হারানোর তালিকায় বাড়ছে যখন প্রিয়জনদের ভিড়

“কেন বাড়লে বয়স
ছোট্টবেলার বন্ধু হারিয়ে যায়
কেন হারাচ্ছে সব বাড়াচ্ছে ভিড়
হারানোর তালিকায়..”
-সায়ান

নায়করাজ রাজ্জাকের প্রথম কোন মুভিটা আমি দেখেছি, মনে নেই। আমার ছোটবেলায় আমরা মুভিকে ছবি বলতাম। প্রতি শুক্রবারে সবাই মিলে নানুবাড়ির উঠানে বসে অপেক্ষা করতাম। বিটিভির সম্প্রচার শুরু হতো তিনটায়। কোরআন, ত্রিপিটক পাঠ শেষ হতে না হতেই আমাদের রুদ্ধশ্বাস অস্থিরতা পেয়ে বসতো। ঘোষক এসে জানিয়ে দিতেন সেদিনের সম্প্রচার হতে যাওয়া ছায়াছবির নাম। বলতেন, শ্রেষ্ঠাংশে থাকবে রাজ্জাক-শাবানা, দিলদার, হুমায়ুন ফরিদীসহ এমন অনেক নাম। আমাদের পছন্দের নায়ক নায়িকার ছবি পেলে আমরা হই হই করে উঠতাম।

নাইনটিজের প্রজন্ম হিসেবে অনেক মানসিক ঐশ্বর্যের দেখা পেয়েছি আমরা। সেই সময় থেকে রাজ্জাক আমার অন্যতম প্রিয় চরিত্র। আজকে ২১ শে আগস্টের গ্রেনেড হামলার দিনে রাজ্জাক চলে গেলেন না ফেরার দেশে। মৃত্যু আমাকে সহজে আপ্লুত করে না। চারপাশের অসংখ্য মৃত্যুর সংস্কারে থাকা, জানাজা পড়া এইসবের ভেতর দিয়ে মৃত্যুকে আমার জন্মের চাইতেও ধ্রুব মনে হতে থাকে। কিন্তু, রাজ্জাকের মৃত্যু আমাকে নাড়া দিয়ে গেলো। স্মৃতির সুন্দর ভাঁজ খুলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেলো। আহ! আমার প্রিয় নাইনটিজের প্রিয় মানুষ! হারিয়ে ফেললাম! ছুটে যাচ্ছে ক্রমশ আমার অতীতের সাথে সম্পর্কের সুতো।

বিগত কয়েকটি বছর ধরে কেবলই হারাচ্ছি। হুমায়ূন আহমেদ চলে গেলেন। সুনীল গেলেন। সৈয়দ শামসুল হক, তারেক মাসুদ গেলেন। আব্দুল মান্নান সৈয়দ, মহাশ্বেতা দেবী, সূচিত্রা ভট্টাচার্যসহ আরো অনেকেই চলে গেছেন। এই যে চলে যাওয়া, এটা কোন ভাবেই থামানো যাবে না। সবকিছু ভেঙে পড়ছে বলে হুমায়ূন আজাদ চলে গেছেন। ভেঙে পড়ছে আমার চারপাশ। এই হারিয়ে ফেলার মিছিল যেনো কখনোই শেষ হবার না!

শৈশবে চিটাগাং থাকতাম। আগ্রাবাদ ফায়ার সার্ভিস কোয়ার্টারে। সেখানে আমাদের বাসায় বারেক মামা, খলিল মামা সহ আরো নাম ভুলে যাওয়া অনেক মামারা আসতেন। বাবার কলিগ উনারা। খুব আদর করতেন আমাকে। এখন আর তারা নেই আমার জীবনে। যে স্নেহটুকু আমি নিয়েছি, সেটা ফিরিয়ে দেয়ার জন্য আবার তাদের কাছে গিয়ে দাঁড়ানোর মতো কোন দরজা এখন আর খোলা নেই। কোয়ার্টারে আমাদের পাশের ফ্ল্যাটে আইরিনরা থাকতো। ওরা ২ বোন ছিলো। আমরা একসাথে মক্তবে যেতাম। খুব ভোরে আমাদের বিল্ডিংয়ের পেছনে বেলি ফুল টোকাতাম একসাথে। শিশিরে ভেজা থাকতো ফুলগুলো।

