মালিকানার ভিত্তিতে বাংলাদেশের সম্প্রচার গণমাধ্যম ব্যবস্থা

মালিকানার ভিত্তিতে বাংলাদেশের সম্প্রচার গণমাধ্যম ব্যবস্থা

‘মিডিয়াম ইজ দ্যা মেসেজ’। মার্শাল ম্যাকলুহানের বিখ্যাত উক্তি। মাধ্যমই বার্তা। মাধ্যমই বলে দিবে, বার্তা কেমন হবে। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তিগত উন্নতি এবং সময়ের পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে পরিবর্তিত হচ্ছে গণমাধ্যমের ফরম্যাট, মিডিয়াম। বিংশ শতাব্দীতে সেভেন মাস মিডিয়া নামে গণমাধ্যম পরিচিত ছিল। মুদ্রিত মাধ্যম, ধারণ যন্ত্র বা রেকর্ডিং , সিনেমা, রেডিও, টেলিভিশন, ইন্টারনেট, মোবাইল-গণমাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে সেই সময় থেকেই। এই প্রকারগুলোর মধ্য থেকে মিডিয়াম বা মাধ্যমের ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের কারণে রেডিও ও টেলিভিশনকে সম্প্রচার গণমাধ্যম বলে আখ্যায়িত করা হয়।

গণমাধ্যম গণমানুষের কথা পৌঁছে দেয় বৃহৎ পরিবেশ ও পরিধিতে। সম্প্রচার গণমাধ্যম এক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে অনেক বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করে থাকে। গণমাধ্যমে সম্প্রচারিত আধেয় নির্ণয় ও নির্ধারণ অন্যতম কষ্টসাধ্য কাজ। প্রতিষ্ঠানের মালিকানা, মালিকপক্ষের আদর্শিক অবস্থান, দেশে প্রচলিত সরকার ব্যবস্থা, সামাজিক চিন্তাধারা ইত্যাদির উপর নির্ভর করে একটি জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্প্রচার আধেয় বা ব্রডকাস্ট কনটেন্ট নির্ধারন করা হয়ে থাকে।

ভক্স পপুলি ভক্স ডাই বা জনগনের কন্ঠস্বরই ঈশ্বরের কন্ঠস্বর-এর মতো বিখ্যাত প্রবাদ থাকার পরও গণমাধ্যম বাস্তব অর্থে জনগনের জন্য নয়। আমরা সাধরণত মনে করি মিডিয়া হবে সত্য প্রকাশের হাতিয়ার, ন্যায় আর বিবেকের পরাকাষ্ঠা।  মালিকানা, মুনাফা, ক্ষমতার রাজনীতি, অংশগ্রহণ নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি নানান জটিলতায় গণমাধ্যম বা সম্প্রচার গণমাধ্যম তার উচিত বৈশিষ্ট্য নিয়ে কাজ করতে পারে না। এই নিবন্ধে আমি দেখানোর চেষ্টা করবো, মালিকানার ভিত্তিতে বাংলাদেশের সম্প্রচার গণমাধ্যম ব্যবস্থার আকার-প্রকার ও কাজের ধরণ। একইসাথে সম্পূরক হিসেবে প্রচারিত আধেয় নিয়ে আলোচনার চেষ্টা করবো।

 

গণমাধ্যমের চার তত্ত্ব বা ফোর মিডিয়া থিওরী

একটি দেশের গণমাধ্যম ব্যবস্থা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভর করে রাষ্ট্রের শাসন-ব্যবস্থার প্রকৃতির উপর। গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক, একনায়কতান্ত্রিক, কিংবা অন্যকোন রকম প্রচলিত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে সেদেশের গণমাধ্যমের মালিকানার প্রকৃতি। এই প্রসঙ্গে বহুল আলোচিত একটি তত্ত্ব স্মরণ করা যেতে পারে। গণমাধ্যমের ৪ মতবাদ নামে পরিচিত এই থিওরী অনুযায়ী, গণমাধ্যম ৪ ধরণের পথ অনুসরণ করে পরিচালিত হয়ে থাকে।

১। গণতান্ত্রিক । রাষ্ট্রের সরকার গণতান্ত্রিক প্রকৃতির হলে সেই রাষ্ট্রের গনমাধ্যমও গণতান্ত্রিক তত্ত্ব বা লিবার্টিয়ান থিওরী অনুসরণে গড়ে উঠে।

