স্ট্রিট ফটোগ্রাফির অন্দরমহলে আপনাকে নিয়ে যাবেন আলোকচিত্রী মোঃ এনামুল কবির

মোঃ এনামুল কবির। ১২১ ক্লিকসের সাথে বিস্তারিত আলাপ করেছেন স্ট্রিট ফটোগ্রাফির বিভিন্ন রকমের সুক্ষ ও গভীর বিষয় নিয়ে। কথা বলেছেন নিজের আলোকচিত্রের ভিন্ন ধরণ ও যে বিষয়গুলো তার ফটোগ্রাফিকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছে, সেসব নিয়ে। অনেকের মতো কীভাবে স্ট্রিট ফটোগ্রাফি তার কাছে বিশেষ ভালোবাসার একটি জায়গা হয়ে উঠলো, সেটা নিয়েও খোলাখুলি জানিয়েছেন আমাদের। তার আলোকচিত্রে সবসময়ই একধরণের ভিন্নধর্মিতা কিংবা জাক্সটাপজিশনের ছাঁপ থাকে। কখনো এই অনুষঙ্গটি ছবির বিষয়বস্তুগুলোর মধ্যে একধরণের খেয়ালি বৈপরীত্য তৈরী করে। আবার কখনো সৃষ্টি করে মনোমুগ্ধকর সাদৃশ্য। আলাদা বিষয়বস্তুর সমধর্মী চিত্রায়ণ এই আলোকচিত্রীর বিশেষ বৈশিষ্ট্য। সাক্ষাৎকারটি আপনাকে অনুপ্রেরণা দেবে। এখনই পড়ে নিতে পারেন।

অনুগ্রহ করে পাঠকদের কাছে আপনার পরিচয় তুলে ধরবেন?
হ্যালো ১২১ ক্লিকসের পাঠক! আমি মোঃ এনামুল কবির। বাংলাদেশ থেকে বলছি। খুলনা বিভাগের ঝিনাইদহ জেলার কোটচাঁদপুর নামের ছোট্ট একটি শহরে আমার বেড়ে উঠা। আকারে ছোট হলেও চমৎকার সুন্দর শহর আমাদের কোটচাঁদপুর। বর্তমানে আমি রাজধানী ঢাকাতে বসবাস করছি। এখানেই আমার কর্মস্থল।

স্ট্রিট ফটোগ্রাফি কেনো করছেন? অন্যকিছু না কেনো?
আমার মনে হয়, স্টিট ফটোগ্রাফিতে যে অনিশ্চয়তা এবং উৎকন্ঠতা তৈরী হয় প্রতিমুহুর্তে, সেটি আমাকে মুগ্ধ করে। এই কৌতুহলই আমাকে স্ট্রিট ফটোগ্রাফিতে নিয়ে এসেছে। আপনি এখানে বলতে পারবেন না, ঠিক পরের সেকেন্ডে কী হতে পারে। আপনার ফটোগ্রাফে বা ছবিতে কোন বিষয়বস্তুকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা আপনি রাখেন না। এরা স্বাধীন। ইচ্ছেমতো ফ্রেমে এসে হাজির হয়। স্ট্রিট ফটোগ্রাফি – আলোকচিত্রের অন্য বিভাগগুলোর মতো নয়। যেখানে একটি ছবিকে প্রয়োজন অনুপাতে সাজিয়ে গুছিয়ে সুন্দর করে তোলা সম্ভব হয়। আমার কোন পূর্ব ধারণা থাকে না যে, ছবিটি দেখতে কেমন হতে পারে। চিত্তাকর্ষক বা মুগ্ধ কোন ফটোগ্রাফ তৈরীর খেলা নয় এটি। আর, এখানেই স্ট্রিট ফটোগ্রাফির আসল চ্যালেঞ্জ।
বেশিরভাগ দিনই আমাকে শূন্য হাতে ফটোওয়াক থেকে বাসায় ফিরতে হয়। ক্যামেরার মেমোরি কার্ডে পরিশ্রমের সমমানের, দেখানোর মতো কোন ছবিই থাকে না। আমাকে এই অনুভূতির সাথে মানিয়ে নিতে হয়েছে। স্টিট ফটোগ্রাফি আমাকে শিখিয়েছে, কীভাবে ধৈর্য্যশীল হতে হয়। কীভাবে কঠিন সময়ে পজিটিভ থাকতে হয় এবং সবসময় হাসি ধরে রাখতে হয়, এইসবকিছুই আমি শিখেছি। এই শিক্ষণ শুধুমাত্র ফটোগ্রাফির ক্ষেত্রে নয়, বরং বাস্তব জীবনে এর প্রয়োগ আমি, রাস্তার ছবিতোলা-জার্ণি থেকেই শিখেছি। এটি আমাকে একজন পরিপূর্ণ মানুষ হতে সাহায্য করে।

