বৃষ্টি, ভালোবাসা , রূপকথা এবং একজন সপ্রতিভ কিশোরীর গল্প

আমার আকাশ আমি যতো ই হাজার অন্য রংয়ে আঁকি..
আকাশ সে তো নীল ই থেকে যায়…
আমার সাদা কালো শহর, সে তো সাদা কালো ই থাকে..
আমি যতোই রঙিন নিয়ন জ্বালাই..

রাতভর ঝুম বৃষ্টি হয়েছে। ভোরের রাস্তায় সুনসান নীরবতা। ভীষণ স্নিগ্ধ আর পবিত্র লাগছে আজকের সকালটা। আমার গল্পের লেখক, অর্ক রায়হান, তার লেখার একটা চরিত্র চিত্রায়ণ নিয়ে বিরক্ত হয়ে আছেন। কিছুত্রেই ফুঁটিয়ে তুলতে পারছেন না চরিত্রটিকে। রামপুরা বাজার হয়ে মালিবাগ রেলগেট, সেখান থেকে ফ্লাইওভারের পথে হাঁটছেন তিনি। চরিত্রটা বেশ জটিল। একজন হাস্যময়ী কিশোরীর চরিত্র।

লেখকের সাথে তার প্রথম দেখা হয়েছিলো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। কোন এক রোদজ্বলা নিঝ্ঝুম দুপুরে। ধরা যাক মেয়েটির নাম অনন্যা। শহরের নামী এক কলেজ থেকে পাশ করে বেরিয়েছে সম্প্রতি। চোখে রঙিন ভবিষ্যতের স্বপ্ন..। মেয়েটি তখন হাসছিলো নিঃশব্দে। দেখেই লেখকের মনে হয়েছিলো, জোৎস্নার ফুল ঝরে পড়ছে শব্দহীন মুখরতায়। কিছু মুখ থাকে এমন, তারার মতো ঝকঝকে। সহজে মুছে ফেলা যায় না স্মৃতি থেকে। বারবার নানা রঙ আর রূপ নিয়ে ফিরে ফিরে আসে।

অনন্যাও ঠিক তেমনই একজন। অনন্যার খুব ভালো লেগে যায় আমার গল্পের লেখককে। সপ্রতিভ ভঙ্গিতে নিজের ভালোলাগা জানিয়েও দেয় অনন্যা।  সম্পর্কটা সামনে এগিয়ে চলে। খুব ভালো বন্ধুত্ব তৈরী হয় তাদের মধ্যে। লেখক লিখেন। অনন্যা পড়তে শুরু করে। সময়ও কাটতে থাকে তার আপন নিয়মে।

লেখক তার চোখ দিয়ে দেখেন অনন্যাকে। পরিবারের নিশ্চুপ অংশ হিসেবে অবহেলায় বেড়ে উঠা অনন্যার ভেতরের শূন্যতাকে লেখক পড়তে চেষ্টা করেন। দিনের পর দিন নিজেকে একটা ছাঁচে আবদ্ধ করে রাখা একজন তুখোঁড় বিতার্কিককে দেখেন লেখক। বুঝতে চেষ্টা করেন অনন্যার যন্ত্রণা। দেখেন একজন কিশোরীকে, যে কোনদিন নিজের জন্য একটা মুহুর্তও বরাদ্দ রাখার সুযোগ পায় নি। যে কোনদিন ঝরঝর মুখর বৃষ্টিতে ভিজে একাকার হয় নি। যার কখনো প্রিয়জনের সাথে কাটানো হয় নি একটা ভালোবাসায় জড়ানো সন্ধ্যা। জীবনের উপভোগ্য অংশটুকু যার কখনোই ছুঁয়ে দেখার সুযোগ হয় নি, লেখক দেখেন সেই অনন্যাকে। দেখেন, অন্যের স্বপ্নপূরণে ব্যস্ত ক্লান্তিতে ভেঙে পড়া এক অনন্যাকে।

