ভিজিটিং প্রিজনার্সে শান্তির ১ টি দিন

আমরা যখন জয়দেবপুর, শিববাড়ি পৌঁছলাম, তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। আমি, শান, মুনির আমরা ৩ জন ঢাকার বিরক্তিকর জ্যাম আর গরমে সেদ্ধ হয়ে রাজবাগান এসেছি আশফাক ভাইয়ের দাওয়াতে। ভিজিটিং প্রিজনার্স নামে অভিনব পাবলিক ইভেন্ট ওপেন করে আমাদের দাওয়াত করেছেন তিনি। দারুন সুন্দর চারপাশ দেখতে দেখতেই সন্ধ্যার পথে আমরা ঢুকলাম বাসায়।

চারদিকে দেয়াল দেয়া গাছপালায় ভরপুর, একতলা পাকা বাড়ি। গেটের মুখে এনার্জি বাল্ব আলো দিচ্ছে জোরেশোরে। বাড়ির পেছনে হিসেব করা দিগন্তজুড়ে চাষের জমি। ধান কাটা শেষ হয়ে গেছে কিছুদিন। দূরের জমিতে ধান মাড়াচ্ছে একদল গ্রামবাসি। ব্যাগব্যাগেজ রেখে আমরা হাঁটতে বের হলাম মেঠো পথে। সাজানো গোছানো সুন্দর গ্রাম।

ধানের ঘ্রাণে বুঁদ হয়ে আছে চারপাশের বাতাস। ভাওয়াল রাজবাগান এস্টেটের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আমরা এসে দাঁড়ালাম এক রাস্তার বাঁকে। সামনে দেখা যাচ্ছে সাঁকো..। নীচে দিয়ে চলে গেছে স্রোতহীন খালের ক্ষীণ প্রবাহ। সাঁকো পার হয়ে ওপাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে বিস্মিত হয়েছি। রাস্তার শেষ প্রান্ত ঢুকে গেছে একটা ঝাঁকড়া গাছের তলা দিয়ে। আকাশের পটভূমিতে কিম্ভূতকিমাকার লাগছে। সন্ধ্যা গড়াতেই ফিরতি পথে যাচ্ছি  আমরা।

রাজবাগান এর ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় দলবাঁধা কুকুরের দল (!) আটকে ফেলতে চাইলো আমাদের পথ। ভয়েটয়ে কোনমতে জায়গাটুকু পেরিয়ে রাস্তায় উঠতেই নোমান ভাই এর দেখা। একটু পর দীপদা আর রানা ভাই আসলেন। আমরা পাশের একটি গাছে ক্লাইম্বিং এর রোপ ফিক্স করছিলাম। বহু ঝামেলা শেষ করে অবশেষে রোপ ফিক্সড করতে করতে রাত ১০ টার বেশি। ততোক্ষণে আশফাক ভাই ফিরেছেন অফিস থেকে।

রেশমা আপার আন্তরিকতা আর আশফাক ভাইয়ের উষ্ণতা আমাদের ভালো লাগে। রাতের খাওয়া সারলাম বারান্দায়, সবাই একসাথে। দারুন সব তরকারী দিয়ে পেটপূর্তি শেষ করে জমলো আড্ডা। ভেন্দেত্তা মুখোশ পড়ে পাগলাটে এক্সপেরিমেন্ট আর নানারকম গল্পে রাত প্রায় ৩ টার পর ঘুমোতে গেলাম।   পরদিন ভোরে উঠে দেখলাম, সবাই তখনো ঘুমিয়ে। আমি বাইরে এসে হ্যামকে বসে সকালের শান্ত সময়টুকু উপভোগ করছিলাম। এরইমধ্যে সারাকে নিয়ে রমাপা বাজারে গেলেন। একটু পর নাস্তার ইন্তেজাম হলো। গরম বোম্বে টোষ্ট সাথে ডিমপোচ। সাধারণ হলেও সেই সময় কেনো যেনো ভালো লাগলো। নোমান ভাইয়ের ব্যস্ততা থাকায় উনি ফিরবেন না ফিরবেন না করেও ঢাকার জন্য বেরিয়ে পড়লেন। আমরা বেরুলাম জুমারিং করবো বলে।

