বৃত্তের বাইরে দাঁড়িয়ে দেখা দৃশ্যপট এবং এলিয়েন হতে থাকা একজনের গল্প

বৃত্তের বাইরে দাঁড়িয়ে দেখা দৃশ্যপট এবং এলিয়েন হতে থাকা একজনের গল্প

# দৃশ্য এক

একজন বাবা তার ছেলেকে কোলে নিয়ে ফুটপাত ধরে হেঁটে যাচ্ছেন। বাচ্চার বয়স  আনুমানিক ৩ বছর হবে। রাতের ঢাকা, ফুটপাতে মানুষের ভিড়, ভাঙাচোরা ড্রেনেজের জঞ্জাল ইত্যাদি কোন কিছুই তার কাছে বিরক্তি কিংবা লক্ষ্য করার বস্তু হতে পারছে না। লোকটি তার ছেলের সাথে কী যেনো কথা বলছেন। ছেলেটি প্রাণখুলে হাসছে। সাথে বাবাও হাসছেন। এই চাঁদের হাসির বাঁধভাঙা জোয়ারের মধ্য দিয়েই পেরিয়ে যাচ্ছেন তাদের গন্তব্যর দিকে। রাতের অন্ধকার ফিকে হয়ে আছে নগরীর বিপনীবিতানের আলোয়। হাঁটাজ্যাম নিয়ে ধীরগতিতে হাঁটছে গাড়িঘোড়া। ধুলা উড়ছে..। এই চারপাশের কিছুই বাবা-ছেলেকে স্পর্শ করছে না যেনো। হৃদয় শীতল করে দেয়া এই হাসির ক্ষণটুকু চমৎকার লাগে..।

ঠিক সেই সময়ে কেউ একজন অচেনা পথিক তাঁদের লক্ষ্য করতে করতে পথ চলছিলো। বাবা-ছেলের আন্তরিক গন্ডির কেউ না সে।

# দৃশ্য দুই

একজন মা তার ছোট মেয়েকে নিয়ে অপেক্ষা করছেন সুনসান রাস্তার মোড়ে। বড়ো মেয়ের বাসায় ফিরতে রাত হচ্ছে..। এই অনিরাপদ নগরীতে রাত ১০টা মানে চিন্তার বিষয়! মা সকালে তার মেয়েকে দেখে খুব আনন্দিত হয়েছিলেন। বেগুণী কিংবা নীলচে রঙের শাড়িতে খুব সুন্দর লাগছিলো তাকে। নিজের মেয়ের মধ্যে মা হয়তো তার সেই বয়সের ছাঁয়া দেখতে পাচ্ছিলেন!

রিকশায় করে অবশেষে মেয়ে এসে নামলো মায়ের পাশেই। মায়ের দৃষ্টিতে স্বস্তির ছাঁপ। আর, ছোটবোনের চোখে আনন্দ..। সারাদিন বোনের দেখা পায় নি বলেই হয়তো…। অস্থির এই বর্তমানে যখন সামাজিক সম্পর্কের বাঁধনগুলো ক্রমশ দুর্বল হতে থাকছে, সেই সময়ে এ’রকম পারিবারিক আবহ সত্যিই ভালোলাগাবোধের জন্ম দেয়। হয়তো এই পরিবারটিরও অসংখ্য সমস্যা আছে। হয়তো অভাব আছে নানা কিছুর। সবকিছু সরিয়ে রেখেই হয়তো তারা সমাজের মতো করে পথ চলে। সবকিছুর পরও তাদের বন্ধনগুলোর যত্ন নিতে তাদের ‍ভুল হয় না। মেয়েটির কিংবা তার ছোটবোনটির মতো চমৎকার শৈশব আমাদের অনেকের পাওয়া হয় নি।

সেই সময়ে কোন একজন ক্ষণিকের রিকশাযাত্রী তাদের পাশ দিয়ে চলে গেছে নগরীর আলোঝলমলে রাস্তার দিকে। যেখানের আলোগুলো বড়ো বেশি প্রাণহীন। বড্ডো বেশি মেকী…। রিকশাযাত্রী মানুষটিরও হয়তো এমন একটি পরিবারের স্বপ্ন ছিলো…।

# দৃশ্য তিন

একটি হলরুম। সাজানো গোছানো। সারিসারি চেয়ার দিয়ে রাখা হয়েছে। সামনে মঞ্চ। সেখানে নাচ-গান-অনুষ্ঠান চলছে। ছোটছোট দলে ভাগ হয়ে গল্প করছে অনেকে। হাসিমুখের মানুষগুলোর দিকে দেখলে মন ভালো হয়ে যায়। অনুষ্ঠানের সাউন্ডবক্স থেকে ভেসে আসছে জোরালো শব্দের তরঙ্গ। সরাসরি এসে মাথায় আঘাত করছে শব্দের প্রবাহ। সময়টাকে একটি সুন্দর সন্ধ্যা বলাই যায়…।