আপনার বেশিরভাগ ছবিতে সাজানো বিষয়বস্তুর বিপরীত উপস্থাপন কিংবা অন্যভাবে বললে জাক্সটাপজিশনের উপস্থিতি থাকে। এতো নিখুঁতভাবে ফ্রেমগুছানোর দক্ষতা আপনি কীভাবে অর্জন করেছেন?
আমি আমার ছবিকে খুব সংক্ষেপ, সহজ ও সংযোগধর্মী রাখতে পছন্দ করি। অল্পকিছু বিষয় নিয়ে সবচে ভালো ফলাফল পাওয়ার চেষ্টা করি। আপনি এটাকে ‘মিনিমাল এপ্রোচ’ কিংবা ‘আড়ম্বরহীন ধরণ’ বলতে পারেন। যদিও চলতি মতামত অনুসারে আমার ছবি মিনিমালিস্ট কিংবা খুব সাধারণ না। ছবির সকল বিষয়বস্তু ও উপাদানসমূহকে নিজের সহজাত অনুপ্রেরণার মাধ্যমে, সুবিন্যস্ত বা সাজানোর প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ সময়ধরে মনোযোগী অনুশীলনের পরিণতি । যার মাধ্যমে আলোকচিত্রে ভিজ্যুয়াল হারমোনি কিংবা দৃষ্টিগত ঐকতান তৈরী হয়। দর্শকের চোখে একরকম ভালোলাগাবোধ জন্ম নেয়।
প্রতিদিন আমি চেষ্টা করি অভিজ্ঞ ও নতুন আলোকচিত্রীদের ছবি দেখতে। আমার নিজের মধ্যে তাদের জ্ঞান কিংবা ফটোগ্রাফিক-সেন্সকে ধারণ করি। আপনি চাইলে এটিকে ‘অনুপ্রাণিত হওয়ার পদ্ধতি’ বলতে পারেন। এই পদ্ধতিটি সেরা ফলাফল পাওয়ার ক্ষেত্রে সবময়ই আমাকে সহযোগিতা করে থাকে।

স্ট্রিট ফটোগ্রাফির ভবিষ্যত কেমন বলে আপনি মনে করেন?
স্ট্রিট ফটোগ্রাফির ভবিষ্যত? বেশ ওজনদার প্রশ্ন হয়ে আমার দেশে স্ট্রিট ফটোগ্রাফি এখনো খুব বেশি জনপ্রিয় না। যদিও অবস্খার পরিবর্তন ঘটছে। অনেকেই ইদানিং স্ট্রিট ফটোগ্রাফিতে আগ্রহী হচ্ছে। ধীরে হলেও একটি আর্টফর্ম হিসেবে স্থান তৈরী করছে স্ট্রিট ফটোগ্রাফি।
বিশ্বব্যাপি, স্ট্রিট ফটোগ্রাফি কমিউনিটি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিদিন সারা পৃথিবী থেকে অসংখ্য ভালো ছবি আমরা দেখতে পাচ্ছি। কম করে হলেও কিছু অনলাইন প্লাটফর্ম চালু আছে, যেখানে অভিজ্ঞ এবং নবাগত আলোকচিত্রীরা অবাধে যোগাযোগ করতে পারছে। স্ট্রিট ফটোগ্রাফির বিভিন্ন বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। লোকজন নিজেদের চিন্তা-ধারণা আদান-প্রদান ও একজন অন্যজনের ছবির আলোচনা-সমালোচনার মধ্য দিয়ে শিখতে পারছে।
আমি মানে করি, স্ট্রিট ফটোগ্রাফি পরিভাষাটি বেশ রহস্যজনক কিংবা দুর্বোধ্য। ভিন্ন ভিন্ন মানুষের কাছে এর ভিন্ন ভিন্ন অর্থ আছে। একটু বিস্তারিতভাবে যদি বলি, আমি নিশ্চিত যে, অনেক বড়ো ফটোগ্রাফাররা নতুন ধরণের আইডিয়া নিয়ে আসবেন। স্ট্রিট ফটোগ্রাফির পূননির্মান হতে থাকবে। এই ক্ষেত্রটি ক্রমাগত আরো বিস্তার লাভ করবে।

