভাবছি, সোহরাওয়ার্দী সাহেবের কথা। কেমন করে তাঁর সাথে আমার পরিচয় হল। কেমন করে তাঁর সান্নিধ্য আমি পেয়েছিলাম। কিভাবে তিনি আমাকে কাজ করতে শিখিয়েছিলেন এবং কেমন করে তাঁর স্নেহ আমি পেয়েছিলাম।”

বইয়ের শুরুতে শেখ হাসিনার লেখা ভূমিকা এবং বইয়ের বিভিন্ন অংশে জুড়ে দেয়া শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে লেখা পান্ডুলিপির টুকরো ছবি বইটিকে বিশেষ মাত্রা দিয়েছে। বইয়ের আনুষ্ঠানিক শুরু পূর্বের একটি উদ্ধৃতি তুলে দিচ্ছি। যা থেকে আন্দাজ করা যায়, একজন ব্যক্তি মুজিবকে কতোটা কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।

“একদিন সকালে আমি ও রেনু বিছানায় বসে গল্প করছিলাম , হাচু ও কামাল নিচে খেলছিল ” হাচু মাঝে মাঝে খেলা ফেলে আমার কাছে আসে আর “আব্বা আব্বা ” বলে ডাকে . কামাল চেয়ে থাকে , একসময় কামাল হাচিনাকে বলছে , হাচু আপা হাচু আপা , তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলি….! আমি আর রেনু দুজনেই শুনলাম . আস্তে আস্তে বিছানা থেকে উঠে যেয়ে ওকে কোলে নিয়ে বললাম, আমি তো তোমারও আব্বা !
কামাল আমার কাছে আসতে চাইতো না, আজ গলা ধরে পড়ে রইলো . বুঝতে পারলাম , এখন আর ও সহ্য করতে পারছে না . নিজের ছেলেও অনেক দিন না দেখলে ভুলে যায় . আমি যখন জেলে যাই ওর বয়স মাত্র কয়েক মাস . রাজনৈতিক কারনে একজনকে বিনা বিচারে বন্দি করে রাখা আর তার আত্মিয়স্বজন ছেলেমেয়ের কাছ থেকে দুরে রাখা যে কতো বড় জঘন্য তা কে বুঝবে ? মানুষ স্বার্থের জন্য অন্ধ হয়ে যায়..”

যে জীবন ছিলো মহীরুহের, সে জীবনের আত্মজীবনী অসমাপ্ত থেকে গেলো। হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া বঙ্গবন্ধুকে আমি দেখি নি। এই অসমাপ্ত বইটি আমাকে মুজিবের ভেতরের ব্যক্তিমুজিবকে দেখার সুযোগ  করে দেয়। আমি বঙ্গবন্ধুর পূর্ণাঙ্গ আত্মজীবনী পড়বার অপেক্ষায় থাকি..।

তথ্যসূত্র সাহায্য:

  • অসমাপ্ত আত্মজীবনী ; শেখ মুজিবুর রহমান ( দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড(ইউ পি এল) )
  • গুডরিডস.কম ( বই বিষয়ক অন্যতম বৃহৎ ওয়েবসাইট )
  • বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাষ্ট ( লিফলেট/প্রচারণা )

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

* ছবির অক্ষরগুলো উপরের ঘরে লিখুন