আমাদের প্রিয় নাম্মি আপুকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা

“জীবনকে আমি যতো দেখি, ততোই অবাক হই। যতোই ভাবি, জীবন থেকে চলে যাবো দূরে…বহুদূরে, জীবন আমাকে ততো বেশি আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ফেলে। কিছু মানুষ আমার জীবনের প্রতি এই মুগ্ধতা, এই মায়াচ্ছন্নবোধ আরো বাড়িয়ে দিয়ে আমাকে বলে যায়, বেঁচে থাকো..। বেঁচে থাকো চারপাশকে নিয়ে।
পাবলিক লাইব্রেরীর সিঁড়িতে আমি মানুষটিকে প্রথম দেখি। গাঢ় করে চোখে কাজল দেয়া মেয়েটি আমাদের আড্ডায় চুপ করে ছিলো। শেষের দিকে কথা বললো। খুব সীমিত আর গোছানো শব্দের ব্যবহার। শতভাগ ভবঘুরে আমার দুনিয়াতে এই ধরণের মেয়েরা দূরাগত জাহাজের মতো। যাদের দূর থেকেই দেখতে হয়। যাদের কাছে টানা কিংবা তাদের কাছে যাওয়া আমাদের মতো ভবঘুরেদের জন্য বারণ। তাই সেদিন দূরেই থেকেছি।
দিন গড়াতে লাগলো। গ্রুপের সবার দাদা হয়ে উঠার পাশাপাশি অবাক হয়ে একদিন লক্ষ করলাম, এই মেয়েটিরও দাদা হয়ে গেছি আমি। স্বতঃস্ফূর্ত প্রাণবন্ততায় মাতিয়ে রাখতো আমাদের সবাইকে। সবার গার্ডিয়ানও হয়ে উঠেছিলো সবার অজান্তে। তিনি আমার এবং আমাদের প্রিয় নাম্মি আপি।
আমি দেখতাম একটু দূর থেকে..। মেয়েটির প্রাণখোলা হাসির মাঝেও কখনো কখনো বিষণ্নতার মেঘ খেলা করতো। যারা সবার আপন হয়ে যায়, তারা আসলে নিজেরা ভীষণ একা। এই ভাবনাটা আমাকে খুব ভাবাতো। বুঝতে চাইতাম, বহুদিন ধরে সবাইকে হাসি-খুশি রাখা মেয়েটি, কে জানে কতোদিন ধরে নিজের মন খুলে, তার সব অনুভূতি অন্যের কাছে ব্যক্ত করে না..। বুঝতে চাইতাম, শেষ কবে মেয়েটি একান্ত নিজের ভালো থাকার কথা ভেবেছে…। আরো অনেক প্রশ্ন জমা আছে এই অদ্ভূত মেয়েটি সম্পর্কে। কিন্তু কখনো করা হয়ে উঠে নি।
রক্তের অনাত্মীয় হয়েও কেউ এতো আপন হয়ে উঠতে পারে আমার, এটা আমার কাছে বড়ো বেশি বিস্ময়ের। আরো অনেক কথা বলতে ইচ্ছে করছে। আরো লম্বা করে লিখতে ইচ্ছে করছে। বলতে ইচ্ছে করছে, প্রিয় আপি, আমি, আমরা সবাই তোমাকে অসম্ভব ভালোবাসি। অন্তু তোমাকে সারাক্ষণ মিস করে। জিজি তোমাকে হয়তো নিজের চাইতেও বেশি ভালোবাসে। সৈকত, তাওসিফ আরো আমরা সবাই তোমাকে মিস করি।

আজকে আমার প্রিয় আপিটার জন্মদিন। যখন আমি খুব আন্তরিকভাবে শুভ কামনা জানাতে চাই, তখন আমাকে শব্দ ধার করতে হয়। আজকেও করছি..।

“ভালো থেকো ফুল, মিষ্টি বকুল, ভালো থেকো…।”

আপি, অনেক বেশি ভালো থেকো। আমাদের সবার অফুরন্ত ভালোবাসা রইলো। জন্মদিনের শুভেচ্ছা পাঠালাম বৃষ্টির খামে করে। নিয়ে নিও। আগামীর প্রতিটি দিন হোক প্রাপ্তির আনন্দে উচ্ছ্বল…।

শুভ জন্মদিন নাম্মিপু…”

এই উপরের লেখাটি লেখার পর ৩ টি বছর পেরিয়ে গেছে। পরিবর্তন হয়ে গেছে আমাদের চারপাশ। নানা ঘটনা আর জীবনের ব্যস্ততা আমাদের মাঝে এনে দিয়েছে দূরত্ব। নাম্মি আপু চলে গিয়েছেন দূর পরবাসে। আমাদের গ্যাংটাও এখন আর আগের মতো নেই। এই দূরত্ব আমাকে কষ্ট দেয়। ইট-কাঠ-পাথরের জঞ্জালে ভরা নীরস শহরে যে সম্পর্কগুলো, যে মানুষগুলো আমার নিঃশ্বাস নেয়াকে সহজ করে দিয়েছিলো কোন এক কঠিন সময়ে, সেই মানুষগুলোকে আমার খুব মনে পড়ে। স্রষ্টার অসীম দয়ায় অন্তরা আমার সাথে আছে। এই একটা দিক এখনো আগের মতো আছে। নাম্মি আপু, জিজি, তৌসিফ কিংবা অন্যরা বেশ দূরের মানুষ এখন। চাইলেও পাবলিকের সিঁড়িতে আমাদের আর বসা হয়ে উঠে না।

