আমি গিট্টুর ভাই ‘বলা’ বলছি!

চিটাগাং থেকে বাবার পোষ্টিং তখন ঢাকার সদরঘাট ফায়ার সার্ভিসে। কোয়ার্টার ছেড়ে দিয়ে আমরা উঠেছি নিজেদের গ্রামের বাড়িতে। মুন্সীগঞ্জের গজারিয়াতে। শৈশবের প্রথম থেকেই আমি বেড়ে উঠেছি শহুরে পরিবেশে। গ্রামের আবহাওয়া, মানুষজন, মাটির নিকানো উঠোন, গরু-মুরগীর হাঁকডাক ইত্যাদিতে তখনো অভ্যস্ত হতে পারি নি। এমনিতেও অবশ্য বুদ্ধিশুদ্ধি কিছুটা কমই আমার। সেকারণেই বোধকরি, সবার কথা ঠিকমতো বুঝতে সময় লেগে যেতো। খেলতে শিখি নি কিছুই। পারি না কোন গ্রামীন অথবা শহুরে খেলা। শুধু আমার প্রিয় তিন চাকার রিকশা গাড়ি চালাতে জানি। আর জানি, কেউ বকলে চুপচাপ তাকিয়ে থাকতে।

আমার প্রায় সমবয়সী এক চাচাতো ভাই ছিলো আমার কিছুটা সহযোগী। আসলে, ও আমাকে সাথে নিতো বলেই আমি কিছুটা সুযোগ পেতাম গ্রামকে খুব কাছ থেকে দেখার। নানান মানুষ আর নানান পরিবেশের ঘ্রাণ নেয়ার। বয়সের ‍তুলনায় খাটো ছিলো বলে সবাই ওকে গিট্টু বলে ডাকতো। শহরে যাদের সাথে মিশেছি আগে, সেখানে তখনও এই ধরণের ‘কিতাবী’ নাম দেয়ার প্রবণতা গড়ে উঠে নি। আমিও তখন ওকে না বুঝেই গিট্টু বলে ডাকতাম। ওর খুব রাগও হতো তখন।

প্রতিদিন বিকালে আমাদের বাড়ির বড়ো উঠোনে খেলার আসর জমতো। মৌসুমী সব খেলার আয়োজন। অন্যপাড়া থেকে ছেলে-মেয়েরা আসতো। উঠোনে পানি ছিটিয়ে ঝাঁট দিয়ে পরিষ্কার করে রাখতেন আমার মা-চাচীরা। একপাশের শাঁনবাধানো পাকাপিড়ায় (গ্রামের ঘরের বাইরের চারপাশের বাড়তি অংশ ) বড়োরা বসতেন। সবাই মিলে খুব আনন্দ হতো তখন। তেমনই এক বিকালে কুস্তি খেলা শুরু হলো। আমি খুব আগ্রহ নিয়ে দেখছিলাম। এমন সময় হঠাৎ কে যেনো বললো, আমাকে আর আমার চাচাতো ভাইকে নিয়ে খেলা হবে। আমিতো অবাক! বিস্ময়ে ভয়ের অনুভূতিও কাজ করছিলো না। সবাই বলাবলি করছিলো। কেউ একজন আমাকে ধাক্কা দিয়ে মাঠে নামিয়ে দিলো। আমি তখন ভেবেই পাচ্ছিলাম না, কী করবো! একটু পর চাচাতো ভাইও নামলো। শুরু হলো বিশ্বের অন্যতম শ্বাসরুদ্ধকর কুস্তি খেলা। রুস্তম আর সোহরাবের জঙ্গ! একতরফা মার খাচ্ছিলো ইতিহাসের সেরা সেই কুস্তিযুদ্ধের একজন বীর পুরুষ। পারস্যের নামজাদা রাজন্যবর্গের পরিবর্তে এখানের দর্শক আমাদের পাড়ার ছেলে-মেয়ে এবং মুরুব্বিরা।

