নির্ণিমেষ দৃষ্টির একজন বৃদ্ধ ও বারান্দার গ্রীলে জমাট নীরবতা

হঠাৎ মারা গেলেন আমার পাশের বাসার এক বৃদ্ধ। পরিবারের সদস্যদের হাহাকার-কান্নায় জানা গেলো সে খবর। আমি যে এলাকায় থাকি, সেটা অনেকটা গ্রাম। শহরতলী বললেই বোধহয় শব্দটা লাগসই হয়। এখানের চারপাশ, বাজার-ঘাট, মানুষ, রাত-দিন সবকিছুই শহুরে তাড়াহুড়ো মুক্ত এবং কিছুটা বেশি অর্গানিক! তাই, কারো মৃত্যুতে এখানে ভদ্রতার বাইরে গিয়ে হাউমাউ কেঁদে ওঠা সহজ।

যে বৃদ্ধটি মারা গেলেন, তিনি আমার পরিচিত নন। কখনো কথা হয় নি আমাদের। কিন্তু, আমি তাকে জানতাম। আমাদের বারান্দা দিয়ে তাকে দেখা যেত, পাশের বাসার বারান্দায় একটি গদীছেঁড়া চেয়ারে বসে আছেন। সকাল থেকে দিনের অনেকটা অংশে আমি ‍তাকে দেখতাম সেখানে। চুপচাপ নির্বিকার। ঘরের ভেতরে তার ছেলের বউ আর শাশুড়ির তুমুল ঝগড়া কিংবা দৌহিত্রের কান্নাকাটি, কিছুই তাকে স্পর্শ করতো না। আসলেই কি করতো না? জানার সুযোগ হয় নি কখনো।

নির্ণিমেষ তাকিয়ে থাকতেন বাইরের পৃথিবীর দিকে। বারান্দার গ্রীলের খাঁজকাটা নকশার মতো তার পৃথিবীও হয়তো খন্ডিত ছিলো নানা অংশে। প্রচুর সিগারেটের ধোঁয়া নিজের চারপাশ ভরিয়ে দিয়ে তিনি বসে থাকতেন তার ভেতর। যেনো আড়াল তৈরী করে নিতেন নিজের জন্য। কী দেখতেন তিনি? জানি না।

বরিশালের কোন এক নদীতীরের ছোট্ট গ্রামে তার ফেলে আসা সময়ের কথা কী তার মনে পড়তো? এই শহরের ইট-কাঠ পাথরের জঞ্জালের ভীড়ে কি তার দম আটকে আসতো? নাকি হিসাব মেলানোর চেষ্টা করতেন  কোন অমিল হয়ে প্যাঁচ লেগে যাওয়া হিসেবের?  তার ঘোলাটে দৃষ্টির মধ্যে যে নির্বিকারত্বের ঝিম ধরানো গভীরতা ছিলো, তা আমাকে ভাবিয়ে তুলতো। আমি ভয় পেয়ে যেতাম..। ধোঁয়ায় আড়াল করা মোড়কের ভেতরে থেকে তিনি তাকিয়ে থাকতেন বারান্দায় গ্রীলের প্রাণহীণ ভাঁজের ভেতর দিয়ে দূরের কোন সময়ের দিকে। তার চোখে আমি দেখতে পেতাম ভবিষ্যতের আমাকে।

নিজের কর্মক্ষমতা হারিয়ে যখন অন্যের গলগ্রহ হয়ে বাঁচতে হয়, যখন টিকে থাকা নির্ভর করে অন্যের দয়ার উপর, তখন হয়তো জীবনের প্রতি অমোঘ টানটুকু কমে আসতে শুরু করে। যে বয়সে ছেলে-নাতী-নাতনীকে নিয়ে বিন্দাস জীবনকে উপভোগ করার কথা আমাদের এই বৃদ্ধের, সে বয়স তিনি চুপচাপ যাপন করে গেছেন ভয়ংকর নীরবতার মধ্য দিয়ে। কেনো এই ঔদাসিন্য, জানতে পারি নি। আর, কখনোই জানা হবে না আমার।

সস্তা সিগারেটের ধোঁয়াটে পর্দায় ঢেকে থাকা নকশাকাটা বারান্দার গ্রীলে সারাদিন-রাত ধরে জমতে থাকা নীরবতা হয়তো অসহ্য হয়ে উঠছিলো তার কাছে। সেজন্যই হয়তো বেঁচে থাকার বদলে চলে যাওয়টাই মেনে নিয়েছিলেন তিনি। এই লেখা যখন লিখছি, ততোক্ষণে তিনি প্রস্তুতি নিচ্ছেন মাটির অভ্যন্তরে সীমাহীন অন্ধকারে অনন্তসময় যাপনের। সেখানের নীরবতা কি উনার ভালো লাগবে? সেখানেও কি থাকবে ফেলে আসা জীবনের প্রতি তার স্মৃতিকাতরতা?

মৃত্যু আমাকে সাধারণত আপ্লুত করে না। খুব ছোটবেলায় কাছ থেকে নিজের প্রিয়জনদের মৃত্যু দেখেছি। সংসারের বড়ো ছেলে হিসেবে দায়িত্বের খাতিরে মৃত প্রিয়জনদের মৃত্যু-পরবর্তী কাজে সক্রিয় থেকেছি। তাই হয়তো মৃত্যুভয় আমাকে ভাবায় না। কিন্তু, কিছু মৃত্যু আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়। আমাকে মনে করিয়ে দেয়, এই প্রাত্যহিক জীবন, এই নাগরিক ব্যস্ততা, সারা দিনমান জুড়ে সফলতার পেছনে ছোটার আসলে কোন অর্থ হয় না। দিনান্তে, আমার বারান্দার গ্রীলেও জমে উঠতে থাকে ঢের ঢের নিশ্ছিদ্র এবং অনুবাদ-অক্ষম নীরবতার,  যার তল কখনো পাওয়া হবে না। হয়তো আমার মৃত্যুতেও কোন একজন কীবোর্ডে টাইপ করে লিখবে এমনই কোন লেখা। হয়তো সে আমার মতো করেই ভাববে আমাকে নিয়ে। হয়তো…।

জীবন কেমন হয়, সফলতা আসলে কাকে বলে কিংবা স্মৃতিকাতরতা অথবা নাগরিক ছুটে চলা, কোনটার অর্থই আমার ঠিকমতো জানা নেই। শুধু এইটুকু বুঝি, আমিও সময়ের হাতে হাত রেখে কখনো গিয়ে দাঁড়াবো মহাকালের বারান্দায়। যেখানে আবারো আমার সাথে দেখা হয়ে যাবে সেই নির্ণিমেষ দৃষ্টির বৃদ্ধের। হয়তো তখন আমরা অনুবাদ করতে শিখে যাবো জমাট নীরবতার। হয়তো তখন আমাদের  বারান্দায় কোন গ্রীল থাকবে না। হয়তো…।


# ছবি কৃতজ্ঞতা: 19eightysevenblog

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

* ছবির অক্ষরগুলো উপরের ঘরে লিখুন