শৈশবের পিঠাবন্ধু উপকারী এক চিলের কাহিনী

আকাশের সুদূর উচ্চতায় ডানা মেলে উড়ে বেড়ায় একটি সোনালী ডানার চিল। চিটাগাং আগ্রাবাদ ফায়ার সার্ভিসের এক ছোট্ট শিশু, রনির সাথে একদিন তার বন্ধুত্বটা হয়েই গেলো! দিনে দিনে সেই সম্পর্ক গিয়ে দাঁড়ালো লেনদেনের ঘনিষ্টতায়। রনি চিলটিকে কী দিতো, সেটা জানা যায় নি। কিন্তু, চিলটি রনিকে দৈনিক ৪ টি করে ময়দায় বানানো পিঠা দিয়ে যেতো! কী অবাক ব্যপার!

বাবার চাকরীর সুবাদে চিটাগাং আগ্রাবাদ ফায়ার সার্ভিসের স্টাফ কোয়ার্টারে থাকি। পৃথিবীর চালচলন, ভাবগতিক তখনো বুঝে উঠতে শুরু করি নি। চারপাশে হাজারো নতুন নতুন বিস্ময়। বেশকিছু শ্যাওলাধরা বিল্ডিং, একটা অফিসঘর, ছোট্ট একটা পিটি করার মাঠ আর কোয়ার্টারের সামনে একচিলতে পার্কের আদলে বানানো আঙিনা। এই নিয়েই ফায়ার সার্ভিস কোয়ার্টার। আমাদের বাসা ছিলো দোতলায়। বিল্ডিংয়ের একটা নাম ছিলো। কিন্তু, এখন মোটেও মনে পড়ছে না। বিকাল ছাড়া আমার বাইরে বের হওয়া ছিলো ভীষণরকমের নিষিদ্ধ একটা ব্যপার।  আমাদের গ্রীলদেয়া বারান্দাটাই ছিলো আমার একমাত্র পছন্দের জায়গা।

নিজের খেলনাপাতি, সাজসরঞ্জাম সবকিছু থাকতো এখানেই। দিনের অনেকটা সময় সেখানে দাঁড়িয়ে আমি তাকিয়ে দেখতাম বাইরের দুনিয়া। কতো কি যে ভাবতাম তখন, আজ আর সেসব মনে পড়ছে না। কিন্তু আমার সময় ঠিকঠাক কেটে যেতো।

আগ্রাবাদের সেই বারান্দায় দাঁড়িয়ে ঠিক ভর দুপুরে আমি দূরের আকাশে একটা চিল দেখতে পেতাম। বাতাসে গোত্তা খেয়ে খেয়ে নেমে আসতো নীচের দিকে। আবার শূন্যে ভর করে উঠে পড়তো আরো উচ্চতায়। ডানায় রোদের আলো পড়ে ঝিঁকিয়ে উঠতো। বড়ো হয়ে জেনেছি জীবনানন্দ দাশের কবিতায়, এই ঝিলিক দেয়ার ‍সার্থক প্রকাশ হচ্ছে, সোনালি ডানার চিল। কখনো কখনো বিমান যেতো চিলটির পাশ ঘেষে। দূর থেকে আমার মনে হতো, এই বুঝি লাগলো ধাক্কা! কিন্তু, আমি জানতাম না বিমানটি চিলটির চাইতেও আরো দূরের পথে চলছে।

কোন এক অজানা টানে আমি প্রতিদিন দুপুরের একই সময়ে এসে বারান্দায় দাঁড়াতাম। চিলটাকে দেখতাম তার নিজস্ব ভঙ্গিতে ঘুরে ফিরতে। সেখানে প্রতিদিন একটি চিলই আসতো কিনা, নাকি কখনো অন্য চিলও আসতো, এই প্রশ্ন আমার কখনো জাগে নি।

গোসলের পর আমাকে মা একধরণের ময়দায় বানানো পিঠা খেতে দিতেন। পিঠাটি আমার খুব পছন্দের ছিলো। অনেকগুলো করে খেয়ে ফেলার লোভ হতো আমার। কিন্তু, মা বলতেন, এই কয়েকটা পিঠাই নাকি সেই চিলটি আমার জন্য দিয়ে গেছে! তাই, এরচে বেশি আর দেয়া সম্ভব না! আমিও মেনে নিতাম। মনে মনে ভাবতাম, ইশ! চিলটা যদি আরো কয়েকটা পিঠা বেশি দিতো!