সেই মুহুর্তে একজন চুপচাপ দেখছে  তার চারপাশের পরিবেশ। চেয়ারে বসে মানুষটি কী যেনো ভাবছে আনমনে ..। নিজেকে নিয়ে সবসময় বিব্রত থাকা ব্যক্তিটি আরো বিব্রত হচ্ছিলো হয়তো। তার প্রিয় বন্ধুটিকেও হয়তো খুব মিস করছিলো..। কিংবা মিস করছিলো তার ছোটবেলায় হারিয়ে ফেলা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সুন্দর মুহুর্তকে। কিংবা, কে জানে হয়তো তার মনে পড়ছিলো, টাকার অভাবে খেতে না যাওয়ায় যে হোটেলমালিক তাকে ডেকে নিয়ে ভাত খাইয়েছিলো বিনা পয়সায়, তার কথা..। বিরাট হলরুমের কোথাও বিব্রত মানুষটি ছিলো না। সবার দৃষ্টির সামনে থাকার পরও যেনো যে নেই..।

 

উপরের তিনটি দৃশ্যেরই শেষের মানুষটি আমার চেনা একজন। তার কোন শৈশব ছিলো না। অবাক হওয়ার মতো হলেও সত্যিকার অর্থেই শৈশবের সময়টুকুতে তাকে প্রাণপনে বেঁচে থাকার পদ্ধতি শিখে নিতে ব্যস্ত থাকতে হয়েছিলো। এই লোকটি সারাক্ষণ নিজের মতো করে খেয়াল করে যায়। তার মনে হয়, এই সময়ে সে এক্সিস্ট করে না। চারপাশের সবকিছু যেনো তাকে ছাড়াই ছুটে চলছে নিজেদের মতো করে।

ব্যক্তিটি জানে, তার এই শৈশবশূন্যতা, ইন্ট্রোভার্টনেস, একাকীত্ববোধ ইত্যাদি বর্তমানের আবেগহীন সময়ে খুব কম কারো কাছে হয়তো মূল্য রাখে । ভ্যালুলেস এইসকল অনুভূতি এখন এক্সপায়ার্ড। সবসময় নিজের জায়গাটুকু ছেড়ে দিয়ে অভ্যস্ত মানুষটির জন্য, করুণা হয়। নিজের অধিকার, তারজন্য প্রিয়জনদের জমানো ভালোবাসা, নিজের সবকিছুকে ছেড়ে দিয়ে চুপচাপ সরে আসে সে সবসময়। তার মনে হতে থাকে, সবধরণের সম্পর্কের জায়গায় সে অনুপযুক্ত। আঙুলের ফাঁক গলে আলেগোছে বেরিয়ে যায় তার সব সম্পর্কের শেকড়গুলো। সার্কেল থেকে ছিটকে পড়তে পড়তে নিজেকে কখনো সংযুক্ত ভাবার দুঃসাহস তার হয় না। মায়া হয় তার জন্য…।

কারো প্রতি কোন অভিযোগ নেই তার! রসকষহীন, বেমানান, এই জাতীয় মানুষদের কোন জায়গা থাকতে নেই কোথাও। দূর থেকে অন্যদের প্রাত্যহিক জীবনের মনোযোগী দর্শক হয়েই কেটে যেতে থাকবে ইন্ট্রোভার্ট মানুষটির জীবন। নিজের অধিকার আদায় করে নেয়ার ক্ষমতা না থাকার মাশুলতো তাকে দিতেই হবে…।

শৈশব-হারানো এই মানুষটির সবসময় মনে হয়, হয়তো কখনো ঠিক হয়ে যাবে তার চারপাশের পৃথিবী। তার বন্ধুরা তাকে সার্কেলের বাইরে ছিটকে পড়তে দেবে না। প্রিয় মানুষগুলো তাকে আগলে রাখবে সযতনে। দৃশ্যের পর দৃশ্য সংগ্রহের পরিবর্তে সে নিজেই একদিন কোন দৃশ্যের অংশ হবে।

তার এই ভাবনার কোন শেষ হয় না..। নিত্যদিন বৃত্তের বাইরে দাঁড়িয়ে থেকেই দেখে যেতে হয় তাকে জীবনের কোলাহল…। সার্কেল থেকে বারবার ছিটকে পড়ার পুনঃপৌনকতা ঘটতেই থাকে…। মানুষটির মনের অন্দরে ক্রমশ ক্ষয়ে যেতে থাকে তার আনন্দিত হওয়ার, ভালো থাকবার ক্ষমতা…। বহুদিন ধরে সে দূরে সারে যাচ্ছে আমাদের থেকে…। বৃত্তের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকার এরকম শাস্তি যেনো সৃষ্টা কাউকে না দিন…।


# ছবি কৃতজ্ঞতাঃ Shutterstock

মন্তব্য করুন