সেদিনের সেই উচ্ছ্বল নাম্মি আপু আজকে ২ জন চমৎকার বাবুর মা। আমান আর আলিজা এখন আলো ছড়া্চ্ছে আপুর সংসার জুড়ে। আপুর চেহারায় সেই দূরাগত জাহাজের মতো ভাবটা এখন আর নেই। মনে হয়, মাতৃত্ব পাল্টে দিয়েছে অনেককিছু। সহজ এবং সুখী স্নিগ্ধতা সেই চেহারায়। হয়তো প্রকৃতি মায়েদের জন্য এই শান্ত শান্তিটুকু জমিয়ে রাখে কোথাও। শুধু মায়েরাই এর দেখা পান..।

আমার এখনো মনে পড়ে কোন এক বিকেলে পাবলিকের সামনের চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে নাম্মি আপুর সাথে কোন এক হারিয়ে যাওয়া সন্তানের গল্প করছিলাম। সেই মা তার সন্তানকে রাখতে পারেন নি নিজের কাছে। পৃথিবীর মুখ দেখাতে পারেন নি সেই মা। তার কান্না আমাদের সবাইকে সেদিন কী ভীষণভাবে আপ্লুত করছিলো।

সময় তার আপন গতিতে চলে যেতে থাকে। আমার পছন্দের মানুষগুলোকে হারিয়ে ফেলার ভয় আমার কেবলই বেড়ে চলে। ছোটবেলায় যে শাহজাহান কাকাকে খুব ভালোবাসতাম, তিনি আমাকে ছেড়ে গিয়েছিলেন হঠাৎ কোন অসুখে। ছোট্ট আমি বুঝতেই পারি নি, তিনি আমাদের বাসায় আর কোনদিন আসেন নি কেনো । ভোলার সেই সহজ সরল ভালো মানুষটির সাথে আর কখনো দেখা হবে না, এটা ভেবে ভেবেই বড়ো হয়ে গেছি আমি। এখনো উনার কথা খুব মনে পড়ে। আগ্রাবাদ ফায়ার সার্ভিসের কোয়ার্টারের বন্ধু আইরিন-রুবেল, যাত্রাবাড়ির জিসান-মুকুল, মুন্সীগঞ্জের আসলাম ভাই, সদরঘাটের অর্ণব-জিলানী, ডেমরার ইলা কিংবা সিলেটের সায়েদা আপাসহ এমন অনেক পছন্দের মানুষগুলো এখন আর আমার আশেপাশে নেই। কোথায় আছে তারা, জানি না। তাই ভয় হয়, একদিন হয়তো আমি হারিয়ে ফেলবো আমার সবপ্রিয়জনদের। অন্তরার ক্ষেত্রেও এই ভয় কাজ করে। সম্পর্কের সযতন পরিচর্যা আমাকে দিয়ে হতে চায় না। যোগাযোগ রাখার প্রক্রিয়া আমার কাছে যথেষ্ট কঠিন। হয়তো সে কারণেই পছন্দেরজনদের সাথে আমার দূরত্ব তৈরী হয়ে যায় নিজের অজান্তেই..।

আমার এই হারিয়ে ফেলার ভয় কোন একদিন কেটে যাবে। এই বিশ্বাস নিয়েই পথ চলি। আমি জানি, জীবন তার নিজের নিয়মেই চলবে। সম্পর্কের যত্ন নিতে না পারা আমার সাথে প্রকৃতি কঠোর আচরণই করবে। তবুও আমি আমার প্রিয়জনদের জন্য মঙ্গল কামনা করি। ভরসা রাখি সৃষ্টার উপর। নাম্মি আপু তার প্রিয়জনদের নিয়ে ভালো থাকবে, এই কামনায় এই লেখাটুকু লিখে রাখছি নিজের ডায়রীতে। আমান-আলিজা কঠিন এই পৃথিবীতে সুন্দর মন নিয়ে বেড়ে উঠবে। আলোকিত হৃদয়ের অধিকারী হবে। কোন একদিন ওরাও হয়তো আমার মতো করেই ডায়রী লিখবে ওদের প্রিয়জনদের নিয়ে। মঙ্গলময় হয়ে উঠুক আমাদের পৃথিবী। ভালো থাকুক আমাদের প্রিয়জনরা।

শুভ জন্মদিন নাম্মিপু..। আগামীর প্রতিটি মুহুর্তহোক সহজ সুখ ও জটিলতাহীন আনন্দের। জীবন থাকুক সজীব ও শতভাগ সতেজ। সৃষ্টার করুণা সবসময় সাথে থাকুক তোমার। ভালো থেকো আমাদের প্রিয় নাম্মি আপু..।


# ছবি: বগুড়াতে নাম্মি আপু ও তার ছোটবোনের একসাথে জন্মদিন পালনের সময়ে তোলা। আপুর ছোটবোনের সৌজন্য পাওয়া

মন্তব্য করুন