নক্ষত্রের রাজ্যে একদিন

সুরাইয়া ও আল-দাবরানের আকাশিয়া প্রেম এবং একটি দারুন রাতের গল্প

আকাশের বিশালতায়ও নাকি হাজার বছরের এক অসমাপ্ত প্রেমকাহিনী বেঁচে আছে সহস্র বছর ধরে! চমকে উঠলেন? আমিও অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। সেদিন সাভারের গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের অডিটোরিয়ামের ছাঁদে দাঁড়িয়ে রাতের আকাশ দেখতে দেখতে যখন একজন বলছিলেন সুরাইয়া আর আল দাবরানের গল্প, তখন আমি ভাবছিলাম, কী দারুন মানুষের কল্পনা! ভ্রমির আয়োজনে নক্ষত্রের রাজ্যে একদিন নামক একটি মহাকাশ বিষয়ক ওয়ার্কশপে যোগ দিতে আমরা তখন সাভারে। শহুরে কোলাহল পেরিয়ে সুবিশাল সীমানা নিয়ে অবস্থিত গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের মিলনায়তন। সেখানেই এই আয়োজন। আমরা (আমি এবং অন্তরা) যখন পৌঁছলাম, তখন রাত গড়িয়েছে বেশ কিছুক্ষণ। সবাই টেলিস্কোপে চাঁদ এবং মঙ্গল ও শনির বলয় দেখার চেষ্টা করছে।

জীবনের প্রথম আমি কোন সত্যিকারের টেলিস্কোপে চোখ রাখলাম। চাঁদের গায়ের উঁচুনিচু খাদ পরিষ্কার হতে অনভ্যস্ত চোখের খানিকটা সময় লাগলো। তারপর মঙ্গল গ্রহের লালচে শরীর দেখার চেষ্টা। সফল হয়েছিলাম কিনা, বুঝতে পারি নি। নিজের মহাকাশ বিষয়ক অজ্ঞানতাই এর পেছনে দায়ী। ডাইনিংয়ে যাওয়ার ডাক আসতেই টের পেলাম, বেশ ক্ষুধার্ত হয়ে আছি। পুকুরের মাছ, মুগডালের মুড়িঘন্ট আর সবজি দিয়ে বেশ ভালো করে খেয়ে আবার উঠলাম গিয়ে ছাদে। এবার তারা চেনার পালা।

আকাশের সুবিশাল প্রান্তর জুড়ে তারাদের দেখা মেলার কথা থাকলেও সেদিন মেঘ আর দূর থেকে আসা উজ্জ্বল আলোর ষড়যন্ত্রে ঠিকঠাক দেখা মিলছিলো না তারাদের। তবুও, কসরৎ চালানো থেমে থাকে নি। সেই আসরেই আমি প্রথম শুনলাম সুরাইয়া আর আল দাবরানের গল্প। সুরাইয়া হচ্ছে একগুচ্ছ তারা। কালপুরুষের কিছুটা পশ্চিমে তার অবস্থান। সুরাইয়ার খুব কাছেই অবস্থান উজ্জ্বল তারা আল দাবরানের। যে ভাইয়া তারা চেনাচ্ছিলেন আমাদের, তিনি বলছিলেন খুব মজার ভঙ্গিতে। সুরাইয়া এক সুন্দরতম নারী। আল দাবরান তার প্রেমিক। সহস্র বছর ধরে সুরাইয়াকে পাওয়ার জন্য ছুটে চলছে আল দাবরান। কিন্তু, কখনোই সে তার প্রিয়তমা সুরাইয়াকে পায় না। সুরাইয়া ও তার মধ্যকার এই দূরত্ব সবসময় রয়ে যায়। একজন আশাবাদী প্রেমিক তার দূরতম প্রেমিকার জন্য কেবলই ছুটছে…। এইভাবেই সুরাইয়া আর আল দাবরানের দেখা মিলছে চিরকাল ধরে। কী চমৎকার গল্প!

