জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

নিজস্বতার দুর্ভিক্ষ ও সঙ্গদোষে একটি অভিশপ্ত রোবটের জন্ম

১ম জনঃ , দেখ দেখ! মালটা কড়া মাম্মা!
২য় জনঃ নজর দিবি না। এইটা তোর ভাবী হয়।
১ম জনঃ আইচ্ছা মামা। তোর নেক্সট এর অপেক্ষায় বইলাম। তহন কিন্তু আমার সম্পদ হইবো।
৩য় জনঃ এ্যাহ! আইছে! এইগুলা তোদের লেইগা না। বয়ফ্রেন্ড আছে।
শালার***। ****বয়ফ্রেন্ডের মজাই মাম্মা..।”

সংলাপগুলো দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ে শিক্ষা গ্রহণকারী ২ জন ব্যক্তির। তারা যাকে নিয়ে কথা বলছিলো, তিনি তাদের সাথে একই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সেইম বিল্ডিংয়েই ক্লাস করেন। ধরে নিই ১ম জনের নাম মি. এক্স। ২য় জন মি. ওয়াই ও ৩য় জন মি.জেড। তারা খুব ভালো বন্ধু বলে আমাদের জানিয়েছেন আরো বহুদিন আগে। এই বন্ধুত্বের শুরু কোথায় হয়েছিলো আমার জানা নেই। অন্যকিছুর আগে আরেকটা ভিন্ন গল্প বলি।

ঢাকা থেকে কয়েকশ কিলোমিটার দূরের এক ছোট্ট গ্রাম। নয়নতারা। গ্রামের পাশ ঘেষে উপজেলা পরিষদের সুড়কিউঠা সড়ক চলে গেছে গঞ্জের দিকে। কিছুপথ এগুলে সুনসান এক রেলস্টেশন। ঘন কালচে রক্তের মতো লাল রঙের কারগোডেড টিনশেডের ছাউনি। ওয়েটিং বেঞ্চিগুলো শেষবার যে লোকটা দেখেছিলো, সে নিশ্চয়ই এতোদিনে না ফেরার দেশে চলে গেছে। হতদরিদ্র এই স্টেশনে টিকেট কাউন্টার নামে একটা খুপড়ি থাকলেও সেটা সারা বছরই বন্ধ থাকে। টিকেট মাস্টার মাসের শুরুতে গঞ্জ থেকে বেতনের টাকাটা নিয়মিতই তুলে আনেন। তার হাজিরাতে কোন কমতি পড়ে না। হাজিরা খাতাটা যে বাসাতেই থাকে!

স্টেশনে সকালের দিকে একটা লোকাল ট্রেন দাঁড়ায়। শহরগামী ট্রেন। গ্রামের লোকজনের শহরে যাতায়াতের দরকার হলে তারা ট্রেনে করে চলে যায়। আবার বিকালে ফিরতি ট্রেনে করে বাড়ি ফিরে।  প্রতিদিন একজন যাত্রীকে দেখা যায়। কাঁধে বইভর্তি ব্যাগ নিয়ে ট্রেনে যাতায়াত করে। গ্রামের লোকেরা তাকে দেখলে গর্ব করে তাকায়। নিজেদের মধ্যে কথা হয়, ‘ছেলেটা শহরে পড়তাছে। বাপের মুখটা রক্ষা করবার পারবো। আরে, ট্যাকাওতো কামাইবো মেলাখানিক..।’ প্রতিদিন প্রায় ২০ মাইল জার্ণি করে ছেলেটি তার স্কুল শেষ করে। তারপর, এরচে কষ্টকর যাত্রাযথ পাড়ি দিয়ে ভালো রেজাল্ট করে কলেজ ছাড়ে।

ভাগ্যের সহায়তা ও নিজের চেষ্টায় ভর্তি হয়ে যায় একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। গ্রামের ছেলেটি এই সুবিশাল জগতে যেনো নতুন করে জন্ম নিয়েছে। চারপাশে নতুন অসংখ্য বিস্ময় তার জন্য অপেক্ষা করে। নানান ধরণের মানুষ। নানা রকমের শব্দের ঘ্রাণ চারদিকে।  সবকিছুই তার কাছে ভালো লাগে। কিন্তু, প্রথমদিন থেকেই কিছু দুঃস্বপ্নও তাকে বহন করতে হয়। র‌্যাগ, ম্যানার্স শেখানোর ক্লাস, ভদ্রতার নতুন সংজ্ঞা, সারারাত না ঘুমিয়েও সকালে ক্লাস, সারাদিন বিশ্রামের সুযোগ না পাওয়া..। নিজের সযতনে লালনকরা স্বপ্নগুলো টিকিয়ে রাখতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে যায় ছেলেটি। তবুও, হাল ছাড়ার পাত্র না হওয়া এই চমৎকার মানুষটি কী ভাবে যেনো টিকে যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশে।

