৫০ টাকা মাসিক হাতখরচের দিনগুলোতে মেয়নেজ মাখানো বার্গার

এ্যলিফেন্ট রোডের একটি মোটামুটি মানের ছাত্রাবাসে  তখন আমি। শৈশব পেরিয়ে সবে কৈশোরের দ্বারপ্রান্তে..। লিফট ছাড়া বিল্ডিংয়ের সাত তলায় থাকি। কাছেপিঠে কোন বাড়ি না থাকার সুবাদে চারপাশের অনেকটা জুড়ে দৃষ্টি চলে। নিত্যকার কাজকর্ম-পড়াশোনার ফাঁকে যেটুকু সময় পেতাম, তার অনেকটা অংশ কাটতো , গরাদআঁটা জানালার ভেতর দিয়ে মুক্ত আকাশ আর জাদুর শহর ঢাকার স্কাইলাইন দেখে।

বাবার ছোট্ট সরকারী চাকরী। বেতনের অংক হয়তো সেকারণেই বাবা কখনো আমাদের বলেন নি। আমার মাসিক হাতখরচ ছিলো ৫০ টাকা। সারামাস কী করে এই টাকায় চলতো, এবং টাকা বাঁচিয়ে কী করে যে মাস শেষে দু’য়েকটা বইও কিনে ফেলতাম, এটা এখনো আমাকে ভাবিয়ে তোলে..।

আমার হোষ্টেলমেটদের বেশিরভাগই ছিলো শহরে বেড়ে উঠা উচ্চমধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান। তাদের চলাফেরা, জীবনাচার, ভাষা সবকিছুই ছিলো গ্রামের ছেলে হিসেবে আমার চোখে দ্রষ্টব্য।

তবে, কী কারণে জানি না, আমার ভাবনার ধরণ, চিন্তার গতিক, রুচিবোধ সবকিছুই ছিলো একটু বেখাপ্পা ধরণের। আমার বয়সের সাথে মিলতো না। সময়ের চেয়ে বড়ো হয়ে গিয়েছিলাম মনে হয়। সেকারণেই হয়তো হীনমন্যতায় ভুগতাম না।

আমার পাশের বেড ছিলো তন্ময় নামের একটি ছেলের। বাবা বড়োসড়ো ব্যাবসায়ী। সম্পদের লোখাযোখা নেই। ওর পরিবারের  সদস্যদের কেউ না কেউ  প্রায় প্রতিদিনই দেখতে আসতো তন্ময়কে। তেমনই এক বিকেলে ওর কাছেই আমি প্রথম দেখি নতুন প্রকারের খাবার। সেটা নিয়েই লিখছি আজকে। সাদা ক্রিমের মতো অচেনা কিছু মাখানো দুইভাগে বিভক্ত একটি রুটি। মাঝখানে ভাজা মাংসের কিমা ।

তন্ময়ের অবিবাহিত এবং ঝলমলে সুন্দর বড়ো বোন ওকে খাইয়ে দিচ্ছে মুখে তুলে। ওর বাসা থেকে মেয়ে আত্মীয় যারা আসতো, বেশিরভাগই ছিলো ঝলমলে সুন্দর। আমাদের চোখে অনেকটা মুগ্ধ হবার মতো তাদের রঙ-রূপ-পোশাক-পরিচ্ছদ। এই মুগ্ধতার উৎস কি তাদের ঝকঝকে পোশাক, শহুরে স্টাইল ছিলো ,  নাকি চেহারার জন্মগত কোমল সৌন্দয্য ? সেদিন আলাদা করতে পারি নি। তাই, বর্তমানে সেই চেষ্টা আর করছি না।

আমার শৈশবের শুরুর অংশ শহরে কাটলেও আমি মূলত গ্রামের ছেলে। গ্রামের অকৃত্রিম কাদা-জল, সোনার ধুলোয় মানুষ আমি। আমার বাবা, তার বাবা, তার বাবা সবাই ছিলেন কৃষক..। শরীরে মাটির গন্ধ লেগে থাকতো। সেই মাটির গন্ধ নিয়ে আমি এসেছিলাম এই জাদুর শহরে, ফিটফাট ধোপদুরস্ত, শিক্ষিত বাবু হবার অভিপ্রায়ে।

শহরে এসেছি তখন বেশিদিন হয় নি। নানা রঙের খাবারের পদ, সেসবের স্বাদ-গন্ধ সবে চিনতে শুরু করেছিলাম। সেদিন  বিকেলে  প্রথম দেখা খাবারটির নাম জানার সাধ্য আমার ছিলো না।  বড়ো বড়ো বেকারীর দরজাগুলো কালো কাঁচের অস্বচ্ছ আয়নায় আটকানো থাকতো। তাই দেখাও হয় নি কখনো এই খাবারটির সাথে। আমার দৌড় তখন রাস্তার পাশের সস্তার দোকানের পুরি-আলুরচপ।

তন্ময়ের বোন চলে যাওয়ার পর ওর কাছে জানতে চাইলাম, কী নাম এই খাবারের। খুব তাচ্ছিল্য নিয়ে হেসে বললো, এটার নাম জানিস না! এটা স্পেশাল চিকেন বার্গার। কোথায় পাবোর উত্তরে,  ও আমাকে জানালো, আমাদের গলির মাথায় যে বড়ো বেকারী, ডেইলিফ্রান্স , ওখানে পাওয়া যায়। দাম ৩০ টাকা।

