আমি একজন চিন্তাশীল মানুষ

(লেখাটি অন্যরকম গ্রুপের একটি ক্রিয়েটিভ প্রজেক্টের জন্য লেখা। এবং, এই লেখাটি আমাকে প্রজেক্টের শর্টলিষ্টে উঠিয়ে তার সামর্থ্য প্রমাণ করেছিলো। 🙁  পড়াশোনা/পরিক্ষার ক্যাচালে ওয়ার্কশপটা করা হলো না। )

চিন্তা, বিচিন্তা, দুশ্চিন্তা কিংবা বিষম চিন্তা যেটাই হোক সেই ছোটবেলা থেকেই মস্তিষ্কের অন্দরে স্বয়ংক্রিয় হয়ে উঠেছিলো এই বোধটি। প্রতিদিন দুটো করে কুকিজ খেতে দিয়ে যখন মা বলতেন অচিনপুরের কোন এক ঈগল পাখির গল্প, যে আমার জন্য দুটো্ করে কুকিজ রেখে যায়, তখন ভাবতাম কোথায় সেই পাখিটির দেশ? কেমন সে দেশের মানুষ? সেখানের শিশুরা কি দুটো কুকিজ খায় নাকি আরো বেশি? আমার ভাবনার রেলগাড়ি তখন থেকেই চলতে শুরু ।

হোস্টেলে বড়ো হবার সুবাদে নিজের চারপাশে রাশি রাশি বইয়ের স্তুপ নিয়ে বেড়ে উঠেছি।বইয়ের পাতায় পাতায় অসংখ্য মানুষ, অসংখ্য জীবন, ফেলে আসা অসংখ্য অতীত আর চলিষ্ঞু বর্তমানের অজস্র চরিত্রের সাথে হাতে হাত রেখে এগিয়ে গিয়েছে আমার চিন্তারা।রবীন্দ্রনাথের ফটিক থেকে শুরু করে শরৎএর শ্রীকান্ত কিংবা হালের টোকন ঠাকুর সবাই আমাকে ভাবায়। সকালের সূর‌্যটা যখন কুয়াশায় মুখ ঢেকে উঁকি দেয়, তখনও আমি ভাবি।

বরিশাল বিএম কলেজের জনশূন্য রাস্তায় নির্জন কোন দুপুরে জীবনানন্দের হেঁটে চলার পথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভাবি, যেদিন ট্রাম দুর্ঘটনায় মারা যান তিনি, কেমন ছিলো সেদিন সন্ধ্যার কোলকাতা? তখন কি তার পকেটে কোন কবিতার খাতা ছিলো? ছিলো কি তাতে কোন অসম্পূর্ণ কবিতার পংক্তি? কিংবা অজানা কোন বনলতা সেন কিংবা অন্য কারো জন্য লাল গোলাপ অথবা সজীব স্বপ্ন? জানা হয় নি আজও আমার। তাই, ভাবনার লালবাগ কেল্লার ক্ষয়ে পড়া লাল দালান কিংবা নাজিমউদ্দিন রোডের উঁচু দেয়ালের জেলখানা রোডে পথ চলি আর ভাবি, ৪০০ বছর আগের এই প্রাত্যহিক শহর কেমন ছিলো।

বাংলা একাডেমীর সামনের ফুটপাথের বেঞ্চিতে বসে ভাবি, এই পথ দিয়ে অসংখ্য মানুষ হেঁটে গেছে বছরের পর বছল ধরে। পথের পিচে জমতে থেকেছে ক্রমশ অসংখ্য মানুষের ছাঁয়া..। ছাঁয়ার পরে ছাঁয়ারা জমে জমে ক্রমেই বাড়তে থেকেছে সময়ের দায়। শীতের সকালে ধোঁয়া উঠা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে ভাবি, সুন্দর আসলে কোনটা? এই কুয়াশাভেজা শীতের সকাল, গরম চায়ের কাপ, এই জীবন নাকি আমার বেঁচে থাকা? সারাদিন ঘামঝড়িয়ে পাশের বাসার রিকশাওয়ালা করিম ভাই যখন তার ছোট্ট বাচ্চার জন্য গামছায় জড়িয়ে দুটো কমলা নিয়ে এসে ঘুমন্ত সায়েমকে খাইয়ে দিন, তখনও আমি ভাবি। বুঝতে পারি না কোত্থেকে আসে এই দরদ এই ভালোবাসার অসীম প্রসবণ।