গল্পের শেষাংশটি যেকোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাথে মিলে যাবে। কিন্তু, পার্থক্য হয়, শেষের পরে নতুন শুরু হওয়া অধ্যায়ে। সেই অধ্যায় আগের মতো সহজ কোন লেখ্য নয়। বরং, ভয়ংকর সময়ের সাক্ষী সে অধ্যায়। নয়নতারা গ্রাম থেকে  অমানুষিক কষ্টে উঠে আসা যে ছেলেটি এখন একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, সে আমার লেখার শুরুর দিকের তিনজনের একজন, মি. এক্স!

অবাক হলেন তো? আমি নিজেই অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। যে ছেলে তার পড়াশোনার জন্য প্রতিদিন ২০ মাইল জার্ণি করেছে, যে ছেলে তার বাবার কষ্টে অংশ নেওয়ার জন্য দাঁড়াতে চেয়েছে নিজের পায়ে, গ্রামের সবার গর্বের সেই ছেলেটির কী অদ্ভূত ভাষা! কী নোংরা মানসিকতা! কেনো এমন হয়ে গেলো মি. এক্স?

মি. এক্স যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন পরিমন্ডলে ডানা মেলতে শুরু করে, তখন তার পরিচয় ঘটে মি. ওয়াই এবং মি.জেডের সাথে। সহপাঠী। তাদের সাথে চলাফেরা, আড্ডা, অবসরের সময়, নিত্যদিনের খাবার-সিগারেট-চা শেয়ার করতে করতে কখন যেনো মি. এক্সকে তারা প্রভাবিত করে ফেলেছিলো! যে ছেলে কখনো অশোভন দৃষ্টিতে কোন মেয়ের দিকে তাকাতে শিখে নি, কখনো অনুচিত চিন্তা করতে অনুমতি দেয় নিজেকে,  বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছুদিনের মধ্যে এমন নোংরা ভাবনা সে কীভাবে আয়ত্ব করলো!

ছোটছোট অনুচিত চিন্তা, অশালীন দৃষ্টির লেহন, অশ্রাব্য মন্তব্য, টিজিং এইসব ঘৃণ্য অনুষঙ্গগুলোকে নিয়মিত পরিচর্যা করেছে মি.এক্স। শিখেছে মি.ওয়াই ও জেডের কাছ থেকে। যখন ওয়াই  তার সাময়িক মনভোলানো ফাঁদে আটকে পড়া প্রেমিকার সাথে ঘনিষ্ট হওয়ার গল্প বলে রসালো ভাষায়, যখন জেড শোনায় ফেসবুক লাইভ কিংবা ইমোতে রেকর্ডেড কোন একান্ত নিজস্ব কানভার্সেশন, তখন মি.এক্স শিহরিত হয় নিষিদ্ধ  রোমাঞ্চে। যখন জেড কিংবা ওয়াই বলে, আরে ধুর ব্যাটা! আর কয়দিন দুধের শিশু থাকবি? কিছু একটা শুরু কর। নে, আপাতত বিড়িটা থেকে একটান দে, তখন আনাড়ি এক্স তাদের কথায় নিষিদ্ধ আনন্দ অনুভব করে। অনভ্যস্ত হাতে সুখটান দেয়ার চেষ্টায় খকখক করে কেশে ফেলে। ওয়াই জেড তখন হা হা করে হাসে আর বলে, মাম্মা, বড়ো হও..!।

