আলবেয়ার কামু’র দ্য আউটসাইডার অথবা দ্য স্ট্রেঞ্জার এর রিভিউ

= প্রকৃত নাম: লেত্রঁজে
= মূল ভাষা: ফরাসি
= লেখার সময় ও স্থান: ৪০এর দশক, ফ্রান্স
= প্রকাশের সময় ও প্রকাশক: ১৯৪২, লাইব্রেরি গালিমার্দ
= সাহিত্যের প্রকার: উপন্যাস
= লেখার ধরণ: অস্তিত্ববাদী, অপরাধ বিষয়ক লেখা
= লেখার পটভূমি: আলজেরিয়া, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কিছু পূর্বে

লেত্রঁজে (L’Étranger) বা ল্যা-এস্রানজার, নোবেল বিজয়ী ফরাসি সাহিত্যিক আলবেয়ার কামু’র সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস। ১৯৪২ সালে স্টুয়ার্ট গিলবার্ট এটির ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। ইংরেজি শিরোনাম দেয়া হয় দ্য আউটসাইডার অথবা দ্য স্ট্রেঞ্জার, এবং এই নামেই এটি বহির্বিশ্বে বেশি পরিচিত। আমাদের দেশের প্রথিতযশা লেখক-অনুবাদক, মুনতাসির মামুন তাঁর বাংলা অনুবাদের সময় বহুল পরিচিত হওয়াতে ‘দি-আউটসাইডার’ নাম দিয়েই প্রকাশ করেন।

গল্পসংক্ষেপে, মরসোঁ আলজেরিয়ার এক অতি সাধারণ যুবক, যে ছিলো সামাজিক এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে একা ও অচেনা। মায়ের মৃত্যুর পর যথাযথ আবেগ দেখাতে পারে নি বলে সে শুরু থেকেই আবেগহীন এক এইলিয়েন হিসেবে আবির্ভূত হয়। ঘটনার পরিক্রমায় হত্যা করে আরবি হিসেবে পরিচিত এক ব্যক্তিকে। কোন বিশেষ কারণ ছাড়াই। এজন্য গ্রেফতার হয় মরসোঁ এবং মুখোমুখি হয় প্রথাগত বিচারের। এ হত্যার বিভিন্ন যৌক্তিক কারণ খুঁজে বের করে মরসোঁ’র সমাজ। তার সংগ্রাম ছিলো সেই যৌক্তিক কারণ আর আইনি ব্যবস্থার বিপক্ষে।

‘মা মারা গেছেন আজ। হয়তো গতকাল, আমি ঠিক জানি না।’ এভাবেই শুরু হয় উপন্যাসটি। প্রধান চরিত্রের দেওয়া প্রথম উক্তিটি বিভিন্নভাবে অগণিতবার ব্যবহৃত হয়ে বিখ্যাত হয়ে আছে সাহিত্য সমাজে। দর্শনভিত্তিক এ উপন্যাসটি এক গভীর তত্ত্বভিত্তিক উপন্যাস, যেখানে জীবনের অযৌক্তিকতা ও অস্তিত্ববাদকে উপস্থাপনা করা হয়েছে অত্যন্ত সহজ এবং বাস্তবিক বয়ানের মাঝ দিয়ে। মানুষ হিসেবে জীবনের অনুসন্ধান কতটুকু সার্থক তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে বিশ্বাসযোগ্য দৃষ্টান্ত ও উপমায়।

উপন্যাসের নায়ক মাসরো। মাসরোর নিজের বয়ানে লেখা উপন্যাস- দি আউটসাইডার। এখানে আমরা এক সাধারণ অবিবাহিত আফিস কর্মাচারীকে পাই। যার প্রধান সমস্যা হচ্ছে সে ভনিতা জানেনা। সমাজ আমাদের কাছে থেকে প্রতিনিয়ত ভান বা ভনিতা আশাকরে। যাকে সন্মানকরিনা তাকে সন্মানকরার ভানকরি। আবার ইশ্বরে বিশ্বাসী হয়ে হেন অনাচার নেই যা করিনা। ইশ্বরে অবিশ্বাসী হয়েও ধর্মমতে বিয়ে করি। এমন অজস্র ভানে ভরা আমাদের নিত্যাকার দিনলিপি। মাসরো এখানেই আমাদের থেকে ব্যাতিক্রম, সে ভান জানে না। যে জন্য সে মৃত মায়ের কফিনের পাশেবসে সিগারেট খায় আবার শবদেহ নিয়ে রাতজাগার অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসে ঘুমায়। কান্না করার সাধারণ রেওয়াজটাও তাকে দিয়ে হয় না। কিন্তু এর সবই সমাজ অন্যরকম চোখে দেখে ও টুকে রাখে।