তারা চেনাও একটি দারুন বিষয়, এটি আমার সেদিন খুব করে মনে হয়েছে। কালপুরুষ, ঊষা, অনিরুদ্ধ আর চিত্রলেখা, ছোট ভাল্লুক, বড় ভাল্লুক, ছয়টি তারার বকমন্ডল, গ্রীক পুরাণের পঙ্খীরাজ পেগাসাস, এ্যান্ড্রোমিডাসহ অসংখ্য তারা আর নক্ষত্রমন্ডলির পরিচয় ও তাদের নানা গল্প আমরা শুনেছি। সেরাতে মনে হয়েছে, রাতের আকাশে খালি চোখে দেখা অসংখ্য তারাদেরও নিজস্ব গল্প হয়! ক্যাসিনির শনি অভিযানের উপর একটি সেশনে অংশ নিয়েছিলাম। অনেককিছুই আগ্রহের সাথে দেখেছি। কিছু কিছু বুঝতে কষ্ট হয়েছে সেই আগেকার দুর্বলতার (মহাকাশ বিষয়ক জ্ঞানের অভাব) কারণে।

একটি দারুন পিচ্চির সাথে দেখা হয়েছিলো সেদিন। বিশাল সাইজের ইংলিশ গানের লিরিক মুখস্থ বলে যাচ্ছিলো। সেই সাথে গিটারও বাজিয়ে যাচ্ছিলো সমানতালে। কিন্তু, ওর কাছে বাংলা গান মোটেও পছন্দের না! এমন নয় যে, বাংলা গান জানতেই হবে কিংবা গিটারে বাংলা গান তুলতে না পারলে জাতে উঠা যাবে না। আমি অবাক হয়েছিলাম, যে ছেলে এতো আগ্রহে গিটার বাজায়, বড়ো বড়ো সব লিরিক যার মুখস্থ, তার কি নিজের ভাষার গান একটুও ভালো লাগে না! সেই হতাশার বোধ কেটে গিয়েছিল। নিজেদের মতো করে ছাদে অনেক্ষণ দো’তারা আর উকুলেলে বাজিয়ে গান শুনিয়েছিলেন আমাদেরই দু’জন সঙ্গী। খুব সহজ করে লেখা বাংলা গান। যেসব গান মাটির খুব কাছের। টেলিস্কোপের আইপিসে চোখ রাখার অভিজ্ঞতার সাথে সাথে সুরাইয়া ও আল দাবরানের প্রেমের অনিঃশেষ গল্প আমাকে অকৃত্রিম আনন্দ দিয়েছে।

সুরাইয়া আর আল দাবরানের আকাশিয়া প্রেম হয়তো এ্যাস্ট্রোনমির দৃষ্টিতে অবান্তর। কিন্তু, আমার মতো একজন সাধারণ এবং উৎসাহী নক্ষত্র-দর্শকের জন্য তারাচেনার এই গল্পনির্ভর পদ্ধতিটি খুব কাজের বলেই মনে হয়েছে। পরদিন ভোরে শীতের শিশির পায়ে মেখে আমরা গাছ চেনার একটি সেশনও যথেষ্ট উপভোগ্য লেগেছে। আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি ভ্রমিসজীব বর্মণ ভাইকে। তিনি স্পন্সর না করলে এমন দারুন ওয়ার্কশপটিতে যাওয়া সম্ভব হতো না। ওয়ার্কশপে যারা মেন্টর হিসেবে জটিল অনেক বিষয়কে সহজ করে আমাদের জন্য উপস্থাপন করার কঠিন কাজটি করেছেন, তাদের সবাইকে ধন্যবাদ

মহাকাশ সবসময় পৃথিবীর মানুষের কাছে বিস্ময়কর একটি অনুষঙ্গ। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ ভেবেছে তার মাথার উপর সুবিশাল আকাশের গায়ের বিন্দু বিন্দু আলোকরাশি নিয়ে। বুঝতে চেয়েছে নক্ষত্রদের জীবনপরিক্রমা।  সেই ইচ্ছা কিংবা আগ্রহ সময়ের সাথে সাথে বেড়ে চলেছে বহুগুণ। প্রযুক্তির উন্নতি প্রতিদিন রাতের আকাশের নতুন কোন দিক তুলে ধরছে আমাদের সামনে। রহস্যময় তারাদের রহস্য হয়তো কিছুটা হলেও মানুষের জানার সীমানায় আসবে। হয়তো রাতের পৃথিবী তখন আলোকিত মানুষদের হবে। দূর গায়ের কোন ছোট্ট উঠোনে বসে আমাদের কেউ একজন হয়তো ছড়িয়ে দেবে সুরাইয়া আর আল দাবরানের কাহিনী। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়বে অনুসন্ধিৎসু মানুষের বিজ্ঞান জনপ্রিয় করার আন্তরিক প্রচেষ্টার এই উপাখ্যান।


# ফিচার ইমেজ কৃতজ্ঞতা: ভ্রমি
#
তারার নাম-ধাম, ইভেন্টের ভেন্যু, মেন্টর ইত্যাদি বিষয়ে ভুল থাকতে পারে। সময় ও জ্ঞান স্বল্পতার কারণে সৃষ্ট ভুল-ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখলে খুশি হবো।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

* ছবির অক্ষরগুলো উপরের ঘরে লিখুন