হলদে ডানার পাখিটি ডানা ঝাপটাক তবুও

মানুষ হয়ে জন্মালেও আমাদের অনেকরই ভেতরটা মানুষের মতো হয় না। হয় পাখির মতো। পাখির মতোন মন নিয়ে আমরা বেড়ে উঠি এই মানুষের সমাজে। মনের গহীনে সযতনে লুকিয়ে রাখি ইকারাসের মতো সুবিশাল ডানাগুলো। ইকারাসের ডানা আসলেই ছিলো কিনা, কিংবা সেই ডানায় চড়ে সত্যিই তিনি উড়ে বেড়াতেন কিনা, জানার উপায় নেই এখন আর। কিন্তু, ইকারাসের ডানা অসংখ্য মানুষকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই। সূর্য না ছুতে পারলেও তিনি ছুঁয়ে গেছেন হাজারো স্বপ্নশীল ক্ষ্যাপাটে মানুষকে।

আমার সাথেও সেদিন জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাস ক্যাফেটেরিয়ার সামনে এক হলদে ডানার পাখির সাথে দেখা হয়ে গেলো হঠাৎ। তখন সন্ধ্যা নামছে ধীর পায়েতে। সেপিয়া কালারের বিষন্ণ এক সন্ধ্যা। মানুষ হয়ে জন্ম নিলেও সেই হলদে ডানার পাখিটি আসলে মানুষ নয়। একটি ডানাবন্ধ পাখি। অন্য জন্মের সাহসী এক ইকারস।

ক্যাফেটরিয়ার আঙিনায় গোল প্ল্যাটফর্মের ছাতার নীচে বসে আমি তখন দেখছি চারপাশের মানুষদের। বন্ধু, প্রেমিকা, বার্থডে পার্টি, গানের দল, মুক্তমঞ্চ, টিএসসি, টারজান পয়েন্ট সবখানের বুদবুদের মতো মানুষের ভিড় আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে বারংবার যে, এই মানুষের মিছিলে আমার দাঁড়াবার জায়গা নেই কোথাও।

কিছুদিন আগে ঢাকার বাইরে গিয়েছিলাম। অন্যরকম এক পরিবেশ ছিলো সেখানে।চারপাশে চা বাগান। তার পাশ ঘেষে চলে গেছে ছোট পাহাড়ি খাল। ঝুম বৃষ্টিতে পাহাড়ি ঢল নেমে আসে বনের ভেতর থেকে। ছোট ছোট পাথরের টুকরো বিছিয়ে আছে খালে।কোন ইলেক্ট্রিসিটি নেই। রাতে অসংখ্য জোনাকী পোকা থোকায় থোকায় উড়ে বেড়ায়। সেই মুহুর্তগুলোতে আমার মনে হতে থাকে, আমি সত্যিই মানুষ নই। এই বিশাল বনের নাম না জানা অসংখ্য প্রাণীর কোন একটির বংশধর হলেই হয়তো ভালো হতো। সেখানের সন্ধ্যার সাথে আজকের এই সন্ধ্যার কতো তফাৎ!

ক্যাফের পাশ ঘেষে পায়ে চলা পথধরে হেঁটে আসা মানুষটি আমার পাশে বসে। কথা হয় আমাদের। অর্থপূর্ণ-নিরর্থক অনেক কথা। আমি বুঝতে পারি, হলদে পাখিটির বিষণ্নতা কেউ দেখতে পায় না। তার নিজের ভেতরের কথাগুলো/ভাবনাগুলোই তাকে বিষণ্ন করে। সবসময় উজ্জ্বল হাসিমুখ আর চমৎকার ভঙ্গি তাকে আড়াল করে রাখে গোপন পর্দার মতো। পছন্দের কেউ নেই তার জীবনের কোন পৃষ্ঠায়। টম হেডেলস্টন কিংবা শাহরুখ খানের প্রতি মুগ্ধ হয় সে কখনো সখনো। কিন্তু, সে তো তাদের কাউকেই ভালোবাসে না। আসলে, ভালোবাসার সক্ষমতাটুকু  ফিরে পেতেই হয়তো চায় না।