২। সমাজতান্ত্রিক। আবার, রাষ্ট্রের সরকার সমাজতান্ত্রিক মতবাদে বিশ্বাসী হলে সেই দেশের গণমাধ্যমও সমাজতান্ত্রিক তত্ত্ব বা কমিউনিস্টিক থিওরী অনুসরণ করবে।

৩। একনায়কতান্ত্রিক। এই জাতীয় প্রকৃতি অনুসরনের রাষ্ট্রে গণমাধ্যম একনায়কতান্ত্রিকতায় বিশ্বাসী হবে। অর্থাৎ, অথোরিটারিয়ান মানসিকতা সম্পন্ন হবে।

৪। কল্যাণকামী। রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার ভিত্তি যদি কল্যাণকামী হয়, তাহলে দেশের গণমাধ্যমও কল্যানকামী মানসিকতার ভিত্তি নিয়েই কাজ করবে।

বাংলাদেশে সম্প্রচার গণমাধ্যম

বাংলাদেশে প্রথম টেলিভিশন সম্প্রচার শুরু হয় ১৯৬৪ সালের ডিসেম্বরে। সে বছরের ১ এপ্রিল অধ্যক্ষ হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন জামিল চৌধুরি। টিভির প্রথম অফিস ছিল অধ্যক্ষের কামরায়। পরে তা ডিআইটি ভবনে স্থানান্তরিত হয়। তখন সম্বল ছিল একটি স্টুডিও, দুটি ক্যামেরা, দুটি ফিল্ম টিভি প্রজেকটর আর ৩০০ ওয়াটের একটি ক্ষুদ্র ট্রান্সমিটার, যার ক্ষমতা ছিল মাত্র ১০ মাইল। এরপর ১৯৬৮ সালে ১৪ এপ্রিল রামপুরায় টেলিভিশন ভবন নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং তা শেষ হয় ১৯৭৫ সলে। ১৭ ডিসেম্বর থেকে এটি ‘বাংলাদেশ টেলিভিশন’ নামে যাত্রা শুরু করে এবং ২১ ডিসেম্বর থেকে নিয়মিত অনুষ্ঠান প্রচার শুরু হয়। এরপর বাংলাদেশে নব্বই এর দশকে স্যাটালাইট আসার পর ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে থাকে বিভিন্ন বেসরকারি টিভি চ্যানেল।

বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। স্বাধীনতার প্রথম দু-তিন বছর যদিও বাংলাদেশ পরিচালিত হয় সমাতান্ত্রিক আদর্শ ও ভাবধারার মধ্য দিয়ে, তবুও তা ছিল কল্যানকামী রাষ্ট্রে বিদ্যমান গণতন্ত্রের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এরপর বাংলাদেশ একটি দীর্ঘসময়, ১৯৭৫’র আগস্টের পর থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত পরিচালিত হয় সামরিক শাসকের অধীনে। ১৯৯০ সালে সর্বশেষ সামরিক শাসক এরশাদের পতনের মধ্য দিয়ে এদেশে পুনরায় গণতন্ত্র ফিরে আসে।

সাংবিধানিক গণতান্ত্রিক ধারার দেশ হওয়ার ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীন বা গনতান্ত্রিক এবং একইসাথে কল্যানকামী হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তার দেখা পাওয়া যায় না। বাংলাদেশে মূলধারার প্রায় সকল গণমাধ্যম মুক্তবাজার অর্থনীতি বা মুনাফাভিত্তিক ব্যবসায়কে মতাদর্শ হিসাবে নির্ধারণ করে কাজ করে যাচ্ছে। সম্প্রচার গণমাধ্যম হিসেবে মূলধারার টিভিগুলো প্রান্তিক জনগোষ্ঠি, নারী, অন্য ধর্মাবলম্বী আর আদিবাসীদের অংশগ্রহণের চেয়ে মার্কেটফোর্স বা ভোক্তার চাহিদাকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। মিডিয়ার মালিকানা প্রান্তিক বা তৃণমূলের মানুষের হাতে না থাকায় তাদের অংশগ্রহণ এখানে নেই বললেই চলে। বর্তমান বাংলাদেশের মিডিয়াকে কেউ কেই ‘ম্যাস মিডিয়া’ না বলে ‘ক্লাস মিডিয়া’ বলে থাকেন।