আমি দুপুরে গোসলের পর মায়ের হাত থেকে নিয়মিত চিলের দেয়া ৪ টুকরো পিঠা নিতাম। তারপর গিয়ে দাঁড়াতাম বারান্দায়। চিলটাকে উড়তে দেখতাম দূরের আকাশে। আমার নিজস্ব সম্পত্তিতে একটি সাধারণ মানের দূরবীন ছিলো। সেটা দিয়ে কখনো দেখতাম চিলটাকে। ধুম করে কমে যেতো দূরত্ব। ইচ্ছ হতো চিলের সাথে কথা বলতে। তখনো আমি জানি না, চিলের সাথে চাইলেই কথা বলা যায় না। যায় না বন্ধুত্ব করাও। অবশ্য, আমার বন্ধুত্বের ইচ্ছাটা কতোটুকু আন্তরিক ছিলো, আর কতোটুকু পিঠার লোভে ছিলো, সেটা বলা এখন মুশকিল হবে।

এমন করেই আগ্রাবাদের কোয়ার্টারে থাকার পুরোটা সময় ধরে আমার প্রিয় পিঠার জোগান দিয়ে যেতো পিঠাবন্ধু সোনালি ডানার চিল। চিটাগাং ছেড়ে মুন্সীগঞ্জ চলে আসার পর কীভাবে যেনো পিঠার কথা আর সেভাবে নিয়ম করে মনে পড়তো না। কিন্তু, চিল আমার নিত্যকার সঙ্গী হয়ে উঠলো। এবারের চিলগুলো আর বন্ধু থাকলো না। আমাদের খোঁয়াড়ের মুরগীর বাচ্চা ছোঁ মেরে ছিনতাই করে নিয়ে যেতো। ফলে ওরা হয়ে উঠলো আমাদের বাড়ির পিচ্চি বাহিনীর একান্ত শত্রু। চিল দেখলেই লাঠি, গুলতি, মাটির ঢেলা নিয়ে ছুটতাম। চিলের ডাক, সাঁই সাঁই করে বাঁক কেটে নীচুতে নেমে আসা, চোখের তীক্ষ্ণ চাহনী সবই আমার স্মৃতিতে আগ্রাসী প্রতীক হিসেবে জায়গা পেতে থাকলো।

কিন্তু, আগ্রাবাদে ফেলে আসা চিলটিকে আমি মনে রেখেছি। একমাত্র পিঠাবন্ধু চিলটিকেই আমার মনে হতো, ভালো চিল কিংবা নায়ক চিল। তখনকার বাংলা সিনেমাগুলোতে নায়ক জসিমকে দানবীর আর ভালো নায়ক হিসেবেই চিনতাম। সেই সূত্র ধরেই হয়তো  আমার অনেকদিনের পরিচিত- পিঠা দানকরা চিলটি- টিকে থাকলো বন্ধুত্বের আসন নিয়ে। আর, মুরগীর বাচ্চা ছিনতাই করা চিলগুলো হয়ে থাকলো ভিলেন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে।

তারপর সময় কেটে গেছে তার নিজস্ব নিয়মে। চিল নিয়ে ভাবার অবসরও হারিয়েছি বহুদিন। জীবন থেকে বিদায় নিয়েছে নির্মল আনন্দ। কখনো অবসরে নিজের প্রিয় খাবারের মুহুর্ত মনে করতে গেলে, আমার মনে পড়ে শৈশবের রনির সাথে অচেনা পিঠাবন্ধু সেই চিলের বন্ধুত্বের কথা। এই যান্ত্রিক শহরে হঠাৎ কখনো সেই পিঠাবন্ধু চিলের সাথে যোগাযোগের সুযোগ হলে, ভালোই হতো। সেইদিনের বারান্দার গ্রীলধরে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুটির অপেক্ষার কথা তাকে জানানো যেতো। এই অদ্ভূত ভালোবাসা কিংবা বন্ধুত্ব কিংবা নিছক পিঠার গল্পগুলো বাস্তব হলেও হতে পারতো..।


# ছবি: ইমরুল হাসানের সংগ্রহ থেকে নেয়া

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

* ছবির অক্ষরগুলো উপরের ঘরে লিখুন