আমি এখনো শীতের সকালে ঠান্ডা ছুঁয়ে দেখার শিহরণ টের পাই। সূর্য উঠতো কিছুসময় পর পিটি বিল্ডিংয়ের পাশ ঘেষে। গার্ড হাউজে ঢং ঢং করে ঘন্টা পড়তো। খুব ভালো লাগতো আমার ভোরের সেই সময়টুকু। সেদিনের সেই আইরিনরা এখন কোথায় আছে, জানি না। হারিয়ে ফেলেছি।

আগ্রাবাদ থেকে কাছেই ছিলো চন্দনপুরা নামের আরেকটা ফায়ার স্টেশন। বাবার সাথে মাঝে মাঝে ওখানে যেতাম। শাহজাহান নামের একজন কাকা ছিলেন। তিনিও বাবার কলিগ।  ভোলার নাম আমি প্রথম শুনি উনার কাছ থেকে। উনি ভোলার মানুষ ছিলেন। আমাকে খুব খুব আদর করতেন। তাঁর ছেলের মতোই ছিলাম আমি, এখন মনে হয়। যখনই গ্রাম থেকে ফিরতেন ছুটির শেষে, আমার জন্য বেশ বড়ো সাইজের চারকোনা সন্দেশ শেপের ‘খইয়ের পাকান’ নিয়ে আসতেন। আমি কেটে কেটে খেতাম আর সন্দেশের সাইজ দেখে অবাক হয়ে ভাবতাম, কীভাবে বানায় এমন করে!!

চিটাগাং ছেড়ে আসার বেশকিছুদিন পর একদিন হঠাৎ শুনলাম, ক্যান্সারে মারা গেছেন শাহজাহান কাকা। পরিবারের কেউ জানতো না তার অসুখের কথা। বাবাকে বলেছিলেন, খামাখা জানায়া কী হইবো..। অভাবের সংসার। চিকিৎসা করাইতে গেলে ভিটা-জমি সব যাইবো। দরকার নাই। ব্যস! ধুম করে হারিয়ে গেলেন তিনি।

গ্রামের বাড়িতে শিফট হয়ে যাওয়ার পর নতুন পরিবেশে একটা ছোট স্কুলে ভর্তি হলাম। সেখানে পেলাম নীলু আপা নামের একজন ম্যাডাম কে। আমার তখনকার স্মৃতি যতোটুকু মনে করতে পারি, ম্যাম ছিলেন দারুন সুন্দর। স্বামী দেশের বাইরে থাকতো। উনি উনার এক ছেলেকে নিয়ে দেশে থাকতেন। অবসর কাটানোর মাধ্যম হিসেবে ইশকুলে পড়াতেন। আমার অসম্ভব ভালো লাগতো উনাকে। উনিও আমাকে খুব আদর করতেন। ইশকুল ছেড়ে অন্য ইশকুলে ভর্তির পর উনাকে আর কখনো খুঁজে পাই নি। শুনেছি, ছেলের সাথে বিদেশে আছেন। হারিয়ে গেলেন আমার প্রিয় নিলু ম্যাম।

প্রাইমারী ইশকুলে ভর্তির সুযোগ পেলাম। ইশকুলের পরিবেশ খুব হতাশ করলো আমাকে। নীচের দিকের ক্লাসের ছাত্ররা সবাই মাটিতে বসে ক্লাস করে। আমি তখন শহর থেকে গিয়েছি গ্রামে। শহরেরন ইশকুলের সাধারণ ব্যবস্থাপনাও তখন আমার কাছে আলীশান লাগতে শুরু করেছিলো। সেই সময় শিখা ম্যাম নামের আরেকজন চমৎকার মানুষের সাথে দেখা হলো। একই সাথে আবার আগের ঘটনার রিপিটেশন। হারিয়ে গেলেন শিখা ম্যাম। মাথায় মোটা করে টকটকে সিঁদুর দিয়ে শাড়ি পরে ক্লাসে আসতেন। এখন আর কখনোই শিখা ম্যাম আমার ক্লাসে আসবেন না। এই হারিয়ে ফেলাও আমাকে কষ্ট দিয়েছে।

