গেরুয়া; এই গ্রাম ছেড়ে তোমরা কোথায় যেতে চাও?

“সুবর্ণ গ্রাম, গিয়েছ কি?
তবে একবার ঘুরে
দেখে এসো..” – আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ

সুবর্ণগ্রামে কাজল রেখার বাড়ি। আমার শৈশবও কেটেছে এখানেই। সত্যিকার অর্থে সুবর্ণগ্রাম নামের কোন গ্রাম নিয়ে আমি লিখছি না। বাংলাদেশের অসংখ্য গ্রামের একই রূপ রঙ ঘ্রাণ। বাতাসে ভেসে বেড়ানো খাঁটি ও সত্যিকারের জীবনের তীব্রতা সবখানেই সমানভাবে বয়ে যায়। জীবনানন্দের ধাঁনসিঁড়ির পাড়ের জনপদ, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহর সুবর্ণগ্রাম কিংবা সোজন বদিয়ার ঘাটের শিমুলতলী। সবগুলো গাঁয়ের দৃশ্য একই লিনিয়ার লাইনে একসাথে এসে মিশে যায়। সেখানে এখনো মানুষেরা বাস করে। নাগরিক জটিলতা সেখানে কঠিন ‍বিষ ছড়ায় না। আমিও এমন একটি গ্রামের গল্প লিখছি। গেরুয়া নামের এই গ্রামটি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের খুব কাছেই অবস্থিত। গেরুয়া মানে গৈরিক বর্ণযুক্ত বা গৈরিক বর্ণে রঞ্জিত। কিন্তু,  কে কবে এই নাম দিয়েছিলো গ্রামটির, সেদিনের সংক্ষিপ্ত অনুসন্ধানে তথ্যটি জানতে পারি নি।

পাতার ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া আঁকাবাঁকা খাল। ছবি: লেখক

পথ শুরু হতেই গ্রামের নৈসর্গিক পরিবেশ , কলাপাতা রঙ, ছোট্ট খালের হাঁটুভাঙা বাঁক, মৃদু বাতাসে সবুজ পাতার হেলদোল পরম আন্তরিকতায় স্বাগত জানালো। আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছিলো যেনো, শহুরে আমার সাথে বয়ে আনা নাগরিক বাহুল্যর চেয়ে এই সরলতার মূল্য যথেষ্ট বেশি। প্রবেশপথে পিচ ঢালাই রাস্তা চলে গেছে গায়ের একমাত্র বাজারের উপর দিয়ে। দুইপাশে দোকানের সারি, মানুষের আনাগোনা জীবনের কথা বলে।

গ্রামের প্রবেশপথ। পিচের রাস্তার দু’পাশে দোকানপাঠ। ছবি: লেখক

বাজারের চেহারা অন্য আর দশটা গ্রামের চেয়ে আলাদা কিছু ছিলো না। কিন্তু, অদ্ভূত একটা ব্যপার আমার দৃষ্টিতে ধরা পড়েছিলো। ব্যবসায়ীদের অধিকাংশই কিছুটা বৃদ্ধ। যুব বয়সী কাউকে বাজারের এই মেঝেতে বিছানো সদাই বিক্রির কারবারে দেখতে পাই নি। একজন স্থানীয় জানালেন, যুবকেদের বেশিরভাগেই শহরে কাজ করার জন্য চলে যায়। জীবন আমাদের কতোকিছুই না করতে শেখায়! এই বয়সে উনাদের বিশ্রামে থাকার কথা থাকলেও সেই সুযোগ কখনো আসেই নি!

স্থানীয় বাজারে কেনাবেচা চলছে। ছবি: লেখক

কিছুদূর যেতেই গাছের ডালে আটকে থাকা ব্রাজিলের পতাকার বেহাল দশা দেখে কষ্ট লেগেছে। যে দেশেরই হোক এভাবে অযত্নে কোন স্বাধীন পতাকা ফেলে রাখাটা ভীষণ অন্যায়ের কাজ। ব্রাজিলের মানুষজন এই দৃশ্যটি কেমনভাবে নেবে? স্বাধীনতার মূল্য যেকোন কারো কাছেই পতাকা তাদের জাতিগত অস্তিত্বের বিষয়। এই বিষয়টি মনে রাখাই মনে হয় উচিত। বিশ্বকাপ আসলে আমাদের এই অঞ্চলের মানুষজনের একধরণের উন্মাদনায় ভোগে। নিজেদের পয়সা খরচ করে ভিনদেশের পতাকা উড়ায় সগৌরবে। এইখানেই একই হয়েছে। কিন্তু, এই অবস্থাটি কোনভাবেই কাম্য নয়।

