প্লেটভর্তি ভাত আর হাঁসের মাংসে – গ্রামের বাজারে আমাদের একরাত

আমরা সেদিন ছিলাম জীবনানন্দের বরিশালে। ঢাকা থেকে ভোরে এসে নেমেছি লঞ্চে করে। ট্রাভেলার্স অব বাংলাদেশ আয়োজিত রামনাথ বিশ্বাস রাইড – ১ এর সাইকেল ট্যুরে। ৯ জনের একদল ব্যাকপ্যাকার। ফয়সাল ভাই, রাইন ভাই, শরীফ ভাই, মুনিম ভাই, মোহাম্মদ ভাই, মিথুন ভাই, বাহার ভাই, নাইম এবং আমি। সাইকেল আর ব্যাকপ্যাকে ক্যাম্পিংয়ের সব সরঞ্জাম, মাথায় হেলমেট। আমাদের  দেখতে এলিয়েনের মতো লাগছিলো ।

সকাল থেকেই বৃষ্টি হচ্ছে। কখনো রুমঝুম..। কখনো টুপটাপ। শীতল বাতাসের ঝাপটায় কেঁপে উঠছি কেউ কেউ। বরিশাল শহরের অলিগলি পেরিয়ে চারণকবি মুকুন্দ দাসের বাড়ি ছুঁয়ে, গুঠিয়ার- ক্যালেন্ডারের পাতায় পরিচিত,  সুন্দর মসজিদ দেখতে দেখতে এগিয়েছি। পথে ঝুম বৃষ্টিতে প্রাচীনতম দুর্গাসাগরের শানবাঁধানো ঘাটে বসে লম্বা সময়ের আড্ডা শেষে প্যাডেলের সাঁই সাঁই শব্দকে সঙ্গী করে চলতে চলতে আমরা এখন শেরে বাংলার জন্মস্থান চাখারে।

উঠেছি চাখারের সরকারী ডাকবাংলোয়। ফজলুল হকের বাড়ি হওয়া সুবাদে আশেপাশের এলাকা থেকে উন্নত এখন চাখার। খুব স্বল্প মূল্যে ভাড়া নেয়া ডাকবাংলোর রুমে সাইকেল রেখে বিশ্রাম শেষে ঘুরে বেড়িয়েছি। গ্রামীণ রাস্তায় বসে সবাই মিলে মশার গুণগুণের ভেতরে বসে দেখেছি সূর্যের পটে যাওয়ার মুহুর্ত। গল্পে আড্ডায় সময় চলে গেছে বেহিসেব। সন্ধ্যার পর রাইন ভাইয়ের কেনা টেনিস বলে,  ফুটবল আর কড়ইগাছের চিকন ডালে ক্রিকেট খেলে আমরা তখন ক্লান্ত। বিকেলেই পাশের বাজারে আনোয়ার ভাইয়ের হোটেলে হাঁস রান্নার অর্ডার দিয়ে এসেছি।  ফয়সাল ভাইয়ের আগ্রহে এই হাঁস খাবারের আয়োজন।

নির্দিষ্ট সময়ে আমরা গেলাম খেতে। নীচু চালের ছোট্ট হোটেল। টিনের বেড়াতে তেল-কালির দাগ। মাথার উপরে জ্বলছে ৬০ পাওয়ারের লাল আলোর খোলা বাতি। আমরা ৯ জন। অপেক্ষায় আছি হাঁসের মাংসের সাথে ধোঁয়াউঠা গরম ভাতের। এককোণের বড়ো এলসিডি স্ক্রীণে চলছে মারদাঙ্গা তামিল মুভি। সারাদিনের কাজ শেষে হোটেলের সবাই বসে দেখছে তামিল নায়কের সুপারহিরো টাইপের এ্যাকশন।

শীতের রাত..। কুয়াশার ঝালর নেমে এসেছে চারপাশ জুড়ে। পায়ে পায়ে নামছে গ্রামীণ রাত। হাজার বছরের প্রাচীন রাত..। এই রাতের আঁধারেই হয়তো শেরেবাংলা তার বাংলোর বারান্দায় বসে ভাবতেন দেশের কথা। কিংবা, কখনো স্ত্রীকে নিয়ে হাঁটতে বের হয়েছেন পাশের ছোট্ট নদীর পার ধরে। সেসময় কেমন ছিল শীতের রাত? তখনও কি এমন সুনসান ছিলো এসব এলাকা? জীবনের কঠিন মুহুর্তগুলোতে শেরেবাংলার কেমন কেটেছিলো এই চাখারের নির্জনতম এলাকাতে?

আনোয়ার ভাই ছিলেন না। তার আরেক ভাই আমাদের জন্য গরম ভাত আর বাটিভর্তি হাঁসের মাংস নিয়ে এলেন। এর আগে কখনো হাঁসের মাংসের প্রতি আমার আগ্রহ ছিলো না। খাবার মুখে দিয়েই মনে হয়েছে, আহ! শান্তি! পেটপুরে খেলাম সবাই। দারুন হয়েছিলো রান্না।

কী অদ্ভূত জীবন! এই শীতের রাতে ঢাকা থেকে বহুদূরের কোন এক অঁজপাড়াগায়ের ছোট্ট একটি হোটেলে বসে আছি আমরা। হয়তো গতকালই কেউ অফিসের প্রচন্ড ব্যস্ততায় হাঁপিয়ে উঠছিলো। কেউ হয়তো অন্যকোন ব্যস্ততায় আটকে ছিলো। আর এখন কোথায় বসে হাতডুবিয়ে হাঁসের মাংসে ভাত খাচ্ছি। টিভিতে চলছে মারদাঙ্গা তামিল মুভি..। নায়কের হাতে চাপাতি। হা হা রে রে করে এগিয়ে যাচ্ছে আপনজন হত্যার প্রতিশোধ নিতে..। সবাই তাকিয়ে দেখছে হা করে…। কোথাকার আমরা, কোথায় এখন! কী করছি বসে!

ভোরেই বেরিয়ে যাবো অন্য গন্তব্যে। অচেনা কোন পথে..। আজ এইসময়ে বহুপ্রাচীন এ.কে ফজলুল হকের বাংলোর পাশের সুনসান বাজারের একটি হোটেলে বসে খাচ্ছি। এমন কি কথা ছিলো হবার? নাকি, আমার শেঁকড় এখানেই রয়ে গেছে বহুশতক ধরে! আমিও কি কয়েকশ বছর আগে এখানের  কেউ ছিলাম না? হয়তো ছিলাম। হয়তো তখন আনোয়ার ভাইয়ের বদলে অন্য কারো হোটেল ছিলো। অন্যকোন ডেকোরেশনে..। তখন হয়তো পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সন্ধ্যা নদীর পাড় ধরে আমিও হাঁটতাম..। হয়তো শীতের রাতে তখন এমনই হিমেল হাওয়া বইতো। কাঠের পোলের রেলিংয়ে বসে তখন হয়তো আমরা বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দিতাম..।

যা হয় হোক। যেমন ছিলাম থাকি। কেমন থাকবো, সেসব নিয়েও ভাববো না। শুধু পথ চলবো। সামনের দিকে..। কখনো একাকী..কখনো এমন সঙ্গীসহ..। কখনো হয়তো ব্যস্ত সময়গুলোতে লিখবো নিজের গল্প..। নিজেদের গল্প..।

============

# ছবিটি প্রতীকি। Biswarup Ganguly র তোলা একটি গ্রামীণ বাজারের দৃশ্য।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।