ডাযনোসর ইউসোরাস

ডায়নোসররাও কখনো কাঁদে এই মুমূর্ষু ‘নেক্রপলিসে’

আজকে আমার সামনের সিটে বসা ডায়নোসরকে কাঁদতে দেখেছি আমি। সকাল ৭:৩০ এর ভার্সিটি বাস। বিআরটিসি থেকে ভাড়ায় নিয়ে আসা আমাদের অনেকের প্রিয় লালরঙা দোতলা। মিরপুর থেকে জাবি। এই বাসে নিত্যদিন যাতায়াত আমার। সেখানে চোখেজল সহ বসে থাকা ডায়নোসর দেখে ভ্যাবচ্যাকা খাওয়াটা দোষের কিছু না নিশ্চয়ই!  অবাক কান্ড, তাই  না? ভীষণ অবাক হওয়ার সাথে শূন্যতার মিশেল ছিলো আমার তখনকার অনুভূতি। আপনি ভাবছেন, ডায়নোসর বাসে আসলো কোত্থেকে!

আমাদের একজন সহপাঠির নামের শেষাংশে ইয়াশনা শব্দটি যুক্ত আছে। একলা মানুষ টাইপের কঠিন এক ধরণের সার্কেল নিজের চারধারে ছড়িয়ে রাখে সবসময়। পার্সোনাল স্পেসের পরিধি ও দৃঢ়তা অনেক বেশি কিংবা অন্যভাবে বললে একটু রুক্ষও হয়তো। বাসে ওঠেই ও সবসময় হেলান দিয়ে আরাম করে ঘুমিয়ে পড়ে। আর, এনিমে দেখা ভীষণ প্রিয়। এইসব চরিত্র মিলেমিশে একদিন আমরা আবিষ্কার করলাম যে, ও হচ্ছে নতুন প্রজাতির ডায়নোসর, যারা ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেয় জীবনের বিশাল একটা অংশ। সেই থেকে ওর নাম আমরা দিয়েছি  ইউসোরাস! ডায়নোসরের বিবর্তনের নতুন একটি প্রজাতি,  ঘুমপ্রিয় ডায়নোসর ইউসোরাস! এই প্রজাতির ডায়নোসররা কী খায়, কীভাবে জীবন যাপন করে সেসব নিয়ে বিস্তরিত থিওরী আমরা এখনো আবিষ্কার করে শেষ করতে পারি নি।

ইউসোরাসের ব্যক্তিগত প্রতিটি কার্যক্রম, অন্যদের সাথে তার যোগাযোগের ধরণ, তার রিএ্যাকশন, ফিডব্যাক সবকিছুতেই একটু ভিন্নতা আমার অব্যাখ্যাত ফিল্টারে ধরা পড়ে। খুব স্পষ্ট কথা বলা,  সোজাসাপ্টা এই মানুষটির কোথায় যেনো একধরণের হলোস্পেস, শূন্যস্থান থাকার একরকমের ধারণা আমার ছিলো এবং এখনো আছে। এই অনুভূতি লুকিয়ে ফেলা ইউসোরাসকে আজকে কাঁদতে দেখে আমি চমকে উঠেছিলাম। জানি না, অন্যদের চোখে ধরা পড়েছে কিনা..। তারপর সারাদিনে টুকটাক অসংখ্য লাইনের অনর্থক কথার বন্যা নিয়ে আসার পর বুঝতে পারলাম, জাফর ইকবাল স্যারের উপর হামলার কারণে ওর মন ভয়ংকর খারাপ।

এই হামলার কথা যখন লিখছি, তখন আমি ভাবছি, কতোটা মস্তিষ্কহীন হয়ে গেলে –  বুদ্ধিবৃত্তিক, মেধা ও মননে শক্তিশালী মানুষদের উপর নৃশংস হামলা করা যায়! তাও আবার ধর্মের নামে! কারো ভাবনা, মতামত, বক্তব্য, বিশ্বাসের সাথে দ্বিমত পোষণ করার এই ধরণে আমি কোনভাবেই একমত নই। ধর্ম আপনি মানতে পারেন, নাও মানতে পারেন। আস্তিক নাস্তিক প্রকৃতবাদী, আপনি যাই হোন না কেনো, কে আপনাকে এই সাহস , অধিকার দিয়েছে যে, ভিন্নমতের আরেকজনকে থামিয়ে দিতে এমন নৃশংস হবেন!! যদি আপনার মনে হয়, আপনার ধর্ম আপনাকে এই প্রেরণা দেয় যে, ভিন্নমত দমনে নৃশংস হওয়া যাবে, তাহলে আমি নির্দ্বিধায় বলছি, সেই ধর্ম আর যাই হোক অন্তত মানুষের ধর্ম না। এইরকম সিরিজ হামলা হয়েছে  এর আগে। পৃথিবীর সভ্যতার নানা পর্যায়ে দেখেছি আমরা কব্জির জোর প্রয়োগের চেষ্টা। বাগদাদ লাইব্রেরির বইয়ের কালিতে যখন ফোরাতের জল কালো হয়ে খাবার অযোগ্য হয়ে গিয়েছিলো, সেই সময়ের কথাও আমরা জানি।

