ভালোবাসা শব্দের অনুবাদ কিংবা অন্তরার জন্য অগোছালো প্যারাগ্রাফ

ভালোবাসি শব্দের সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয় গ্রামের বাড়িতে। আমরা তখন সদ্য চিটাগাং থেকে বাড়িতে শিফট হয়েছি। বাবার সরকারী চাকরীর সুবাদে এমন জায়গাবদল আমার জন্মের পর এ’নিয়ে তিনবার হলো। একদিন স্কুল থেকে ফিরতে শুনলাম সবাই বলাবলি করছে, পাশের পাড়ার  বারেক কাকার মেয়ে ‘স্মৃতি’ , এসিড দিয়ে শরীর পুড়িয়ে ফেলেছে। কিছু না বুঝেই সবার সাথে দেখতে গেলাম। জানা গেলো, সে পাড়ার ফারুক মিস্ত্রির সাথে স্মৃতির অনেকদিনের সম্পর্ক ছিলো। ফারুক হঠাৎ করে বাবা-মায়ের পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করে ফেলায় স্মৃতি এসিড দিয়ে তার বুকে এবং হাতে ফারুকের নাম লিখেছে। স্পষ্ট জ্বলজ্বল করছিলো, ‘ফারুক ভালোবাসি..’ । সেই প্রথম ভালোবাসি শব্দকে বাস্তবে কাছ থেকে দেখি।

‘স্মৃতি’ আমার দেখা শৈশবের অন্যতম সুন্দর মেয়ে ছিলো। খুব লম্বা, চটপটে। খুব সুন্দর করে সাজতো। আমার এখনও মনে পড়ে..। আমি যখন স্কুল থেকে ফিরতাম, দেখা হলেই বলতো, ‘এইযে আপনি! আপনাকে আমি বিয়ে করে উঠিয়ে আনবো।’ আমি লজ্জায় মাথা নিচু করে পালাতাম। ভালোবাসা, বিয়ে এইসব কিছুই তখন কেমন অস্পষ্ট আর অজানা লজ্জা কিংবা ভয়ের ছিলো।

তারপর গ্রাম ছেড়েছি বহুদিন। সময় পেড়িয়ে গেছে অনেকটা পথ। স্মৃতিদের ভাঙা বেড়ার ঘর এখন একতলা বিল্ডিং। এলাকার এক উঠতি রাজনীতিকের সাথে পূনরায় প্রেমের শেষে তাদের বিয়েও হয়েছে বেশ অনেকদিন হয়ে গেছে। পাল্টে গেছি আমি..। নিয়ন আলোর এই ব্যস্ত শহরে আমাকে আর চেনাই যায় না।

ছুটন্ত আমার একদিন চলতে চলতে হঠাৎ থেমে যেতে ইচ্ছে হলো। সেদিন সন্ধ্যার ধোয়াটে আলো-আধারিতে আমি প্রথম অন্তরাকে দেখি। চটপটে চঞ্চল। উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে চারপাশে। নিজের চতুর্দিকে একটা অদৃশ্য বলয় নিয়ে তার জগত। তখন আমি সবে কুষ্টিয়া থেকে ফিরেছি অসুস্থ এক বাচ্চার জন্য ফিল্ড ক্যাম্পেইনে অংশ নিতে। ভবঘুরে আমি তখন উদ্যেশ্যহীন ছুটছি কেবল। ভোকাট্টা ঘুরি হয়ে..। আজ এখানে তো কাল ওখানে। সেই সন্ধ্যার আলোয় অন্তরাকে দেখে কেনো যেনো মনে হয়েছিলো, আহ! এবার আমার থেমে যাওয়াই ভালো। সেদিন হয়তো ওর চোখে আমি আমার সর্বনাশই  দেখেছিলাম।

তারপর পথ বেঁধে দিলো বন্ধনহীন গ্রন্থি। টিএসসির রঙজ্বলা ক্ষয়াটে সিমেন্টের বেঞ্চি, পাবলিক লাইব্রেরীর সিঁড়িতে ফ্লাডলাইটের আলো, রিকশাভ্রমণে ঘুমচোখের শহরে আমাদের আনাগোনার সময় বেড়েই চললো। ছন্নছাড়া আমার মধ্যে পাল্টে যেতে থাকলো বহু হিসাবনিকাশ। সময়ের হাত ধরে বহু ঝর- ঝঞ্ঝা পেরিয়ে এখন এক ছাদের নীচে আমাদের বসবাস।