আমার পড়নের সাদা টি-শার্ট কাঁদা-মাটিতে একাকার। চাচাতো ভাই আমার উপর বসে, কষে চেপে ধরে আছে আমাকে। আমি শ্বাস নিতে পারছি না। ছুটতে চাইছি প্রাণপণ। বিভিন্নজন বিভিন্ন রকম পরামর্শ দিচ্ছে। এটা করো ওটা করো..। আমি তখন কিছুই শুনতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিলো, সত্যিই আজকে আমার শেষ দিন।  এমন সময় খেলা শেষ করে উঠে দাঁড়ালো গিট্টু ভাই। আমি পড়ে আছি মাটিতে। হাঁপাচ্ছি। ছোটরা মিছিলের মতো করে কানের কাছে বলছে, “হারিলো রে হারিলো…‘বলা’ মিয়া হারিলো..”। আমার নাম রেখে কেনো আমাকে ওরা ‘বলা’ বলছিলো, কিংবা ‘বলা’ শব্দের অর্থই বা কি, জানতাম না আমি। খেলায় কোন রকমের সাফল্যছাড়া বিনা কৌশলে হেরেছি এবং কারো পরামর্শ বুঝতে পারি নি, এইসব দেখে সবাই সেদিন নিশ্চিত হয়েছিলো, আমার কোন বুদ্ধিজ্ঞান নেই। এরকম মানুষকে আমাদের গ্রামে ‘বলা’ বলে ডাকা হতো। ‘বলা’র পদমর্যাদা ‘রামছাগল’ এর চেয়ে নীচে!

সেদিন বিকালের পর থেকে আমি হয়ে গেলাম ‘বলা’ । যাদের সাথে থাকতাম, সবাই আমার নামের পরিবর্তে আমাকে ‘বলা’ বলে ডাকতে শুরু করলো। আমার খুব খারাপ লাগতো। মনে হতো, আমি বুঝতে পারি না কিছু, আমি বোকা। এটার জন্য কি আমি দায়ী? যিনি সমম্ত জ্ঞানের মালিক, তিনি কেনো আমাকে জ্ঞান দেন নি..। আমার খারাপ-লাগা দেখে গিট্টু ভাই একদিন বুঝিয়ে বললো। কেউ ‘বলা’ নামে ডাকলে সাড়া দিতে না। খেপতে না। তাহলেই সবাই ডাকা বন্ধ করে দেবে। আমিও তেমনই করা শুরু করলাম। আস্তে আস্তে ‘বলা’ নামটা মুছে গেলো আমার বাড়ির ইতিহাস থেকে। কিন্তু, আমার ভেতরের সেই বুদ্ধিসুদ্ধিহীন কিশোরের কি আদৌ বুদ্ধি হয়েছে কখনো! কিংবা, সেই বহুকাল আগের সেই ‘বলা’র কখনো বুদ্ধি হবে!

আমার গিট্টু ভাই এখন উচ্চতায় আমার প্রায় সমান। পড়াশোনায় অমনোযোগী সেই চাচাতো ভাই এখন রীতিমতো সফল উদ্দ্যোক্তা। কয়েকজন বন্ধু মিলে একটি বেশ বড়ো ইলেক্ট্রনিক্স এর দোকান চালায়। আমি সেদিনের ‘বলা’ এখন এই জাদুর শহরে বাস করি। সাঁইসাঁই ছুটে চলা সময়ের সাথে আমার স্বল্পগতির বুদ্ধি নিয়ে চলতে হিমশিম খাই প্রতিমুহুর্তে।

এই শহর, এই গতিশীল সময়,  বুদ্ধিভিত্তিক উৎকর্ষতার। এই সময়ে ‘বলা’রা বড়ো বেশি অসহায়। ব্যাকডেটেড। বাতিল মাল। হয়তো সেকারণেই এই শহরের সবখানে আমি বড্ডো বেশি বেমানান। চারদিকের এই দ্রুততা আমার ভেতরের ‘বলা’র নির্মল আনন্দে বেঁচে থাকার ক্ষমতা কেড়ে নিচ্ছে ক্রমশঃ। নিজের একান্ত সম্পদ – আমার সজীবতা – প্রতিনিয়ত হারাচ্ছে তার উজ্জ্বল্য। নাগরিক সময়ের ‘বলা’রা এখন ছুটছে..। বেঁচে থাকার রেস, যান্ত্রিক জীবনের কাটখোট্টা ট্র্যাকে টিকে থাকার অসম যুদ্ধে হারিয়ে ফেলছে অপার্থিব অর্কেষ্ট্রার সুর..। ‘বলা’রা এই প্রাণহীন জীবনকে কেবল টেনে নিয়ে চলেছে..। অজানা সময়ের প্যান্ডেলে বসা চকচকে কোন অপেরার দিকে..। তবুও আশা রাখি..। তবুও অপেক্ষায় থাকি কোন তীরে জাগা প্লাবনের..। তবুও থাকি লাবণ্যময় কোন সময়ের অনিঃশেষ অপেক্ষায়..

===================

# Photo Credit: Michelle Sheppard

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।