বিজ্ঞাপনে সেমিওটিকস; ১ টি বিজ্ঞাপন বিশ্লেষণ

বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে সেমিওটিকস বিষয়টির শুরুতে কিছু বিষয় লক্ষ্য করলে আলোচনাটি সার্থক রূপ লাভ করবে। তাই পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করছি। প্রসঙ্গত একটি প্রাচীন লাতিন প্রবাদ উল্লেখ করে নিচ্ছি। ‘Rem tene, verba sequenteur’ অর্থাৎ বিষয়ের সঙ্গে থাকো, ভাষা আপনাতেই আসবে।

বিশ্লেষণের জন্য আমি বেছে নিয়েছি গ্রামীণফোনের থ্রি জি ইন্টারনেট সম্পর্কিত একটি বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপন কী কাজ করে কিংবা কীভাবে কাজ করে, তার ব্যবহারিক বিষয়গুলো আমরা জানি। কিন্তু, আসলে কীভাবে একটি মিনিট খানেকের ভিডিওচিত্র আপনার মনের মধ্যে ছাঁপ ফেলে, সে বিষয়টিই আলোচনার প্রাসঙ্গিক অনুষঙ্গ। বিজ্ঞাপনের ভিডিওচিত্র থেকে কিছু স্থিরচিত্র দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছি।

সেমিওটিকস বলতে ভাষা বা শিল্পের ক্ষেত্রে চিহ্নের (সাইন) নির্মাণ, পদ্ধতিগত গঠন ও প্রয়োগের আলোচনা বোঝায়। সিগনিফায়ার (সূচক) ও সিগনিফায়েড (সূচিত), এই দুটি অনুষঙ্গ মিলেই ‘চিহ্ন’ তৈরি হয়। চিহ্নগুলিকে নিজস্ব অর্থ প্রকাশ কিংবা বৈশিষ্টের কারণে তিন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। যথাঃ (ক) প্রতিমা (আইকন), (খ) সূচক (ইনডেক্স), এবং (গ) প্রতীক (সিম্বল)। তিনটি ভাগ করা হলেও বৃহত্তর অর্থে এগুলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। প্রতিটি চিহ্নেই এই তিনটি বৈশিষ্ট্য বা চরিত্র বর্তমান, যদিও যে-কোনো একটি প্রাধান্য পেতে পারে।

রেপ্রিজেন্টেশন বিষয়টি একটু নজর দেয়ার চেষ্টা করি। যখন কোন বিজ্ঞাপন পাঠক/দর্শক/শ্রোতা/ভোক্তার কাছে তুলে ধরা হয়, তখন তাকে সাধারণ অর্থে পরিবেশন বা রেপ্রিজেন্টেশন বলা হয়। এর মানে হচ্ছে,  ভাষার সাহায্যে অডিয়েন্সের কাছে বার্তা বা মেসেজ অর্থপূর্ণভাবে তুলে ধরা কিংবা সেটা উপস্থাপন করা। এই ভাষা হতে পারে আলোকচিত্র, চলচ্চিত্র, সাহিত্য, পেইন্টিং ইত্যাদি। রেপ্রিজেন্টেশন অডিয়েন্স কীভাবে গ্রহণ করবে সে বিষয়টি ভাষা ও তার অর্থ সবটুকুই অডিয়েন্সের সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত থাকে।

আমরা যে সাইন বা চিহ্নের কথা বলেছি, সেগুলো যেসব মূল অর্থ ধারণ করে, সেই অর্থগুলো আমরা আমাদের সাংস্কৃতিক পরিমন্ডল, আমাদের পূর্বসঞ্চিত অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ইত্যাদির মাধ্যমে সঙ্কেতাবদ্ধ (এনকোড) করে নিয়েছি।  তাই, কোন বিষয় কীভাবে তুলে ধরা হবে এবং তা কী অর্থ প্রদান করবে সম্পূর্ণ রেপ্রিজেন্টেশন সাংস্কৃতিক। একটি বিজ্ঞাপনের চিত্র, ভিডিও বা পোস্টারের নির্দেশিত অর্থ (ডিনোটেটিভ মিনিং) থাকে। আমরা যখন বাহ্যিক অর্থের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সাংস্কৃতিক অর্থ বা কোডগুলোকে পৃথকভাবে চিহ্নিত করতে পারি ডিকোড পদ্ধতির মাধ্যমে, তখন সেই চিত্রের গূঢ়ার্থও (কনোটেটিভ মিনিং) বের করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়। রোলাঁ বার্থ সেমিওটিকস বিষয়টির এই পদ্ধতি অনুসারেই কাজ করার কথা জানিয়েছেন।

