নগরবাড়ি ঘাটের এক ‘ভয়ংকর পিচ্চি’র কথা লিখছি

আজকে সারাদিন বৃষ্টি হলো। শেষ বিকেলে থেমেছে বর্ষার অবিরাম ঝমঝম। জলমগ্ন চারপাশে বেড়েছে অথই মগ্নতা। যে বাড়িতে থাকছি, সেই বাড়িতে একটা পিচ্চি আছে। ভয়ংকর এক পিচ্চি। ভূত, পুলিশ, পাগল, হাপ্পা ইত্যাদি হাবিজাবি কোনকিছুতেই ভয় পায় না বিচ্ছুটা। জ্যান্ত ব্যাঙ ধরে এনে বড়দের ভয় দেখানোর চেষ্টা করে প্রায় দিনই। দারুন ছটফটে। আমার খুব পছন্দ ওকে। সারাদিন মাতিয়ে রাখে ওর চারপাশ। সবাইকে তুমি করে ডাকে। সবচেয়ে জীবন্ত হচ্ছে ওর প্রানোচ্ছল হাসি…। এতো সুন্দর আর ঝকঝকে যে, দেখলেই মন ভালো হয় যায়।

খুব সাধারণ আর ভীষণ অসচ্ছল পরিবার ওদের। নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর প্রবাদও এখানে অচল, এতোটাই অসচ্ছল। একবেলা তৃপ্তির আহার জোটানোর সে কী প্রানান্ত চেষ্টা…অভাব এখানে অক্সিজেনের মতো নিত্য সহচর। কিন্তু, সবকিছুর বাইরে থেকে ওই বিচ্ছুটার অমলিন হাসি আমাকে ভীষণ অবাক আর অসম্ভব মুগ্ধ করে। দারিদ্র্যের নিদারুন আঘাতের মাঝেও কী অপার্থিব ঔজ্জ্বল্যে বাঁচিয়ে রেখেছে পিচ্চিটা ওর অনিন্দ্য সুন্দর হাসিটিকে! অভাবের সাধ্য নেই সেই হাসির স্বর্গীয় আভাকে ম্লান করার। নিজেকে খু্‌ব সুখী মনে হয় তখন…। পৃথিবীজোড়া শিশুদের এই অমলিন হাসিগুলো বেঁচে থাক আপন কোমলতা নিয়ে….।

বছর চারেক আগে আমি পাবনার নগরবাড়ি ঘাটের কাছাকাছি এক গ্রামে স্বেচ্ছা নির্বাসনে গিয়েছিলাম। এমন প্রায়ই যেতাম বিভিন্ন জায়গায়। আমার ভালো লাগতো এই সাময়িক হারিয়ে যাওয়া। তখন লিখে রাখা ডায়েরী থেকে ফেলে আসা সময়ের এই পিচ্চি চরিত্রটির কথা মনে পড়লো। সেবার আমার পথ থেমেছিলো ছোট্ট এক গ্রামে। এক বাড়িতে পেয়িংগেস্ট হিসেবে উঠে পড়েছিলাম। বাবা-মা তিনবোন নিয়ে ছিলো তাদের সংসার। গৃহকর্তা বাবলু ভাই মোটামুটি অবস্থাসম্পন্ন পরিবহন ব্যবসায়ী। বড়ো মেয়ে রাজশাহী শহরে পড়াশোনা করে। মেঝো মেয়ে গ্রামের স্কুলে। আর ছোটটি বাড়িতে মায়ের আঁচলে আঁচলে ঘুরে বেড়ায়।

