বিরুপাক্ষের গেরুয়া সন্ন্যাসী ও পৌরানিক ট্রেইলে যাত্রা

“মৃত্যু নহে বিচ্ছেদ চির মিলনের দ্বার”

পাহাড়ি পথ আমার সবসময় ভালো লাগে। সরু ফিতের মতো চলে যাওয়া ট্রেইলে, পায়ে পায়ে আমি ঢুকে যেতে থাকি নৈঃশব্দের বাড়িতে। শহুরে ব্যস্ততা কিংবা কোলাহল এখানে ক্রমেই তাল হারায়। একসারিতে হেঁটে চলা আরো আরো শান্ত সময়ের পানে। এমনই এক ট্রেইলে হেঁটেছি এই সেদিন। অল্টিচ্যুড আউটডোর এক্টিভিটিস ( Altitude – outdoor activities ) এর একটি ইভেন্টে গিয়েছিলাম সীতাকুন্ডের চন্দ্রনাথ মন্দির এলাকায়। পাহাড়ের গোড়ায় মহামুণি ভার্গব নির্মিত রাম-সীতার স্নানের কুন্ড। হাতের পাশে হনুমানজির মন্দির।

পায়েচলা পাকা পথ উঠে গেছে উপরে। সামনে ভবানী মন্দির পার হয়ে দেখা পেলাম টাইলস নির্মিত গেইটের। তারপর শ্রী জগন্নাথের মন্দির। মাঝে সয়ম্ভূনাথ। লাল-সালু পরিহিত সন্ন্যাসী সঙ্গী হিসেবে জুটিয়ে দিলেন মন্দিরের কুকুরকে। শুরু হলো পথ চলা। জগন্নাথ মন্দির হতে চন্দ্রনাথ যাওয়ার পথে আনুমানিক ১৩/১৪শ ফুট সামনে গেলে চোখে পড়বে পাহাড়ের গা বেয়ে ক্ষীণ ধারায় নেমে আসা একটি ঝর্ণা কিংবা ঝিরি। কেউ বলেন, এই ঝর্ণার জল আসে স্বর্গের নদী মন্দাকিনী থেকে। এখানের জল স্বয়ম্ভুনাথের সেবা- পূজাদির কাজে ব্যবহৃত হয়। বাম দিকের সিঁড়িটি ছত্রশিলা, কপিলা আশ্রম, ঊনকোটি শিব মন্দির ও বিরুপাক্ষ মন্দির এবং পাতালপুরী যাবার রাস্তা হয়ে চন্দ্রনাথ মন্দির পর্যন্ত চলে গেছে। আর ডান পাশের রাস্তাটি সরাসরি চন্দ্রনাথ মন্দিরে চলে গেছে।

আমার কাঁধে বেশ প্রমাণ সাইজের ব্যাগ। ভোর তখন মাথা বের করে তাকাচ্ছে পৃথিবীর দিকে। সীতাকুন্ড রেঞ্জের পাহাড়ে পাহাড়ে ছড়াচ্ছে প্রথম আলো। আমরা উঠতে শুরু করলাম সে আলোয় মাখামাখি হয়ে। বাঁধানো পাঁকা সিঁড়ি। দূর পাহাড়ের শীর্ষে দেখা যাচ্ছে আমাদের গন্তব্য। চন্দ্রনাথ মন্দির। আগেই জেনে নিয়েছি, এই সিঁড়ি পাওয়া যাবে উঠার সহজ অবলম্বন হিসেবে মন্দিরের শেষ পর্যন্ত । আমি উঠছি…। ইতিহাসের পাতায় ছড়ানো অসংখ্য নাম আর মুহুর্ত টাইমফাইলসের মতো আমার সামনে দিয়ে ভেসে যাচ্ছে।

