’স্মার্ট’ এই নগরীতে একজন ’আনস্মার্ট’ আমি ও আমার ‘খ্যাতমার্কা’ আউটফিটের ফুটনোট

’স্মার্ট’ এই নগরীতে একজন ’আনস্মার্ট’ আমি ও আমার ‘খ্যাতমার্কা’ আউটফিটের ফুটনোট

# অগোছালো কোকড়া চুলের ‘খ্যাতমার্কা’ এই ছেলেটা এইখানে কেমনে আসলো!
# দেখ, কেমন পাগলের মতো দেখাচ্ছে ওরে!
# এই ছেলে! ভাইবা বোর্ডে কেউ  এই গেটআপে আসে! স্মার্টনেসও তো একটা শেখার বিষয়!

অন্যদের এই ধরণের কথা ও ভাবনার সাথে আমার পরিচয় অনেক দিনের। নিজের পোশাক-আশাক, সাজগোজ, ধরণ-ধারণ যথেষ্ট রকমের ‘আউলা’ টাইপের। সময়ের সাথে ঠিক যায় না হয়তো। এই আউটফিট নিয়ে নির্লিপ্ত কিংবা বেখেয়াল থাকার অভ্যাস আমার বেশ আগের। ঢাকায় এসেছি তখন কয়েক বছর হয়েছে। যেখানে পড়তাম, সেই প্রতিষ্ঠানের আদর্শ কিছু শিক্ষক ছিলেন, যারা দারুন রকমের সুন্দর আর সময় সচেতন পোশাক পড়তেন। আমি একসময় তাদের অনুসরন করতে শুরু করলাম। আয়রন/ইস্ত্রি ছাড়া কখনোই জামা পড়তাম। মালিবাগ থেকে মোহাম্মদপুরে গিয়ে রেকমেন্ড পাওয়া টেইলার্স দিয়ে পোশাক বানাতাম! এই নিয়ে নানান ধরণের আদিখ্যেতা ছিলো। ছোটবেলায় বাবাকে দেখেছি খুব পরিপাটি আর টিপটপ হয়ে থাকতে। হয়তো সেই ব্যাপারটিও অবচেতনে উৎসাহ দিয়েছে  আমাকে।

তারপর বেশ অনেকটা সময় পার হলো ঢাকাতে। ততোদিনে হোস্টেল ছেড়ে কামরাঙ্গীরচরের সস্তাদরের এক টিনশেডে আশ্রয় নিয়েছি। নিজের খরচ জোগাতে রীতিমতো হিমশিম খাই। বই পড়ার অভ্যাস ভয়ংকর রকমের বেড়ে গিয়েছে। চারপাশের বন্ধুহীন জগতে বইয়ের চরিত্রগুলো জীবন্ত হয়ে আমাকে সঙ্গ দিতে শুরু করেছে ততোদিনে। আমি টের পেতে শুরু করলাম যে, পোশাক-পরিচ্ছদ কিংবা আউটফিটের প্রতি আগ্রহটা আর আগের মতো কাজ করছে না। মনে হতে লাগলো, আমার নিজের সত্যিকারের মানুষটির পরিবর্তে যদি আমি আমার পোশাকের জন্যই সম্মান পাই, তাহলে এরচে দুঃখের ব্যাপার আর হয় না!

ব্যস! আউটফিটের ভুত আমাকে ছেড়ে চলে গেলো। এরপর থেকে দিনে দিনে ভীষণ অমনোযোগী হয়ে গিয়েছি নিজের সাজগোজের প্রতি। পোশাক-পরিচ্ছদের ঝকঝকে চার্ম কিংবা জেল্লা আমাকে আর টানে না। সবসময় প্লাস্টিকের খুব স্বল্পদামে কেনা একজোড়া পেগাসাস পায়ে ঘুরে বেড়াই সবখানে। কর্পোরেট অফিসে যাই কখনো সখনো। সেখানেও এভাবেই থাকি। একাডেমিক ভাইবা বোর্ডে চেয়ারম্যান অবাক হয়ে যান আমার আউটফিট দেখে! কী ভীষন ‘আনস্মার্ট’ আমি!