লেখার শুরুতে যে পিচ্চির কথা বলেছি, সে এই বাড়ির না। আজকে এতোদিন পরে এসে ওর নাম মনে করতে পারছি না। গ্রামের আরেকপ্রান্তে তাদের বসতভিটা। একচিলতে ছোট্ট উঠান ঘিরে তিনটে খুব সাধারণ ঘর। বর্ষায় পানিবন্দি হয়ে যায় বাড়িটি। এই বাড়িতে দারিদ্র স্থায়ীভাবেই আবাস পেতেছে। কিন্তু,  এখানের জীবন বড়ো বেশি প্রাণবন্ত ছিলো। অনেকগুলো পিচ্চি সারাক্ষণ মাতিয়ে রাখছে চারপাশ। মানুষগুলোর আন্তরিকতা কখনো ভুলে যাওয়া সম্ভব না। অভাবের সংসারেও কী অসাধারণ অতিথি আপ্যায়ণ! আমি িএখনো চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাই..। ঋণে ডুবে থাকা এই পরিবারটি প্রতিদিনের বেঁচে থাকার জন্য প্রাণপন চেষ্টা করে যায়। অভাব তাদের স্বস্তি দেয় না। তবুও হৃদয়ের ্অবারিত ঐশ্বর্য এরা কোত্থেকে পায়, আমি জানি না।

পাবনা ছেড়ে এসেছি অনেকদিন। জীবন আমাকে টেনে নিয়ে চলেছে এঘাট থেকে অন্যঘাটে। দারুন ছটফটে পিচ্চি এখন কতোটুকু বড়ো হয়েছে, খোঁজ নিই নি। খোঁজ নেয়া হয় না আসলে। দিনের পর দিন আমরা ক্রমশ নির্লিপ্ত হতে থাকি। চারপাশের কোন কিছুই এখন আর আমাকে ভাবায় না। স্বার্থপরতার অভ্যাস করছি মনোযোগ দিয়ে। এই নাগরিক সভ্যতা আমার ভেতরের মানুষ আমিটাকে কেড়ে নিচ্ছে। এই শহরে বৃষ্টি হলেই নোংরা জল জমে একাকার হয়। নির্দ্বিধায় আমরা ময়লা-আবর্জনা পলিথিন ফেলি যেখানে সেখানে। ভরাট করে ফেলেছি শহররক্ষা খালগুলো। তবুও আমাদের নিজেদের ছাড়া আর কিচ্ছু ভাবার সময় হয় না। রেজাল্টের ঘাটতি এখানে পরিশোধ করতে হয় জীবন দিয়ে। ছাত্ররা স্বপ্ন না দেখে কেবলেই ছুটে চলা অভ্যাস করে। এই ভুতুড়ে নগরীর অপরাধী আমাদের চেয়ে পাবনার সেই ছোট্ট শিশুটির অভাবের জীবনও অনেক বেশি মর্যাদার। অনেক বেশি জীবন্ত।

হয়তো সেও বড়ো হয়ে কাজের খোঁজে, স্বচ্ছলতার খোঁজে এই মরার শহরে চলে আসবে। হয়তো নিজের সকল ঐশ্বর্য খরচ করে কিনবে পচে যাওয়া জীবনের সাফল্য। কিন্তু, আমি তেমন কিছু চাই না। আমার আন্তরিক প্রার্থনা, অভাবের মধ্যে থেকেও যেনো সেই শিশুটি জীবনকে ভালোবাসতে শিখে। যেনো সফলতার চাইতেও আনন্দ নিয়ে বেঁচে থাকা নিশ্চিত করে। জানি, আমার এই চাওয়ার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো স্বচ্ছলতা। তবুও আমি প্রার্থনা করি। আমি প্রার্থনা করি তেমন কিছু মানুষের জন্য, যারা শুধু জীবনের জন্যই বাঁচবে। নগড়বাড়ি ঘাট তার ফেলে আসা অতীত নিয়ে কোলাহলহীন টিকে থাকছে। সেই ভয়ংকর পিচ্চিটিও বেঁচে খাকুক কোলাহলমুখর জীবনকে সাথে নিয়ে।

# ছবি: নগরবাড়ি ঘাটের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া যমুনা নদী।  আজিজুল ইসলাম অভি‘র সৌজন্যে পাওয়া

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

* ছবির অক্ষরগুলো উপরের ঘরে লিখুন