পাহাড়ি রাজকন্যা এবং চন্দনের ঘ্রাণমাখা কোন এক বিকেল

সময়টা বহুদিন আগের। আমি তখন উড়ে বেড়াচ্ছি ভোকাট্টা ঘুড়ি হয়ে। ককসবাজারে অফ সিজন চলছে। অসম্ভব রকমের মানসিক চাপ নিয়ে ঢাকা ছেড়েছিলাম সেইবার। সাথে ২ রুমমেট। কোন একবিকেলে বার্মিজ মার্কেটে গিয়েছি।  হাঁটা এবং দেখা, এর দুটোই ফ্রি বলেই হয়তো  ঘুরে ফিরে দেখছিলাম। পকেটে অগ্রীম কেটে নেয়া ফিরতি-টিকেট ছাড়া একটা সিকি-আধুলিও নেই। খাওয়া-দাওয়া চলছে রুটি-কলা-বিস্কিটের উপর। থাকছি সস্তার রঙজ্বলা টিনশেড হোটেল রুমে। সুতরাং,  কিছু কেনার নেই।

ঘুরতে ঘুরতে এক দোকানে ঢুকলাম। শেষদুপুরে সূর্য  তাপ ছাড়াচ্ছিলো আগ্রহ নিয়ে। তেতে উঠা চারপাশ যেনো ঘেমেনেয়ে উঠছে। মার্কেটের সামনে তিন/চারটি কুকুরের ক্লান্তভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকার দৃশ্য আমাকেও ক্লান্ত করছিলো।

দোকানী মেয়েটি আমাদের খুব সুন্দর হেসে সম্ভাষণ জানালো। আমরা হাসির জবাবে একটু নিষ্প্রভ হেসে জানালাম, আমরা কিছু কিনতে আসি নি। এমনিতে ঘুরে দেখছি। কথাটা বলার সময় একরকম নিশ্চিতভাবে জানতাম, মেয়েটার হাসিটার ভোল্টেজ কমে যাবে অন্যসব বিক্রেতার  মতো।

কিন্তু, আমাদের অবাক করে দিয়ে মেয়েটা হেসে বললো, তাহলে বসুন আরাম করে। ক্লান্ত দেখাচ্ছে আপনাদের। ঠান্ডা পানির একটা ক্যান এনে রাখলো সামনে…। সেই ক্ষণটিতেই আমি সিন্ধান্ত নিয়ে নিতে পারলাম, মেয়েটিকে ভালো লেগেছে আমার।  এই ভালোলাগার কোন গাছ-পাথর নেই। জাগতিক চাহিদাশূন্য  কোন একধরণের মুগ্ধতা বলা যায়। বোতলের স্বচ্ছ গাঁ গড়িয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় জল ঝরে পড়ছিলো নিত্যকার পরিষ্কারে চকচকে হয়ে উঠা দোকানের গ্লাসের ডিসপ্লে কাউন্টারের কাঁচের উপর।

জীবনের মুহুর্তগুলোও কি এভাবেই প্রতিদিন ঝরে পড়ছে না?

অবাক হয়েই আমরা বসে পড়লাম। কথায় কথায় জানলাম মেয়েটির বাড়ি রাঙামাটির কোন এক পাহাড়ে। তখন রাঙামাটি জেলার অবস্থান আমার কাছে শুধুমাত্র ম্যাপেই সীমাবদ্ধ। এই কথা- সেই কথা বলতে বলতে আমার সঙ্গীরা আলাপে মেতে উঠলো। আমি তাকিয়ে দেখতে থাকলাম মেয়েটিকে। ছোটখাটো আকৃতির চাপা রঙের সাধারণ এক পাহাড়ি কন্যা।  কতো নিরুদ্বেগ, নিশ্চিন্ত আর সপ্রতিভ!  ওর প্রাণখোলা হাসি, মাথা নাড়ানোর মনোযোগী ভঙ্গী, একটু পর পর অবিন্যস্ত চুলে হাত রেখে কপালে চলে আসা চুলের গোছাকে শাষণ করার পূণঃপৌনিক চেষ্টা,  এইসব দেখছিলাম। দোকানের বাতাসে ভাসছিলো চন্দনের তীব্র ঘ্রাণ..। সেই ঘ্রাণ আমাকে আকুল করে তোলার পরিবর্তে শান্ত করে দিচ্ছিলো।

ও বলছিলো, মালিকের দোকানের চাকরী..। নিজের বিয়ের জন্য টাকা জমাচ্ছে। ছেলে রাঙামাটিতেই থাকে। কিছু টাকা জমলে নিজেদের ছোট্ট একটা দোকান হবে নিজের গ্রামে। একটা ছোট্ট ঘর হবে।  তখন আর এই কষ্ট থাকবে না। খুব সাধারণ একটি মেয়ে…। খুব সাধারণ তার ভাবনা-চিন্তা।

