নাস্তার টেবিলের খোঁড়া কাকের জন্য লিখছি

আগ্রাবাদ ফায়ার সার্ভিস স্টাফ কোয়ার্টারের জীর্ণ একটি বিল্ডিংয়ে তখন আমাদের বসবাস। মা বাবা আর আমি। বাবা সারাদিন অফিসে থাকেন। কখনো রাতেও বেরিয়ে যান ‘ফায়ার কলে’। আমার রোজকার নাস্তার টেবিলের সঙ্গী ছিলো তখন একদল কাক। নাস্তার সময় কী করে করে টের পেয়ে যেতো ওরা , সেটা আজও আমার কাছে বিস্ময়ের । আমার খারাপ লাগতো না ওদের উপস্থিতি। নিজের রুটি থেকে, একটি রুটি বরাদ্দ থাকতো কাকদের জন্য। ছোটছোট টুকরো বল বানিয়ে জানালা দিয়ে ছুড়তাম। আমাদের ব্যালকনিতে বসে চেঁচামেচি করে চলতো কাকেদের বল-ক্যাচ-ধরা। নিত্যদিন এই ‘কাকরুটিখেলা’ , আমার আটার রুটি খাবার কষ্টকর রুটিন ভুলে যেতে সাহায্য করতো।

এই একঝাঁক কাকের মধ্যে একটি খোঁড়া কাক আমার নজর কাঁড়ে। একা চলতে অভ্যস্ত ছিলো মনে হয়। দলের বাইরে সবসময় একাই দেখতাম কাকটিকে। সেই কাকটিই বেশিরভাগ রুটির বল লুফে নিতো। ভালো পায়ের অন্যগুলো শুধু চেষ্টাই করে যেতো। মা বলতো, আমার কাকবন্ধু। জানালা থেকে পাশের বাসার আঙ্কেল প্রায় ডেকে বলতেন, আরে! তুমিতো ভালো বন্ধু জুটিয়েছো। তখন কখনো কাকটিকে বন্ধু মনে হয় নি। এখন কি বন্ধু মনে হয়। হয়তো না। কাককে বন্ধু ভাবার মতো সময় কিংবা অবসর আমার ছিলো না। তবে, এইটুকু বুঝেছিলাম, আমার প্রতিদিনের চারপাশের অসংখ্য অনুষঙ্গের মতো এটিও একটি।

ফুফার বিদ্যুৎ বোর্ডে চাকরির সুবাদে আমরা কোয়ার্টার পেলাম যাত্রাবাড়ির বিদ্যুৎ কোয়ার্টারে। বিল্ডিংয়ের নাম ছিলো শাপলা। সুন্দর সাদা রঙ করা। বাসার ভেতর তখনও নতুন রঙের ঝাঁঝালো গন্ধ পাওয়া যায়। চিটাগাং ছেড়ে ঢাকায় চলে আসার পর প্রায়দিন নাস্তার সময় আমার কাকটির কথা মনে পড়তো। মনে মনে কতো ভেবেছি, কোনভাবে যদি কাকটির কাছে খবর পাঠানো যেতো..। তখন টেলিভিশনে মুগলী কার্টুন দেখতাম আমরা কোয়ার্টারের অনেক পিচ্চিরা মিলে। চিন্তা করতাম, ইশ! কোনভাবে যদি মুগলীকে দিয়ে খবর পাঠানো যেতো..। মুগলীতো পশু-পাখির সাথে কথা বলতেই পারে..।

সমস্যার আপাত সমাধান বের করেছিলাম মুগলীকে দিয়ে। কিন্তু, মুগলীকে পাবো কোথায়, এই চিন্তায় মাঝে মাঝে সব জট লেগে যেতো। তারপর, ধীরে ধীরে কেটে গেছে সময়। বেড়েছে ব্যস্ততা। বিস্মিত হবার মতো অসংখ্য বিষয়ের সাথে পরিচিত হচ্ছি প্রতিনিয়ত। কখন যে জীবন থেকে হারিয়ে গিয়েছিলো সেই খোঁড়া কাক, আজ এতোদিন পর এসে তা আর মনে করতে পারি না।

সেই খোঁড়া কাকটি আমার শৈশবের একটি মনে রাখার মতো অধ্যায় ছিলো। মাসের পর মাস কাকেদের সাথে খেলার এই অভ্যাস এমন হয়ে দাঁড়িয়েছিলো, আমি যেখানেই যেতাম, নাস্তার সময় আনমনে সেই খোঁড়া কাকটিকে খুঁজতাম। প্রকৃতি দারুন রকমের ন্যায়বিচারক। কাকটিকে ছোট পা দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছে। কিন্তু, সাথে দিয়ে দিয়েছে অন্যদের চেয়ে সক্ষমতা। হয়তো এভাবেই ভারসাম্য রক্ষা করে চলে আমাদের চারপাশ…।

আজ বহুদিন সকালের নাস্তায় কাকের খোঁজ করি না। মনেও পড়ে না সেইসব দিন। তবুও যখন নিজের কোন জন্মগত অযোগ্যতা খুঁজে পাই। যখন দেখি, অন্যরা বিনাচেষ্টায় সেইসব দিকে আমার চেয়ে ভালো। তখন সেদিনের সেই কাকটির কথা মনে হয়। মনে হয়, আমার এই অযোগ্যতার পরিবর্তে নিশ্চয়ই কোন যোগ্যতা আমার মধ্যে সুপ্ত রয়েছে। সেই যোগ্যতা খুঁজে পেলেই আমি ঠিক হয়ে যাবো। হয়তো অন্যদের চেয়ে ভালোই করতে পারবো। ক্ষণিকের মনভার করার কারণটুকু তখন সহজ মনে হয়।

শৈশব থেকে জীবনের নানা অনুষঙ্গে, অসংখ্য হতাশার সময়ে সেই খোঁড়া কাক আমাকে সঙ্গ দিয়ে যায়..। সঙ্গীহীন সেই কাকের ছায়াও মিলিয়ে গেছে আমার জীবন থেকে। কিন্তু, এখনো পড়ে আছে মায়া..। প্রতিদিনের নাস্তার টেবিলের সেই খোঁড়া কাকের জন্য অহেতুক মায়া..।

——————–

# পেইন্টিং: Qingdao Artist Lvnan

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।