আমিতো শুনে মহা অবাক! এইটুকুন রুটি আর একটু কিমা ভাজা, সাথে শাদা মেয়নেজ নামের কী যেনো দেয়া। এই বার্গারের দাম এতো বেশি হয় কীভাবে! আমার প্রায় ১৫ দিনের নাস্তার খরচ! ২ টাকায় তখন একধরণের স্থানীয় বেকারীর তৈরী বিস্কুটের ছোট প্যাকেট পাওয়া যেতো।

সেদিন তন্ময় আমাকে একটুকরো বার্গার কী মনে করে যেনো খেতে দিয়েছিলো। আমি চাই নি। হয়তো আমার আগ্রহ দেখে। তারপর থেকে আমি  নাস্তা না খেয়ে একটু একটু করে টাকা জমাতে শুরু করলাম। ইচ্ছে, বার্গার খাবো। আস্ত একটি বার্গার না খেতে পারলে আমার আর চলবে না।  সবাইকে খেতে দেখলে আমারও কিছু খেতে ইচ্ছে করবে বলে বিকালে নাস্তার সময় ছাদে উঠে যেতাম। শুরু হলো আমার টাকা জমানোর মিশন।

এক শুক্রবার ছুটির দিনে অবশেষে আমি বার্গার কিনে আনলাম।  মেয়নেজ মেখে আকর্ষণীয় হয়ে আছে। রুমমেটরা সবাই তখন ঘুমে।  খুব যত্নে কাগজের প্যাকেট ছিড়ে নিয়ে প্রথমে আস্তে করে প্লেটে রাখলাম। যেনো, জোরে রাখলে আমার প্রিয় বার্গারের কষ্ট হবে! চুপচাপ বসে থাকলাম কতোক্ষণ বার্গার সামনে নিয়ে। এই একটুকুন জিনিসটার জন্য ১৫টা দিন আমাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে! অভ্যাসজনিত ক্ষুধার কষ্টে বিকেলগুলো তখন খুব দীর্ঘ মনে হতো।

বার্গারের টুকরো মুখে দিয়ে খেতে খেতে ভাবছিলাম, আমার বাবার অনেক টাকা হলে আমি তিনবেলাই বার্গার খাবো। মেয়নেজ মাখানো স্পেশাল চিকেন বার্গার!  সেদিনের পর আমার অনেকদিন আর বার্গার খাওয়া হয় নি। বার্গারের চেয়ে বই আমাকে বেশি টানতো বলেই হয়তো বইই কিনে ফেলতাম বাঁচানো টাকায়। আমার বাবারও কখনো অনেক টাকা হয় নি।

জীবন কী অদ্ভূত! একটুকরো মেয়নেজ মাখানো বার্গার খাবার জন্য কী দুর্দমনীয় আকুলতা ছিলো সেদিন আমার! বাবার টাকা না থাকার কষ্টে কিশোর নীরবের ছোট্ট বুকটা সেদিন কেমন করে উঠেছিলো, চোখ বন্ধ করলে আমি আজও অনুভব করতে পারি।

তার পাশের বন্ধু একই বয়সে বিপুল ঐশ্বর্য নিয়ে বেড়ে উঠছিলো। আর, সে একটি মেয়নেজ মাখানো বার্গারের জন্য কী তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সময় কাটিয়েছে! এই যে নির্মম বৈষম্য, এই যে নিদারুণ দারিদ্র্য,  কেনো আমাদের শৈশব-কৈশোরের সুন্দর সুকোমল  সময়গুলোকে কঠিন করে তোলে?

তারপর থেকে কেটে গেছে জীবনের অনেকটা সময়। পেরিয়ে এসেছি অনেকটা পথ। এখন নিজের উপার্জনে আমি মেয়নেজ মাখানো  স্পেশাল বার্গার খাওয়ার সামর্থ্য রাখি। কিন্তু, ইচ্ছেটা মরে গেছে সেই কবে..। কাঁচের গ্লাস লাগনো অভিজাত বেকারী, দামী হোটেলের শীততাপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে, চায়নিজ, মেক্সিকান কিংবা ইটালিয়ান খাবার খাওয়ার সাধ্য এখন আছে। প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে খেয়েছিও কখনো সখনো। কিন্তু, সেই ছোট্টবেলায় ফেলে আসা নীরবের মেয়নেজ মাখানো বার্গার আমি এখনো ভুলি নি। দামী কোন খাবারে হাত দিলেই মনে হয়,  সেদিনের সেই আমার মতোই হয়তো কেউ আমাকে দেখছে দূর থেকে। হয়তো ভাবছে, এই খাবারটির নাম কি? সেই মানুষটির সংসার হয়তো চলে যায় দামী রেস্টুরেন্টের একবেলার খাবারের বিলে..।

এই ভাবনা আমাকে বারবার আঘাত করে। আমাকে ক্ষতবিক্ষত করে..। আমার আর দামী বেকারীতে খাওয়ার তৃপ্তি পাওয়া হয় না।

আমি ভাবি, আমার সাধ্য হলে একদিন এই জাদুর শহরে বাস করা, দূর থেকে দেখা ছোটবেলার নীরবদের মতো মানুষগুলোকে নিয়ে একদিন বার্গার খাবো। বড়ো কোন রেষ্টুরেন্টে সেদিন শুধু আমরাই থাকবো। মেয়নেজের গন্ধ ভেসে বেড়াবে বাতাসে..। আমি তৃপ্তি নিয়ে খাবো সেদিন মেয়নেজ দেয়া স্পেশাল চিকেন বার্গার…।

===============

# এ্যলিফেন্ট রোড ঢাকায় অবস্থিত।
# বার্গারের ছবিটি ইন্টারনেট থেকে নেয়া। প্রতিকী ছবি

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

* ছবির অক্ষরগুলো উপরের ঘরে লিখুন