সেলিম রেজা নিউটন বাংলাদেশের মূলধারার কর্পোরেট মিডিয়া বা সম্প্রচার গণমাধ্যমের ৫টি ‘কর্মসূচি’র কথা উল্লেখ করেছেন।এই কর্মসূচিগুলো হলো:

১. নিজ নিজ বিজনেস-গ্রুপের পুঁজি-মুনাফা-ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষা করা;

২. সাধারণভাবে বাংলাদেশের প্রাইভেট সেক্টরের বা ব্যবসায়িক খাতের সামগ্রিক স্বার্থ রক্ষা করা;

৩. দেশী-বিদেশী কর্পোরেট পুঁজির অনুকূল সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশ গঠন করা, তথা মার্কিন কায়দায় পুরোপুরি একটা ‘ভোগবাদী সমাজ’ গঠন করা;

৪. ব্যবসার অনুকূল রাজনৈতিক ‘স্থিতিশীলতা’ বজায় রাখার ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করা অর্থাৎ পশ্চিমা ঢঙের দ্বি-দলীয় ‘গণতান্ত্রিক’ ব্যবস্থাকে কার্যকরভাবে চালু করার চেষ্টা করা, এবং রাজনৈতিক দলগুলোর লেজুড়বৃত্তির বাইরে স্বাধীন অবস্থান গ্রহণ করা;

৫. আমাদের দেশে শক্তিশালী বুর্জোয়া শ্রেণীর ঐতিহাসিক অনুপস্থিতিতে সামাজিক-সাংস্কৃতিক-বেসরকারী পরিসরের এলিটদের নিয়ে রাজনীতিবিদগণকে বাদ দিয়ে রাজনৈতিক দলের পাল্টা সামাজিক শক্তি হিসাবে ব্যবসায়ীদের পরিচালনাধীন একটা ‘সুশীল সমাজ’ গঠন করা এবং তার নেতৃত্ব ঐ ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধি হিসাবে সংবাদপত্রের বা মিডিয়ার হাতে রাখা।

নিজস্ব স্বার্থরক্ষার হাতিয়ার হয়ে উঠা বাংলাদেশের সম্প্রচার গণমাধ্যম আঙিনায় মালিকানার বিষয়টি গভীরভাবে ভূমিকা রাখে।


লেখাটি পিডিএফে পড়ার জন্য ক্লিক করুন


সম্প্রচার গণমাধ্যমের মালিকানার ধরণ

সম্প্রচার গণমাধ্যমের মালিকানার বিষয়টি নিয়ে আলোচনার সুবিধার্থে এবার সম্প্রচার গণমাধ্যমের মালিকানার আরেকটি ধরণ নিয়ে আলোচনা করা যায়। সম্প্রচার মাধ্যমগুলোর মালিকানার ধরণ বিশ্লেষণ করার জন্য বিশ্বব্যাপী তিনটি মডেল ব্যাপকভাবে অনুকরণ করা শুরু হয়। সিডনী এ হেড এর মতে, প্রকার তিনটি হচ্ছেঃ

১। Permissive Ownership System বা অনুমোদিত মালিকানা পদ্ধতি

ধরনের মালিকানা পদ্ধতিতে সম্প্রচার মাধ্যম সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত হয় বাজার সংস্কৃতির দ্বারা। এই ধরনের সম্প্রচার  গণমাধ্যমের প্রধান উদ্দেশ্য থাকে দর্শক-শ্রোতার চাহিদা অনুযায়ী অনুষ্ঠান প্রচার করা। সম্প্রচার মাধ্যমের উপর সরকারের কোন নিয়ন্ত্রন থাকে না।  ভোক্তার জন্য যা উচিত তার পরিবর্তে ভোক্তা যা দেখতে চাইছে , সেটাই প্রচার করে থাকে। সব প্রোগ্রামের উপর সকল স্থান ও সকল শ্রেণীর ভোক্তার সমান অধিকার থাকে না। ভোক্তা চাইলে নির্দিষ্ট প্রোগ্রামের জন্য গ্রাহক হতে পারে। সকল প্রোগ্রাম বা আধেয় সবার জন্য সমান দামে বিক্রি হয় না। অর্থাৎ, ইকুয়াল পেইড নয়।