একজন স্বপ্নাচ্ছন্ন তরুণকে ভালো লাগে অনন্যার। কিন্তু, কখনো তাকে বলা হয় নি ভালোবাসার কথা। হবেও না হয়তো কখনো। অনন্যার চোখে সেই ফেলে আসা ভালোবাসার জন্য সকরুণ বেদনা দেখতে পান লেখক।

তিনি দেখেন, ঝিনুকের মতো বালির বিষ সহে কী অদ্ভূতভাবে অনন্যা তৈরী করছে অপার্থিব সুন্দর হাসির মুক্তো। ছটফট করতে থাকা চোখে হাজারো ভাবনার ইতিউতি ছুটোছুটি দেখতে দেখতে লেখক বিস্মিত হন। একসাথে পথ হাঁটেন তারা কখনো। কখনো ভ্যাপসা গরমে বাসের সিটে একসাথে পার হন মাইলের পর মাইল। কথার পিঠে কথা জমে উঠতে থাকে। জমাট অনন্যা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে লেখকের শাদা ক্যানভাস জুড়ে।

জীবন এমন হয় কেনো, জানেন না আমাদের লেখক..। জানেন না অনন্যারা এতো সুন্দর করে হাসে কীভাবে..। বুঝতে পারেন না, অনন্যাদের ভালোবাসতে হয় কীভাবে..। একজন বন্ধু হয়ে, একজন শুভাকািঙ্ক্ষী হয়ে কীকরে মুছে দেয়া যায় অনন্যাদের দুঃখগুলো..। লেখক ভাবেন, তিনি যদি অনন্যার মনের বন্ধ জানালাগুলো খুলে দিতে পারতেন..। যদি পারতেন অনন্যার আকাশে প্রজাপতির উড়াউড়ি দেখতে..।

জামার পকেটে হাত রেখে অনন্যা হেঁটে চলে ক্যাম্পাসের পিচের রাস্তা ধরে। দূর থেকে লেখক তাকিয়ে দেখেন অনন্যার পথচলা..। লেখকের খুব ইচ্ছা হয়,অনন্যার মাথায় একটু হাত রাখতে..। তপ্ত দুপুরে বরফের শীতলতায় একগ্লাস শরবত এনে দিতে..। ইচ্ছা হয় বলতে, প্রিয় বন্ধু, আমি আছি..। কিন্তু লেখক কখনো বলতে পারেন না। সময় হয়ে উঠে না। সময়ের বড়ো বেশি অভাব আমাদের। এই ব্যস্ত নগরীতে বড়ো বেশি সময়ের খরা…।

তবুও তারা ঠিক করেন , একদিন সন্ধ্যায় তারা একসাথে বেরুবেন। এই ব্যস্ত নগরীর নাগরিক কোলাহল সেদিন তাদের ছুঁয়ে যাবে না। ধুলো-মলিন নিয়নআলোয় দেখা এই শহর তখন রূপকথার শহর হয়ে উঠবে। তৈরী হবে গল্পের পর গল্প। বন্ধুত্ব, ভালোবাসা এবং একটি অমিমাংসিত সম্পর্কের উপাখ্যাণ।

আমি জানি, আমার গল্পের লেখকের খুব প্রিয়জন এই কিশোরী। কিন্তু, পারিপার্শ্বিকতা লেখককে তার প্রিয় একজন মানুষের সাথে স্বাধীন পথ হাঁটার সুযোগ দেয় না। লেখকের ভয় হয়, হয়তো তিনি একদিন হাঁরিয়ে ফেলবেন তার প্রিয় এই বন্ধুকিশোরীকে। এমন অসংখ্য প্রিয়মুখ পেছনে ফেলে এসেছেন আমাদের লেখক। উপেক্ষা করেছেন পিছুটান। কিন্তু, এখন তার খুব ক্লান্ত লাগে। খুব প্রয়োজন হয় বন্ধুর ভালোবাসার।

