সুখী কিংবা অসুখী বৃত্তের বাইরে উঁকি দিয়ে আকাশ দেখার একটি দুপুর

আমি ভবঘুরেই হব- এটাই আমার অ্যাম্বিশন
আমি কোনে বাউল হব- এটাই আমার অ্যাম্বিশন
তবু আমি বোকাই হব- এটাই আমার অ্যাম্বিশন।

আমি তুমি সে কিংবা তারা, আমরা কেউই ভালো নেই! আসলেই কি! ভালোথাকা না থাকার মানদন্ড কিংবা বিচারিক গেজেট আমরা কোথায় পেলাম? একজন রাস্তার পাশের চটের দেয়ালে ঢাকা সস্তার হোটেলে স্টীলের থালায় ভরপেট খেয়ে তৃপ্তির ঘুম দিচ্ছে। অন্যজন চকচকে ডেকোরেশনের আধুনিক ক্যাফেতে প্রেমিকার সাথে ক্ষীণকন্ঠের সংলাপ আর ফেসবুক চেকইন দিয়ে বলছে, লাইফটা হেল হয়ে যাচ্ছে..!

আকাশের গায়ে হেলান দেয়ার স্পর্ধা দেখানো কংক্রিট প্রাসাদের খোলা বারান্দা থেকে শহর দেখে কেউ ভাবছে, নাহ! শহরটা ভবঘুরে মানুষের ভিড়ে নোংরা হয়ে পড়ছে। হোল্ডিং নাম্বারহীন কোন অজ্ঞাত শহরতলীতে  নর্দমার উপরে বানানো মানুষের খোঁপে গরমে সেদ্ধ হতে হতে কেউ পরম আনন্দে ঘুমোচ্ছে অন্যকেউ।

কেউ ভালো আছে, কেউ ভালো নেই। এই যে ভালো থাকা না থাকার জটিলতা, সফল হতে না পারার বেদনা, এটা কতোটুকু যুক্তিযুক্ত? এই পরিমাপ কোথায় শিখেছি আমরা? ছোটবেলা থেকে কবি হবার জন্য জন্মানো ছেলেটা হয়ে যাচ্ছে প্রকৌশলী। তিন গোয়েন্দা পড়া তীক্ষ্ণ মেধাবী ছেলেটা হারিয়ে যাচ্ছে আটটা-পাঁচটার জবে, রাশি রাশি ফাইল আর উন্নতির চেষ্টার অহেতুক যাত্রায়..। দিনের পর দিন নিজের ভালো না লাগার জায়গাতে আটকে থেকে জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে যাচ্ছে..।

মাথায় প্রিলোডেড মেমোরীর মতো বাজতে থাকে, কিছু একটা হতে হবে..কিছু একটা করতে হবে। কিছু না হয়ে কিংবা কিছু না করেও শুধু মানুষ হবার চেষ্টা কেনো আমরা করি না?

আমার চারপাশে আমি শুধু হতাশা দেখি। শো অফ করার প্রতিযোগীতা দেখি। অন্যকে অনুসরণ করে সফল হতে চাওয়ার দৌড়ে শামিল হতে দেখি বহু মানুষকে। সেলিব্রেটি কি হতেই হবে? একটা ফেসবুক লাইক, কিছু ফেসবুক ফলোয়ার, যারা বাস্তবের দুনিয়ার আমার জন্য কোন আন্তরিকতা জমা রাখে না, তাদের প্রশংসা কি মানুষ হবার সৌভাগ্যের চেয়ে বেশি দরকারী?

নানারকম চেষ্টা চলছে হতাশা থেকে মুক্তির। কেউ ট্রাভেলিং করছে..। কেউ সাইক্লিং, কেউ ভলান্টিয়ার, কেউ পথশিশুদের নিয়ে আছে। সবাই কাজ করছে। কিন্তু কতোজন ট্রাভেল করতে শিখছে নিজের ভেতরের মানুষকে সাথে নিয়ে? কতোজন ট্রাভেল করছে অহেতুক সেলফি আর সামিটের গল্প বলার ইচ্ছা বাদ রেখে? শত শত কিলো সাইকেল চালিয়ে মাইলস্টোনের ছবির বাইরে কতোটুকু দেখার সক্ষমতা অর্জন করেছি আমরা? একশো কিলোর কতোটা প্যাডেলে শুধু জীবনকে কাছ থেকে দেখার জন্য দেয়া হয়? কতোটা জীবনকে আমরা ছুঁয়ে যেতে পারি সত্যিকার অর্থে ?