আমার এই বাহ্যিক সাজগোজ, পোশাক-আশাক নিয়ে আমার কোন আফসোস কিংবা খেদ নেই। আমি বরং ভালোই আছি। কষ্ট হয় আমার চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা শুভাকাঙক্ষী ও সহযাত্রীদের জন্য। আমার এই আউটফিট প্রায়ই তাদের অস্বস্তির কারণ হয়! আমি বুঝতে পারি। তারা মহৎ বলেই হয়তো কখনো প্রশ্ন তোলেন না। কেউ আবার একান্ত নিজের বিষয় বলে কোন মন্তব্য না করেই চুপচাপ সহ্য করেন। কিন্তু, আমি টের পাই তাদের নীরব বিরক্তি। আমার যে বন্ধুটি চমৎকার পোশাকে আমার মতো ‘খ্যাতের’ সাথে হাঁটছে, তখন অন্যরা সেই চমৎকার বন্ধুটিকে ঠিক চমৎকারভাবে হয়তো নিতে পারছে না। কিংবা, যে শিক্ষক আমাকে কোন বিষয়ে দক্ষতার কারনে পছন্দ করেন, তিনি আমার ্এই ‘ভোম্বলমার্কা’ চেহারা নিয়ে হতাশ হন। আমি যখন অন্তরার (অন্তরা আমার স্ত্রী) সাথে কোথাও বের হই, তখন প্রায়ই ওর সহজ সুন্দর আউটফিট আমার মতো ‘খ্যাতের’ কারণে ম্লান হয়ে যায়। কে জানে অন্তরাও কখনো কখনো হয়তো আমাকে নিয়ে অন্যদের মতো ‘আউটফিটজনিত হতাশা’ বোধ করে।

আমার শৈশবের শহর চিটাগাং থেকে ঢাকায় স্থায়ী হয়েছি অনেকদিন আগে। সেই সময়টাতে আমার বাবার একটা র‌্যাডিক্যাল চেঞ্জ/আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। তার বাহ্যিক চরিত্রের সাথে সাথে মানসিক জগতেও বেশ পরিবর্তন এসেছে। তখন থেকে তিনি অসম্ভব ধরণের সাদামাটা পোশাক পড়েন। আমার চেয়েও সাধারণ ২ ফিতার বাটার সেন্ডেল আর লুঙ্গি-পাঞ্জাবী পড়ে তিনি ঢাকা থেকে বাড়িতে যাতায়াত করেন। আমি মিলাতে পারি না কোন রকমেই। যে মানুষটি তার কাপড়ে অনাকাঙিক্ষত কোন ভাঁজও সহ্য করতে পারতেন না একসময়- প্রতিদিন নিয়ম করে শেভ করতেন-ধোপদুরস্ত প্যান্ট-শার্টে অভ্যস্ত ছিলেন- তিনি কীভাবে এইরকম পরিবর্তিত হয়ে গেলেন! অবাক হলেও  তার এই ব্যাপারটি হয়তো ‍পূর্বেকার পরিপাটি থাকার মতো করে, আমার অগোছালো কিংবা বেখেয়ালি হয়ে উঠার পেছনে পরোক্ষ ভূমিকা রেখেছে!

আমি বলছি না, পরিপাটি থাকা দোষের কিছু। এটাও বলছি না যে, দোপদুরস্ত কিংবা স্মার্ট থাকা অন্যায়। আমার আসলে কেবল একটা ব্যাপারই মনে হয়, এই সময়ে এসে আমরা শুধু মানুষকে তার আউটফিটের উপর বিবেচনা করে বিচার করে ফেলি। একজন মানুষের ইনারওয়ার্ল্ড বিভিন্নভাবেই সমৃদ্ধ হতে পারে। সেটা হয়তো তার বাইরের চেহারা থেকে কখনোই বুঝতে পারা সম্ভব না। এই যে আমরা মানুষের উৎকৃষ্টতা বিচার কিংবা যাচাইয়ের একটা প্যারামিটার হিসেবে তার আউটফিট কিংবা স্মার্টনেসকে ধরে নিচ্ছি, সেটার কতোটুকু আসলে ব্যক্তির সত্ত্বাকে রিপ্রেজেন্ট করে? কেউ থাকতেই পারে তার পারিপাট্য নিয়ে। হতে পারে যে কেউ দারুন রকমের স্মার্ট। তাতে আমি দোষের কিছু মনে করি না। একইভাবে কেউ যখন নিজের মতো থাকে- সমাজের দৃষ্টিতে যেটা ‘আনস্মার্ট’ কিংবা ‘খ্যাত’ টাইপের- তাতেও আমি আপত্তির কিছু দেখি না।

আমার কোন কোন বন্ধুর পরিপাটি সাজগোজ, পরিশীলিত সৌন্দর্য আমার খুব ভালো লাগে। হয়তো সেই সাজ-পোশাকই আমার এই ভালোলাগার পেছনের অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করে। কিন্তু, আমি একটা ব্যাপারে খুব সতর্ক থাকি। তাদের বাহ্যিক ধরণটা আমার কাছে মূখ্য থাকে না। বরং, মানসিক দিক থেকে তাদের উন্নত মনে করি বলেই তাদের সঙ্গ আমার ভালো লাগে। আমার কাছে মনে হয়, মানুষের ভেতরকার সৌন্দর্যই তার সত্যিকারের সৌন্দর্য। ব্যক্তির বাহ্যিক উপস্থাপনা সেই সৌন্দর্যের একটি সহ-উপাদান হিসেবে কাজ করতে পারে বড়োজোর।