বিয়ের একবছরের বেশি সময় পার হয়ে গেছে। ছোটবেলার সেই ভালোবাসি শব্দের অর্থ না বুঝতে পারা আমি,  এখনো ভালোবাসি শব্দের অর্থ বুঝতে পারি না। আমার অনর্থক রাগ, অগোছালো স্বভাব, বাউন্ডুলে আচরণ, অসংসারী ব্যবহার সবকিছু সহ্য করে যাওয়া অন্তরাকে ভালোবাসি বললেই কি সবটুকু বলা হবে? চাকরী ভালো লাগছে না বলে বাসায় বসে দিনের পর দিন কাটিয়ে দিচ্ছি। ছোট্ট একটা একরুমের সাবলেট বাসায় দমবন্ধ করে কাটিয়ে দেয়া অন্তরাকে ভালোবাসি শব্দটি দিয়ে সন্তুষ্ট করে দেয়ার সাধ্য আমার নেই। অস্বচ্ছল সংসারে নিজের ইচ্ছে কিংবা চাহিদার কথা ভুলে ও যখন আমার জন্য ফোন কিনে এনে দেয়, কিংবা, নিজের হাতখরচের সামান্যক’টা টাকা  থেকে কিছুটা বাঁচিয়ে যখন আমার ফাঁকা মানিব্যাগে ভরে রেখে বলে, আমার টাকা লাগবে না, তখন শুধু ভালোবাসা বলা কি যথেষ্ট হতে পারে?

নিজের হতাশা, বিরক্তি, রাগ, আক্রোশ সবযখন ওর উপর ঢেলে দিই, তখন চুপচাপ সহ্য করে নিরুপায় হাসি দেয়া অন্তরার উপর কতোটা নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি, এটা বুঝতে গিয়ে আমি অবাক হই। সবকিছুর পরও যখন ও বারবার বলে, ভালোবাসি, তখন বুঝতেই পারি না কী বলা উচিত। আবার সেই আগেকার ধাঁধা ফেরত আসে, ভালোবাসা আসলে কাকে বলছি?

এই চারপাশের কঠিন সময়ে আমি বিশ্বাস রাখি ভালোবাসা শব্দের উপর। না বুঝতে পারা এই শব্দটি নিশ্চয়ই এমন কোন শক্তি কিংবা ক্ষমতা ধারণ করে, যার বদৌলতে অন্তরা আমার ভরসার জায়গা হয়ে দাঁড়ায়। পাওয়া না পাওয়ার হিসাব বাদ দিয়ে নিসংকোচে আমার পায়ের তলার জায়গাটুকুতে টিকে থাকতে সাহায্য করে। ফেসবুক, টুইটার, মেসেঞ্জারের বর্তমান সময়ে ভালোবাসা কেমন হয়, জানি না। আমি শুধু বুঝতে পারি, ভালোবাসা হচ্ছে আমার একান্ত ভরসার জায়গা। দিনশেষের ক্লান্ত আমি যেখানে শান্তিতে বিশ্রাম নিতে পারি।

না বুঝতে পারার পরও যখন আমার কাছে এই ভালোবাসা থাকছে, তখন কী প্রয়োজন এর অর্থ বুঝতে পারার? থাকুক না কিছু নীরবতা,  অনুবাদ অক্ষম..। থাকুক কিছু শব্দ তাদের নিজেদের অক্ষরে..। তবুও ভালোবাসা থাকুক আমাদের শহরে..। ছোট্ট একরুমের সাবলেট বাসার প্রতিটি অংশজুড়ে..। ভালো থেকো প্রিয় চাইমবেল..।


# ছবি কৃতজ্ঞতাঃ Contemporary Abstract Art Images

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

* ছবির অক্ষরগুলো উপরের ঘরে লিখুন