দি আউটসাইডার-এর বঙ্গানুবাদে মুনতাসীর মামুন নায়ক মারসোর বয়ানে লিখছেন, ‘মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে মা’র নিশ্চয়ই মনে হয়েছিল মুক্তির তীরে কারও পৌঁছে যাওয়ার মতো, যে আবার নতুন করে জীবন শুরু করতে প্রস্তুত।’ কিংবা, ‘তাঁর কাছে গিয়ে আমি শেষবারের মতো বোঝাতে চাইলাম, আমার সময় বেশি নেই এবং যেটুকু আছে সেটুকু আমি ঈশ্বরের পিছে নষ্ট করতে রাজি নই।’অথবা, ‘তাছাড়া খুনের দায়ে অভিযুক্ত হওয়ার পর কাউকে যদি মরতে হয় মা’র অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় না কাঁদার জন্যে, তাতেও বা কী আসে যায়? কারণ অন্তিমে তো দুটোর পরিণতি একই?’

ঘটনাক্রমে সে খুনকরে বসে এক আরবকে। যার সাথে তার কোন পূর্ব শত্রুতা ছিল না। মাসরোর কোন পূর্ববর্তি ক্রিমিনাল রেকর্ডও নেই। কিন্তু তার শিক্ষা, কর্মজীবন ও অন্যান্ন সদগুনাবলিকে ছাপিয়ে বিচার প্রক্রিয়ার গুরুত্ত্বপূর্ন হয়ে উঠে মায়ের অন্তেস্টিক্রিয়ায় তার উদাসীনতা ও তার কান্না না করা। আর এসবই তার হৃদয়হীনতার অকাট্য দলিল হয়ে উঠে। উকিল ও ম্যাজিস্ট্রেট তাকে সাহায্য করতে চেয়েছে কিন্তু এখানেও নিজেকে রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ভান করতে সে ব্যার্থ হয়। আত্মপক্ষ সমর্থনের অনেক চেষ্টা সে শুধু একারণের করেনা যে পুরো বিচার প্রক্রিয়া তার কাছ থেকে সেটাই চাইছে। সরকারি উকিলের ঠাট্টা তার আত্মপক্ষ সমর্থনের মেজাজ নষ্ট করাতে সে চেষ্টাটাই ছেড়ে দেয় কয়েক দফা। পাদ্রী যখন তাকে বলে তোমার চেয়ে বড় বড় অপরাধীকে আমি তোমার অবস্থানে( মানে মৃত্যুদন্ডাদেশ কার্যকর হবার আগে) আত্মসমর্পন করতে দেখেছি। মাসরো পাদ্রীকে বলতে যাচ্ছিল যে, কারণ তারা ছিল অপরাধী। কিন্তু সে বলেনা, কারণ তার মনেপড়ে যায় যে সে একজন মানুষ হত্যার দায়ে অভিযুক্ত ও মৃত্যুদন্ডের জন্য অপেক্ষা করছে।

বইটির নায়ক মারসো একজন খুনি। আবার একইসাথে মারসো একজন প্রেমিক। মারসো একজন বন্ধুবৎসল মানুষ। মারসো ঈশ্বর নিয়ে মাথা ঘামাতে রাজি নন। বরং জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে ঘটে যাওয়া ঘটনাকেই নিরাসক্ত চোখে দেখতে চান। যুদ্ধোত্তর সমাজ, ধর্ম ও বিজ্ঞানের দ্বন্দ্ব, দর্শনের মধ্যচারিতা, জীবন সম্পর্কে নির্মোহ-নিরাসক্ত দৃষ্টি অর্জনের ক্ষমতার মধ্যে যে লড়াই, সেই বহুযুদ্ধের নায়ক মারসো।

