স্পোর্টস, মিডিয়া, বিজনেস ও বাংলাদেশ

স্পোর্টস, মিডিয়া, বিজনেস ও কলোনিয়াল হ্যাংওভারের ভাবনা

খেলাধুলার প্রধান উদ্দেশ্য আনন্দ দেওয়া। প্রাথমিক পর্যায়ে খেলা বলতে শুধু নির্মল বিনোদনকে বুঝাতো। কিন্তু, সময়ের সাথে সাথে পাল্টে গেছে খেলাধুলা বিষয়ক প্রাসঙ্গিকতার আকার আকৃতি ও ধরণ। পেশাদারিত্বের ম্যাজিকে এই বিনোদন মাধ্যমটি হয়ে উঠেছে একইসাথে ব্যবসার অন্যতম বৃহৎ অনুষঙ্গ। মিডিয়া ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিগত সংযোজন এনেছে বহুমাত্রিক ভিন্নতা। ফুটবলে বার্সেলোনা, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, আর্সেনাল, বায়ার্ন মিউনিখ, রিয়েল মাদ্রিদের মতো ক্লাবগুলোর অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই মিলবে এর সহজ উদাহরণ।

বাংলাদেশের ক্লাব কালচার একসময় অনেক গতিশীল থাকলেও এখন তার পরিধি কমে গেছে। ৯০ এর দশকে আবাহনী-মোহামেডান, ব্রাদার্স ইউনিয়ন, ফরাশগঞ্জ স্পোর্টিং, আজাদ ক্লাবসহ এমন আরো কিছু নাম ছিলো সুবিদিত। ফুটবল, হকি ভলিবল ইত্যাদির প্রচলন ছিলো সমাজের তৃণমূল পর্যায়ে। কিন্তু, উপনিবেশিক মানসিকতা নির্ভর মিডিয়া বা কলোনিয়াল হ্যাংওভার কাটিয়ে উঠতে না পারা আমাদের মিডিয়া একসময় ক্রিকেট আগ্রাসনকে পৌঁছে দিয়েছে আমাদের দোরগোড়ায়। ফলশ্রুতিতে বহুমাত্রিক খেলাধুলায় সমৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকলেও আমরা আটকে গেছি ক্রিকেটের একমুখি গন্ডিতে। এইযে আটকে যাওয়া, এর পেছনে সবচে বড়ো ভূমিকা রয়েছে মিডিয়ার। প্রিন্ট, ইলেক্ট্রিক কিংবা ইন্টারনেট ভিত্তিক সকল ধরণের মিডিয়া আমাদের চিন্তা, পছন্দের গতিপথকে অন্য সকল ক্ষেত্রের মতো খেলাধুলার ক্ষেত্রেও নিয়ন্ত্রণ করছে।

ক্রিকেট বিশ্বের বিস্তার ও এর সাথে সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের পরিধিগত বিস্তৃতিও আমাদের একইকথা মনে করিয়ে দেবে যে, স্পোর্টস এখন আর শুধুই স্পোর্টস নেই। এখন সেটা মিলিয়ন ডলারের সুবিশাল টাকার মেশিনে পরিণত হয়েছে। খেলাধুলা যখন তার অসংখ্য বিস্তৃতির একটি মৌলিক অংশে বিজনেস কিংবা ব্যবসায় কিংবা অন্যভাবে বললে টাকার মেশিনে পরিণত হয়েছে, তখন এর সহঅনুষঙ্গ হিসেবে মিডিয়া বা গণমাধ্যমও যোগ হয়েছে বৃহৎ পরিসরে।

এই বিষয়গুলো একসাথে ইদানিং একটা টাইটেল কিংবা একটি সিস্টেমের মধ্যে আনার কথা হচ্ছে। যার সহজ প্রকাশ বলা হচ্ছে, স্পোর্টস ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম। যেখানে খেলাধুলা, ব্যবসায় ও মিডিয়া একইসাথে একলক্ষ্যে পরিচালিত হবে। এই ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষিত মানবসম্পদের গুরুত্ব বাড়ছে। খেলাধুলা এই সময়ে শুধু ব্যক্তিগত বিনোদনের অংশ না থেকে ক্রমশ একটি সামাজিক এবং বাণিজ্যিক কাজে রূপ পরিগ্রহ করেছে। বর্তমানে স্পোর্টস শুধু একটি ইভেন্ট নয়, এটি একটি শিল্পও। ১৯৬৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমে স্পোর্টস ম্যানেজমেন্টের ওপর পড়ানো শুরু হয়। স্পোর্টস ম্যানেজমেন্ট বেশকিছু কোর বা মৌলিক অংশ নিয়ে গঠিত। যেমন,  মিডিয়ারাইট সেলস, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, প্রোডাকশন এবং কনস্যালটেন্সি।