গাছের মাথায় অবহেলায় পড়ে থাকা ব্রাজিলের পতাকা। ছবি: লেখক

ব্রাজিলের প্রিয় তারকার রোনাল্দো কিংবা বিশ্বাকাপের উম্মাদনার সাক্ষ্য ছাড়িয়ে সামনে আসতেই দেখতে পেলাম খড়ের গাদা। কোল ঘেষে অবস্থান নেয়া্ পরিত্যক্ত গরুর ঘরে এখন জ্বালানীকাঠের আশ্রয়স্থল। এই খড়ের গাদাটা পিচের রাস্তার পাশে দাঁড়িয়েও সগৌরবে জানান দিচ্ছে নিজের অস্তিত্বের। কোন একটি পরিবারের অমূল্য সম্পদ গরুটিও হয়তো আছে কাছেপিঠে কোথাও।

খড়ের গাদা ও পরিত্যক্ত গোয়ালঘর। ছবি: লেখক

পাশেই মাটির ঘর। দেয়ালের রঙ দেখেই হয়ে হয়েছে, আমি কোন এনশিয়েন্ট টাইমের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। এই সময়ে মাটির ঘর এক ধরণের  পুরনো সময়ের কথা বলে। রোমান্টিকতা আছে হয়তো। আমার চোখে রোমান্টিকতার চেয়ে চোখে পড়েছে দারিদ্র্য। যে পরিবারটি এই মাটির ঘরে বসবাস করছে , তাদের কষ্ট, প্রতিদিনকার সংগ্রামের কথা আমাকে ছুঁয়ে দিচ্ছিলো। বৃষ্টির দিনে এই মাটির ঘরগুলো রক্ষণাবেক্ষন করার খরচ আর ঝামেলার কথা মনে হতে সৌন্দর্যের চেয়ে প্রয়োজনের তাগিদকেই গুরত্বের মনে হচ্ছিলো।

মাটির দেয়ালের ঘর। ছবি: লেখক

মাটির ঘরের দেয়ালের এই ফাঁটল দেখে কোনভাবেই সুন্দর কিছুর কথা আমার মাথায় আসে না। মনে হয়, হয়তো দারিদ্যের কঠিন আঘাত তাদের আবদ্ধ করে দিয়েছে একটি কঠিন গন্ডিতে। যেখানে দিন আসে খাবারের চিন্তায়। শীতের রাতে ঠান্ডা বাতাস ঘরে ঢুকে পড়ে অজান্তে। আমি দামী ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে যখন ছবি তুলছি এই ভাঙা দেয়ালের, তখন এইঘরে জন্ম নেয়া শিশুটি কি তার মৌলিক অধিকারগুলো পাচ্ছে? এই ভাবনা আমাকে কিছুটা অপরাধীও করে।

মাটির দেয়ালে অর্থের অভাবে মেরামত না করা ফাঁটল। ছবি: লেখক

মাটির ঘরের সীমানা ছাড়িয়ে সামনে এগুতেই নজরে পড়ে আকাশের পটভূমিতে দাঁড়ানো মোবাইলের নেটওয়ার্ক টাওয়ার। এই প্রযুক্তির অনুষঙ্গটি আমাদের যোগাযোগকে সহজ করেছে। কিন্তু , আসলেই কি তাই? এই দারিদ্যের মাঝখানে বেঁচে থাকার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কী হতে পারে! গেরুয়াতে ঘুরে বেড়ানো আমাদের হয়তো  গ্রাম ও তার সুন্দর পরিবেশ অনেক ভালো লেগেছে। কিন্তু, আমি দেখেছি সেখানের পরতে পরতে দারিদ্য আর জীবনের কঠিন অবস্থা।

মোবাইল ফোন কোম্পানীর নেটওয়ার্ক টাওয়ার। ছবি: লেখক

সরু রাস্তা ধরে আমরা গ্রামের আরো ভেতর দিকে যেতে থাকি। মাটির আরেকটা দেয়ালে একটি পাখির ছবি দেখে থামকে দাঁড়াই। পাখিটি কাঁচা হাতের আঁকা। যে  শিশুটি তাদের বাড়ির দেয়ালে এই পাখিটি এঁকেছিলো, হয়তো সে চেয়েছে পাখির মতো উড়তে। শত বাধার পরেও আমি এই আঁকা পাখিটিতে জীবনের ঘ্রাণ পাই। জীবন এখানে বেঁচে থাকে খুব সাধারণ আঁকা পাখির মধ্যে।

