একজন ছেলেধরার সাথে হারিয়ে-যাওয়া-আমার একটি বিকেল

আমরা তখন মুন্সিগঞ্জ জেলা সদরের উকিলপাড়া নামক এলাকাতে থাকি। মা, আমি আর ছোটখালা। ভিটেপাকা টিনের দুটি ঘর মিলে একটি বাড়ি। একঘরে আমরা। অন্যটাতে থাকতো আসলাম ভাইয়েরা। আসলাম ভাইদের সাথে পরিচয় এই বাড়িতে আসার পর। আমরা চিটাগাং ছেড়ে চলে এসেছি সবে কিছুদিন হয়েছে। এখানের কিছুই চিনি না। চারদিকে ছেলেধরার খুব উপদ্রব চলছে..। সেকারণে বাড়ির ৬ হাত বাই ২ হাত উঠোন আর ২টি ঘরের চৌহদ্দির বাইরে বের হওয়া নিষেধ আমার। ততদিনে নিজের কল্পনার জগত তৈরী হয়ে গেছে আমার। একা একা কথা বলি..। একা একা খেলি..। মা বাড়িতে সবসময় থাকেন না। খালার সাথে বাসার কাছেই ষ্টেনো টাইপ শিখতে যান।

আমি আর আসলাম ভাই প্রতিদিন সকালে ব্রাশ নিয়ে ঘুরতে বের হতাম। কিছুদূরে একটি সুন্দর পুকুর ছিলো। শানবাঁধানো। সেখানের রাস্তা ধরে হাঁটতাম। আমার খুব প্রিয় ছিলো ভোরের ওই সময়টুকু। আমার শৈশবের তখনকার দিনগুলোতে আসলাম ভাই ছিলেন আমার বন্ধুর মতো। বন্ধুত্ব ব্যাপারটা অবশ্য তখনও বুঝি না। তবে, এতোটুকু বুঝতাম, তিনি খুব আপন ছিলেন।

মাঝে মাঝে আমরা বিকেলেও বের হতাম। এদিক সেদিক ঘুরতাম। তেমনই একদিন আমি আর আসলাম ভাই বেরিয়েছি। বাজারের দিকে যাবো। আমার পড়নে ছিলো হালকা খয়েরী কালারের ২ পকেটের শার্ট। শার্টটা আমার ভীষণ প্রিয় ছিলো। আমরা হাঁটছি। বরাবরের মতো আসলাম ভাইয়ের হাত ধরে আছি। আগে কখনো বাজারে আসি নি আমি। চারদিকে এতো মানুষ, নানা জিনিসের বিকিকিনি, হাক-ডাক অবাক চোখে দেখছিলাম। আসলাম ভাই’র এক বন্ধুর সাথে দেখা হয়ে গেলো আমাদের। ভাইয়া তার বন্ধুর সাথে কথা বলতে শুরু করলেন। আমি হাত ছেড়ে দিয়ে এদিক ওদিক দেখছি। কিছুদূরে একটা দোকানের নির্মাণ কাজ চলছিলো। শ্রমিকরা ইট-বালি-সিমেন্ট মেশাচ্ছে। আমি দেখছি কীভাবে কী করছে..। তন্ময় হয়ে তাকিয়ে আছি। এর মাঝে কখন যে আসলাম ভাই চলে গিয়েছেন, আমি বলতেই পারবো না। আমার যখন দেখা শেষ হয়েছে, ঘুরে দেখি ভাইয়া নেই! আমি ভীষণ অবাক হয়ে গেছি। ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছিলো। প্রথমেই মনে হয়েছে, আমি আর কখনো আমার পরিবারের কাছে ফিরতে পারবো না..। আমি হারিয়ে গেছি মানুষের ভিড়ে..। খুব কান্না করতে শুরু করলাম..। একদিকে হাঁটতে থাকছি আর কাঁদছি…।

বেশ বড়ো একটা রিকশাষ্ট্যান্ডের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। বেশ কয়েকজন রিকশাচালক বসে আড্ডা দিচ্ছিলো তখন। অলস বিকেল। তাদের মধ্য থেকে একজন জানতে চাইলো, কী হয়েছে আমার, কাঁদছি কেনো..। আমি বললাম, আমি হারিয়ে গেছি। তখন অন্যরা সেই রিকশাচালককে বললো, আরে বাদ দে..। এইসব পোলাপানরে সাহায্য করতে গেলে নিজেই বিপদে পড়বি। পুলিশ ধরবো। উনি বললেন, আরে ধরলে ধরুক। এইটুইক্যা পোলা..। কই যাইবো, কী করবো..ক..দেহি..। তখন অন্যরা বললো, তোর যা খুশি কর। আমরা নাই এর মইধ্যে। উনি তখন বললেন, আমার রিকশাটা গ্যারেজে দিয়া আহিস..। আমি আইতাছি..।

উনার মাথায় লাল রঙের গামছা বাঁধা ছিলো। পড়নে সম্ভবত ময়লাটে,  সাদা কালোর পুরোনো চেকশার্ট। উনার হাত ধরে আমি হাঁটতে শুরু করলাম। যে পুকুরপাড় ধরে সকাল বেলা আমি আর আসলাম ভাই রোজ হাঁটতাম, তার আশেপাশের কোথাও দিয়ে হাঁটছি। চেনা মনে হলেও চিনতে পারছি না। আর নিজের বাসার ঠিকানাও জানি না। শুধু ওই পুকুড়পাড়ের বর্ণনা মাথায় ছিলো। সেটা শুনেই সেই রিকশাচালক মামা আমাকে ওই এলাকাতে নিয়ে এসেছেন। হিন্দুধর্মাবলম্বিদের বসবাস এদিকে। তারপরও মামা একেরপর এক দরজায় নক করছিলো। দরজা খুললে জানতে চাইছিলো, এটা কি আপনাদের ছেলে…। এভাবে দারজার পর দরজা, বাড়ির পর বাড়ি পাড় হচ্ছি। আমি আমার বাসা খুঁজে পাচ্ছি না। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। মামা আমাকে এইকথা সেইকথা বলে সান্তনা দেয়ার চেষ্টা করছেন। আমরা হাঁটছি…। হঠাৎ আমার মাথায় উকিলপাড়া শব্দটি ফ্লাশ করে গেলো। মায়ের কাছে কখনো শুনে থাকবো হয়তো। মামাকে বললাম। মামা আমাকে নিয়ে উকিলপাড়ায় আসলেন। এখানের সবকিছুই চেনা লাগছিলো।

