শৈশবের শবে বরাতে গরম জিলাপির বিলাসিতা

শৈশবের শবে বরাত ও পকেটভর্তি গরম জিলাপির বিলাসিতা

শবে বরাত শব্দটির সাথে পরিচয় হয় শৈশবে। আমরা তখন চিটাগাংয়ের আবাস ছেড়ে গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জে চলে এসেছি। বাবার সরকারি চাকরীর বদলি হলো ঢাকাতে। গ্রামের পরিবেশ আমার কাছে মোটেও রোমান্টিক টাইপ মনে হয় নি। শহুরে আমি যেমন জীবনে অভ্যস্ত ছিলাম, গ্রামে জীবন তারচে অনেক আলাদা ছিলো। সবচে বেশি অবাক লাগতো, গ্রামে তখন কোন ইলেক্ট্রিক আলো ছিলো না। ফ্যান চলতো না। চারদিকে রাত হলেই ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে যেতো। ঘুটঘুটে অন্ধকারের কথা একটু বড়ো হবার পর যখন বইয়ে পড়েছি, তখন সেটার ধরণ ভেবে নিতে আমার একটুও কষ্ট হয় নি। আরেকটা বিপদ ছিলো ওয়াশরুম। গ্রামে তখন স্যানিটারী বাথরুম ছিলো না। পূর্বপুরুষের কোন এককালের বনেদীপনার সাক্ষ্য হিসেবে তুলনামূলক আমাদের ওয়াশরুমের অবস্থা কিছুটা উন্নত হলেও সেটা সেনিটারি ছিলো না। কী যে কষ্ট হয়েছে আমার মানিয়ে নিতে…।

সেই সময়টাতেই আমি শবে বরাতের কথা প্রথম শুনি। আমাদের বাড়িতে আমাকে সহ ৮/১০ জন পিচ্চিবাহিনী ছিলো। সবাই একসাথে ঘুরে বেড়াতাম। খেলাধূলা করতাম। বলা ভালো যে, ওরা একসাথে খেলতো, আমি দূরে দাঁড়িয়ে দেখতাম। ঢাকা থেকে গিয়েছিলাম বলে ওদের সাথে ঠিক খাপ খেতো না। সেজন্য ওরা আমাকে অবচেতনেই আউটসাইডার হিসেবেই ধরে নিতো। এই ব্যাপারগুলো না বুঝলেও অবহেলাটুকু টের পেতাম। যাইহোক।

একদিন বিকালে দেখি সবাই যার যার মিনি হারিকেন ঠিকঠাক করে নিচ্ছে। হারিকেন বলতে আমাদের সবার একটা করে নিজস্ব সম্পত্তি ছিলো। রঙের কিংবা কনডেন্সড মিল্কের টিনের কৌটার পেছনদিকে অনেকগুলো ছোটছোট গোল ছিদ্র করে নেয়া হতো প্রথমে। তারপর কৌটাটিকে আড়াআড়ি (হরাইজেন্টালি) করে রেখে গুনা  (লোহার তার) দিয়ে হাতল বানানো হতো। সেই কৌটার মধ্যে ছোট করে কাটা মোমবাতি জ্বালিয়ে হাতে নিয়ে রাতে আমরা মসজিদে যেতাম নামাজ পড়তে। কৌটার পেছনদিককার ছিদ্রগুলো দিয়ে আলো আসতো পর্দার মতো করে। আর, সেই অংশটুকু সামনের দিকে মুখ করে রাখার কারণে বাতাসও আটকাতো। ফলে ভেতেরর বাতি নিভতো না।

সেদিন সন্ধ্যায় ওদের সবাইকে জিজ্ঞেস করে জানা গেলো যে আজকে রাতে সবাই এশার নামাজ মসজিদে পড়তে যাবে। মসজিদে শবে বরাত উপলক্ষে বিশাল অায়োজন আছে নাকি।  শবে বরাত শব্দটি একেবারে আনকোড়া মনে হওয়াতে আমি এর অর্থ জানতে চাইলাম। ওদের মধ্যে পন্ডিত সবজান্তা ছিলো রাসেল নামের একজন। ও আমাকে বললো, এই রাতে আমাদের ভাগ্য লেখা হয়। আজকে যে যতো বেশি ভালো কাজ করবে, সারাবছর সে কেবল ভালো কাজই করবে। আর, একইসাথে আজকে কেউ ভালো  খেলে সারাবছর ভালো খাওয়া পাবে।

