ওস্তাদ হোটেল

ওস্তাদ হোটেল; বিরিয়ানির ঘ্রাণ যেখানে মানুষের গল্প বলে

যে কেউ অন্যের পেট ভরানোর ক্ষমতা রাখে। কিন্তু, তাদের মন ভরানোর ক্ষমতা থাকে কয়জনের!

ওস্তাদ হোটেলের প্রবীণ মালিকের কন্ঠে এই সত্যভাষণ আমাকে চমকে দেয়। কেরালার কোন এক সাগর তীরের ছোট্ট এক হোটেল। যেখানে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ খেতে আসে। পাশেই লম্বা হয়ে আকাশের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো ফাইভ স্টার হোটেল বিচ বে ইন্টারন্যাশনাল। তাদের সিগনেচার আইটেম মালাবারি বিরিয়ানি। সেই বিরিয়ানির কারিগর থাকেন এই ওস্তাদ হোটেলে। ওস্তাদ কারিম ক্কা। খুব সাধারণ একটা গল্প। একজন শেফের বাবুর্চি হয়ে ওঠার গল্প। কেরালা কিংবা কোন শহরতলীর খুব সাধারণ এই গল্পে আমি মানুষ দেখি। মানুষের সাথে জীবনের বেড়ে ওঠা দেখি।

ফাইজাল কিংবা ফাইজির চরিত্রে অভিনয় করা দুলকার সালমান আমার চোখে আর সালমান থাকে না। ওস্তাদ হোটেলের মাটির চুলার সামনে দাঁড়িয়ে বিরানীর পাতিলে আটার লক লাগাতে থাকা ওস্তাদ কারিমের দ্বীতিয় জন্মের অবতার হয়ে যায়। অঞ্জলি মেননকে আমি জানি না। মালায়লাম মুভি খুব বেছে বেছে দেখা হয়। সেকারণেই হয়তো পরিচালক আনোয়ার রশীদকেও কখনো চেনা হয় নি। লিস্টিন স্টেফেন প্রযোজনা  করেছেন মুভিটি। তাকেও জানতাম না কখনো। তবে, এবার জেনেছি। ওস্তাদ হোটেল আমাকে জানিয়ে দিয়ে গেছে তাদের কথা।

বেশকিছুদিন ধরে শেফ, রান্না, কুজ্যিন ইত্যাদি বিষয়ে বেশ আগ্রহ বোধ করছিলাম। কুক আপ এ স্টর্ম নামের হংকং বেইজড একটি মুভি আমার মধ্যে রান্নার প্রতি মনোযোগ জাগিয়ে তোলে। নিজে টুকটাক শখ করে রান্নাও করতে শুরু করি। আগে থেকে কিছুটা অভ্যাস থাকায় খাওয়ার যোগ্য কিছু একটা হয়। সেই সূত্র ধরে মাস্টারশেফ ইন্ডিয়া, শেফ ভিকাশ খান্না, শেফ ভাদুরিয়া সহ আরো অনেকের পেছনের গল্প দেখি। মাঝখানে হিন্দি একটি সিনেমা রিলিজ পেলো শেফ নামেই। মূল স্টোরি জন ফেভরুউ এর। হিন্দিতে বানিয়েছেন রিতেশ শাহ, সুরেশ নাইয়ার এবং রাজা মেনন। সাইফ আলি খানের অভিনয়ে বেশ উপভোগ্য লেগেছিলো।