মেরুন কালারের শাড়ি আর কাচ্চির অদ্ভূত কম্বিনেশন তার প্রাত্যহিক জীবনকে সহজ করে তোলে মাঝে মাঝেই। কখনো রাতের ট্রেনে করে ছুটতে চায় হয়তো বহুদূরের অজানা কোন স্টেশনের পথে। জানালা দিয়ে তখন হু ‍হু করে ঢুকে পড়বে উত্তুরে বাতাসের দল। কুয়াশার নরোম ছোঁয়া। ধানের ঘ্রাণে ভেসে যাবে ট্রেনের ছোট্ট বগি। মাঝে মাঝে টিম টিম করে জ্বলা কুপির আলোর দেখা মিলবে কোন ঘরের বেড়ার ফাঁকফোকর দিয়ে।

যখন যাত্রা শেষ হবে, তখন দেখবে সে, সামনে ভোরের কুয়াশায় নিমগ্ন হয়ে আছে অচিন গায়ের সেই স্টেশন। জনশূন্য। নড়বড়ে ছাউনির জংশন ঘরটির সামনে এক চিলতে প্ল্যাটফর্ম। পাশেই ছোট্ট একটি বেঞ্চি। সে হয়তো তাতে বসবে ক্ষণিকের জন্য। খানিকপর জীর্ণ পোশাকের বৃদ্ধ স্টেশন মাস্টার এসে টিনের গ্লাসে চা দিয়ে যাবে। তিতকূটে স্বাদের ঠান্ডা মেরে যাওয়া সেই চা তখন তার খুব ভালো লাগবে। কালো বর্ডারের সাদা সিমেন্ট বোর্ডে লেখা দেখা যাবে, নিতাইগঞ্জ জংশন। আমি সেই তখনকার সুখি মানুষটির মুখ ভাবতে চাই।  যে মুখে এই শহুরে জীবনের কোন ক্লেদ, বেঁচে থাকার  কোন ক্লান্তি থাকবে না। থাকবে শুধুই জীবনের প্রতি কৃতজ্ঞতা, প্রিয় মানুষদের জন্য ভালোবাসা।

আমার চিন্তা চলতে থাকে। নিজের জন্য করুণা হয়। হারিয়ে ফেলা অসংখ্য মানুষ, অসংখ্য অন্যায়, অসংখ্য মিথ্যা, অসংখ্য পাপ জমে জমে ক্রমশ মানুষের তালিকার বাইরে চলে এসেছি বহুদিন আগেই। ভীষণ জটিল মানসিক গড়নের আমার সাথে এই হলদে ডানার পাখিটির কতো বেশি পার্থক্য! জটিলতাহীন জীবন কাটানোর সুযোগ মিস্ট্রিম্যানদের হয় না কখনো। অন্যের পাজল সলভ করতেই সময় চলে যায় তাদের।  আমি কখনো নিজেকে মিস্ট্রিম্যান বলি না। হতেও চাই নি এমন কিছু কখনো। আমি খুব দ্রুত সবার সাথে মিশে যেতে পারি। হয়তো সেজন্যই সবসময় ভেবেছি, আমার চারপাশে অসংখ্য প্রিয় মানুষরা থাকবে। বন্ধু থাকবে।কিন্তু, থাকে না কখনো কেউ। কেবলই চলতে থাকে  হারিয়ে ফেলার পুনরাবৃত্তি..।

 

Life is a Gift আকাশের মত উদার হওয়া শেখো, পানির মত স্বচ্ছ হও, স্বাগত জানাও প্রতিটা দিনকে with your warms wide open!বেঁচে আছি এইতো অনেক Let’s uncomplicated!

 

আমি মনে মনে ভিজুয়ালাইজ করার চেষ্টা করি  হলদে পাখিটির ডানা লুকিয়ে ফেলার কারণ। দেখতে পাই অনেকদিন আগের শীতের রাতগুলোতো মায়ের কোলে চুপটি করে শুয়ে গল্প শুনছে মেয়েটি। বাবার সময় হতো না ভালোবাসার, আদর করার। মা নিজের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করছেন মেয়েটিকে ভালো রাখার। অকৃত্তিম ভালোবাসার সেইসব রাত্রিগুলো কতো চমৎকারই না ছিলো..।

আমি দেখি, কাজিনদের সাথে রাতজেগে আনন্দ উৎসবে ব্যস্ত মেয়েটিকে। সুদীর্ঘ গ্রীষ্মের বিকালগুলোতে নানু ভাইয়ের হাতে হাত রেখে টুকটুক করে হেঁটে বেড়ানোর প্রশান্তিময় মুহুর্তগুলো। এখনো মেয়েটি পথ হাঁটে। সেই ফেলে আসা সময় আর বর্তমানের মাঝে পেরিয়ে গেছে অনেকগুলো বছর। জীবনের প্রয়োজনে এখনো সে হাঁটে হয়তো একই পথে।