আমি বিশ্বাসী মানুষ। আমার বিশ্বাস করতে ভালো লাগে, লেখক তার প্রিয়কিশোরী বন্ধু অনন্যাকে নিয়ে তুমুল বৃষ্টিতে ভিজছেন। প্রিয় ক্যাম্পাসের পথজুড়ে ছড়িয়ে আছে ভালোবাসার অজস্র পদচিহ্ন। সময়ের সীমারেখা মুছে গেছে। থেমে গেছে মুহুর্ত। বৃষ্টির জল গড়িয়ে পড়ছে অনন্যাকে ছুয়ে দিয়ে। লেখক তাকিয়ে দেখছেন, সাধারণ মুহুর্তগুলোর অপার্থিব পোট্রেট হয়ে উঠা..।

আমি তখন শুনতে থাকি নেপথ্যে বেজে উঠা জেরেমির বেহালা..। জীবনানন্দ বনলতা সেনের খোঁজে হাজার বছর ধরে পথ হেঁটেছেন। কিন্তু, তিনি কি কখনো খুঁজে দেখেছেন, তার খুব কাছে কোন বনলতা তার কথা ভেবে রাত ভোর করছে কিনা..। অনন্যা তার সব দুঃখ-কষ্ট-না পাওয়ার বেদনাকে সিন্ধুকে আটকে রেখে কোন এক সোনালী বিকেলের অপেক্ষায় থাকছে। আমাদের লেখক তার প্রিয়কিশোরী বন্ধুর জন্য রাজপুত্র এনে দেবেন বলে ভাবেন।

রঙধনু ছড়িয়ে পড়ছে বৃষ্টিভেজা বিকেলের নরোম আলোর আকাশ জুড়ে। পায়ে পায়ে নামছে সন্ধ্যা। রাস্তার আইল্যান্ডে সারি সারি দাঁড়িয়ে থাকা ল্যাম্পপোষ্টে জ্বলে উঠছে সান্ধ্যবাতি। লেখকের সবকিছু মিলেমেশে একাকার হয়ে যায়। সকাল-সন্ধ্যা, ক্যাম্পাস-নগরী, সবকিছু রঙচঙা কাগজের মোড়ক হয়ে উঠে। বাস্তব-অবাস্তব এক হয়ে তৈরী হয় পরাবস্তবতার মেঘ..। অনন্যা হয়ে যায় কিংবদন্তির লাইলি কিংবা শিরির প্রতিরূপ..। লেখক অপেক্ষায় থাকে মজনু কিংবা ফরহাদের আগমনের অপেক্ষায়..।

টিএসসি কিংবা পলাশির ফুটপাতের টঙ দোকানে দাঁড়িয়ে ধোঁয়াউঠা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে ভাবি, আমার গল্পের আদৌ কোন লেখক আছে কি? একদিন লিখবো অনন্যাকে নিয়ে..। সেদিন অনন্যার অন্যরকম একটা ছবি আঁকবো। সে গল্পের অনন্যার অনেক সুখ থাকবে। বুকের ভেতর জমিয়ে রাখা স্বপ্নগুলো সত্য হবে। নিজের ছোট্ট সুন্দর একটা সংসার থাকবে। ছোট্ট একজন রাজপুত্র গুটি গুটি পায়ে হাঁটবে ঘরময়। মা বলে ডাকবে আমাদের অনন্যাকে। রূপকথার গল্পের মতো হবে তাদের সংসার..। আমার ভাবতে ভালো লাগে, অনন্যা ভালো আছে। অনন্যার অপূর্ণতাগুলো সৃষ্টা দূর করে দিয়েছেন। রাতের হাজারো তারাদের সাথে আশীর্বাদ হয়ে ঝড়ছে কুয়াশার নরোম ভালোবাসাময় শুভকামনা…।

সেদিন নিশ্চয় একটা রূপকথা লেখা হবে….। অনন্যাকে নিয়ে লেখা সেই রূপকথা লিখবেন কোন একজন স্বপ্নশীল লেখক। ভালোবাসায় জড়ানো সেই গল্পের শুরুটা হোক আজকে…।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।