আমি আসলে ঠিক রেসিপি বেইজড কিছু খুঁজছি না। আমি খুঁজছি শেফদের পেছনের গল্প। যে গল্পগুলো কখনো দেখা যায় না। ফাইভ স্টার কিংবা দামী হোটেলের চকচকে ক্রোকারিজ আর চোখধাধানোর পরিবেশনের আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকা সেইসব স্টোরিগুলোই আসলে ফ্লেভার যুক্ত করে দেয় সাধারণ খাবারের ভাঁজে ভাঁজে। শেফ ভিকাশ খান্না যখন বলেন, অমৃতসরের ছোট গলিতে মায়ের সাথে দিনের পর দিন ছোলা-ভাটুরা বিক্রি করে গেছেন, কিংবা মায়ের অসুস্থতার সময়ে সেই কিশোর খান্না –  রান্না করছেন লাকড়ির চুলায় কিংবা অল্প অল্প করে পয়সায় দাম নিয়ে দিনের শেষে মেলাচ্ছেন নিজেদের হিসাবের খাতা, তখন অদ্ভূত লাগে। যে ভিকাশ খান্নার নিউইয়র্কের ‘জুনুন রেস্টুরেন্টে’ খাবার খেতে যাওয়ার জন্য ছয়মাসের লম্বা ওয়েটিং লিস্ট পাড় হতে হয় এখন, সেই ভিকাশের অমৃতসরের দিনগুলো কী ভীষণ কষ্টকর ছিলো! ধীরে ধীরে জীবনের নানারকম ফ্লেভার থাকে বলেই হয়তো এই মানুষগুলো স্পেশাল কিছু হন। ওস্তাদ হোটেলে কারিম ক্কার বিরিয়ানিতেও তেমনই জীবনের ঘ্রাণ আসে ইনগ্রিডিয়েন্টের ঘাণের আড়াল থেকে।

২০১২ এর জুনে মুক্তি পাওয়া ‘ওস্তাদ হোটেল’ মুভিটির স্টোরিটেলিং খুব সাধারণ। কিন্তু, সেই মালাবারি বিরিয়ানির মতো কোথায় যেনো স্পেশাল ফ্লেভার এড হয়ে গেছে। একটানা দেখা শেষ করে মনে হচ্ছিলো, নাহ! শেষ হলো না। আসলে এই জার্ণি শেষ হয় না কখনোই। মালায়লাম ইন্ড্রাস্ট্রির ঝানু অভিনেতা বৃদ্ধ কারিমের চরিত্রে অভিনয় করা থালিকান, কিংবা তাজ হোটেলের শেফের চাকরি ছেড়ে আসা অভিনেতা জায়াপ্রকাশ, ফাইজির চরিত্রে দুলকার সালমান সবাই নিজেদের জায়গায় চমৎকার মানিয়ে গেছেন। নায়িকার চরিত্রে নিত্য মেনন খুব বেশি আলো ছড়িয়েছেন বলে মনে হয় নি। বরং, এই মুভির দুর্বল দিক বলে  মনে হয়েছে একটি বিষয়কেই।

এখানের নারী চরিত্রগুলোকে স্বাধীনভাবে উপস্থিত হতে দেখি নি। কারিমের স্ত্রী, ফাইজির প্রেমিকা, কারিমের ছেলে আব্দুল রাজ্জাকের স্ত্রী কাউকেই খুব বেশি উজ্জ্বল মনে হয় নি। হতে পারে, মালায়লাম সমাজের সামাজিক বিশ্বাস, মূল্যবোধ, নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা ধর্মীয় বিবেচনাবোধ থেকে পরিচালক আনোয়ার রশীদ এভাবেই দেখাতে চেয়েছেন। অথবা, ওস্তাদ হোটেলকে , কারিম ক্কা, ফাইজি, রাজ্জাক এই তিনটি চরিত্রের পারস্পরিক সম্পর্ক, মিল-অমিল, মানসিকতার গড়ন ইত্যাদির জটিলতা কিংবা এপিয়ারেন্স এর প্রতি বেশি মনোযোগি থাকায় অবচেতনে কিছুটা অবহেলা করে গেছেন অন্যসব কিছু..। হেলেন কেলার প্রতিবন্ধি স্কুলে যখন শিশু-কিশোরদের খাবারের পর ধন্যবাদ দিতে দেখি ফাইজিকে, তখন মনে হয়, রান্নার একটি সার্বজনীন ও এ্যাবস্ট্রাক্ট কমিউনিকেশন ফর্ম আছে। এটি একধরণের মানসিকভাবে সংযুক্ত ভাষার সৃষ্টি করে। যার মধ্য দিয়ে পৃথিবীর সব মানুষ, সব সাংস্কৃতির সাথে যোগাযোগ সম্ভব। একজন বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিও সেই ভাষা অনুবাদ করতে জানে।