মাটির ঘরের দেয়ালে হাতে আঁকা পাখি। ছবি: লেখক

কষ্টের অনুভূতি সাথে নিয়ে আমাদের পথচলা চলতে থাকে। ছায়াঘেরা পথ দেখি। ভেতর বাড়ির দিকে চলে গেছে সরু পথ। দৃশ্যটি আমাকে আমাদের ফেলে আসা গ্রামের কথা মনে করিয়ে দেয়। যেখানে হয়তো কোন ছোট্ট শিশু স্বপ্ন দেখছে ভবিষ্যতের। সেই ভবিষ্যত কি আদৌ তাকে কখনো শান্তির জীবন এনে দিবে? নাকি আমাদের মতো গড়পরতা জীবনের ভিড়ে সেও হারিয়ে যাবে মানুষের মিছিলে?

বাড়ির দিকে চলে যাওয়া পায়েচলা পথ। ছবি: লেখক

প্রকৃতির এতো কাছে থাকায় সেই শিশুটি যে প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যের মাঝে বেড়ে উঠছে, ধন-সম্পত্তির অভাব কি সেই বিপুল ঐশ্বর্যের দানকে টিকে থাকতে দেবে? জানি না। শুধু আশা রাখি, প্রকৃতি নিশ্চয়ই তার সন্তানদের দেখে রাখবে।

পিচঢালাই রাস্তা ও পাশে মা-মেয়ের পথচলা । ছবি: লেখক

একজন মা তার মেয়ের সাথে পথ হেঁটে আসছে আমাদের দিকে। পিচের রাস্তায় এসে পড়ছে সকাল শেষের কিছুটা তেজি আলো। পাতার ফাঁক দিয়ে রোদের নকশা এসে পড়ছে রাস্তার জমিনে। পাশে দিয়ে আন্তরিক ভালোবাসায় মা-মেয়ের হেঁটে যাওয়া আমাকে আশাবাদী করে।

খরাজাল ও ফ্রেমের ভেতর দিয়ে দূরের ব্রিজ। ছবি: লেখক

খরাজালের উপস্থিতি ও তার মধ্য দিয়ে দূরে মাটি সড়কে ব্রিজে দাঁড়ানো আমাদের সবাইকে দেখতে পাচ্ছিলাম।  বিলের পানিতে কচুরিপানার সবুজ চাদর বর্ষা সময়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিলো। আমাদের গ্রামেও বর্ষাকাল শেষের সময়ে বিলে এমন করুচিপানা জমে থাকতো। চাচার নৌকাতে করে আমরা ভাই-বোনেরা মিলে ঘুরতে বেরুতাম বিকেল বেলায়। গেরুয়াতে সেদিন আমার শৈশবের সময়গুলো সিনেমার স্ক্রিণের দৃশ্যের মতো ভাসছিলো।

বিলের মাঝে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘর। ছবি: লেখক

বিলের প্রায় মাঝে কয়েকটি বাড়িঘর। বর্ষায় দ্বীপের মতো জেগে থাকে। যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম তখন হয়ে উঠে নৌকা। গ্রামপ্রধান এই দেশে এখনো গ্রামেই থাকে বেশিরভাগ জনগোষ্ঠী। কিন্তু, ক্রমশই গ্রামের পরিবেশের পরিবর্তন ঘটছে। সেই পরিবর্তন কখনো কল্যাণকর হচ্ছে। কখনো সার্বিকভাবে উপকার বয়ে আনছে না।

মা ও নানীর সাথে গল্পে নিমগ্ন একটি শিশু। ছবি: লেখক

রুগ্ন হয়ে যাওয়া ইটের রাস্তা। শেষপ্রান্তে মায়ের কোলে উঠার বায়না ধরেছে নাম না জানা শিশু। পাশে নানী দাঁড়িয়ে হাসছিলেন। সবুজের মাঝখান দিয়ে দূরের এই দৃশ্যটি গেরুয়া ছাড়িয়ে তখন বৈশ্বিক হয়ে যায়। স্থান-কাল-দেশ-জাতি সবকিছুর ভিন্নতা থাকতে পারে। কিন্তু, এই আন্তরিকতার ভেতরকার ভাষার কোন ভিন্নতা নেই।