মিডিয়া প্রধানত স্পোর্টস ম্যানেজমেন্টের মার্কেটিংয়ের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। খেলাধুলার ব্যবসায় বিষয়ক অংশকে স্পোর্টস বিজনেস ডেভেলপমেন্ট বলা যায়। যেটা নিয়েই মূলত কাজ করে আমাদের মিডিয়া। প্রসঙ্গত আমরা বলতে পারি, বাংলাদেশসহ এশিয়া , অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকার দেশগুলোতে ক্রিকেটের প্রচলন অনেক বেশি। বৃটিশ উপনিবেশ ছিলো কখনো, এমন সব কলোনিয়াল ধাঁচের দেশগুলোতে ক্রিকেট বেশি খেলা হয়। আবার, ইউরোপ, আমেরিকার বেশ বড়ো অংশে ফুটবল খেলা হয়। কোন খেলাটা দেখবে অডিয়েন্স, কোনটা কম দেখবে, কোনটা নিয়ে হাইপ কিংবা মাতামাতির ঝড় উঠবে, এই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছে মিডিয়া। স্পেসিফিক বা সুনির্দিষ্টভাবে বললে বলা যায় স্পোর্টস রিলেডেট মিডিয়া। তারমধ্যে  স্পোর্টস জার্নালিজম একটি অংশ হিসেবে কাজ করছে।

খেলাধুলা আমাদের আনন্দের মাধ্যম। একইসাথে শিল্পও। এই শিল্পের সাথে জড়িয়ে আছে অসংখ্য মানুষের জীবন-জীবিকা। ব্যবসায় অংশটিতে ভূমিকা রাখছে মিডিয়া। তৈরী করছে ক্রমশ সুবিশাল এক জগত। যেখানে শত বিলিয়ন ডলারের হাতবদল হচ্ছে প্রতিনিয়ত। আইপিএল, বিপিএল, ন্যু ক্যাম্প, উয়েফা চ্যাম্পিয়ন লীগসহ অসংখ্য আন্তর্জাতিক টুর্ণামেন্ট আয়োজন করা হচ্ছে। বিক্রি হচ্ছে লক্ষ কোটি ডলারের মিডিয়া রাইটস। সম্প্রচার স্বত্ত্ব।

বাংলাদেশের একজন ক্রিকেটারের এক সিজনের আয় দেশের একটা প্রথম শ্রেণীর ফুটবল টিমের এক সিজনের চেয়ে বেশি বলে ধারণা করা হয়। আকরাম খান, বুলবুল, সুজন মাহমুদ কিংবা হালের সাকিব আল হাসানকে আমরা যতোটা চিনতে পারি, ওয়ালি ফয়সাল, প্রাণতোষ কুমার, জাহিদ হাসান এমিলিকে ঠিক ততোটা চিনি না। মিডিয়া এখানেই ব্যবসার স্বার্থ রক্ষায় কাজ করছে। ক্রিকেটকে উঠিয়ে আনছে। হারিয়ে যাচ্ছে অন্য খেলার মাধ্যমগুলো।

এই স্পোর্টস জগতের বিশাল কর্মযজ্ঞে ব্যবসায় স্বার্থ রক্ষার জন্য মিডিয়া হয়ে উঠেছে অন্যতম প্রয়োজন অনুষঙ্গে। আমরা বলছিনা, সাকিব আল হাসানকে কিংবা বৃহৎ অর্থে ক্রিকেটকে কম গুরুত্ব দেয়া হোক। বরং, আমরা বলতে চেয়েছি, এই গুরুত্ব দেয়া না দেয়া, কোন খেলাটা আমাদের জনপ্রিয় ও ব্যবসায় সফল খেলার মাধ্যম হবে, সেটা নিয়ন্ত্রণে মিডিয়ার ভূমিকা অপরিসীম।

মিডিয়া ওউনারশিপ, স্পোর্টস ম্যানেজমেন্টের বিজনেস অংশ এবং স্পোর্টস তিনটি বিষয়ই পারস্পরিক গভীরভাবে সম্পর্কিত ও নির্ভরশীল। এই শতাব্দীতে খেলাধুলার উদ্দেশ্য শুধু আনন্দদান কিংবা নিছক বিনোদন নয়। একইসাথে সেটা উল্লেখযোগ্য একটি সুবিশাল শিল্পও। যেখানে খেলাধুলা, বিজনেস ও মিডিয়া একসাথে পথ চলে। আমরা আশা করি, এই দ্রুতগতির সময়ে খেলাধুলা সম্পর্কিত শিল্পের প্রতিটি স্টেকহোল্ডারের অন্যতম মৌলিক লক্ষ্য হোক গণমানুষের কল্যাণ।

মন্তব্য করুন