আমাদের এক্স তাই বড়ো হওয়ার কাজে লেগে পড়ে। আগে নানান রসদ সরবরাহ করতো ওয়াই-জেড। এখন সে নিজেই নিজের জন্য আ্নন্দ, শিহরণ তৈরী করতে পারে। ভিড়ের মধ্যে দক্ষতার সাথে ঢলে পড়তে পারে মেয়ে সহযাত্রীর গায়ে। কখনো হাতের ছোয়ায় শিহরিত হওয়ার চেষ্টাও থাকে। গায়ে সেঁটে থাকা স্টিকি নোটের মতো করে তার দৃষ্টি আটকে থাকে কোন মেয়ের শরীরে। তার অনৈতিক ও জঘন্য ফ্যান্টাসির জগত বড়ো হয়। ক্লাসের সহপাঠী মেয়ে বন্ধুটিও তার ফ্যান্টাসির ্ক্যারেক্টার হয়ে যেতে থাকে।

এই লেখাটি লিখতে বসে আমার চোখের সামনে মি. এক্সকে আমি দেখতে পাচ্ছি। একদিন অসাবধানে ওর একটা কনভার্সেশন কানে চলে এসেছিলো। আরেকদিন একটা গ্রুপ চ্যাটবক্সে ঢুকে পড়েছিলাম। চ্যাটবক্সের নিকনেমগুলো উচ্চারণ করারও অযোগ্য অবস্থায় ছিলো…।  লজ্জা! 🙁  আমার কষ্ট হচ্ছে খুব। নয়নতারা গ্রামের সেই সৎ, সহজ, পরিশ্রমী ছেলেটিকে খুব মনে পড়ে নিয়মিতই। নিজের জীবনকে আলোয় ভরিয়ে দিতে যে ছেলেটি কঠোর শ্রম দিয়ে পাবলিক বিশ্বাবিদ্যালয়ে জায়গা করে নিয়েছিলো, সেই ছেলেটি ক্রমশ হারাচ্ছে অন্ধকারে..।

আমার অন্য আরো বন্ধুরা আছে। যাদের চলাফেরার গন্ডি মি. এক্সের মতো হলেও তারা ঠিক আগের মতোই আছে। মি. ওয়াই কিংবা মি. জেডের মতো মানুষেরা তাদের জীবনে কোন কুপ্রভাব ফেলতে পারে নি। কেনো? কেনো মি. এক্সকে তারা প্রভাবিত করতে পেরেছে? আর কেনোইবা এমন অনেকেই থাকে, যারা তাদের দ্বারা বিন্দুমাত্র প্রভাবিত হয় না? তাদের দৃষ্টির ধরণও পাল্টায় না। ফ্যান্টাসির জগত এমন বিভৎস আকার ধারণ করে না..।

কারণ মনে হয়েছে, নিজস্ব একটি শক্তিশালী ভিত্তি কিংবা বেইজের অভাব ছিলো মি. এক্সের। মানুষ হয়ে উঠা কিংবা নিজের সম্পর্কে ধীর-স্থির জ্ঞান তার ছিলো না। এটাকে ভাগ্যের দায় বলা যাবে না। শিক্ষা-দীক্ষা-সামাজিকীকরণ, সবদিক থেকে তারা কেবলমাত্র মানুষের অবকাঠামোতে উন্নীত হয়েছে। দেখতে মানুষ মনে হলেও আত্মার কোন জোর নেই তার। নিজের শিক্ষা তাকে প্রজ্ঞার পরিবর্তে দিয়েছে রাশি রাশি অক্ষরের জ্ঞান। এ যেনো মানুষের খোলসে বেড়ে উঠা কোন প্রোগ্রাম করাপ্টেড রোবটের জীবন!

বহুদূরে ফেলে আসা সবুজ-সুন্দর নয়নতারা গ্রাম, সারাদিন নিঃসঙ্গ পড়ে থাকা রেলস্টেশন, সুড়কি উঠা উপজেলা পরিষদের চিরচেনা রাস্তা, পাশের বাড়ির সহপাঠীদের দল, ট্রেনের ঝিকঝিকাঝিক, মায়ের হাসি, বোনের বিশ্বস্ত ভালোবাসা কোনকিছুই এখন আর মি.  এক্সকে স্পর্শ করে না। অসৎসঙ্গ কিংবা দুর্জন-সঙ্গ তাকে রোবট বানিয়ে ফেলেছে। অভিশপ্ত কোন রোবট, যে শুধু অকল্যাণ বয়ে আনতেই সক্ষম।