সিনেমাটোগ্রাফি খুব অসাধারণ ছিলো বলে মনে করি না। টেকনিক্যাল অনেক কিছু নিয়েই সমালোচনা করা সম্ভব হয়তো। শব্দ নিয়ে বেশ সহজ কিন্তু, সুন্দর কিছু করার চেষ্টা করেছেন। গানগুলোতে ফিউশনধর্মী মিক্সিং এর আইডিয়া চমৎকার লেগেছে। ঢাকার একটি ছোট্ট বাসায় বসেও আমি ওস্তাদ হোটেল, সেই এলাকা, সমুদ্রের পাড়, কারিম ক্কার সাথে মরুভূমিতে সফর, হুট করে বৃষ্টি সবকিছুই যেনো অনুভব করতে পারছিলাম। এখানেই মুভিটির সার্থকতা।

জীবন আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে এই ব্যস্ত সময়ে, আমরা বেশিরভাগ মানুষই তা জানি না। অন্যদের ভাবনা, রুচি, চিন্তা ধার করে চলছে আমাদের নিত্যদিন। আমি যা পছন্দ করি বলে ভাবছি, হয়তো সেটা কখনোই আমার পছন্দের ছিলো না। এই মেট্রোপলিসের সবচে বড়ো সমস্যা হচ্ছে আইডেন্টিটি ক্রাইসিস বা অস্তিত্বের সংকট। নিজের রূট কোথায়, কোন পথটা আমার নিজের, কী করতে ভালোবাসি, কী চাই, এইসবের কিচ্ছু আমাদের এখন আর জানা থাকে না। ওস্তাদ হোটেলের মালাবারি বিরিয়ানির ঘ্রাণ আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছিলো, এইখানে আমাকে মানাচ্ছে না। আমার শেকড় এই শহরে হয়তো না। হয়তো কোন খুব সাধারণ অজপাড়া গায়ে। যেখানে বেঁচে থাকা আনন্দের। অভাব থাকলেও যেখানে জীবন উৎসব নিয়ে নেমে আসে। যেখানে ওস্তাদ হোটেলের কারিম ক্কা, আশ্রমের বাবুর্চি নারায়ান কৃষ্ণান কিংবা আনন্দের জন্য গান গাওয়া ব্যান্ড ‘কাল্লুম্যাকাইয়াস’ এর মতো অসংখ্য মানুষ আছে। ঝাঁ চাকচকে ঐশ্বর্যের বাইরেও অন্য এক পৃথিবী  যেখানে অভিনন্দন জানায় প্রতিটি দিনকে।

নাহ! আমি শেফ হয়ে যেতে পারছি না। ওস্তাদ হোটেলের কারিম ক্কা কিংবা প্যারিসের জব ছেড়ে দেয়া ফাইজি হওয়ার সাহস আমার নেই এখনো। তবে, নিজের ভেতরের হুইসপার কিংবা আত্মার ধ্বনি টের পাই। মালায়লাম মুভির ‍ওস্তাদ হোটেল হয়তো আমার জন্যও পৃথিবীর কোথাও অপেক্ষায় আছে। সেখানে আমি হয়তো শেফ হয়ে যাবো কিংবা নিজের সত্যিকারের পছন্দের কাজ শেষে দুপুরে বিরিয়ানি খেতে আসা কোন কাস্টোমার হবো অনায়াসে। তাই, ওস্তাদ হোটেল মুভির প্লেটাইম শেষ হলেও আমার মাথার মধ্য থেকে মালাবারি বিরিয়ানির ঘ্রাণ কিংবা কারিম ক্কা মুছে যায় না।  ২ ঘন্টার ৩০ মিনিটের অসাধারণ এই মুভিটিতে বিরিয়ানির ঘ্রাণ জীবনের গল্প বলে যেতে থাকে আমাকে।


সিনেমা:- Ustad Hotel
পরিচালক:- Anwar Rasheed
প্রযোজক:- Listin Stephen
গল্পকার:- Anjali Menon
সিনেমাটোগ্রাফার:- Loganathan Srinivasan
অভিনয়শিল্পী:- Thilakan, Dulquer Salmaan, Siddique, Mamukkoya, Nithya Menon, Jayaprakash, Lena, Manian Pillai Raju, Assim Jamal, Jinu, Jishnu, Praveena, Meghna Nair, Mythili, Sija Rose,
Asif Ali(Cameo) etc
রিলিজ ডেট:- ১৩ ই জুলাই, ২০১২
রানিং টাইম:- ২ ঘন্টা ৩১ মিনিট
আইএমডিবি রেটিং:- ৮.৪/১০

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

* ছবির অক্ষরগুলো উপরের ঘরে লিখুন