ঝাঁ-চকচকে শহুরে পরিবেশে বড়ো হওয়া আমার মনে হতে লাগলো, জীবন নিশ্চয়ই সাধারণ। না হলে এই তথাকথিত আধুনিক আমি,  এই পাহাড়ি অচেনা কন্যাকে এতোটা পছন্দ করছি কেনো! এই পছন্দের কোন আকার নেই, আকৃতি নেই। এই পছন্দে ছিলো না কোন আপন করে পাওয়ার আকাঙক্ষা। মেয়েটিকে মনে হচ্ছিলো যেনো পাহাড় থেকে নিঃসঙ্কোচে ঝরে পড়া ঝর্ণার অবিরাম ছন্দময় গান…।

অনেকক’টা বছর পেরিয়ে গেছে তারপর। কিন্তু, আমি চোখ বন্ধ করলে এখনো দেখতে পাই সেই পাহাড়ি মেয়েটিকে..। মুখে চন্দনের আচড়কাটা..। খুব সাধারণ প্রিন্টেড পাহাড়ি পোশাক। দোকানের মালপত্রের ভিড়ে আলাদা হয়ে ভেসে থাকা একটি মুখ..। তাকালেই বোধহয় শান্তি শান্তি…।

অনেকক্ষণ আলাপ করেছিলাম আমরা সেদিন। আমার মানসিক ভারাক্রান্ত মন সেদিন হালকা হয়ে গিয়েছিলো। বুঝেছিলাম, ভ্রমণ মানুষের ভেতরকার ক্রমশ জমে উঠা নাগরিক জীবনের ক্লেদাক্ত  অসচ্ছ্ব  জলকে কী করে নির্মল করে তোলে…।

আমরা সেদিন সেই আলাপের পর অনেক্ষণ কোন কথা বলি নি। শুধু হেঁটেছি। সৈকতে গিয়ে অনেক রাত অবধি বসে বসে ভেবেছি। আমার সঙ্গীরা কী ভেবেছে সেদিন, জানি না। তবে, আমি ভেবেছিলাম, আমার জীবনের প্রতিটি জটিলতা নিয়ে। ভেবেছিলাম, সেই পাহাড়ি কন্যার অবারিত উচ্ছ্বলতা নিয়ে..। যে তার সবসমস্যা সামলে নিচ্ছে আশ্চর্যরকম শান্ত দৃঢ়তায়। হয়তো পাহাড় তাকে শিখিয়েছে এই বাধাহীন উচ্ছ্বলতা। দেখিয়েছে বেঁচে থাকার আনন্দময় গোপন কোন পদ্ধতি…।

সেই ভ্রমণ থেকে ফিরে লিখতে চেয়েছি অসংখ্য দিন,  ফেলে আসা পাহাড়ি কন্যার গল্প। লেখা হয়ে উঠে নি। কী লিখবো, কীভাবে লিখবো ভাবতেই কেটে গেছে লম্বা সময়…।

এরপর বারবার গিয়েছি সমুদ্রের শহরে। প্রয়োজন-ভ্রমণ বিভিন্ন উপলক্ষ্যে। কিন্তু, সেই পাহাড়ি কন্যার সাথে আর কোনদিন দেখা হয় নি আমার। জানি না কেমন আছে সেই হাস্যময়ী পাহাড়ি রাজকন্যা..। হয়তো এখন সে রাঙামাটির কোন এক সবুজ পাহাড়ের কোলে,  বড়ো আদরে গড়ে উঠা কোন গাঁয়ে নিজের প্রিয়জনদের নিয়ে বাস করছে..। হয়তো তাদের ঘর আলো করে স্বপ্নের রাজপুত্র এসেছে। হয়তো সেই চন্দনের উপটান-মাখা মেয়েটি এখন ঘোরতর সংসারী হয়েছে..। হয়তো…

 পাহাড়ের আশ্রয় যার আছে, তার আর ভাবনা কিসের! পাহাড় তাকে নিশ্চয়ই আগলে রাখবে…। রাখুক..।

ভালো থাকুক আমার পাহাড়ি রাজকণ্যা। ভালো থাকুক তাহার পাহাড়..। চন্দনের ঘ্রাণে ভরে থাকুক জীবনের প্রতিটি অমিমাংসিত অধ্যায়…।

ভালো থেকো  ’মুরো রাজা জিবো’ …ভালো থেকো..

=====================

## ব্যবহৃত ছবিটি প্রতিকী। ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

## চাকমা ভাষায়  ’মুরো রাজা জিবো’ শব্দের অর্থ হচ্ছে পাহাড়ি রাজার মেয়ে/রাজকন্যা

    1. অনেক ধন্যবাদ জন ভাই। ভালো লাগলো আপনাকে আমার এখানে দেখে। কষ্ট করে পড়া এবং মন্তব্য করার জন্য অনেক ধন্যবাদ 🙂 আবার আসার আমন্ত্রণ 🙂 ভালো থাকবেন। 🙂

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

* ছবির অক্ষরগুলো উপরের ঘরে লিখুন