সিজিপিএ স্লেভারি সিনড্রোম ও জাহাঙ্গীরনগরে আমার নিজস্ব গল্প

গ্রাম ছেড়ে যখন ঢাকায় আসি তখন চারপাশের ব্যস্ততা দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। উন্নতমানের প্রতিষ্ঠানে শিক্ষাগ্রহণ করার সুযোগ করে দেয়ার জন্যই বাবা আমাকে নিয়ে আসলেন এই জঞ্জালের শহরে। সদরঘাটের ঘিঞ্জি এক গলিতে অখ্যাত এক প্রতিষ্ঠানে শুরু হলো আমার শিখন প্রক্রিয়া। হোস্টেলে থেকে পড়তে হতো। বাড়ির জন্য, মায়ের জন্য খুব কষ্ট হতো। আমার প্রিয় পুকুরপাড়, বর্ষায় নৌকায় করে বিলে শাপলা তোলা, ঝুম বৃষ্টিতে জানালা দিয়ে উঠোনে বৃষ্টির গড়িয়ে চলা দেখা, মায়ের গায়ের ঘ্রাণ সবকিছুই তখন মনে পড়তো।

প্রশ্ন জাগতো, কেনো আমাকে পড়াশোনার জন্য গ্রাম ছেড়ে আসতে হলো! ভালোইতো পড়ছিলাম আমি লক্ষীপুর ১৯ নং সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে..। সেই প্রশ্নের উত্তর দেয়ার গরজ কারো ছিলো না। তারপর পেরিয়েছে অনেকদিন। এখান থেকে ওখানে , নানা প্রতিষ্ঠান বদলে, নতুন নতুন শিক্ষকদের দেখে আমি শিক্ষিত হয়ে উঠতে থাকলাম। জ্ঞানী হওয়ার সেকি আপ্রাণ চেষ্টা আমার!

তখন চৌধুরীপাড়ার এক প্রতিষ্ঠানে পড়ি। সেখানে একজন চমৎকার শিক্ষক আমাদের ক্লাস নিতেন। তাকে দেখে আমার মনে হতো, কখনো সুযোগ পেলে শিক্ষক হবো। তিনি সবসময় পড়াশোনা করে প্রিপারেশন নিয়ে তারপর ক্লাস করাতেন। কী দারুন ব্যক্তিত্ব ছিলো তার! সেই সময়গুলোর কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে।

তখন হোস্টেলে পঁচা তরকারী আর মাছ দেয়ার প্রতিবাদে আমরা আন্দোলন করেছিলাম। সবাই বেলার পর বেলা তরকারী ছুঁয়েও দেখতো না। যেখানে সারাদিনের তিনবেলার খাবার ছিলো আমাদের কাছে খুবই আগ্রহের, সেখানে আমরা একরকম না খেয়ে কাটিয়েছি কয়েকদিন। তারপর ডাইনিং কমিটি সমস্যা সমাধানের পর আবার আমরা খেয়েছি।

আরেকবার একজন শিক্ষকের অনৈতিক আচরণের স্বীকার হয়ে একজন ছাত্রকে বিনাদোষে হোস্টেল ছেড়ে যেতে হয়েছিলো। তখন আমরা কর্তৃপক্ষের সব ধরণের ভয়ভীতি উপেক্ষা করে ক্লাস বর্জন করে গিয়েছি। একসময় সেই শিক্ষককে অব্যাহতি দেয়ার পরই স্বাভাবিক হয়ে আসে পরিস্থিতি। আমার বাবা কখনো আমাকে এই আন্দোলনে অংশ নেয়া থেকে বারণ করেন নি। তিনি বলতেন, যদি আমি ঠিক মনে করি, তাহলে সেটাই যেনো করি..। তাই, আন্দোলন শব্দটির ওজন বুঝতে পারার আগেই আমি আন্দোলন করতে শিখে যাই। টের পাই আমার একটা শক্ত মেরুদন্ড জন্মেছে।

ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি শেষ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের অন্যতম একটি পাবলিক ভার্সিটিতে। আমি যখন পড়াশোনার বিশাল গ্যাপের কারণে দেরী করে কলেজ শেষ করলাম, তখন ধারণা ছিলো ভার্সিটি মানে শেখার উন্মুক্ত পরিবেশ। বইয়ে পড়া বিশ্বভারতী কিংবা আদর্শ সব ভার্সিটির কথা ভাবতাম। ভার্সিটির শিক্ষকগণ চমৎকার উদার মনের মানুষ। নানা বিষয়ে তাদের জ্ঞান অফুরন্ত। পড়তে ভালোবাসা আমি তখনও জানি না, কোন ভার্সিটিতে পড়ার ‍সুযোগ আমি পাবো।

তারপর জাবিতে ভর্তি হলাম। ক্লাস শুরু করলাম। কিছুদিন যেতেই আমার চারপাশ দেখে আমি বুঝতে শুরু করলাম, এখানে জ্ঞানের পরিবর্তে অক্ষরের বিনিময় সহজ। সেন্ট্রাল লাইব্রেরীতে বেশিরভাগ সবাই চাকরী আর বিসিএসের জন্য পড়ছে। অন্যরাও নোট নিচ্ছে পরীক্ষায় ভালো করার জন্য। শুধু পড়তে ভালোবাসে বলে পড়ছে, এমন খুব কম মানুষজনকে দেখতাম। বটতলা, মুরাদে জম্পেশ আড্ডা হয়। বন্ধুদের সাথে ঘুরে বেড়াই। ভার্সিটির স্টিকার লাগানো বাসে করে ফ্রিতে ঢাকা থেকে যাওয়া-আসা করে পড়ছি।  পার্টটাইম অফিস করছি সংসারের খরচ চালাতে হবে বলে। একদিন খেয়াল হলো, আরে! সবই হচ্ছে! শুধু পড়াশোনাটা হচ্ছে না্!

সেই সময়ই আমি প্রথমবারের মতো সিজিপিএ স্লেভারি সিনড্রোম এর অস্তিত্ব টের পাই। এই রোগের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, আক্রান্ত রোগী তার সিজিপিএ উন্নতিকরণ ও রক্ষার জন্য যেকোন কিছু করতে রাজি থাকে। দাসত্ব মনোভাব দেখা দেয়। ক্লাসের সবচে  মেধাবী শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে একজন সাধারণ শিক্ষার্থীও এই রোগে আক্রান্ত। পরীক্ষার আগে সারারাত জেগে পড়াশোনা, নোট-শিট কাউকে না দিয়ে লুকিয়ে রেখে একা একা পড়াশোনা করা, আশেপাশের সহায়ক উন্নতির মেশিনগুলোতে তেল প্রদান করা, মেকী হাসির আড়ালে সুবিধা নেয়া, সবকিছুই করছে সবাই। উদ্দেশ্য, যে করেই হোক সিজিপিএ বাঁচাতে হবে!

প্রথমবছর  এই সিনড্রোম আমাকে আক্রান্ত করে নি। সবাইকে দেখে আমার খারাপ লাগতো। ২য় বছরের শেষের দিকে এসে আবিষ্কার করলাম, নিজের অজান্তেই সিজিপিএর প্রতি আমার টান তৈরী হয়েছে। তখন থেকেই সিনারিওর উল্টোদিকটা দেখতে শুরু করলাম। সিনড্রোম আমাকে পেয়ে বসলো ভালো করে। এ্যাটেন্ডেন্সের জন্য কিছু কিছু ক্লাসে আসতাম। শিক্ষক কী পড়াচ্ছেন , সেটার অন্য বিকল্প থাকতে পারে, এরচে ভালো করে বিষয়টি জানার চেষ্টা করা যেতে পারে, দ্বিমত পোষণ করা যেতে পারে,  এমন কিছুই চিন্তা করতে চাইতাম না। এই সিনড্রোম আমার মধ্যে দেখা গেলেও সেটা ছিলো খুবই সীমিত্। অন্যদের দেখে ভয় লাগতো রীতিমতো। সিজিপিএর একেকটা পয়েন্ট যেনো একেকটা লাইফলাইন!