আত্মীয়-পরিজন, বন্ধু-সহপাঠীদের আড্ডা, ভার্সিটি, ভাইবা বোর্ড, কর্পোরেট দুনিয়া ইত্যাদি সবখানেই এই আউটফিটের কারণে আমার চারপাশের মানুষেরা বিরক্ত হয়। কষ্ট পায়। কেউ কেউ করুণাও বোধ করে!  অথচ, আমি আমার নিজেকে নিয়ে শতভাগ সন্তুষ্ট আছি। কিন্তু, প্রিয়জন-শুভাকাঙ্ক্ষিদের হতাশা দেখে খারাপ লাগে। মাঝে মাঝেই মনে হয়, আমার এই ‘আনস্মার্ট’ আউটফিট তাদের চারপাশের পরিবেশকে আক্রান্ত করছে। তাদের কমফোর্ট জোনের স্বস্তিকর বাতাস দুষিত হচ্ছে। আমাকে তাদের সাথে কিংবা তাদের পাশে ঠিকঠাক মানাচ্ছে না। তখন মানসিকভাবে গুটিয়ে যাই নিজের মধ্যে। হয়তো কখনো সরে যাই তাদের সার্কেল থেকে। কারণ, এই সমাজ ঠিক করে দিয়েছে যে, আমার মতো অগোছালো চুলের রঙচটা পোশাক পড়া লোকজন ‘খ্যাত’ হয়। ‘আনস্মার্ট’ থাকার শাস্তি হিসেবে  এই সমাজের ‘স্মার্ট জনগন’ আমাদের মতো মানুষদের বয়কট করে রেখেছে! মোটেও সবাইকে গনহারে আমি স্মার্ট জনগনের কাতারে দাঁড় করাচ্ছি না। একইসাথে, কোনটা উচিত কোনটা অনুচিত সেই জাজমেন্টেও যাচ্ছি না। আমি শুধু বলতে চাইছি, ভেতরকার মানুষটিকেই আগে লক্ষ্য করা উচিত।

বর্তমানের এই ব্যস্ত সময়ে নিজেদের দিকে তাকানোর সময় আমাদের নেই। চিন্তার কোন স্থিরতা নেই। অন্যের পার্সোনাল স্পেস সম্পর্কে কোন খেয়াল আমাদের থাকে না। চারপাশে শুধু অস্থির গতিময়তার সার্কাস। নিজের কোন ইনার স্পেস কিংবা নিজস্ব জগতের কথা এখনকার আমাদের কেনো যেন মনে থাকে না! আরশিনগরে বসত করা মানুষটির খোঁজ করার মতো সময়ের বড়ো অভাব আমাদের। নিজের ভেতরে একটু উঁকি দিয়ে দেখার ইচ্ছাও কখনো আমাদের হয় না!  তার উপর, কর্পোরেট কালচার আমাদের প্রতিদিনকার জীবনকে জটিল করে তুলছে। ব্যক্তির চেয়ে পণ্যই সেখানে মূল অনুষঙ্গ হিসেবে ভূমিকা পালন করে। সেকারণেই হয়তো আমাদের মতো আনস্মার্ট মানুষগুলো ক্রমশ বাতিলের খাতায় চলে যাচ্ছি। স্পঞ্জের সেন্ডেল পড়া আমার বাবা কিংবা প্লাস্টিকের দেড়শ’ টাকা দামের পেগাসাস পায়ে ঘুরে বেড়ানো আমার ‘সামাজিক বিক্রয়মূল্য’ হয়তো আসলে খুবই নগন্য!

তাই, আন্তরিক কষ্ট পাই আমার চারপাশের মানুষগুলোর কথা ভেবে। যারা আমার এই ‘আনস্মার্ট খ্যাতমার্কা আউটফিটের জন্য অস্বস্তিতে থাকে। তাদের কাছে সবসময় মানসিকভাবে দুঃখিত হয়ে থাকা আমি প্রায়ই ভাবি, কখনো হয়তো আমার চারপাশের পৃথিবীতে র‌্যাডিক্যাল কোন চেঞ্জ আসবে। তখন মানুষের সবচে বড়ো পরিচয় থাকবে, সে একজন মানুষ। পোশাক-পরিচ্ছদ, গায়ের রঙ, জাতিগত অবস্থান, জেন্ডার ইত্যাদি মানবীয় শ্রেষ্ঠত্ব কিংবা বৈষম্যের প্যারামিটার বা মাপকাঠিগুলো আর থাকবে না। হয়তো কখনো মানসিক উৎকর্ষতার একটি গ্রহণযোগ্য অবস্থানে পৌঁছুতে পারবো আমরা..হয়তো। লালচে হয়ে যাওয়া মাথাভর্তি কোকড়া চুল ও রঙচটা পোশাকের চরম ‘আনস্মার্ট’ আমি সেই ‘হয়তোদিনের’ অপেক্ষায় থাকি..।

মন্তব্য করুন