গল্পের হকার = গল্পকার

এই গল্পটা অমিয়র।ওর সাথে আমার দেখা হয়েছিলো ভার্সিটিতে। একদিন চায়ের আড্ডায় দারুন স্বতঃস্ফূর্ততা নিয়ে একজনকে কথা বলতে দেখে অবাক হওয়ার পাশাপাশি ভালো লাগলো। শাহজাদা আর শাহেরজাদীর গল্প চলছিলো সেদিনের তপ্ত দুপুরে। ফোরজি জেনারেশনকে হাজার রাতের আলিফ লায়লার কাহিনী শোনানোর মতো সাহস ক’জনের হয়…। সেই থেকে শুরু..। ক্যাম্পাসের এখানে সেখানে, চায়ের গোলমহল কিংবা মুক্তমঞ্চে, কারণে অকারণে আমাদের দেখা হয়ে যেতো..। আনমনে দাঁড়িয়ে কখনো দেযালের ছাপচিত্র অথবা নিতান্ত অবহেলায় মুছে যাওয়া রাস্তা পেইন্টের সামনে দাঁড়িয়ে অমিয়র নোটবুকে লিখে যাওয়ার দৃশ্যটা অভ্যাসের মতো হয়ে উঠলো।

একদিন জানতে চেয়েছিলাম, অমিয়, কী হতে চাও তুমি? লেখক? সাহিত্যিক? কবি? মাঝখান দিয়ে ঈশিতা ফোঁড়ন কেটে বলেছিলো, আরে বাদ দেতো..ও হবে ছ্যাকা খাওয়া আতেল..। বরাবরের মতো নির্বিকার হেঁসে অমিয় বলেছিলো, আমি গল্পের হকার হতে চাই। গল্পের হকার মানে! আমি স্টোরীটেলার হতে চাই। আমি শুনতে চাই মানুষের গল্প। দেখতে চাই তাদের নিত্যকার জমে উঠা গল্পের জগত। আমি কুড়োতে চাই পথে পথে পড়ে থাকা অসংখ্য গল্পের অমলিন শরীর। আমি স্পর্শ করতে চাই গল্পকে। গল্পের মোড়কে আটকে থাকা মানুষের আবেগ-অনুভূতি আর দুঃখ ও ভালোবাসাকে।

চমকে উঠেছিলাম সেদিন। মানুষের জন্য সময় কোথায় এই দ্রুত ধাবমান নাগরিক জীবনে! ক্লাসের অন্যতম মেধাবী ছাত্রটি যখন চকচকে ক্যারিয়ারের পরিবর্তে বলে উঠে গল্পের হকার হতে চাওয়ার কথা, তখন একজন নৈর্ব্যক্তিক পাঠক হিসেবে আমার চমকানোর অধিকার অবশ্যই আছে।

অমিয়র গল্পের সাথে পাল্লা দিয়ে ঘুরতে থাকে সময়ের চাকা। ওকে ওর সেই চিরচেনা অভ্যাসে দেখতে থাকি। অসংখ্য মানুষের সাথে গভীর মনোযোগে কথা বলা আর শোনা। তারপর লেখা। এর বাইরে অমিয়র জগতে শুধু একটুখানি ফাঁকা জায়গা ছিলো। সেখানে বাস আমাদের গল্পের নায়িকা অণিমার। অমিয় আর অণিমার মধ্যকার ভালোবাসার ধরণটা অন্যরকম হলেও আমাদের চোখে ছিলো মুগ্ধকর। চলতি ট্রেন্ডের মতো সেখানে দেখানো ভাব মোটেও ছিলো না। বেইবি কিংবা জানু জানু করে ফেনা তুলে ফেলার চেয়ে চুপচাপ বসে আকাশ দেখার বিলাসিতাটুকু ছিলো ওদের। কিন্তু, সেই গল্পের শেষটুকু অমিয় কিংবা অণিমা, কারোরই জানা ছিলো না। অমিয়র ধারণা, আমাদের চারপাশের অসংখ্য মানুষের হাজারো গল্পের ভিড়ে কোথাও অযত্নে পড়ে আছে ওদের গল্পের শেষটুকু।অন্যদের গল্প মেলাতে মেলাতে আলাদীনের চেরাগের সেই ফেরিওয়ালার মতো অমিয়ও পেযে যাবে তার গল্পটুকু।

সময় গড়াতে থাকে। গল্পের হকার অমিয়র বাড়তে থাকে গল্পের স্টক। দ্রুত চলার তৃষ্ণা নিয়ে বিরামহীন জেগে থাকা এই মেগাসিটিতে এখনো অমিয়র দেখা মেলে মানুষের ভিড়ে। কখনো শুনছে, কখনো লিখছে, কখনো শোনাচ্ছে..। অমিয়র গল্প এক্সপ্রেস চলছে..। হয়তো মিলে যাবে তার গল্পের শেষ অংশটুকু..। হয়তো স্টোরীটেলার আমাদের শোনাবে আরো অসংখ্য আধুনিক শাহেরজাদীর গল্প..।

# ছবি: shutterstock

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

* ছবির অক্ষরগুলো উপরের ঘরে লিখুন