এমন সময় দূর থেকে দেখলাম, আমাদের বাড়ির লাল টিনের গেট! আনন্দে আমার কেমন লেগেছিলো, সেটা আজও বলে বুঝাতে পারবো না। বাসায় ঢুকে দেখি, সবাই বসে গল্প করছে। আসলাম ভাই ফিরে নি। কেউ জানে না কিছু। তখন মোবাইল কারো হাতে দেখেছি কিনা, মনে পড়ে না। হয়তো সেকারণে তখনও আমার হারিয়ে যাওয়ার খবর কেউ পায় নি। আমাকে একা অপরিচিত একজন লোকের সাথে ফিরতে দেখে সবাই অবাক হয়ে জানতে চাইলো, একা কীভাবে আসলাম! এই লোক কে! আমি হাউমাউ করে কেঁদে বললাম, আমি হারিয়ে গেছিলাম। রিকশামামা আমাকে খুঁজে এনেছেন। তখন সবাই ব্যস্ত হয়ে গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা রিকশাচালককে খুঁজতে গিয়ে দেখে, কেউ নেই সেখানে। চলে গিয়েছেন। ঘেমে নেয়ে ক্লান্ত সেই মানুষটিকে কেউ সেদিন বাড়ির ভেতরেও আসতে বলে নি। একগ্লাস ঠান্ডা জলও সেদিন কেউ তাকে দেয় নি।

আমি সেই মানুষটার চেহারা আজ আর মনে করতে পারি না। জানি না, কোথায় আছে..। আমার হঠাৎ হারিয়ে ফেলা জীবনটাকে তিনি পরম যত্নে খুঁজে দিয়েছিলেন সেদিন। এই যে আমি আজকে আমার নিজের ব্লগে লিখছি অফিসে বসে, হারিয়ে গেলে আজকের সময়টা হয়তো অন্যরকম হতো। আমার কোন পরিচয় থাকতো না। ঝরে পড়া তারাদের মতো হারিয়ে যেতাম নাম-পরিচয়হীন হাজারো মানুষের ভিড়ে। এখন আমি ভালো আছি। আরো ভালো থাকার চেষ্টায় অবিরাম খেটে মরি। কিন্তু, আমার জীবন ফিরিয়ে দেয়া সেই মানুষটাকে আর খুঁজে পাই না। জীবন বড়ো অদ্ভূত! ইদানিং সব উপকারের প্রতিদান দিতে হয় আমাদের। কিন্তু, সেই মানুষটি মুখ খুলে সেদিন একগ্লাস পানিও খেতে চান নি। মানুষ কি সত্যিই মহান হতে পারে! হয়তো রিকশামামার কাছে সেদিনের ঘটনটা খুব সহজ এবং সাধারণ ছিলো। অথচ, সেদিনটি ছিলো আমার পূনর্জন্মের দিন..।

আমরা মুন্সিগঞ্জ উকিলপাড়া ছেড়ে এসেছি অনেকদিন হলো। আমি এখন এই জাদুর শহর ঢাকাতে থাকি। চিলেকোঠার ঘরে আমার ছোট্ট সংসার..। হাজারো মানুষের ভিড়ে ক্লান্ত এই শহরে আমি ঘুরে ঘুরে সুখ ধরি..। রঙবেরঙয়ের সুখ..। সেদিনের সেই রিকশামামার কথা আমি কখনো ভুলি না। খুঁজে ফিরি অবচেতন মনে..। জানি, কখনো শেষ হবার নয় এই অন্বেষণ। তবুও খুঁজি..। প্রার্থণা করি, যেখানেই হোক, ভালো থাকুক আমার রিকশামামা..। আমার মনে হয়, সেদিনের রিকশামামাকে পেলেই আমার ঘরপালানো শৈশব ফিরবে আবার। আমি আবারো শহর দেখতে বের হবো রোজ সকালে..। আবার শুরু হবে আমার সুখে থাকার দিন…। আবার…।

————————————
# ছবি কৃতজ্ঞতা: oneparentshort

  1. এখন আমার হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে আপনার ঘটনা পড়ে।
    এই মুহূর্তে যদি আমার নিজস্ব কিছু পরিমাণ টাকা থাকতো তাহলে আমি আপনাকে একটা উপন্যাস লিখতে বাধ্য করতাম।
    তাই ভাগ্য আপনার, আমার পক্ষে আছে বিধায় সে সুযোগটা হয়নি।
    অসাধারণ লিখেছেন…………..
    এই রকম হারিয়ে যাওয়ার আমার একটা গল্প আছে। একদিন লিখবো।

    1. ধন্যবাদ এতো লম্বা মন্তব্যের জন্য। এবং কষ্ট করে লেখাটা পড়ার জন্য। লিখে ফেলো তোমার নিজের গল্পটি। পড়বো। 🙂 কৃতজ্ঞতা। ভালো থেকো।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।