আলোকচিত্র ধারণে আপনি কোন ধরণের সরঞ্জাম (গিয়ার) ব্যবহার করেন?
আমি একটি ক্রপ-সেন্সর ক্যানন ৫৫০ ডি এবং ক্যামেরার সাথে দেয়া ১৮-৫৫ এমএম লেন্স ব্যবহার করি।

কাজের ক্ষেত্রে বর্তমান সময়ের অন্যান্য স্ট্রিট ফটোগ্রাফারদের থেকে, কীভাবে আপনি নিজেকে আলাদা রাখতে চান?
সত্যি বলতে আমার কোন পরিকল্পনা নেই। ইউনিকনেস কিংবা অনন্য বৈশিষ্ট্য সাধারণত স্টাইল বা ধরণ হিসেবে চলে আসে। যেটা প্রকৃতিগত বা স্বাভাবিক প্রবণতা থেকেই তৈরী হয়। জোর করে এটাকে আনা সম্ভব না। আলোকচিত্রের ক্ষেত্রে এটি একধরণের ব্যক্তিগত প্রকাশ ধরণ বা নিজস্ব বক্তব্যের জায়গা। একজন কীভাবে তার পৃথিবীকে দেখেন, সেটাই তার অনন্য বৈশিষ্ট। অন্যদের সাথে যেটা কখনোই মিলবে না।
আমি সবসময়ই আমার আলোকচিত্রকে উপভোগ করি। আমার যা ভালো লাগে, আমি তাই ছবিতে তুলে রাখি। ডিসাইসিভ মোমেন্ট বা চূড়ান্ত মুহুর্ত থেকে শুরু করে একটি কুকুরের পোর্ট্রেট, সবকিছুই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আমি আমার মাথার মধ্যে সম্পাদকের মনোভাবকে আসার অনুমতি দিই না, যে সম্পাদক আমার ছবি তোলাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। বরং আমি আমার সহজাত ভাবনাকে সুযোগ দিই ফ্রেমকে অনুধাবন করতে। যাতে আমার ফটোগ্রাফার মন সময়মতো সবকিছুকে ধারণ করে ফেলতে পারে। যখন থেকে আমি ছবি তোলা শুরু করি, তখন থেকেই এই অনুশীলনটি আমি করে আসছি। ৩ বছর ধরে একই পদ্ধতির সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিয়েছি আমি।
এখনো নিজেকে সেই ছোট্ট শিশুর মতো মনে করি, যে পৃথিবী সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানে না। এবং, তার কাছে এই বিশ্বজগত একটি চমৎকার আনন্দময় স্থান। আমি সবসময় নিজের মধ্যে ক্রমাগত শিখে যাওয়ার আগ্রহ অনুভব করি। যে শিক্ষা আমাকে ফটোগ্রাফার হিসেবে প্রতিনিয়ত বেড়ে উঠতে সাহায্য করে। জেফ, রেমির মতো বিশ্বের নানা প্রান্তের উপকারী বন্ধুরা আমাকে আলোকচিত্র নিয়ে শিখতে সহযোগিতা করে। তাদের চিন্তা-ভাবনা, ধ্যান-ধারণা আদান-প্রদানের মাধ্যমে তারা আমার জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করে।