কোথায় যাবে তুমি? যেখানে যাও
একই মাটিজল নীলাকাশ
জন্মভূমি যেন, দেশের তুলনাই
তোমাকে সাজে, এই গ্রামের থেকে যেই
ও গ্রামে যাও, তবু কোনও ভুল নেই
বাতাস একই বয় একই নীলাকাশ
– বিষ্ণু দে

মসজিদের গেইট ও মিনার। ছবি: লেখক

গেরুয়ার শেষ দিকে এসে দেখা মিললো মিরেরটেক মসজিদের। গেইটের দুইপাশে চন্দ্রাকৃতির দুটি মিনার আর মুসলিম স্থাপত্য নির্দেশক খিলানের সম্মিলন চমৎকার দৃশ্যের সৃষ্টি করছিলো। শহরের ঝাঁ চকচকে মিনারের চাকচিক্য চোখ ধাঁধিয়ে দিলেও শান্তি দেয় বলে মনে করি না। কিন্তু, এই গ্রামের সাধারণ মিনার ও তার আশেপাশের উপকরণগুলো এক ধরণের নিশ্চয়তাবোধের জন্ম দিচ্ছিলো। পল্লীকবি জসীমউদ্দিনের সোজন বদিয়ার ঘাট নামক কাহিনীকাব্যে শিমুলতলী গ্রামের যেমন বর্ণনা ছিলো, তেমন মনে হচ্ছিলো আমার।

হেন কালে দূর গ্রাম পথ হতে উঠিল আজান-গান
তালে তালে তার দুলিয়া উঠিল স্তব্ধ এ ধরাখান

কড়ই গাছের কাটা শেকড়। ছবি: লেখক

গাছ কেটে ফেলার চিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছে কড়ইয়ের শেকড়। বাড়ি বানানোর প্রয়োজনে জায়গা পরিষ্কার করতেই হয়তো এই উদ্যোগ। গ্রাম হলেও গেরুয়াতে দেখা গিয়েছে বেশকিছু ছোট আকারের পাকা বাড়ি, বিল্ডিং। যেসব স্থাপনা স্বচ্ছলতা ইঙ্গিত বহন করে। কিন্তু, প্রকৃতির জায়গায় যান্ত্রিকতা দখল করে নিচ্ছে গেরুয়াকেও। হারিয়ে যাচ্ছে গেরুয়া গ্রাম। এই নগরায়নকে আমি কোনভাবেই স্বাগত জানাতে পারি না। আমার কষ্ট হয় এটা ভেবে, একসময় হয়তো আগামী প্রজন্মকে গ্রাম দেখতে জাদুঘরে যেতে হবে।

একটি বিষয় আমাকে বেশ চিন্তিত করেছে। গ্রামে ইসলাম ধর্মাবলম্বিদের মসজিদ দেখেছি কয়েকটি। সুন্দর। কিন্তু, সেই অনুপাতে অন্যকোন ধর্মের উপাসনালয় নজরে পড়েনি। তারমানে কি এইখানে কখনো অন্যধর্মের অধিবাসীরা ছিলোই না? নাকি, সংখ্যগরিষ্ঠের চাপে তারা ঢাকা পড়ে গেছে? আমি সবসময়ই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পক্ষে। আমাদের গ্রামগুলোর বৈশিষ্ট্য একসময় এমনই ছিলো। সময়ের সাথে সাথে এই সহাবস্থান ও সুসম্পর্কের জায়গাগুলো আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক জটিলতায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে..।

গ্রামের ভেতরকার কাঁচা রাস্তা। ছবি: লেখক

সবুজের বেষ্টনির মধ্য দিয়ে কাঁচা রাস্তার সামনে এগিয়ে চলা। মনে হচ্ছিলো কোন সবুজ টানেল, চলে গেছে অনন্ত দিগন্তের পথে। গ্রামীণ এই মেঠোপথ আমাকে নস্টালজিক করে। আমি তখন ভাবি, বহুবছর আগে কেউ একজন প্রথম এইপথে হেঁটেছিলেন। তিনি কি কখনো ভেবেছেন, আমাদের মতো ক্যামেরা হাতে কেউ আসবে, তাঁর গ্রামে! প্রাচীন পদচিহ্নের উপর পড়বে আমাদের কারো পায়ের ছাঁপ! গ্রামের বয়স জানার একটি পদ্ধতি শিখিয়েছিলেন নানাভাই। গ্রামের সবচেয়ে বয়স্ক গাছ দেখে বুঝা যায় গ্রামটি কতোদিনের। সেইদিক থেকে আমার কাছে গেরুয়াকে অনেক বেশি পুরনো মনে হয় নি। স্বাধীনতারও অনেক পড়ে সম্ভবত পত্তন হয়েছিলো গেরুয়ার।