আমি সৃষ্টিশীল মানুষ নই। হয়তো সেকারণেই আমার ভাবনার পিঠে ভাবনা জমে উঠে না। ভাবনার হাত ধরে সৃষ্টি হয়না নতুন ভাবনার দল। ছোট ছোট আইডিয়ার পাজল মিলিয়ে আমার মাথায় জন্ম নেয় না কোন পরিপূর্ণ ভাবনার প্লট। তবুও আমি ভাবতে ভালোবাসি। দেখতে ভালোবাসি আমার প্রতিদিনের চারপাশ। লোকাল বাসের হাতলে ঝুলতে ঝুলতে আমি ভাবি। কোন গ্রীষ্মের রাতে নিউ মার্কেট কিংবা পলাশীর মোড়ে হাতে ঝালমুড়ির ঠোঙা নিয়ে ভাবতে আমার ভালো লাগে। সাঁই সাঁই ছুটে চলা বাসের জানালা দিয়ে ল্যান্ডস্ক্যাপের দ্রুত সরে সরে যেতে থাকা দেখতে আমার ভালো লাগে। ট্রেনের হুইসেল আমার ভেতরে ভাবনার মেঘ তৈরী করে। আমি ভাবতেই থাকি ।

আমার ভাবনার শেষ হয় না। চারপাশের খুব সাধারণ অসংখ্য অনুষঙ্গে জড়িয়ে থাকা জীবনের বিস্তৃতি দেখতে আমার ভালো লাগে। আমি সবকিছু খুব খুটিয়ে খুটিয়ে দেখি।খোলা মাঠে শুয়ে আকাশে মেঘেদের চলাফেরা দেখতে আমার ভালো লাগে। চিন্তা করতে থাকি কতো সহস্র বছর ধরে এই আকাশ পরম বিশ্বস্ততায় ছাঁয়া দিয়ে যাচ্ছে আমাদের। এতো নির্ভরতা কোত্থেকে পায় আকাশ। সেন্টমার্টিনে সাগরতলার পৃথিবী দেখতে দেখতে ভাবি, পৃথিবী কতো অসংখ্য রঙ আর রকমে ছড়িয়ে আছে আমাদের চারপাশ জুড়ে।নীলগিরিতে দাঁড়িয়ে মেঘেদের নাকে মুখে চোখে কিংবা পকেটে ঢুকে পড়া দেখি।

ভাবি,ভাবনার শেষ আছে কি কোথাও? ছোটবেলায় সিনেমার হিরো, স্যুপারম্যান,বেন টেন কিংবা অসমসাহসী সিন্দাবাদ হতে চায় নি,এমন কাউকে পাওয়া যাবে না,একথা প্রায় নিশ্চিতভাবেই বলা চলে।শৈশব-কৈশোরে পরিচিত হওয়া বই-পত্র, সিনেমা কিংবা আমাদের প্রতিদিনের জীবনে থেকে উঠে আসা কিছু চরিত্র, অহর্ণীশ আমাদের হৃদয়ের অতলান্তিক গভীরতায় সযতনে আটকে থাকা আরশিতে ছাপ ফেলে যায়। নিজের অজান্তেই আমরা পথ চলি সেইসব প্রিয় চরিত্রগুলো সাথে। আমার ভাবনার জগতের অপরিহার্ সদস্য হয়ে উঠা এই চরিত্রগুলো আমাদের মনোজগতকে আলোড়িত করে। চরিত্রগুলো আমরা তুলে রাখি মনের গোপন বাকসে।ব্যস্ত এই ধাবমান সময়ে নিজেকে সময় দেয়ার মতো সময়ও যখন আমাদের থাকে না, তখন এই চরিত্রগুলো মনের রঙিন বাকসো থেকে বেরিয়ে আসে।