“বরং দ্বিমত হও, আস্থা রাখ দ্বিতীয় বিদ্যায়।
বরং বিক্ষত হও প্রশ্নের পাথরে।
বরং বুদ্ধির নখে শান দাও, প্রতিবাদ করো।
অন্তত আর যাই করো, সমস্ত কথায়
অনায়াসে সম্মতি দিও না।
কেননা, সমস্ত কথা যারা অনায়াসে মেনে নেয়,
তারা আর কিছুই করে না,
তারা আত্মবিনাশের পথ
পরিস্কার করে।” – নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

কিছু মানুষ আসলে আলোকবর্তিকার মতো হন। তারা আলো ছড়ান বাতিঘর হয়ে। এদের থামানো যায় না। গ্যালিলিওর সূর্য নয় বরং পৃথিবী ঘোরে, এই মতবাদ মানুষের মাথা ঘুরিয়ে দিয়েছিলো। ধর্মীয় ক্ষমতাসীনদের রোষে পড়তে হয়েছে তাকে। ব্রুনোকে আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। তারপরও সেই মতবাদ থেমে থাকে নি। যারা ধর্ম নিয়ে ভাবেন , ধর্মের নিক্তিতে বিচার করেন সবকিছু, তারা কি দেখেন  নি ধর্মের প্রচারকদের! যারা নিজেদের মতবাদ ছড়িয়ে দিতে কতো কষ্টকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছেন! আপনি এখান থেকে এটা শিখতে পারছেন না কেনো যে, নিজের মতবাদের উপর দৃঢ়তা ও অন্যের মতের উপর শ্রদ্ধা থাকতে হবে!

জাফর ইকবাল স্যার এমন একজন আলোকবর্তিকা। সেই আলো আপনার পথকে আলোকিত করবে কিনা, সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। সব আলো সবার জন্য নাও হতে পারে। একজন আস্তিকের কাছে তার ধর্মবিষয়ক আলোচনা আলোর পথের পাথেয়। আবার একই আলোচনা একজন নাস্তিকের কাছে আফিমের মতো মোহাবিষ্টতার অনুষঙ্গ। আলোর ধরণ, রকম, কার্যকরণ নিয়ে আপনার দ্বিমত থাকতে পারে। কিন্তু তারমানে এই নয় যে, আলোর অস্তিত্বই মিথ্যে। আমাদের এই লেখার ডায়নোসর ইউসোরাসের কাছে জাফর স্যার একজন আলোর মানুষ। ইউসোরাসের মা ও বাবা,  স্যোশ্যাল সাইন্স ডিসিপ্লিনের মানুষ। সেই হিসেবে উনারা ধরে নিয়েছিলেন যে,  ইউসোরাসও সেরকম কোন সাবজেক্টেই ভর্তি হবে।

ইউসোরাস ছোটবেলা থেকেই গণিতে বেশ দুর্বল ছিলো। ওর কাছে সবসময় মনে হয়েছে, এই সাবজেক্টটি মুখস্থ করেই করতে হয়। মনোযোগ সহকারে গণিত মুখস্থ ও হজম করার কঠিন এক কাজে ও সবসময় ব্যস্ত ছিলো। ক্লাস টিচাররা ওকে কখনো বুঝাতে পারেন নি যে, এটা আসলে মুখস্থের নয়, বরং বুঝে নেয়ার। আমার নিজের মাথায় এই গণিত বিষয়টি কখনোই ঢুকে না। তাই মুখস্থ করে করেই পরীক্ষা দিয়ে এসেছি। যদিও এখন গণিতের সাথে কালেভদ্রে দেখা হয় সোস্যাল সাইন্সের সাবজেক্টে পড়াশোনার সুবাদে। ক্লাস এইটে ইউসোরাস একজন শিক্ষকের কাছে প্রথম অনুধাবন করতে পারে যে, গণিত আসলে বুঝতে হবে।

তারপর কমবেশি চেষ্টা চলছে। বইপড়ার স্বভাব থাকায় জাফর ইকবালের সাইন্স ফিকশন পড়া হয়ে গেছে অনেকটা। এরই মধ্যে হাতে আসে স্যারের লেখা আমি তপু। চোখের-নাকের জল একাকার করে দিয়ে সেদিনের কৈশোরে থাকা মেয়েটি প্রতিজ্ঞা করে, তপু গণিত পারলে আমি নই কেনো..। তারপরের গল্পটি একটি গাণিতিক মস্তিষ্কের রিবর্ণের গল্প।  যে পরিবারে ধরা হয়েছিলো যে, জেনেটিক কারণে তাদের মেয়েটি সায়েন্স ফ্যাকাল্টিতে পড়তে সক্ষম না, সেই মেয়েটি েএখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন একটি কঠিন ফ্যাকাল্টিতে অন্যদের সাথে সমানতালে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। এই যে বিবর্ণ, এই যে বদলে যাওয়ার গল্প, এর ভিত্তিটা দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন জাফর স্যার। যাকে নাস্তিক ট্যাগ দিয়ে অনায়াসে হামলা করার জাস্টিফিকেশন তৈরী করা হচ্ছে।