কিন্তু, চারপাশের কতোকিছু কী ভীষণভাবে পাল্টে গেছে! পাল্টে গেছে সময়। নানাভাই এখন আর তার সাথে হাঁটেন না। একাই হাঁটতে হয় তাকে। কে জানে, হয়তো নানাভাইও তার পাশেই পথ হাঁটেন সঙ্গোপনে। নানাভাই যে জগতে আছেন এখন, সেখানের মানুষদের কখনো দেখতে পাই না তো আমরা..! কিন্তু বিশ্বাস রাখি, নানাভাই তার প্রিয় নাতনিকে ভুলে যান নি।

আপাত হাসিমুখ, ফাউন্ডেশন পাউডার আর পরিশীলিত মেকআপ ও চমৎকার মেকি প্রাণবন্ততার অন্তরালে লুকিয়ে রাখা তার বিষণ্নতার প্রগাঢ় প্রলেপটুকু আমাকে চমকে দেয় সেদিনের সেই সন্ধ্যায়। সুনিপুন অভিনয় করে সে বেঁচে থাকে তার চারপাশকে নিয়ে। তার মা-বাবা, আত্মীয়-পরিজন, বন্ধু-সহযাত্রী কেউ কি কখনো আঁচ করতে পারে ভেতরের অতল গভীর বেদনার হাহাকার? জানি না আমি।

এই ক্যাফেটরিয়ার আঙিনায় আজকের মতো অসংখ্য সন্ধ্যা এসেছে। আমি যেখানটায় বসে আছি, সেখানেও বছরের পর বছর ধরে অন্যরা বসে বসে অনেক কথাই ভেবে গেছে। তারা আজ কোথায়, জানা নেই আমার। হারিয়ে যাওয়া মুহুর্ত, মানুষ, বিষণ্নতা, সেপিয়া কালারের সন্ধ্যা কিংবা ক্যাফেটরিয়া সবকিছু মিলেমিশে যায়। ভালো রেজাল্ট করা, হাসিমুখের দেখতে সুখি মেয়েটির অতলান্তিক শুন্যতাটুকুই টিকে থাকে। আচ্ছন্ন করে রাখে চারপাশকে।

জানি আমি, আমার এই দেখার ধরণ, বিবেচনা কিংবা বিশ্লেষণের রকমকে পাগলাটে বলে চালিয়ে দেয়াই যায়। হয়তো এর পুরোটুকুই অহেতুক। তবুও আমি এভাবেই ভাবি। ঘটনার বাইরের ঘটনাকে এভাবেই দেখতে শিখেছি আমি। হলদে ডানার পাখিটি তার চারপাশের সাথে আপস করে বেঁচে থাকতে গিয়ে ক্রমশ হারিয়ে ফেলছে ডানা ছড়াবার শক্তি ও সাহস। গোপন দুঃখগুলো তাকে দখল করে আছে সর্বাত্মক।

তবুও আমি ভাবতে চাই অন্যভাবে। আমি প্রাণপন আশা রাখি, হলদে পাখিটি সত্যিকার অর্থেই সুখি হওয়ার চেষ্টা করবে। এই চারপাশের সুকঠিন জীবনের গরাদআঁটা খুপড়ি থেকে বেরিয়ে পড়বে সে একদিন। প্রিয় মায়ের অকৃত্তিম স্নেহ, আদরের ছোটবোনের নির্ভরতা কিংবা অন্তহীন বেঁচে থাকার দেশে চলে যাওয়া নানাভাইয়ের আঙুলের ভালোবাসার স্পর্শে জেগে উঠবে তার ভেতরকার মানুষটি। লুকিয়ে রাখা ডানাগুলো মেলে ধরবে আকাশের সুবিশাল বিস্তারের মাঝে। শত দুঃখ-কষ্ট-অপূর্ণতার মাঝেও ডানা ঝাপটাবে প্রাণবন্ত আনন্দের সাথে সেদিনের হলদে পাখি। জীবন তখন মুগ্ধ হয়ে দেখবে বেঁচে থাকার তীব্র উচ্ছাস! ক্যাফেটরিয়ার সন্ধ্যাগুলোতে অন্য একজন স্টোরিটেলার লিখবে সেদিনের সেই মুগ্ধতার গল্প।

মন্তব্য করুন