ঢাকায় এসে এক আবাসিক হোস্টেলে উঠলাম। পড়াশোনার উদ্দেশে আসা। কিন্তু, হোস্টেলের প্রথম দিনই টের পেলাম যে, ভীষণ বিপন্ন পরিস্থিতি। র‌্যাগ আর বড়োদের অত্যাচারে চোখে অন্ধকার দেখছিলাম। নাজমুল হাসান নামের একজন শিক্ষক ছিলেন। তিনি আমাকে হাতে ধরে শেখাতে চেষ্টা করলেন সবকিছু। ধীরে ধীরে সহনীয় হয়ে উঠলো হোস্টেল জীবন। একসময় প্রতিষ্ঠান পাল্টে তিনিও হারিয়ে গেলেন কোথাও। আমার ব্যক্ত্বিত্বের বেইজ গড়ে দেয়া মানুষদের একজন তিনি। আর খুঁজে পাই না তাঁর সাথে সম্পর্কের সুতো।

তারপরে পেলাম রুহুল আমিন নামের আরেকজন ক্ষণজন্মা মেন্টর শিক্ষককে। এতো ভালো লাগতো উনাকে যে, উনার পোশাক পড়ার স্টাইল পর্যন্ত আমি ফলো করতাম। একই টেইলার্স থেকে জামা বানাতাম। যাতে আমাকে দেখতে উনার মতো লাগে। আমার মানসিক যে ব্যক্তিত্বের জায়গা, সেটা ভালো কিংবা খারাপ সে বিবেচনায় যাচ্ছি না, উনার অবদানে গড়া। এখনো অবচেতন মনে আমি উনাকে ফলো করি। কিন্তু, সামাজিক সম্পর্কের জটিলতা উনার সাথে আমার যোগাযোগ বন্ধ করে দিলো। আমি এবার হারালাম আমার সবচে প্রিয় শিক্ষককে। এখনো তিনি আমার সবচে প্রিয় শিক্ষক।

মালিবাগ থাকি তখন। সেখানে একজনের সাথে বন্ধুত্ব হলো। ছোটবেলা থেকে অস্থির ঠিকানার কারণে কোন বন্ধু আমার ছিলো না। মহিউদ্দিনও একসময় হারিয়ে গেলো ইচ্ছা করেই। আমি ভীষণ ভেঙে পড়লাম। খুব আঘাত লেগেছিলো বিশ্বাসের জায়গাটাতে। পড়াশোনা অফ হয়ে গেলো। সাইক্রিয়াটিস্টের সাজেশন অনুযায়ী চলার চেষ্টা করতে হলো। সেই জের ধরে হারালাম আমার তিনজনের পড়ুয়া সার্কেলটাকে। ফেসবুকের কল্যাণে খবর পাই তাদের। কিন্তু, যোগাযোগের-বন্ধুত্বের টানটা ছিড়ে গেছে সেই কবে!

তখন বাংলা ব্লগের খুব চল। প্রথম আলো ব্লগে আমরা অনেকেই লিখি। কমেন্টে তুমুল আলোচনা চলে। ২০/৩০ টা ট্যাব খুলে কমেন্টের রিপ্লে দিই। একটু পর পর সুপার স্লো ইন্টারনেট কানেকশনের মধ্য দিয়েই বারবার রিলোড দিই। আপডেট দেখি। এরই মাঝে মেয়েদের অসম্মান করে লেখা এক পোস্টের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমত গড়ে উঠে। সেই সময় এই্ ভার্চুয়াল আন্দোলনে তপা নামের একজনের পক্ষে ডিফেন্স করতে গিয়ে আমার সাথে ওর পরিচয় হয়। তারপর নানা সময়ে টুকটাক কথা। লেখা নিয়ে আলাপ। শীতবস্ত্র বিতরণে একসাথে কাজ করা। টুকটাক গল্প। একসময় বন্ধুত্ব খুব চমৎকার একটা জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়।