সংযোগ-সড়কহীন মিরেরটেক ব্রীজ। ছবি: লেখক

কোন জনপ্রতিনিধির দয়ার-দান এই ব্রিজটি আদৌ কতোটা কাজে লাগে গ্রামের মানুষের, সেটা নিয়ে সন্দেহ আমাদের রয়েই যায়। সংযোগ সড়কহীন এই সেতু শেষ বিকেলে গল্প গুজবের জন্য চমৎকার হলেও সত্যিকারের উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। উন্নয়ন উন্নয়ন বলে চিৎকার করলেই প্রকৃত উন্নয়ন আসে না। মানুষের জীবনমান বাড়াতে হয় তাদের জন্য কল্যাণকর পরিবেশের ভেতর দিয়ে। এই কথাটি আমাদের জনপ্রতিনিধিরা বুঝতেই রাজি নন।

বাড়ির আঙিনায় মাটির রান্নাঘর। ছবি: লেখক

একটি অবস্থাসম্পন্ন বাড়ির আঙিনার দৃশ্য। মাটির রান্নাঘরের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে ইটের গাঁথুনি দেয়া টিনশেড ঘর। নতুন আর পুরনো সময়ে একত্রে বসবাস। একসময় এই মাটির ঘরগুলো থাকবে না। এখানে তৈরী হবে আরো পাকা ঘর। এভাবেই গ্রামের চিহ্ন হারিয়ে যাবে হয়তো একসময়। বাড়ির আরেকটি ঘরের বারান্দায় আমি একজন বৃদ্ধকে বসে থাকতে দেখেছি। দূর দিগন্তের দিকে তাকিয়ে ছিলেন তিনি। অন্যমনষ্ক হয়ে। কী দেখছিলেন মানুষটি? ফেলে আসা লম্বা সময়ের বিস্তারে হারিয়ে যাওয়া অসংখ্য প্রিয়জনদের? নাকি অন্যকিছু? কে জানে..।

পুকুরের পানিতে আলোছায়ার খেলা ও সোনালু ফুলের গুচ্ছ। ছবি: লেখক

গ্রামের দৃশ্য পার হয়ে ফিরতি পথে দেখা পেলাম সোনালু ফুলের। পানির উপর গাছের ছাঁয়াগুলো তৈরী করছে বিচিত্র রকেমের নকশা। তার উপরে একথোকা সোনালু নুয়ে পড়ছে। কী দারুন এক দৃশ্য! আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা এমন বহুকিছুই আমরা অবহেলায় লক্ষ্য করি না। জীবনের শেকড় কতোটা গভীরে ছড়িয়ে আছে, তার খোঁজ আমাদের কখনোই জানা হয় না।

আউটডোর ফটোওয়াকের জন্য নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়ে আসে। আমরা গেরুয়া ছেড়ে ফিরে আসি নিজেদের পরিচিত পরিবেশে। কিন্তু, গেরুয়ার ঘ্রাণ মাথা থেকে মুছতে চায় না। রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে শব্দ ধার নিয়ে মনে মনে বলি,

দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিষের উপরে
একটি শিশিরবিন্দু।

 


এই ফটোফিচারটি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজম এন্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের ফটোজার্নালিজম কোর্সের একটি আউটডোর এসাইনমেন্ট হিসেবে তৈরী হয়েছে।  সার্থক ফটোস্টোরি হয়তো হয় নি। কিছুটা গল্পের ধাঁচে লিখিত এই ফিচারটি একটি ক্লাসওয়ার্ক। এবং ব্যবহৃত ছবিগুলো লেখকের তোলা। ধন্যবাদ তত্ত্ববধায়ক সালমা আহমেদ ম্যাডামকে। তিনি আমাদের উৎসাহ প্রদান না করলে হয়তো এই কাজটি শেষ করা সম্ভব হয়ে উঠতো না।

মন্তব্য করুন