এই মারসো রক্ত-মাংসের মানুষ। প্রেম-কাম জাগ্রত জীবনের মানুষ। সেইটেই তার বড় পরিচয়। সবকিছুর মধ্যে থেকেও না থাকেন যিনি, আবার না থেকেও সবকিছু তারিয়ে তারিয়ে দেখেন যিনি- এই রকম শক্তিমান মানুষ বইটির নায়ক মারসো। দর্শনে, ঈশ্বরে, ভালোবাসায়, ক্রোধে, প্রেমে, কামনায়, কাতরতায়, বন্ধুবাৎসল্যে, খুনে, জিঘাংসায় এক অসাধারণ, সাধারণ মানুষ মারসো। যিনি প্রকৃতই একজন আউটসাইডার। যিনি প্রতি কালের, সব দেশের, সব সময়ের জিজ্ঞাসু মানুষ। যিনি জীবনকে ভালোবাসেন। মৃত্যুকে নয়।

যার অভিজ্ঞান হচ্ছে, ‘কোনো রকম পাপ সম্পর্কে আমি সচেতন নই, যা জানি তা হলো ফৌজদারি অপরাধের জন্যে আমি অভিযুক্ত।’

তাই, আমার মতে, মরসোঁ পতিত নয়, বরং একজন দুঃখী এবং অনাবৃত মানুষ, যে এমন এক সূর্যকে ভালোবাসে যার আলো দূর করে দেয় সব ছায়া। তাকে একজন আবেগ বিবর্জিত মানুষ মনে করাটা ঠিক হবে না, বরং সে এক অবিচল ও নিগূঢ় ভালোবাসা দ্বারা তাড়িত: পরম এবং সত্যের প্রতি ভালোবাসা। জীবন ও অনুভূতিজাত এই সত্য আজো সমাজের চোখে ক্ষতিকর মনে হলেও, এটাকে বাদ দিয়ে আত্মজয় কিংবা বিশ্বজয় কখনোই সম্ভব হবে না।

আলবেয়ার কাম্যু তার এই অসাধারণ উপন্যাসে দেখিয়েছেন মাসরোরা আমাদের এই জটিল সমাজে মূলত আউটসাইডার। একজন বহিরাগত। তার মাকে সে যখন বৃ্দ্ধাশ্রমে দিয়ে আসে, তখন প্রতিবেশিরা তার সমালোচনা করে । কিন্তু, তার মধ্যে মায়ের জন্য যে একাকীত্ব, তার কোন সমাধান তারা দেয় না। মায়ের জন্য কান্না না এলেও সমাজ চায় মাসরো অন্তত কান্নার অভিনয়টুকু করুক। দুঃখ ভুলতে ভালবাসাকে কাছে টেনে নিলেও সমাজের আপত্তি থেকে যায়। আর সবচেয়ে অশ্চর্য্য যুক্তিহীনতা হল পুরো বিচার প্রক্রিয়াতে সব কিছু ছাপিয়ে এসবই হয়ে উঠে মাসরোকে একজন ঠান্ডা মাথার খুনি প্রমানের প্রধান কারণ। মাসরোকে আসলে খুনের সাজা দেয়া হচ্ছে না তার ভানহীন জীবনের ঔদ্ধত্তের সাজা দেয়া হচ্ছে সেই প্রশ্নটিই বড় করে রেখে গেছেন লেখক তার এই কালজয়ী উপন্যাসে।

জীবন সাধাসিধে সহজ এবং অভিনয়হীন হোক, লেখক হয়তো তাই বলতে চেয়েছেন। হযতো চেয়েছেন মুখোশপড়া একজন মানুষের চেয়ে হত্যাকারী ও দোষগুণ সম্পন্ন মাসরোকে প্রকৃত মানুষের জায়গাটি দিতে। মানুষ হয়ে উঠুক সত্যিকারের মানুষ। ফরাসী লেখক আলবাখ ক্যামি হয়তো এই প্রার্থনাটুকুই রেখে যেতে চেয়েছেন। আমিও সেরকমই প্রত্যাশা রাখি।

মন্তব্য করুন