সাজানো সিঁড়িতে হাঁটে হাঁটতে মনে পড়ছে কতো শতো কিছু। এই পথে সিঁড়ি নির্মানের প্রথম উদ্যোগ গ্রহন করেন চব্বিশ পরগনা নিবাসী শ্রীগঙ্গারাম বিশ্বাস। তার বৃদ্ধ মা  চন্দ্রনাথ মন্দির দর্শনে এসে পাহাড়ী দুর্গমপথে পৌছতে পারেন নি চন্দ্রনাথ মন্দিরে। বৃদ্ধ মা তার ছেলেকে নির্দেশ দেন- সীতাকুন্ড পাহাড়ে সিঁড়ি নির্মান করে দেওয়ার। মাতৃআজ্ঞা পালন করতে ১২৭০ বঙ্গাব্দে শ্রীগঙ্গারাম বিশ্বাস সীতাকুন্ডের পাহাড়ী পথে ৭৮২টি সিঁড়ি নির্মান করেন। আচ্ছা, গঙ্গারাম মহোদয়ের মা এখন কোথায়? কোথায়ই বা আছেন গঙ্গারাম স্বয়ং? সিঁড়ি নির্মাণের সময়গুলোতে তিনি কি ছিলেন এখানে? হয়তো ছিলেন..। হেঁটে হেঁটে তদারকি করেছেন নির্মাণ কাজের। ভরাট গলায় আদেশ দিয়েছেন রাজমিস্ত্রীদের। হয়তো..

১৩২৯ বঙ্গাব্দে সিঁড়িগুলো সংস্কার করেন চব্বিশ পরগনার জমিদার শ্রীসূর্যকান্ত রায় চৌধুরী। এরপর শ্রীগোপাল চন্দ্র সাহা ও মধুসূধন সাহা নামের দুই সহোদর বিরুপাক্ষ মন্দির থেকে চন্দ্রনাথ মন্দির পর্যন্ত প্রায় ১.২৫ কিলোমিটারের পথে সিঁড়ি নির্মান করে দেন।  ১৯২৩ সালে বর্ধমানের শিয়ালশোলের রাজা শ্রীযুক্ত প্রমথনাথ মালিয়া, শম্ভুনাথ মন্দিরে যাওয়ার ৬৮টি সিড়ি নির্মান করিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি কি কখনো ভেবেছেন, সেই সিঁড়িতে পা পড়বে শতবর্ষের পরে কোন পথিকের?

এছাড়াও অন্নদা রঞ্জন বন্দোপাধ্যায় ও বসন্ত কুমারী দেবীর নামে রয়েছে কিছু সিঁড়ি। এ সিঁড়িগুলো নির্মানের ফলে তীর্থযাত্রীরা পৌছাতে পারেন শীর্ষস্থানে। এই যে সূর্যকান্ত রায় , গোপাল চন্দ্র সাহা কিংবা মধুসূদন সাহা, কোথায় হারিয়ে গেছেন পরোপকারী এইসব ব্যক্তিরা? অন্নদা রঞ্জন কিংবা বসন্ত কুমারী কি পরস্পরকে চিনতেন? তখন কেমন ছিলো পূজার রীতিনীতি? এই সীতাকুন্ড রেঞ্জের সুপ্রাচীন ট্রেইলের সন্ধ্যা কিংবা সকালগুলো কেমন ছিলো? আমার জানতে ইচ্ছে করে।

ষোড়শ শতাব্দিতে যখন সম্ভুনাথ মন্দিরটি  ধনমানিক্য বাহাদুর , পরৈকোড়ার জমিদার বৃন্দাবন দেওয়ানের মাতা দুর্গারানী , প্রতাপ চৌধুরী ও মুক্তাগাছার জমিদার বিদ্যাময়ী দেবী নিজেদের অর্থায়নে নির্মাণ করেন, তখন তাঁরা কি জানতেন শত বছর পরে ভিন্নধর্মাবলম্বী কেউ একজন গভীর শ্রদ্ধায় ভাববে তাঁদের কথা?