ওদের কথা শুনে আমি বেশ উৎসাহ বোধ করে ঘরে ফিরলাম। মাকে মসজিদের যাবার কথা বলতেই তিনি খুব খুশি হয়ে রাজি হলেন। আমাদের বাড়িতে তখন হালুয়া-রুটি, মজার মজার আরো কি কি যেনো রান্না হচ্ছিলো। আমার চাচাতো ভাই  হাসান (সবাই ওকে গিট্টু বলে ডাকতো) এসে আমাকে বললো, সাথে যেনো একটা পলিথিনের ছোট প্যাকেট নিয়ে নিই। জানতে চাইলাম, কী হবে প্যাকেট দিয়ে। ও আমাকে বললো, মসজিদে আজকে অনেক হালি বিস্কুট (টোস্ট বিস্কুট আমাদের এলাকাতে হালি বিস্কুট নামে পরিচিত) আর গরম গরম জিলাপি দিবে। আমিতো  ভীষণ অবাক! মসজিদে আবার কখনো রাতে এভাবে খাওয়া দেয় নাকি! জিলাপির কথায় আমারতো আরো আনন্দ হচ্ছিলো। মিস্টিজাতীয় খাবার আমার খুব পছন্দের ছিলো। যদিও মায়ের কড়া নিষেধাজ্ঞার কারণে বাইরের খাবার ঘরে আসতো কালেভদ্রে।

আমরা রেডি হয়ে মিনি হারিকেন জ্বালিয়ে বের হলাম। সবার পকেটে প্লাস্টিকের ছোট ছোট ব্যাগ। কারো কাছে একের বেশি প্যাকেটও আছে বলে জানালো। তখন শবে বরাতের সময় খুব শীত পড়তো। গলা অব্দি শীতের পোশাকে ঢেকে আমরা মসিজদে গেলাম। অনেক্ষণ ধরে নামাজের পর মিলাদ শেষে তবারকের পালা আসলো।  আমাদের প্লাস্টিকের প্যাকেট হাতে নিয়ে সিরিয়ালে বসে আছি। একজন একজন করে বড়ো কাগজের ঠোঙায় নানা ধরণের তবারক নিয়ে আসছে। আমাদের প্যাকেট ভরে উঠছে ধীরে ধীরে। হালি বিস্কুট, গুড়ের বাতাসা, তালমিশ্রির বাতাসা, নাড়ু, নিমকি আরো কতো কি আইটেম! সেই সাথে বাজারের ঘোষের দোকানের গরম জিলাপি! আহা! সেই জিলাপি কখন বাজার থেকে আনা হয়েছিলো, আর নামাজের এতো লম্বা সময় ধরে কী করে যে সেগুলো গরম ছিলো, তখন সেটা চিন্তায় আসে নি। আমার এক প্যাকেট ভরে যাওয়াতে আরেকটা প্যাকেট হাসানের কাছ থেকে ধার নিয়ে তাতে ভরে নিচ্ছিলাম হাত উপচে পড়া তবারক। প্যাকেটভর্তি পছন্দের খাবার দেখে তখন প্রশ্ন ছাড়াই মনে হয়েছিলো, নিশ্চয়ই আজকে রাতে মানুষের ভাগ্য লেখা হয়। নাহলে, অন্যদিন মসজিদে এমন খাবার দেয় না। অথচ আজকে দিচ্ছে কেনো! নিশ্চয়ই সারা বছর ভালো খাবার যাতে পাওয়া যায়, তাইতো সবাই অন্যদের খাওয়াচ্ছে!

হাতভর্তি করে জিলাপি আর হালিবিস্কুট-বাতাসা নিয়ে ঘরে ফিরেই আবার হালুয়া-রুটি খেয়েছি বাড়ির সবার ঘরে। তারপর ভাবনাহীন ঘুমিয়ে গিয়েছি। আমাদের শবে বরাত ছিলো এমনই। সেই দিনগুলোতে বাবার চাকরীর বেতন খুব নগন্য ছিলো। আমার বায়না থাকলে কয়েকমাস আগে জানাতে হতো। বাবা আমাদের সুন্দর সময় দিতে চেষ্টার কোন ত্রুটি করেন নি। কিন্তু, কীভাবে যেনো বুঝে গিয়েছিলাম শৈশবেই যে, আমার চাওয়া-আকাঙক্ষা ইত্যাদির সীমা খুব ছোট। সেই ছোট্ট সীমানাতেই নিজেকে মানিয়ে নিয়েছিলাম না বুঝেই। এই প্যাকেটভর্তি জিলাপির বাজারমূল্য হয়তো খুব বেশি ছিলো না। কিন্তু, আলাদা করে কখনো খাওয়া হতো না আমাদের। একটুকরো গরম জিলাপিও তখন আামদের কাছে বিলাসিতাই ছিলো। তাই, যখন শবে বরাত আমার পছন্দের জিলাপি পাওয়ার উপলক্ষ্য হয়ে গিয়েছিলো, তখন শবে বরাতকে সত্যিকার অর্থেই সৌভাগ্যের রজনী মনে হতো।