কিছুই হয় না। কারণ, আমাদের সবকিছুতে বড়ো বেশি তাড়াহুড়ো। সবকিছু দরকারমতো তৈরী থাকতে হবে। পারফেক্ট হতে হবে। লাইফে কিছু করে দেখাতে হবে। এই কিছু হওয়া, কিছু করা, সেগুলোর প্রদর্শনীর সুপ্ত ইচ্ছা আমাদের ভালো থাকার নির্মল অনুষঙ্গগুলোকে নষ্ট করে দিচ্ছে।

সারাদিন অফিস করে ক্লান্ত কর্তার বিশ্রামের সময়টুকুতে কর্ত্রীর অভিযোগ জমা হয়, ‘বাসার কোন কাজতো করোই নাই। সবকিছু একা হাতে সামলাতে হয়’। আমি বলছি না, বাসার কাজে কর্তা সাহায্য করার বিরোধী আমি। কিন্তু, অফিস ফেরৎ বেচারার মানসিক অবস্থা বুঝতে পারার চেষ্টা কেনো করা হয় না, এখানেই আমার আপত্তি। একইভাবে দুজনেই কর্মজীবি যখন, তখন দুজনেই কেনো সাধ্যমতো কাজ না করে শুধু কর্ত্রীর ঘাড়ে চাপিয়ে দিই সংসারের হাড়িপাতিল? বেঁচে থাকার প্রয়োজন মেটারও পরও এটা নেই, সেটা প্রয়োজন এইসব ভেবে ভেবে আজকের শান্তিতে কেনো অবহেলা করি? আগামীকাল ভালো থাকার জন্য আজকের অমূল্য মুহুর্তগুলো কেনো হারিয়ে ফেলি প্রতিনিয়ত?

ভালো নেই, ভালো থাকছি না, আমি হতাশ, কিচ্ছু হলো না – এইসব হতাশার উচ্চারণ আমাদের মানসিক বৃদ্ধির পথে বাঁধা তৈরী করছে। ভার্চুয়াল রিয়েলিটিতে অভ্যস্ত আমরা দুনিয়া দেখছি এলইডি স্ক্রিণের আলোতে। অভিমন্যুর এই বৃত্ত থেকে মুক্তির পথ নিজেরাই রুদ্ধ করছি প্রতিক্ষণ।

সুখী থাকার চেষ্টা না করে বরং জীবনকে জটিলতাহীন যাপন করার চেষ্টা করলেই আমার মনে হয়, আমরা ভালো থাকতে শুরু করবো। কিছু হওয়ার অনর্থক চেষ্টার চেয়ে শুধু মানুষ হবার চেষ্টাটা বরং বেশি প্রয়োজন। একজন নিরেট মানুষ। শতভাগ সহজ এবং সাধারণ একজন মানুষ। তাহলেই হবে। যে জীবন প্রাত্যহিক জটিলতায় আকীর্ণ, সে জীবন আমার না হয় নাইবা হলো। সফল, সুবিখ্যাত না হয়ে আমি না হয় হলাম একজন অখ্যাত নামহীন কেউ। ভিড়ের মধ্যে মিশে যাওয়া কোন এক আগন্তুক..। যে জীবন ফড়িংয়ের..দোয়েলের সে জীবন হোক আরাধ্য..। ভালো থাকুক আমার ভেতরের শুদ্ধ মানুষটি..।

————–

## লিরিক কৃতজ্ঞতা: নচিকেতা
## ছবি কৃতজ্ঞতা: Hokusai Iris ( Flowers And Grasshopper Art Print )

মন্তব্য করুন