আমার কোন অভিযোগ ছিলো না এই সিনড্রোমের প্রতি। কিন্তু, আমি ভয় পেয়ে গেলাম এবারের আন্দোলনের সময়। ভয়ের যথেষ্ট কারণও ছিলো। আন্দোলনের কারণ আমার কাছে সম্পূর্ণ  যৌক্তিক ছিলো। কিন্তু, আমি তখন ঢাকা থেকে ভার্সিটি আসি নি। সশরীরে  পাশে দাঁড়াই নি আমার বন্ধু, সহযাত্রীদের। নিজে অজুহাত দিয়েছি যে, আমিতো ঢাকা থাকি। হলে সিটও পাই নি এখনো। ভার্সিটি কষ্ট করে গেলেও রাতে থাকবো কোথায়!

তারপর আন্দোলন মোড় নিলো। মামলা হলো শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে। মিডিয়াতে অযৌক্তিক আর অহেতুক ভাষায় টকশোর টেবিল গরম রাখলেন ক্ষমতাসীন কর্তৃপক্ষ। সত্য-মিথ্যা মিলিয়ে তৈরী ঘোল, দেদার খাওয়ানো হলো সবাইকে। নিরাপদ সড়ক যেখানে সবার অধিকার, সেখানে সেই অধিকারের বাস্তবায়ন চাওয়ার জের ধরে তিলকে তাল বানিয়ে হল ভ্যাকেন্ট করলেন তারা। সবাইকে বাধ্য করলেন হল ছেড়ে যেতে। এতোকিছুর পরও আমি অফলাইনে জোরালো অবস্থান নিয়ে দাঁড়াতে পারি নি। তারপরের মিছিল-মিটিং-সমাবেশ সবকিছুকেই অনলাইন এবং নৈতিক সমর্থন দিয়ে নিস্ক্রিয় থেকেছি।  এই যে আমার না পারা, আমার শিরদাঁড়া শেষ হয়ে গিয়ে রাবারে পরিণত হওয়ার মতো পরিবর্তনের দায় এই সিজিপিএ স্লেভারি সিনড্রোমের।

আমি জানি, আপনি বিরক্ত হয়ে ভাবছেন, নিজের মুরোদ নেই তো ইনিয়ে বিনিয়ে লিখছি কেনো এই সাফাই! লিখছি নিজের কাছে জবাবদিহি করার জন্য। গ্রাম থেকে ‍বহু কষ্টে উঠে আসা আমার মতো কেউ ভালো রেজাল্ট করতে চাইলে সেটা অন্যায় কিংবা অযৌক্তিক না। পড়াশোনা শেষ করে ভালো রেজাল্ট নিয়ে বের হবো, এমন চিন্তা সবার। যদি প্রতিবাদ করি, অন্যায়ের  বিরোধিতা করি, তাহলে আমার সাথে ভিন্নমতের শিক্ষক,  আমাকে মার্কস কমিয়ে দিতে পারেন। কিংবা, বিদ্রোহী অথবা কোন প্রতিবাদী দলের সাথে আমাকে ট্যাগ করে দিয়ে অন্যায় আচরণ করা হবে আমার সাথে, এই ভয়ে আমি নিস্ক্রিয় থাকি। দাস কিংবা আজ্ঞাবহ ভৃত্যে পরিণত হয় আমার আত্মা।