২। Paternalistic Ownership System বা অভিভাবকসুলভ মালিকানা পদ্ধতি

এই মডেলের আওতায় যে ধরনের সম্প্রচার গণমাধ্যম থাকবে, সেসব মাধ্যমের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, বাজার সংস্কৃতি বা মুনাফা এখানে মূখ্য বিষয় হয় না। সাধারণত রাষ্ট্র পরিচালিত সম্প্রচার গণমাধ্যমগুলো এই প্রকারের অন্তর্ভূক্ত হয়ে থাকে । Paternalistic সম্পর্কে Sydney W. Head তার World Broadcasting System গ্রন্থে বলেন, ‘Paternalism means considering needs as well as wants and curbing market forces. এই মালিকানায় সব ধরণের সেবা সব জায়গায় পাওয়া যাবে। সব ধরনের ভোক্তাকে একই পরিমাণে অর্থ পরিশোধ করতে হবে অর্থাৎ, ইকুয়াল পেইড ব্যবস্থা।

দর্শক দেখতে পছন্দ না করা সত্ত্বেও কিছু আধেয় প্রদর্শিত হবে উন্নয়ন ও সামাজিক দায়িত্ব পালনের স্বার্থে। আদর্শিকভাবে নিরপেক্ষ হওয়ার চেষ্টা থাকবে এই জাতীয় মালিকানায়। সরকারের সীমিত নিয়ন্ত্রণ থাকে প্রচারিত আধেয় বা কনটেন্টের উপর। স্থানীয় শিল্পী, কলা-কুশলী, পরিচালক-প্রযোজক, নির্মাতাদেরকে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেয়ার চেষ্টা থাকবে। বিজ্ঞাপনদাতা ও সরকারের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণকে অস্বীকার করে বা পাশ কাটিয়ে চলে এই জাতীয় মালিকানার সম্প্রচার গণমাধ্যম।

৩। Authoritarian Ownership System বা নিয়ন্ত্রনমূলক মালিকানা পদ্ধতি

এখানে নিয়ন্ত্রইন প্রধান বিষয়। এই জাতীয় মিডিয়া আক্ষরিকঅর্থেই সরকার বা মালিকের মুখপাত্র। সরকার বা মালিকগোষ্ঠীর ভালোলাগা-মন্দলাগা, গুণগান প্রচার ইত্যাদির জন্যই এই জাতীয় মিডিয়ার জন্ম। জনগণের স্বার্থেই সবকিছু প্রচার করা হচ্ছে এই ডায়লগের ভেতর দিয়ে সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা হয় সবক্ষেত্রে। সরকার বা কর্তৃপক্ষের স্বেচ্ছাচারিতা নিয়েই কনটেন্ট বা আধেয় ডিজাইন করা হয়।

উন্নত গণতান্ত্রিক দেশে গণমাধ্যমে cross-ownership বা একাধিক মালিকানাকে উৎসাহিত করা হয়। আমরা বিবিসির মডেল লক্ষ্য করতে পারি। বৃটেনের জনগনের শেয়ারভিত্তিক মালিকানায় পরিচালিত হয় বিখ্যাত এই প্রতিষ্ঠানটি। সারাবিশ্বে নিজের দেশ ও জনগণের ব্র্যান্ডিংয়ের কাজটি সুনিপুণভাবে করে যাচ্ছে তারা।

বহুমালিকানার সবচে বড়ো সুবিধাজনক দিকটি হলো হলো, কোনো একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠি যেন সেই গণমাধ্যমকে তার কায়েমী স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে। কিন্তু আমাদের দেশে একই ব্যক্তি বা গোষ্ঠি পত্রিকা, টেলিভিশন, এফএম রেডিও এমনকি অনলাইন প্রতিষ্ঠানের মালিক। কারো কারো আবার একাধিক ধরণের মিডিয়ার মালিকানা করায়ত্ব করতেও দেখা যায়। ফলে তথ্য ও মত প্রকাশের প্রায় সবগুলো শাখা দখলে রাখতে সক্ষম হচ্ছেন তারা এবং সেটা তারা করছেন রাজনৈতিক আর ব্যবসায়িক স্বার্থকে মাথায় রেখে, জনস্বার্থে নয়।

মিডিয়া প্রোফাইল ও আধেয় বিশ্লেষণ

সম্প্রচার গণমাধ্যমের আধেয় বিশ্লেষণের সুবিধার্থে আমি ২ টি টিভি চ্যানেল ও একটি এফ.এম রেডিও স্টেশন বেছে নিয়েছি। প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক/মালিকগোষ্ঠীর কিঞ্চিৎ বিবরন (মিডিয়া প্রোফাইল) সহকারে,  সম্প্রচারিত আধেয় নিয়ে আলোচনা করা হলো।