আমার যে বন্ধুরা রোবট হওয়ার পরিবর্তে এখনো মানুষ আছে, তাদের নিজস্ব একটি বেইজমেন্ট ছিলো। একাডেমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে জীবন তাকে নানা মাধ্যমে শিখিয়েছে। মানুষ হিসেবে অনায়াসে তারা পাশ মার্ক পেয়ে যাবে। এই মানুষগুলো কতোটুকু ভালো – ব্যক্তি হিসেবে, সে বিচারে আমি যাবো না। হতে পারে তাদের কেউ কেউ মনের খুব গভীরে ভীষণ খারাপ, পারভার্ট! হতে পারে সেও তার মেয়ে বন্ধুর জন্য অনিরাপদ। কিন্তু, জীবন তাকে শিখিয়েছে, কীভাবে নিয়ন্ত্রিত আচরণ করা যায়..। কীভাবে নিয়মিত চেষ্টায় ক্রমশ ভালো মানুষ হওয়া যায়..।

মি. এক্স এর পরিবর্তন দেখে আমি শঙ্কিত বোধ করি। মেয়েরা তার দৃষ্টিতে ‘মালে’ রূপান্তরিত হয়। চোখের দৃষ্টির তীক্ষ্ণতা যেনো দূরে বসা মেয়েটির চামড়া ভেদ করে যাবে..। আমার মাথায় কোনভাবেই ধরে না যে, একটি মেয়েকে তার অলক্ষ্যে জঘন্য মানসিকতা নিয়ে ছুয়ে দিলে কী আনন্দ পাওয়া যায়..! দূর থেকে বেহায়ার মতো লকলকে জিহ্ববা নিয়ে তাকিয়ে থাকার রেজাল্ট কী, আমার সত্যিই জানা নেই।

আমি বলছি না , আমি সাধুপুরুষ। বরং, আমি বলতে চাইছি,  মি. এক্সের এই নোংরা ্ বিনোদনের ধরণ আমার কাছে ঘৃণার। মি. এক্সকে বদলে যেতে দেখে আমার কষ্ট হয়।  মি.এক্সের মা-বোনসহ পৃথিবীর সকল নারীর দৃশ্যায়ন বদলে গেছে এখন তার কাছে।  আত্মীয়, বন্ধু, সহপাঠি এমনকি নায়িকার রোল প্লে করা সিনেমার হিরোইন- যেকোন নারীই তারচোখে এখন ‘মাল”! নয়নতারা গ্রামের সেই চমৎকার ছেলেটি তার নিজস্বতাবোধের অভাবে, তার একাডেমিক শিক্ষা ও চারপাশ থেকে গ্রহণ করা জ্ঞান-  সবকিছু নিয়ে,  এখন সে মি. ওয়াই্ এবং মি. জেডের পায়ে পায়ে অনুসরণকারী কুকুরের জায়গা নিয়ে নিচ্ছে!

কিন্তু আমি,  এই অভিশপ্ত রোবট হওয়ার প্রোডাকশন সার্কেল ভাঙতে চেয়েছি সবসময়। ‘মাল’ বলে কখনো ডাকি নি কোন নারীকে। মেয়ে বন্ধুদের জন্য নিজেকে তৈরী করতে চেয়েছি নিরাপদ সঙ্গী হিসেবে। কারণ, আমার নিজস্বতা বোধের স্টোরেজে কখনো দুর্ভিক্ষ আক্রমণ করে নি। নিজের বোন-মা, বন্ধু, প্রিয়জনদের সহজ আনন্দ আমাকে সঙ্গ দেয় সবসময়। তাই, আমি সাধুপুরষ না হতে পারলেও অন্তত পার্ভাট  অভিশপ্ত রোবট হই না।

অসম্ভব জেনেও আমি প্রাণপন চাই, মি. এক্স বদলে যাক। চারপাশের অভিশপ্ত রোবটগুলো মানুষ হোক। মেয়ে বন্ধুটি নিরাপদ বোধ করুক একসাথে রাস্তায়। ফ্যান্টাসির জগতের বাইরে এসে আকাশ দেখার সুযোগ হোক সবার। সঙ্গদোষের অভিশাপ দূর হয়ে মহাশান্তি আসুক। হেমাঙ্গকে যেনো তার প্রেমিকার জন্য কখনো ভয়ে ভয়ে থাকতে না হয়..। ইরা যেনো চায়ের কাপ হাতে বন্ধুদের আড্ডায় চারপাশ কাঁপিয়ে মনখুলে হাসতে পারে। প্রতিটি স্পর্শ যেনো হয় সবার আগে একজন মানুষের স্পর্শ।

মন্তব্য করুন