আমি করুণা নিয়ে চিন্তা করি, ছোটবেলার সেই সংগ্রামী আমি কোথায় হারিয়ে গেছি! সেই সময়ের চেয়ে আমার শিক্ষা-দীক্ষা বেড়েছে। পরিশীলিত হয়ে উঠেছি আগের চাইতে। কিন্তু, এই সিজিপিএ স্লেভারি সিনড্রোম আমাকে স্লেভ বানিয়ে ফেলেছে। লজ্জা আর করুণা আমাকে ঘিরে ধরে। কৈশোরে সিজিপিএ নিয়ে কখনো ভাবি নি। পাত্তা দিতাম না রেজাল্ট বিষয়ক কোন চিন্তাভাবনা। সেইজন্যই হয়তো তখন অন্যায়ের  প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছিলাম। তারপর আরো পরে ব্লগ লিখেছি। রাস্তায় নেমেছি। আন্দোলনের সক্রিয় অংশ ছিলাম বিভিন্ন সময়। এখন সেই ইচ্ছাটা আর কাজ করতে চায় না নির্ভয়ে। মোটামুটি পাশ করে বেরুনোর মতো সিজিপিএর জন্যই হয়তো অজান্তে চেষ্টা চালাই।

শহীদ মিনারে যখন অনশন চলে, সাংবাদিকতার ছাত্র হিসেবে শুধু উঁকি দিয়ে চলে যাওয়া, নৈতিক সমর্থন দেয়াকেই যথেষ্ট মনে করে বসে থাকি। কোন কোন ক্লাসে শিক্ষকের মতামতের সাথে আন্দোলন বিষয়ক দ্বিমত প্রকাশের সাহস কিংবা চেষ্টা করছি না। কারণ, আমি সিজিপিএ স্লেভারি সিনড্রোমে আক্রান্ত। আমি শুধু এখন স্লেভ কিংবা কৃতদাস হয়ে চুপচাপ আদেশ পালন করে যাওয়া ছাড়া আর কিছুরই ক্ষমতা রাখি না। এই বাস্তবতা আমাকে চমকে দেয়। রাশি রাশি করুণা জাগে নিজের জন্য। ভাবি, আহ! সেদিনের ্সেই কিশোর নীরব আজকের আমার চাইতে হাজরগুণ টেকসই মেরুদন্ড নিয়ে টিকে ছিলো।

এই রোগ থেকে মুক্তি চাই আমি। আমি চাই আবার আগের মতো মানুষ হয়ে উঠতে। বুকিশ গর্ধভ হতে চাই না। আমি চাই না, সিজিপিএ আমার নৈতিক বিশ্বাসের জায়গাতেও পৌঁছে যাক। এই ধরণের কৃতদাস কিংবা স্লেভ হয়ে জীবন যাপনের মতো দৈন্যতা আর নেই। তাই আমি স্পষ্টভাষায় বিরোধিতা করছি প্রশাসনের ভূমিকার। সহমত পোষণ করছি অসংখ্য সাধারণ শিক্ষার্থীর ভাবনা ও দাবীর সাথে।

এই চলমান আন্দোলনের বিভিন্ন দিক, ধরণ নিয়ে যে কারো দ্বিমত থাকতে পারে। থাকতে পারে নিজস্ব ব্যাখ্যা। তাতে আমার  আপত্তি নেই। কিন্তু, যে পদ্ধতিতে কর্তৃপক্ষ সেই ধারণা, মত, অবস্থানের ব্যাখ্যা করছেন এবং যে কার্যপদ্ধতি নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন, তাতে আমি সক্রিয় বিরোধিতা জ্ঞাপন করছি।

আমি প্রাণপনে চেষ্টা ও প্রার্থনা করছি, যাতে আমার সিজিপিএ স্লেভারি সিনড্রোম কেটে যায়। আমি যাতে গর্দভ বুকিশ না হয়ে একজন মানুষ হই। মুক্তির মিছিলে মুক্ত মানুষেরা আলো ছড়াক। ভালো হোক প্রিয় জাহাঙ্গীরনগরের।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

* ছবির অক্ষরগুলো উপরের ঘরে লিখুন