মূল পাহাড়ী চুঁড়ায় অবস্থিত মন্দিরটি চন্দ্রনাথ মন্দির এবং সর্বোচ্চ গিরিশৃঙ্গে অবস্থিত বিরুপাক্ষ মন্দির। পরৈকোড়ার জমিদার নারায়ন লালা এ মন্দিরগুলোর নির্মাতা। তিনি চন্দ্রনাথ মন্দির ও বিরুপাক্ষ মন্দিরের জল সরবরাহের খরচ নির্বাহে ৮০০ দ্রোন লাখেরাজ ভূমি দান করেছিলেন। ১৩২৫ সালে মন্দির গুলো ক্ষতিগ্রস্থ হলে রংপুরের ডিমলার রানী শ্রীমতী বৃন্দারানী চৌধুরানী বহু অর্থ ব্যায় করে মন্দিরগুলোর সংস্কার করে দেন।এ ছাড়াও তিনি ১৩০৪ বঙ্গাব্দে চন্দ্রনাথ ও বিরুপাক্ষ মন্দিরের সিঁড়ি ও লৌহ সেতু নির্মান করে দেন এবং তাঁর স্বামী রাজা শ্রীজানকি বল্লভ সেনের নামে স্মৃতি ফলক দেন। মন্দির নির্মান,সংস্কার ও উন্নয়নে আরও অনেক ব্যাক্তির অবদান রয়েছে। এর মধ্যে ত্রিপুরার রাজা শ্রীগোবিন্দ মানিক্য, সরোয়াতলী গ্রামের জমিদার শ্রীরাম সুন্দর সেন এবং ময়মনসিংহের জমিদার রাজেন্দ্র কুমার রায় চৌধুরী অন্যতম।

নারায়ন লালা থেকে শুরু করে রাজেন্দ্র কুমার রায়সহ আরো অসংখ্য নাম না জানা মানুষ এখানে অর্থ দিয়েছেন। শ্রম দিয়েছেন। প্রাণ উজাড় করে দিয়েছেন ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার অঞ্জলি।  অসংখ্য তীর্থযাত্রী হেঁটে গেছে এই পথ ধরে। আমিও হয়তো হাঁটছি তেমন কারো পদরেখায় ভর দিয়ে..। যে মানুষটির পায়ে পা রেখে হাঁটছি, কেনো এসেছিলো সে এই মন্দিরে? উপাসনায় নত হতে? নাকি, নিজের প্রিয়জনের জন্য কল্যাণ কামনা করতে? হয়তো তার বাড়িতে ছোট ছেলেটা অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছিলো? কিংবা, একটু উন্নতির আশায় পাশের খেতের ফসল নষ্ট করার অনুতাপ থেকে এসেছিলো সে? নাকি, কেবলি পূণ্য অর্জনের বাসনা? জানি না আমি। আমার খুব কষ্ট হয় এই ভেবে, আর কখনোই জানা হবে না, মানুষটি কেনো এসেছিলো। শোনা হবে না তার কথা।

মহামুণি ভার্গব থাকতেন এই পাহাড়ে। এসেছিলেন গৌতম বুদ্ধ। এসেছিলেন রাম-সীতা-লক্ষণ। সয়ম্ভুনাথ মন্দির থেকে সামান্য পূর্ব দিকে গয়াক্ষেত্রের কাছের কুণ্ডের মধ্য দিয়ে মন্থন নদী পূর্ব থেকে পশ্চিমে বয়ে গেছে। এখানে আছে হর গৌরী, দ্বাদশ শালগ্রাম, বিশ্বেশ্বর শিব, পাতালকালী,  অষ্টবসু,  রূদ্রেশ্বর শিব,  গোপেশ্বর শিব, পঞ্চানন শিব,  মন্দাকিনী, পাতাল গঙ্গাসহ অন্য দেব-দেবীর অধিষ্ঠান। তাঁরাও আছেন মিথ আর বিশ্বাসে। এখানে গিরি গুহার অভ্যন্তরে উনকোটি শিব অবস্থিত। কখনো এখান দিয়ে প্রবাহিত হতো আটটি নদী।