তারপর? আমার ভাগ্যের সার্কেল পূর্ণ হয়। হারিয়ে ফেলি আমার সেই বুন্ধটাকে। এখন ও বাংলাদেশ থেকে বহুদূরের এক দেশে। যেখানে ওর প্রিয় ফুচকা পাওয়া যায় না। স্প্রাইট পাওয়া যায় হয়তো। কিন্তু, নীলক্ষেত থেকে ডেমরার রোডের রিকশাভ্রমণ আর পাওয়া যায় না। এখানেও সেই হারিয়ে ফেলার গল্প।

সেইসময় ব্লগের সূত্র ধরেই ছায়েদা আলী নামের একজন খুব কড়াকথার ব্লগারের সাথে সখ্যতা তৈরী হয়। বয়সে অনেক বড়ো ছিলেন তিনি। আমরা সবাই বড়োপা ডাকতাম। অনেক ভালো একটা সম্পর্ক ছিলো আমাদের। ভাই-বোনের সম্পর্কই ভাবতাম এটাকে। তারপর উনার পারিবারিক অশান্তি চরম পর্যায়ে চলে যায়। আপার একটা প্রিন্সেসের মতো মেয়ে ছিলো। নাম সুহা। আমরা অনেক কথা বলতাম। গল্প করতাম। আপা তার লেখা কবিতা আবৃত্তি করে শোনাতেন। একদিন তিনি হারিয়ে গেলেন। আর খুঁজে পাই নি তাঁকে। এখনো মনে মনে খুঁজি তাঁকে। হয়তো কখনো পাবো..।

আজকে এই লেখা লিখতে বসে আমার স্বাভাবিক গতি ঠিক থাকছে না। অগোছালো আর অদ্ভূতভাবেই লিখে ফেলেছি এতোদূর। অসংখ্য মানুষের কথা জেগে উঠছে স্মৃতির কোষে কোষে। আহ! কতোটা সময় পার করে ফেলেছি জীবনের! কিন্তু, কতো কতো প্রিয় মানুষকে ধরে রাখতে পারি নি। হারিয়ে গেছে তারা সবাই।

আমার কোন শৈশব ছিলো না। অন্য আর দশটা মানুষের মতো আমার শৈশবের এতো রঙও ছিলো না। ২ রুমের একটা ফ্ল্যাট, একটা গরাদ দেয়া ছোট্ট জানালা। আর কিছু খেলনা। এই ছিলো আমার শৈশব। গতানুগতিক শিক্ষার ধারা অনুযায়ী পড়াশোনা করা হয় নি। তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রীক বন্ধু হতো না আমার। আমিও অবশ্য ততোদিনে একা চলতে শিখে গেছি। অবাক হই নিজেই এটা ভেবে যে, আমার জীবনের এতো বিশাল একটা অংশ পার করে আসার পরও আমি কোন বন্ধু ধরে রাখতে পারি নি! আঙুলের ফাঁক গলে কখন যে তারা হারিয়ে গেছে…খুব কষ্ট হয় চিন্তা করলে। ভয়ংকর একাকীত্ব এসে গ্রাস করে আমাকে।

মানুষ হিসেবে বাইরে থেকে দারুন মিশুক আমি। মানুষ ভালোবাসি। মানুষের সম্পর্কে জানতে , মানুষ দেখতে ভালোবাসি। সেই আমারই কোন বন্ধু হয় নি কখনো! কী যে ভীষণ হাহাকার লাগে আমার! সবাই হারিয়ে যায়। আমিই ধরে রাখতে পারি না কাউকে…।

সময় চলে যেতে যেতে থাকে। মানুষের পর মানুষ চলে যেতে থাকে..। শুধু আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় প্রিয়জনদের, বন্ধুদের হারিয়ে ফেলার ভয়ংকর শুন্যতা নিয়ে..। জনারন্যে থেকেও কী ভীষণ নির্জনতা! এই হারিয়ে ফেলার মিছিল ক্রমশ বড়ো হচ্ছে। হারানোর তালিকায় বাড়ছে প্রিয়জনদের ভিড়..।  তবুও ভালো থাকুক মানুষ। ভালো থাকুক জীবন। যেখানেই হোক ভালো থাকুক সবাই।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

* ছবির অক্ষরগুলো উপরের ঘরে লিখুন