এবার আমরা গ্রামীণফোনের বিজ্ঞাপনটির কিছু স্থিরচিত্র দেখি।

এখানে দ্যোতক হিসেবে পাচ্ছি: উইগ বা পরচুল পরিহিত একটি মেয়ে। তার পেছনে সমান্তরাল একটা লাইন। পেছন থেকে খালি টেবিল। উইগহীন খালি মাথা। চোখের দৃষ্টির তীব্রতা। অনেকগুলো ছবির ফ্রেমে চুলসহ মেয়েটির ছবি। মেয়েটির পাথরের মতো মুখ। সেখানে আলো পড়ছে। ফেসবুকে বন্ধুদের শেয়ার করা ন্যাড়ামাথার বন্ধুদের পোস্ট দেখে আন্তরিকতাপূর্ণ হাসিমুখ মেয়েটি। সবশেষে গ্রামীণফোনের লোগোর থিমেটিক এপিয়ারেন্স।

এই একগুচ্ছ দ্যোতক সাধারণ যে অর্থ বহন করে তা হলো: একটি ক্যান্সার আক্রান্ত মেয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার পর বন্ধুরা তার ন্যাড়ামাথা আবিষ্কার করে। সেখানে মেয়েটির চোখের তীব্র দৃষ্টি নিরুপায় ব্যক্তির প্রতিনিধিত্ব করে। বেশকিছু চুলভর্তি মাথার ছবি ফ্রেমের কম্পোজিশন, এক ধরণের বাস্তবতা তৈরী করে যে, মেয়েটির জীবিত সত্ত্বাটি ফ্রেমের মধ্যে বন্দি। বাইরে মেয়েটি চুপচাপ বসে থাকা পাথুরে মূর্তি। যার চেহারায় আলাদা কোন রং নেই। সহপাঠীদের সামনে ন্যাড়ামাথার বিষয়টি মেয়েটিকে কষ্ট দেয়। সহপাঠীরা মেয়েটির মায়ের কাছ থেকে জানতে পারে, মেয়েটির ক্যান্সার। কেমোথেরাপির কারণে তার চুল পড়ে গেছে। মেয়েটির মাথাভর্তি চুল ছিলো একসময়। এই বিষয়টি সহপাঠীদের নাড়া দেয়। তারা নিজেদের মাথা ন্যাড়া করে ফেসবুকে শেয়ার করে। সেই সময় ফেসবুকের থিম কালার সহঅসংখ্য ছোট স্ক্রীণ দেখা যায়। মেয়েটি বন্ধুদের এইরকম ব্যাপারটি দেখে অভিভূত হয়। হাসিমুখের মেয়েটির আনন্দিত চোখবন্ধকরা চেহারাটি তৃপ্তির আবেশ ছড়ায়। মেয়েটির কাছে বন্ধুদের এই সারপ্রাইজ অনেক ভালো লাগে।

এখানে পুরো বিষয়টির রেপ্রিজেন্টশন খেয়াল করলে আমরা দেখতে পাই, পরস্পর সম্পর্কিত দুটি বিষয় ভিন্নতা সহকারে প্রতিফলিত হয়েছে। প্রথম স্তরে, দ্যোতক (বিজ্ঞাপনের বিভিন্ন উপাদান) ও দ্যোতিত (ধারণাসমূহ,  ক্যান্সার আক্রান্ত মেয়ের সামাজিক অসহায়ত্ব, বন্ধুদের পাশে দাঁড়ানো) মিলে একটি চিহ্নগত সার্কেল বা বৃত্ত গঠিত হয়েছে। যা একটি নির্দেশিত অর্থ দিচ্ছে আমাদের।  ‘ক্যান্সার আক্রান্ত বন্ধুর জন্য ভালোবাসা জানাতে হবে অন্যভাবে বললে, তার সময়গুলো স্পেশাল করে তুলতে হবে’।