একুশে টিভি

একুশে টেলিভিশন বা ইটিভি (ইংরেজি: Ekushey Television বা ETV) বাংলাদেশের একটি বেসরকারি টেলিভিশন সম্প্রচার কেন্দ্র। ২০০০ সালের ১৪ই এপ্রিল এটি সম্প্রচার কার্যক্রম শুরু করে। প্রথমদিকে এটি উন্মুক্ত টেরিষ্টোরিয়াল টেলিভিশন কেন্দ্র হিসেবে সম্প্রচার শুরু করে। টিভি চ্যানেলটির খবরে নতুনত্ব ও অভিনবত্ব থাকার কারণে দর্শকদের কাছে বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে।

শুরুর দিকে টিভি চ্যানেলটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন সাইমন ড্রিং এবং বার্তা প্রধান ও পরিচালক ছিলেন মিশুক মুনীর। টিভি সাংবাদিক হিসেবে জ ই মামুন, মুন্নী সাহা, সামিয়া জামান, সামিয়া রহমান প্রমুখ জনপ্রিয়তা অর্জন লাভ করেন।

২০০২ সালের ২৯শে আগস্ট টিভি কেন্দ্রটি সম্প্রচার আইন লঙ্ঘনজনিত মামলার কারণে বন্ধ করে দেয়া হয়। পরবর্তীতে ২০০৫ সালের ১৪ই এপ্রিল পুণরায় সম্প্রচারের অনুমতি লাভ করলেও উন্মুক্ত সম্প্রচার ক্ষমতা বিলোপ করা হয়। ২০০৭ সালের ২৯শে মার্চ থেকে টিভি কেন্দ্রটি বর্তমানে পূর্ণাঙ্গভাবে তাদের সম্প্রচার কার্যক্রম ।

২০১৫ এই টেলিভিশন চ্যানেলের মালিকানায় পরিবর্তন এসেছে। মালিকানা পরিবর্তনের পর নতুন চেয়ারম্যান হয়েছেন এস আলম গ্রুপের সাইফুল ইসলাম। অর্থ ঋণ আদালত আইন-২০০৩ এর ১২ ধারা অনুযায়ী আদালতের নির্দেশক্রমে ২০১৫ সালের ৮ অক্টোবর নিলাম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসাবে এস আলম গ্রুপ কর্তৃক একুশে টেলিভিশন লিমিটেডের সকল কিছু ক্রয় করা হয়।

আওয়ামী ঘরানার এই চ্যানেলটি দলীয় মতবাদঘেষা আধেয় সম্প্রচার করে থাকে।কনটেন্টের প্রকার অনুসারে সাজিয়ে অনুষ্ঠানগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এন্টারটেইনমেন্ট জাতীয় আধেয়র আধিক্য বেশি। পরিবর্তনে অঙ্গীকারাবদ্ধ স্লোগান ধারণ করলেও জনকল্যানমূলক অনুষ্ঠান প্রচারে তাদের অনিহা আছে বলেই মনে হয়। এন্টারটেইনমেন্ট এর পরে আছে সংবাদ ও তথ্যজাতীয় অনুষ্ঠানের স্থান।

সারাদিনব্যাপি যে সংবাদ চালানো হয়, তার অধিকাংশই বহুলপাঠে জর্জরিত। সারাদিনে খুব বেশি বৈচিত্র্য দেখা যায় না সংবাদে প্রচারিত তথ্য ও ধরণে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান সারা সপ্তাহে মাত্র ২ দিনে দেড় ঘন্টার মতো পাওয়া যায়। আধিবাসী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অনুষ্ঠানের পরিমাণ শুন্যের কোটায়।

( একটি অনুষ্ঠান বিভাজন তালিকার মাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা করা হলো। এখানে ১ম থেকে ৭ম বলতে সপ্তাহের বিভিন্ন দিনের ক্রম বুঝানো হয়েছে। এবং কলামের সংখ্যাগুলো মিনিট হিসেবে যোগ করে নিয়ে সারা সপ্তাহের যোগফল একেবারে ডানপ্রান্তের ঘরে দেয়া হয়েছে।)