বাড়ির কাছেই নদী আছে শুনে সেখানে গোসল করবো। সবাই বের হয়ে নদীর কাছে নামলাম। দূর থেকে দেখে সুন্দর লাগলেও ছোট্ট সেই নদীটির পানি শেষবর্ষার আবর্জনায় পূর্ণ ছিলো। এই সত্যটা পানিতে নামার আগে বুঝতে পারি নি। সারাগায়ে আঁশটে কাঁদা আর চুলকানি নিয়ে বাসায় ফিরে ২য়বার গোসল।

তারপর দুপুরে ভরপেট খেয়ে আবার আড্ডা এবং ঝুলাঝুলি শেষ করতে করতে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। সারাটা সময়ধরে আমাদের সঙ্গ দিয়েছে ‘পিচ্চি সারা’ আর রুদ্র। বিকেলে বিস্কিট চা খেয়ে নিয়েছি। এবার আমাদের প্রিজনে ফেরার পালা। ফিরতে ইচ্ছে করছিলো না। এই শান্ত কোলাহলহীন ছায়াঘেরা বাড়ি, আদুরে পিচকি সারা, আন্তরিক রমাপা, আশফাক ভাই সবাইসহ মনে হচ্ছিলো, প্রিজনে না ফিরে যদি থেকে যেতে পারতাম।

সামাজিক হবার অসংখ্য সমস্যার একটা হচ্ছে, চাইলেই আমরা সব করতে পারি না। সেদিনও আমরা পারি নি থেকে যেতে। রাজবাগান থেকে শিববাড়ি। ওখান থেকে পথে বাস খারাপ হয়ে কিছুটা দেরীতে বাসায় ফিরেছি। জানি না, সেই রাজবাগান, চুপচাপ বয়ে যাওয়া শান্ত নদী, চারপাশের নীরব সন্ধ্যায় ধানের গন্ধমাখা কোন পথিক, কিংবা আমাদের আদুরে সারা এখন কেমন আছে..।

এই বর্তমান সময়ে বসে আমার মনে হতে থাকে, জীবনের চলার পথগুলো কখনো ক্ষণিকের জন্য থেমে গেলে হযতো ভালো হতো। শতবছরের পুরোনো রাজবাগানের গাছপালাঘেরা অন্ধকারে হয়তো এখনো থেমে আছে রাজণ্যবর্গের পথ চলার শব্দ। হয়তো এই নিশ্চল নীরবতার মাঝে এখনো বেসে বেড়ায় নাম-পরিচয়হীন কোন বাইজীকন্যার নূপুরের ধ্বণি। এই রাজবাগানে এখনো ভালোবাসা জমা হয়। এখনো সারার জন্য সারার বাবা শহুড়ে ভিড়ের বাইরে একটু নিঃশ্বাস নেয়ার জায়গা খোঁজেন। রমা’পার চোখে এখনো ছন্নছাড়া আমাদের জন্য সহোদরসুলভ মায়া উপচে পড়ে।

এখনো ভালো লাগে আমার এইসব মানুষের পাশে বসে সময়ের পাতা উল্টে যেতে। জীবন কী, সে আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে, কিংবা আমি নিজে আসলে কোথায় চলেছি, জানি না। তবে, প্রাণপনে চাই, ভালো থাকুক সারা। ভালো থাকুক আমাদের চারপাশের ভালো মানুষেরা। যাদের দেখে পথচলার ক্লান্তির মাঝেও একটু স্বস্তি মেলে..।


# ছবিটি তুলেছেন: টুটুল চৌধুরী । স্থান, রাজবাগানের পাশের নদী। সেদিনের তোলা কোন ছবি আমার কাছে না থাকার কারণে অন্যের ছবি দিলাম।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

* ছবির অক্ষরগুলো উপরের ঘরে লিখুন