 দ্বিতীয় স্তরে এই সমাপ্ত বার্তা বা চিহ্ন আরেকগুচ্ছ দ্যোতকের সঙ্গে মেলবন্ধন ঘটছে। যথাঃ  গ্রামীণফোন একটি বৃহৎ কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান । আর্থিক মুনাফা লাভ ছাড়াও তারা আমাদের সামাজিক বন্ধনগুলো সুরক্ষা কিংবা পরিচর্যার  ক্ষেত্রে প্রভাব রাখতে চায় ।

প্রথম অর্থটি রেপ্রিজেন্টেশন প্রক্রিয়ায় দ্বিতীয় স্তরের সাথে মিলেছে। যখন একজন অডিয়েন্স  এই দ্যোতককে বা প্রথম অর্থকে দ্বিতীয় স্তরের অর্থের বা ধারণার সঙ্গে মিলিয়ে বুঝার বা ডিকোডের চেষ্টা করছেন, তখন তিনি অনায়াসেই পুরো বিষয়টির বাহ্যিক অর্থের বাইরে গিয়ে অধিক বিস্তৃত ও আদর্শগতভাবে কাঠামোবদ্ধ বার্তা বা অর্থ পাবেন। ডিনোটেটিভ মিনিং ছাড়িয়ে গিয়ে অডিয়েন্স তখন একটি কনোটেটিভ মিনিং এর সন্ধান লাভ করেন। এই স্তরে বলতে চাওয়া হচ্ছে যে গ্রামীণফোণের শক্তিশালী থ্রিজি নেটওয়ার্ক দিয়ে ফেসবুক ব্যবহার করার মাধ্যমেই আপনি আপনার ক্যান্সার আক্রান্ত বন্ধুর পাশে দাঁড়ানোর মতো আরো মহৎ কাজ করতে পারবেন।

এবং সবশেষে বলা হচ্ছে, ‘ইচ্ছে হলেই চলো বহুদূর’। বিজ্ঞাপনের সব ধরণের অর্থ অডিয়েন্সের অবচেতন ডিকোডিংয়ের ধাপ পেরিয়ে এসে এই লাইনটি  যখন তাকে দেয়া হবে, তখন একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে চালিত করার মতো বা টার্গেট গৌল ড্রাইভেন এক্টিভিটি হিসেবে স্লোগানটি অডিয়েন্সকে একটি বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করবে। সেটা হলো, অডিয়েন্সের মনে হতে থাকবে, গ্রামীণফোনের থ্রিজি ব্যবহার করে ফেসবুক চালিয়ে আমিও এমন মহৎ কাজ করতে পারি। এবং, মূল্য যখন ২ টাকা বলছে, তখন নিয়েই নিই। একটা মহৎ কাজের অংশতো হবো।

এভাবেই দৃশ্যমান বার্তার ভেতর দিয়ে চিহ্ন আমাদের অন্য আরেক স্তরের বার্তা দিয়ে থাকে। বিজ্ঞাপন, সিনেমা কিংবা ভিজ্যুয়াল আর্টের সব ধরণের মাধ্যমেই এই চিহ্নবিদ্যা বা সেমিওটিকসের কারিশমা বিদ্যামান। আমরা তাই ভাষা না বুঝলেও বেশিরভাগসময় আন্দাজ করে নিতে পারি, ভিজ্যুয়াল দেখে। সেমিওটিক বিষয়টি যতোটা না ভাষাতাত্বিক তার চেয়ে অনেক বেশি সত্তাতাত্ত্বিক, এমনকি মনস্তাত্ত্বিক। যার একটা বিরাট অংশ স্ট্রাকচার বা কাঠামোর বাইরে থাকে।

মন্তব্য করুন