বিজ্ঞাপনের সময়ের অফিসিয়াল কোন হিসাব ডিসক্লোজ করে নি সংশ্লিষ্টরা। সেজন্য ১ ঘন্টা সময় বিভিন্ন টিভি চ্যানেলর অনুষ্ঠান দেখার পর প্রাথমিক ধারণা হিসেবে বলা যায় যে, প্রতিটি প্রোগ্রামের মাঝে মাঝে প্রায় ৩% সময় এ্যাডস্লট বা বিজ্ঞাপন সময় হিসেবে নির্ধারিত থাকে।

মাছরাঙা টিভি

মাছরাঙ্গা টিভি (ইংরেজি: Maasranga TV) বাংলাদেশের একটি বেসরকারি টেলিভিশন সম্প্রচার কেন্দ্র। ২০১১ সালের ৩০ জুলাই এটি পূর্ণাঙ্গ সম্প্রচার কার্যক্রম শুরু করে। মিশ্রিত অনুষ্ঠান পরিচালনা করে থাকে এই টেলিভিশনটি। স্কয়ার গ্রুপের অঞ্জন চৌধুরীর মালিকানায় আছে শুরু থেকেই।

স্কয়ার পরিবার আওয়ামী ঘরানার হলেও মাছরাঙা টিভির আধেয় দেখে অনেকেই মনে করেন, এই টিভিটির মূলত আধেয় নির্ধারণ নেই। কখনো আওয়ামী ঘরানার প্রতি সফট কর্ণার আবার কখনো অন্যদলের প্রতি সহজ অবস্থান লক্ষ্য করা গেছে। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে তাদের করা একটি রিপোর্ট একসময় ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিলো।

সংবাদ প্রচারের ক্ষেত্রে মাছরাঙার টাইমস্লটের কিছু বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা গেছে। যেমন, ২ মিনিটের একটি আপডেট তারা সম্প্রচার করছে। এন্টারটেইনমেন্ট জাতীয় অনুষ্ঠানের আধিক্য বরাবরের মতো চোখে পড়ে। কিছু বিদেশি চলচ্চিত্র ও সিরিয়ালের বাংলা ডাবিং প্রচার করে থাকে নিয়মিত।

অনুষ্ঠানের কোন শক্তিশালী প্যাটার্ণ লক্ষ্য করা যায় না। সম্প্রচার গণমাধ্য মালিকানা তত্ত্ব অনুসারে আপাত দৃষ্টিতে পারমিসিভ ও প্যাটার্নালিস্টিক এর মিশ্র প্রয়োগ দেখা যায়। ইসলামী অনুষ্ঠান খুব কম সময় বরাদ্দ থাকলেও অন্যধর্মের অনুষ্ঠান দেখা যায় নি।

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বা তাদের ভয়েস রেইজ করার জন্য উৎসাহ বা আগ্রহমূলক কোন আলামত দেখা যায় না। মুনাফার প্রতি নজর রেখে চলছে এই টেলিভিশনটি। এমনটিই মনে হয় প্রাথমিক যাচাইয়ে।

এবিসি রেডিও

এবিসি রেডিও বাংলাদেশের একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক এফএম রেডিও ষ্টেশন।  এই রেডিও ষ্টেশনের বেতার তরঙ্গ ৮৯.২ এফএম। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার কাওরান বাজারে এবিসি রেডিওর প্রধান কেন্দ্র অবস্থিত। ২০০৯ সালের ৭ই জানুয়ারি এবিসি রেডিও বাণিজ্যিক পরিচালনা শুরু করে। ‘বাংলার আওয়াজ’ স্লোগানে এই রেডিও কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দেশের অন্যতম প্রভাবশালী মিডিয়া গ্রুপ ট্রান্সকম এর মালিকানায় পরিচালিত এই রেডিওটি প্রথমদিকে অনেকাংশেই নিরপেক্ষ থাকলেও পরবর্তীতে দলীয় মুখপাত্র হিসেবেই অবস্থান তৈরী করে নেয়।

সম্প্রচারিত আধেয়র দিক থেকে দেখলে মোটেও উন্নয়নমূলক বা কল্যানকামী সম্প্রচার গণমাধ্যম বলার পক্ষে আমি নই। ইনসোমনিয়া উইথ রেহান, মেন্টোস কানেকশন মামাস, সিম্ফনি সান শাইন আওয়ার, উইকেন্ড রাশ, হট বক্স উইথ রাফা ইত্যাদি নিয়মিত প্রচারিত অনুষ্ঠানের নাম শুনে কোনভাবেই বুঝার উপায় নেই যে, আমাদের লোকাল অনুষ্ঠান হতে পারে এগুলো।