শুধু এই ঘুমপ্রিয় ডায়নোসরই নয়, বাংলাদেশে অসংখ্য কিশোর-তরুনসহ নানা বয়সের মানুষকে তিনি বদলে দিয়েছেন তার লেখা দিয়ে। তার ভাবনা দিয়ে। নিঃসঙ্গ গ্রহচারীর সুহান আর লাইনার ভালোবাসা, ট্রিনির রোবটিক কষ্টে সেই নিঃসঙ্গ গ্রহে অসংখ্য মানুষ তাদের সাথে ছিলো। টুকুনজিল, সফদর আলি কৈশোরে সঙ্গ দিয়েছে আমাদের অনেককেই। দীপু নম্বর টু পড়ে কিংবা চলচ্চিত্র দেখে আমরা দীপু হতে চেয়েছি অনেকেই। সেই উঁচু পানির ট্যাংকিতে ডানপিটে কিশোরের ধুমধাম করে ওঠে যাওয়া কিংবা আঙুলের ফাঁকে কলম গুজে শাস্তি দেয়ার কোনকিছুই ভুলি নি। আমার বন্ধু রাশেদ পড়েছিলাম বহুআগেই। নিজেদের মুক্তিযুদ্ধের অংশ মনে করার কী আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলাম আমরা! চলচ্চিত্র দেখে খুঁজে বের করেছিলাম, কে অভিনয় করেছিলো সেই কিশোরের চরিত্রে। আমি তপুর সেই আরিফুল ইসলাম তপুকে নিজের আরেকটা কপি মনে হয়েছিলো। ভালোবাসার একজন প্রিয়াংকাকে খুঁজে পাওয়ার কী অদ্ভূত আকুলতায় আচ্ছন্ন ছিলাম সেইদিনগুলোতে।

এইভাবে আরো উদাহরণ টানতে গেলে কেবল বড়ো হবে এই তালিকা। সেই চেষ্টা না গিয়ে শেষ করার চেষ্টা করছি এই ডায়নোসরের কান্নার চ্যাপ্টার। জাফর ইকবাল স্যারের মতো মানুষেরা খুব কমসংখ্যায় জন্মান প্রতি শতকে। তাদের উপর হামলার জন্য মস্তিষ্ক-বুদ্ধি-জ্ঞান ফ্রিজে টাইট বয়ামে রেখে দেয়া অ-মানুষরা জন্মায় জ্যামিতিক হারে। তাদের জন্য কোন শব্দই যথেষ্ট না। কিন্তু, জাফর ্স্যারের মতো মানুষেরা যতোদিন আমি তপুদের মতো বই লিখবেন, যতোদিন প্রিয়াংকারা পরম মমতায় গণিত শেখাবে তপুদের, যতোদিন রোবট ট্রিনিরা ভালোবাসতে শিখবে ততোদিন স্যারের মতো আলোর মশালগুলো, পথ দেখানো বাতিঘরগুলো কখনোই থামবে না।

ঘুমপ্রিয় ডায়নোসর অনুভূতি কন্ট্রোল করা আমাদের ইউসোরাসের মনের মধ্যে সযতনে রেখে দেয়া ভালোবাসা কখনোই মুছে দিতে পারবে না কেউ। স্যার অতিদ্রুতই সুস্থ হয়ে ফিরবেন। লিখবেন আবার। আবার শোনাবেন নতুন কোন গল্প। এই ভালোবাসার মতো সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য কিশোর-তরুন, অসংখ্য প্রিয়াংকা, রাশেদ, তপু, অসংখ্য পাগলাটে সফদর আলি, ত্রাতিনাদের মনের গভীরে পরম মমতায় জমিয়ে রাখা ভালোবাসাটুকু জাফর স্যারদের বাঁচিয়ে রাখবে। এমনকি, এই নশ্বর সময়ের বাইরে যদি কোন অনন্ত সময় থেকে থাকে, সেখানেও তারা আলো ছড়াবেন।

এই বাতিঘরগুলো বেঁচে থাকুক আমাদের জন্য। ইউসোরাসের মতো ডায়নোসারদের অনুপ্রেরণা যুগিয়ে যাওয়ার জন্য। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে যাক এই ভালোবাসা, শক্তি। তপুর লেখক সুস্থ হয়ে উঠবেন শীঘ্রই। প্রিয়াংকার ভালোবাসায়, ডায়নোসর  ইউসোরাসের চোখের জলে, আমাদের প্রার্থনায় এই প্রাচীন মুমূর্ষু ‘নেক্রোপলিসেও’ একদিন ফিরবে নতুন সময়। ‘আগুনের দিন’ আবার ফিরবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

* ছবির অক্ষরগুলো উপরের ঘরে লিখুন