আগামী দিনে যারা ফটোগ্রাফার হতে চায়, তাদের জন্য এনামুলের কোন পরামর্শ আছে কি?
বিশুদ্ধ ও নতুন কিছু ভাবুন, চমৎকার ও নতুন কিছু তুলুন। অন্যরা কী ছবি তুলছে, কীভাবে তুলছে, সেসব ছবি আর না তুললেও চলবে। যখন ক্যামেরায় আপনাকে একই বিষয় ধারণ করতেই হবে, তখন এমনভাবে তুলুন, এমন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখান যা কেউ কখনো কেউ তুলেও নি এবং দেখেও নি।

আপনার অনুপ্রেরণা কারা?
ইমতিয়াজ আলম বেগ।। বাংলাদেশে মিউজিক ফটোগ্রাফির গুরু। তিনি আমার সবচে বড়ো অনুপ্রেরণা। যদি আমি এই অসাধারণ মানুষটির সাথে পরিচিত না হতাম, তাহলে ফটোগ্রাফির আনন্দ ও লাইফস্টাইল আমি কখনোই পেতাম না। সাকিব প্রাটওয়ে, কানাডার একজন বাংলাদেশি আলোকচিত্রী। শুরুর দিনগুলোতে আমাকে নিজের পথ খুঁজে নিতে সাহায্য করেছে। আমরা এখনো খুব ভালো বন্ধু।
মুহাম্মদ ইমাম হাসান ও ফায়সাল বিন রাহমান শুভ- আমার আরো ২ জন সঙ্গী। আমরা তিনজনই ইনসাইট কালেক্টিভ নামক একটি সংগঠনের সদস্য। এরা দুজনই উপকারী বন্ধু ও চমৎকার ফটোগ্রাফার। তাদের সাথে রাস্তায় হাঁটা, ছবি তোলা কিংবা চা খেতে খেতে ফটোগ্রাফি নিয়ে আড্ডা দেয়া সবসময়ই আনন্দের।
তারপর, সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা আরো অনেক গুরুতূল্য আলোকচিত্রী আছেন। যেমন, ট্রেন্ট পার্কে, এলিয়ট এরউইট, উইলিয়াম ক্লেইন, ব্রুস গিলডেন, মাসাহিসা ফুকাসে। অল্প কয়েকজনের নাম উল্লেখ করলাম। তাদের ‘কাজ-দেখা’ অন্যরকম অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়।

১২১ ক্লিকসের সাথে থাকার জন্য আবারো ধন্যবাদ জানাচ্ছি। সবশেষে কিছু বলতে চান পাঠকদের উদ্দেশ্যে?
আমাকে এখানে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য ১২১ ক্লিকসকে ধন্যবাদ। একজন ভালো ফটোগ্রাফার হওয়ার চাইতে একজন সত্যিকারের ভালো মানুষ হওয়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।


আপনি মোঃ এনামুল কবিরকে ইন্টারনেটে খুঁজে পাবেন:
ওয়েবসাইট
ফেসবুক
ইনসাইট কালেক্টিভ
ফ্লিকার

কপিরাইট:
এই পোস্টে ব্যবহৃত সকল ছবির কপিরাইট মোঃ এনামুল কবিরের। মূল মালিকের স্পষ্ট অনুমোদন ব্যতিত এগুলোর পুনরুৎপাদন, এমনকি আংশিক হলেও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।


এই সাক্ষাৎকারটি 121clicks এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত Md.Enamul Kabir – This Bangladeshi Photographer Takes You Deep Into Street Photography শিরোনামের ইন্টারভিউর বাংলা অনুলিপি। মূল ইন্টারভিউর স্বত্ত্ব 121clicks এর।  ইংলিশ ভার্সনটি পড়তে পারেন এই লিঙ্ক থেকে

মন্তব্য করুন