তারপর ঢাকায় পড়তে আসলাম। মানুষের মতো মানুষ হতে হলে তখন সবাই ঢাকা আসতো। পুরনো ঢাকায় শবে বরাত ছিলো জমকালো। অনেক বেশি উৎসবমুখর। হোস্টেলে ব্যাপক আয়োজন হতো। খাওয়ার এতোসব আইটেম জমা হতো যে,  বেশিরভাগের নামও তখন জানতাম না। হোস্টেলের ছাদে দাঁড়িয়ে রাতের আকাশে আতশবাজি দেখতাম। সারারাত জেগে বড়ো ভাইদের সাথে ঘুরে বেড়াতাম পাটুয়াটুলি-আরমানিটোলার রাস্তায়। প্রচুর মানুষের আনাগোনা হতো শহরজুড়ে। মসজিদগুলো থেকে গমগমে জিকিরের শব্দ আসতো। সবকিছুই আমার কাছে খুব নতুন ছিলো। এতো আনন্দ-মানুষ-উৎসব মুখরতা, সবকিছু ছাপিয়ে আমার তখন কেনো যেনো গ্রামের শবে বরাতেই গরম জিলাপির কথা মনে পড়তো। মিনি হারিকেনের টিমটিমে আলোয় পথ চলার শিহরণ আমি তখনও অনুভব করতে পারতাম। এতো আলোর মধ্যেও আমার কেনো যে ইলেক্ট্রিসিটিহীন অজপাড়া গাঁয়ের অন্ধকারকে অনেক বেশি নিজের মনে হতো।

তারপর অসংখ্য শবে বরাত কেটে গেছে। অসংখ্য ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টেছে। এই শহর বদলে গেছে। পাল্টে গেছে গ্রামের আপন অন্ধকারের ভালোবাসামাখা নিস্তব্ধ রাতগুলো। শত টুকরো জিলাপি শেষ করেছি। জেনেছি জিলাপির ভিন্নভিন্ন নাম হয়। সাধের ভিন্নতার সাথে দামের তারতম্যও আমার জানা হয়েছে। কিন্তু,  বহুদিন আগে গ্রামের রাতে ফেলে আসা  শবে বরাতের প্লাস্টিক প্যাকেটভর্তি আনন্দটুকু আর কোথাও খুঁজে পাই না। এখন আমাদের নাগরিক জীবন অনেক বেশি গতিশীল। ব্যস্ত। এখনো শবে বরাত আসে প্রতিবছর। পত্রিকার পাতা আর সোশ্যাল মিডিয়াতে লাইনের পর লাইন লেখা হয় খাবারের রেসিপি নিয়ে। হালুয়ার নানান ধরণ আর  মুখরোচক খাবারের ঘ্রাণ এখনো ভাসে রাতের নাগরিক হাওয়ায়। কিন্তু, গ্রামের একদল খুব সাধারণ শিশু-কিশোরের প্রাণের গভীর থেকে উৎসারিত সেই নিশ্চিন্ত আর প্রাণখোলা আনন্দ কি এই নাগরিক মানুষেরা উপভোগ করতে পারে?

 

 

# বিঃদ্রঃ  শবে বরাত পালন নিয়ে ধর্মীয় নানা ব্যাখ্যা তর্কে আছে। সেসবের সাথে এই লেখার কোন সম্পর্ক নেই। বহুবছর পূর্বের একজন ৬/৭ বছর বয়সী মানুষের একান্ত নিজস্ব অনুভূতি ও ভাবনাটুকু নিয়েই এই লেখা। ধর্মীয় কোন মতাদর্শ কিংবা ভাবনার সাথে সাংঘর্ষিক মনে হলে, একান্তই তার দায় লেখকের নয়। ধন্যবাদ!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

* ছবির অক্ষরগুলো উপরের ঘরে লিখুন