পরম মমতায় হাত রাখে আমাদের হাতে।অবিরাম পথ চলার ক্লান্তি মুছে দেয়। আমরা আবার পথে নামি..।আবারো ভাবি..। আমার খুব মনে আছে নিশ্চিন্দিপুরের সেই অবাক চোখের কিশোর, নিস্পাপ পল্লীবালক অপুর কথা।পথের পাঁচালীর দুর্গার বোন অপুকে কথা আমার সবসময়ই মনে পড়ে।আমি এই শতকের মানুষ। ওই আস্তাবলের মাথার উপরে যে আকাশটা ওরই ওপারে পূবদিকে বহুদূরে তাহাদের সেই ছোট্টগ্রাম নিশ্চিন্দিপুর আমি দেখি নি কখনো। দেখি নি, শাখারীপুকুর, ঘোঁষদের বাঁশতলা,দিগন্তুছোঁয়া সোনাডাঙ্গার মাঠ। দেখি নি, বর্ষার ঢল নামা ইছামতি আর জলমগ্ন শিমুলতলা। কিন্তু আমি চিলাম সেখানে। অপুর অবাক চোখ দিয়ে দেখেছি ঝোঁপেঝাড়ে ফোঁটা নাটাকাটা-বনকলমির ফুল। দেখেছি নীল অপরাজিতায় ছাওয়া, বনের ধারের মায়াময় অসংখ্য বিকেল।অপু আমাকে দেখতে শিখিয়েছিলো পৃথিবীকে। অপু আমাকে শুনিয়েছিলো অন্য এক জীবনের গল্প। যে জীবন ফড়িংয়ের দোয়েলের..সর্বোপরি একজন মানুষের। যে জানে বেঁচে থাকার মুহুর্তগুলো কীভাবে সজীব রাখতে হয়।যে গল্প একান্তই মানুষের।রেলের থার্ডক্লাস বগির বাদুরঝোলা লোকটা কিংবা গ্রামের পথে ছিন্ন পোশাকপড়া উস্কুখুস্কু চুলের মেয়েটাও যে ভাবনার বিষয় হতে পারে, গভীরভাবে সিক্ত করতে পারে হৃদয়কে, আমি এটা শিখেছিলাম অপুর কাছে। এই বন তার শ্যামলতা নবীন স্পর্শটুকু তাহার আর তাহার দিদির মনে বুলাইয়া দিয়াছিলো। বোনাফল কিংবা বৈচির রস আমি কখনো আস্বাদন করি নি। প্রবল ঝড়ের রাতে জিরজিরে চালের ভাঙাফাঁকা দিয়ে জল ঝরে নি কখনো আমার গায়ে। আমার শৈশব কৈশোরে ছিলো না কোন আতুড়ি বুড়ি কিংবা ইন্দিরা ঠাকরুন।এই ইট-কাঠ-পাথেরর নাগরিক প্রাত্যহিকতায় কোন প্রান নেই। তবুও শৈশবের-কৈশোরের নিশ্চিন্দিপুর আমার সাথেই তাকে। পরম যত্নে হাত রাখে আমার হাতে। আমি পথ হাঁটি যান্ত্রিক এই নগরীতে, অবাক চোখের সেই অপুর সাথে..। পথ হাঁটি আর ভাবি।

হুমায়ূন আহদের শুভ্র চরিত্রটি আমাকে ভাবায়। কিন্তু, আমি আমার চারপাশে প্রায়ই দেখি শুভ্রকে। একটা সাদা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার পাশে। মোটা ফ্রেমের চশমা পড়া শুভ্র দাঁড়িয়ে ভিজছে তুমুল জ্যোৎস্নায়..। চারদিক সরে যাচ্ছে অতিদ্রুত ধাবমানতায়। শুধু শুভ্র আর সাদা গাড়ি আছে..। আর আছে আমার বর্ণহীন বর্তমান.. আরো অসংখ্য চরিত্র আমার শৈশব-কৈশোরের প্রতিটি মুহুর্তকে সঙ্গ দিয়েছে। এখনো সঙ্গ দিচ্ছে ভাবনার জগতে। এরা আমাকে শিখিয়েছে ভালো থাকতে। শিখিয়েছে নিজের ভেতরে উঁকি দিয়ে নিজেকে দেখে নিতে। শিখিয়েছে সাধারণের মাঝে অসাধরণকে খুঁজে বের করতে। নজরুলের লিচুচোর, রোমেনা আফাজের দস্যু বনহুর,গ্রেগরি পেকের দুর্দান্ত অভিনয়, প্রেমেন্দ্র মিত্রের ঘনাদা, শরৎচন্দ্রের মেজদা, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের টেনিদা, সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা, শির্শেন্দুর দূরবীনের ধ্রুব, কালবেলার মাধবীলতা, লালসালুর মজিদ,সংসপ্তকের রমজান, আঙ্কল টম, অলিবার টুইষ্ট, হ্যারি পটার, সিডনী স্যালডনের ,টিনটিনের ,এনিড ব্লাইটন, আ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড, শার্লক হোমস সহ অসংখ্য প্রিয় চরিত্র আমার শৈশব-কৈশোরকে বুঁদ করে রেখেছিল।কৈশোরের প্রেম ছিনতাই করা সেইসব চরিত্রগুলো আজও  পথ হাঁটতে বন্ধুর মতো আমার সঙ্গী হয়।

এই যান্ত্রিক সময়ের আমার চারপাশ জুড়ে তৈরী করে দেয় প্রান্তমুক্ত বন্ধনহীন এক মুক্ত জগতের। যে জগতের কোন কালিক পরিধি নেই। বহুলৌকিক আলোকময় সুষম শান্তিময়তায় নির্মিত সে জগতে নিরাপদ আমি।ছুটে চলার ক্লান্তি আমায় স্পর্শ করে না সেখানে। সেখানে শুধুই ভালোথাকার গল্প তৈরী হয়..।

ভাবনার অসংখ্য অনুষঙ্গের খামে সারাদিন আটকে থাকে আমার বেহিসেবী মন। জানি, এই কর্পোরেট সময়ে আমার এইসব ছাইপাশ ভাবনা কোন জায়গা নেই। তবুও আমি ভাবতে ভালোবাসি। আমি দেখতে ভালোবাসি আমার চারপাশ একান্ত আমার মতো করে। কারণ, আমি একজন চিন্তাশীল মানুষ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।