শম্পা ও মৌসুমীকে নিয়ে আমাদের প্রেম অতঃপর…

শম্পা ও মৌসুমীদের বাড়ি তখন আমাদের প্রাইমারী ইশকুলের কাছেই। সাজানো গোছানো পরিপাটি উঠোনের একপাশে ছোটমতো বাগান। কাঠের নকশাকাঁটা টিনের বেড়া আর চৌচালা ঘর, সাথে শানবাধানো পুকুর। স্বচ্ছলতার ছাপ চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। শম্পা আর মৌসুমী পড়তো আমাদের সাথেই। একই ইশকুলে। দুইবোনের মধ্যে শম্পা ছোট আর মৌসুমী বড়ো। ওদের ছোটবেলা কেটেছে ঢাকার কোথাও। তাই, ওদের পোশাক-আশাক, কথা-বার্তা, চালচলন আমাদের কাছে দ্রষ্টব্য বস্তু। যতোটুুকু মনে পড়ে, দেখতে খুবই সুন্দর ছিলো। হয়তো পোশাকী ঠাঁটবাটের চকমকে জেল্লার কারণেই দেখতে সুন্দর মনে হতো।

সবার সাথে মিশতো না ওরা। কথাও বলতো না সবার সাথে। সবাই চাইতো, আজকে যেনো কথায় হয়। ভাঙা টিনের চাল আর জানালার কাঁচহীন কপাটের বদৌলতে আমাদের ইশকুলের চেহারা হয়েছিলো ভগ্নদশা ঐতিহাসিক স্থাপনার মতো। আমরা বিদ্যান পন্ডিতেরা, স্যার আর ম্যাডামের ঘুমানোর ফাঁকে সেই ঐতিহাসিক ইশকুলঘরে দুনিয়ার সব জ্ঞান-বিজ্ঞান আহরণ করতাম। অবশ্যই সেগুলো পাঠ্যবিষয়ে হতো না। নোংরা বারান্দা আর স্যাঁতসেতে দেয়ালের ইশকুলে দেখবার মতো কিংবা অবাক হওয়ার মতো কিছুই ছিলো না। যখন শম্পারা আসলো , তখন আমরা সবাই ওদের নিয়ে পড়লাম। ইশকুলের দেয়ালে “শম্পা + ওমুক” কিংবা বাথরুমের দেয়ালে “মৌসুমী আমি তোমাকে…..করতে চাই”, এইসব বাণী অঙ্কিত থাকতে দেখেছি। এইসব ডটডটের অর্থ অবশ্য অনেক পড়ে বুঝেছিলাম।

সৌভাগ্যবশত আমার সাথে কিছুটা ঘনিষ্ঠতা ছিলো শম্পার। সেকারণে শম্পার স্বঘোষিত প্রেমিকদের কাছে খুব পাত্তা পেতাম। ভুলভাল বাক্য আর শব্দে ভরা চিঠি পৌঁছে দিতাম শম্পার কাছে। এই ক্ষমতা ব্যবহার করে অবশ্য সবার চিঠিই পড়া হয়ে যেতো। কারো চিঠিতে থাকতো গোলাপের পাঁপড়ি। কেউ পাঠাতো নতুন কড়কড়ে নোট। কেউ আবার দিতো, খুব-চলা কোন সিনেমার ভিসিডি ক্যাসেট।

মৌসুমী বয়সে বড়ো হবার কারণে ওর কাছে যেতাম না তেমন। তবে, আঁচ করতে পারতাম, বয়সের সাথে সাথে আমার  ভাবনার ধরণটা বোধহয় পাল্টে যাচ্ছিলো। মৌসুমীর চোখের দিকে তাকালে কেমন লজ্জা লাগতো। মাথা নীচু করে কথা বলতাম। এইসব কিছুই তখন দুর্বোধ্য ঠেকতো। এখন বুঝতে পারি..।

ইশকুলের শেষের দিকে মৌসুমীকে নিয়ে এক স্যারকে জড়িয়ে বিচ্ছিরি এক ঝামেলার সৃষ্টি হয়। সেই ঝামেলার ঝাঁজ এসে পড়ে শম্পার উপরেও। ইশকুল ছেড়ে চলে যায় ওরা। আমাদের নানাজনের গোপনে দেয়া উপহারগুলোর সাথে সাথে, আমাদের কৈশোরের প্রেমও সাথে করে নিয়ে, কোন এক গ্রীষ্মের ভরদুপুরে ওরা দু’বোন চলে যায়। আমি আমার বয়সের তুলনায় বুঝতাম কম। বন্ধু কিংবা সঙ্গ ছিলো না বলেই হয়তো বুঝতে পারতাম না এই প্রেম কিংবা আকর্ষণের ব্যাপারগুলো। হয়তো মনের কোন অজানা অন্দরে আমিও চাইতাম ওদের কাছে গুরুত্ব পেতে। কে জানে…।

তারপর থেকে আমাদের ইশকুল আবার একঘেয়ে নিরানন্দ রুটিনে চলতে থাকলো। গ্রীষ্ম শেষে বর্ষা আসলো। আমরা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখতাম। গত বর্ষায় শম্পা আর মৌসুমীর সাথে অনেকদিন নৌকায় চড়া হয়েছিলো। এবার ওরা নেই। ইশকুলের পাশের কড়ই গাছটায় বাঁধা আমজাদ চাচার নৌকাটা এখন আর কেউ ব্যবহার করে না। ভালোবাসা কিংবা প্রেম থাকুক বা না থাকুক, ওরা তবুও ছিলো আমাদের কেউ, এই বোধ আমার মধ্যে অদ্ভূত বিষণ্নতা তৈরী করে। শম্পার বসার জায়গাটাতে এখনও কেউ বসে না। রবিউলের চিঠির খাতাটা পড়ে থাকে ব্যাগের এককোণে..।

তারপর পেরিয়েছে অনেক সময়। জীবন-জীবিকার তাগিদ আমাকে শেকড় থেকে নিয়ে এসেছে বহুদূরে। শম্পা আর মৌসুমী এখন কোথায় আছে জানি না। ওরা কি সেই আগের মতো সুন্দর আছে দেখতে? ওদের জীবনে কি সত্যিকারের ভালোবাসার কোন প্রিন্স চার্মিং এসেছে? হয়তো..। তবুও আজকে এই সন্ধ্যায় যখন ওদের কথা মনে পড়লো, তখন মন থেকে চাইলাম, ভালো থাকুক আমাদের সবার কৈশোরের অনুবাদ-অক্ষম ভালোবাসার শম্পা ও মৌসুমীরা..।

======================

## Photo Credit: Pickycovers

    1. ঝামেলাতো এইখানেই। লিখতে ইচ্ছা করে। তাই লিখি। অন্যরা ভাবে, ছেলেটা এমন!!!! 🙂
      তাতে আর কী আসে যায়! আমি লিখতে চাই। লিখবো। আমার মতো করে। ব্যস! নাকি? =D

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।