আমি বলছি না যে, ইংরেজি নাম থাকতে পারবে না টাইটেল হিসেবে। আমি বলতে চাইছি, এই অনুষ্ঠানগুলোর মধ্য দিয়ে ইংলিশ-বাংলার জগাখিচুড়ি উপস্থাপন, গানের হরেক রকম ভ্যারিয়েশন, বার্তা বা পারমর্শের লোকালাইজেশন এর পরিববর্তে গ্লোবালাইজেশন সত্যিই ভাবার মতো বিষয়।

অনুষ্ঠানগুলো বেশিরভাগই হালকা চটুল টাইপের কমেডিয়ান ধাঁচের ডায়লগসমৃদ্ধ। সারা সপ্তাহে ২৫ মিনিটের একটা স্লটে ইসলামী অনুষ্ঠান থাকলেও অন্যকোন ধর্মের অনুষ্ঠানের দেখা মেলে নি। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের কথা চিন্তা করা এখানের পরিবেশ অনুযায়ী একেবারেই অবান্তর মনে হয়েছে।

বাংলাদেশের সম্প্রচার গণমাধ্যম একটি ক্রান্তিকাল পার করছে। প্রায় ৫০ বছর বয়স এ’দেশের সম্প্রচার গণমাধ্যমের। কাছাকাছি সময়ে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ঘটলেও আধেয়-বৈচিত্র বা প্রকাশ-স্বাধীনতার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবস্থানে যেতে পারে নি। অবশ্য এই সময়কালকে সম্প্রচার গণমাধ্যমের বিকাশমান কাল হিসেবেও ধরা যেতে পারে।

সামগ্রিক বিবেচনায় বলা যায়, দেশের সম্প্রচার গণমাধ্যম অভিভাবকসুলভ মালিকানার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। আধেয়র দিকে লক্ষ্য করলে মনে হতে পারে যে, অনেকক্ষেত্রেই কিছুটা পারমিসিভ মালিকানার প্রভাব রয়েছে। মিডিয়া মালিকানা সমানভাবে মিডিয়া ফিলোসোফি ও প্রোগ্রাম টাইপোলজিকে প্রভাবিত করে থাকে।

উন্নয়নমূলক ও যথার্থ স্বাধীন সম্প্রচার গণমাধ্যম পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক মিডিয়া ও যথেষ্ট অবকাঠামোগত শক্তি আছে আমাদের সম্প্রচার গণমাধ্যমের। প্রয়োজন সরকার, মালিকগোষ্ঠী, ভোক্তা-দর্শক, নির্মাতা-সমালোচক সকলের সমানভাবে চেষ্টার। তাহলেই সম্প্রচার গণমাধ্যম শুধু প্রচারমাধ্যম না হয়ে গণমানুষের বিনোদনের পাশাপাশি তাদের জন্য কল্যাণজনক অনুষঙ্গ হতে পারে।

তথ্যসূত্রঃ

১)      Sebert, Fred S.; Peterson, Theodore & Schramm, Wilbur, Four Theories of The Press, University of Illinois Press
২)     Head, Sydney W. (1985), World Broadcasting Systems: A Comparative Analysis, Belmont, Calif, Wadsworth pub. Co.
৩)     উইকিপিডিয়া।
৪)      তারিক, নঈম (২০১১), টেলিভিশন সাংবাদিকতা, ঢাকা, জনান্তিক।
৫)     বাংলাপিডিয়া।
৬)     শাহরিয়ার বিপ্লব (২০১৩), ব্রডকাস্ট জার্নালিজম, ঢাকা, ঐতিহ্য।
৭)     এরশাদ, আনিসুর রহমান (০৮-০৮-২০১৪), সামহোয়্যার ইন…ব্লগ, ঢাকা।
৮)     অফিসিয়াল ওয়েবসাইট (২০১৭), মাছরাঙা টেলিভিশন, ঢাকা।
৯)     অফিসিয়াল ওয়েবসাইট (২০১৭), একুশে টেলিভিশন, ঢাকা।
১০)    অফিসিয়াল ওয়েবসাইট (২০১৭), এবিসি রেডিও, ঢাকা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

* ছবির অক্ষরগুলো উপরের ঘরে লিখুন