আমার পা চলতে থাকে। সহযাত্রীরা ক্লান্তিতে বসে পড়ে। আড্ডা গল্পে টুকটাক পথ চলে। আমি তাদের সাথে সাঁড়া দিই। কিন্তু, আমার মন পড়ে থাকে পৌরানিক সময়ের পাতায়। সময় কাটতে থাকে। আমরা একসময় উঠে যাই চন্দ্রনাথের মন্দিরে। শান্ত শান্তির শীতলতা প্রাঙ্গণ জুড়ে। দেখি বুদ্ধের পায়ের ছাপে আনত-মস্তিস্ক পূজারীকে। এই ট্রেইলের জীর্ণ-প্রাচীন বিরুপাক্ষ মন্দিরে গেরুয়া বস্ত্রের সন্ন্যাসীকে পূজারত দেখি। কতো শত বছর ধরে এই একইভাবে কতো অসংখ্য নাম না জানা পূজারী অর্চনা দিয়ে আসছেন। কোথায় তারা আজকে? এখনো কি তারা পূজার সময় এসে হাজির হন? এখনো কি কালভৈরবীর রহস্যময় মন্দিরে আরতি হয় প্রেতসাধনার?  এখনো কি কেউ যায় সেখানে, সব আলোকময় প্রার্থনা বিফল হওয়ার পর? আলোর পরিবর্তে অন্ধকারের কাছে এখনো কি কেউ আনত হয় পরম আকাঙ্খায়?

জানি না। আমার প্রশ্নের উত্তর জানা হয় না। পৌরাণিক ট্রেইল তার সুদীর্ঘ প্রাচীন সময়ের খাতা নিয়ে অপেক্ষায় থাকে। সিদ্ধার্থ , রাম-সীতা কিংবা ভার্গব মুণিদের জন্য অফুরন্ত অপেক্ষা।  আশা-আকাঙ্খা, পাপ-পূ্ণ্য, ঘণা-ভালোবাসা, আলো-অন্ধকার সব মিলেমিশে একাকার হয়ে জড়িয়ে থাকে এই ট্রেইলের প্রতিটি পরতে। মন্দাকিনীর জল হয়তো পাতাল গঙ্গার পথ ধরে ছুটে চলছে স্বর্গের পথে..। ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ভক্ত-পূজারিদের সব অমঙ্গলময় অনুষঙ্গ। হয়তো গেরুয়া সন্ন্যাসী এই মুহুর্তে অপেক্ষায় আছেন পূজার পবিত্র লগ্নের। হয়তো বৌদ্ধের পায়ের ছোঁয়া পাল্টে দিচ্ছে কোন নতুন সিদ্ধার্থকে..। হয়তো..। প্রাগৈতিহাসিক এই ট্রেইলে ভেসে থাকা সুপ্রাচীন বাতাসে আমি সময়ের স্পর্শ টের পাই। আমি মিশে যাই সময়ের সাথে..। সাধারণ ট্রেইলের পদযাত্রা আমার জন্য হয়ে উঠে সময় পরিভ্রমণের অনন্য টাইমমেশিনে..।


বিরুপাক্ষ মন্দির। ছবি: লালকমল

# এই লেখায় ব্যবহৃত বিভিন্ন ব্যক্তির নাম, সময়কাল, মহাপুরুষ, দেবতা, মন্দির, ঐতিহাসিক চরিত্র ইত্যাদির বর্ণনা বিভিন্ন সূত্র থেকে নেয়া। সেসব সূত্রের সঠিকতা নির্ণয় করার চেষ্টা লেখক করেন নি। তিনি শুধুমাত্র তার অনুভূতির কথা লিখেছেন। তাই, ঐতিহাসিক ভুল/বিভ্রমের দায় লেখকের নয়।

Altitude – outdoor activities একটি ঘুরিয়ে প্রতিষ্ঠান বা ট্রাভেল এজেন্সি। যারা বিভিন্ন সময়ে সুলভ অর্থের দারুনসব ট্যুর/অভিযাত্রা পরিচালনা করে থাকেন। লেখকের সাথে প্রাতিষ্ঠানিক কোন যোগাযোগ নেই অল্টিচ্যুডের। ব্যক্তিগত ইচ্ছা থেকে নাম দেয়া হয়েছে।

মন্তব্য করুন