দূর পাহাড়ের পথে চলেছেন নিঃসঙ্গ অভিযাত্রী!

“লাল পাহাড়ের দেশে যা
রাঙ্গামটির দেশে যা
ইত্থাক তুকে মানাইছে না রে
ইক্কেবারে মানাইছে না রে..”

কেনো ট্রেকিংয়ে আগ্রহী, সেটা এককথায় কিংবা একটি ইমেইলের কয়েকটি লাইনে বুঝিয়ে বলা সম্ভব নয় আমার পক্ষে। শৈশবে চিটাগাং ফায়ার সার্ভিসের কোয়ার্টারে থাকতাম তখন। কোয়ার্টার বিল্ডিংয়ের পাশে সুউচ্চ একটি টিলা ছিলো। প্রতিদিন বিকেলে আমরা ক’জন তখন সামিট করতাম! সামিট শব্দটাও তখন শুনি নি। কিন্তু, সবকিছু ছাড়িয়ে উচ্চতায় বসে নিজের পরিচিত চারপাশকে দেখতে বড়ো ভালো লাগতো। মনে হতো পাখির চোখে দেখছি আমার প্রাত্যহিক সংসার।

আমার তথৈবচ শৈশব এবং টলমলে কৈশোরের দিনগুলোতে সবসময়ের সঙ্গী ছিলো রাশিরাশি বই। সমরেশের হাত ধরে ঘুরে বেড়িয়েছি তখন জলপাইগুড়ি আর ডুয়ার্সের পাহাড়ে পাহাড়ে। এরই মধ্যে পড়া হয়ে গেলো চাঁদের পাহাড়। অদ্ভূত এক ঝিমধরানো নেশায় বুঁদ হয়ে রইলাম কিছুদিন। তারপর বেঁচে থাকার দৈনন্দিন কর্মযজ্ঞে ঝাঁপিয়ে পড়েছি। পুরি, রুটি আর রেডিমেড ছোট্ট দই কিংবা তন্দুর থেকে সদ্য মুক্তি পাওয়া বাকরখানিতে কেটে যাচ্ছে দিন। তখনকার সময় বহুদিন পাহাড়ের খোঁজ নেয়া হয় নি।

তারপর, ফেসবুকে বিচরণ শুরু করলাম। পড়ার টেবিলে হাজির হলো স্যার হেনরী রাইডার হ্যাগার্ড। মন্টেজুমা’স ডটার, দি পিপ্‌ল অফ দ্য মিস্ট, দ্য হলি ফ্লাওয়ার, কুইন শেবা’স রিং , বইগুলো সস্তার নিউজপ্রিন্টের পৃষ্ঠার প্রতিটি লাইনে আটকে থাকা নায়কেরা আমাকে পাহাড়ের পর পাহাড় পার করে নিয়ে যেতো হাজারো বছরের পূর্বেকার সময়ে। যেখানে আমি না থেকেও ছিলাম। হয়তো কোন পাহাড়ি গোত্রের সর্দার হয়ে। কিংবা, আমার আকাক্ষিত পাহাড়ি শামান হয়ে।

ধীরে ধীরে পরিচিত হলাম টিওবির সাথে। দেখতে থাকলাম। পড়তে থাকলাম। লোকাল হিরোদের পাহাড় দাঁপিয়ে বেড়ানোর গল্প খুঁজে বের করতাম। সামুতে পড়ে থাকতাম। ট্রেকিং, ট্রেইল, সামিট, জিপিএস, হাইকিং, ট্রেভাস ইত্যাদি নতুন শব্দের ভান্ডার যোগ হতে থাকলো। সময় গড়ালো। বাড়লো পড়াশোনার পরিধি। লোকাল হিরোদের সাথে যুক্ত হলেন বৈশ্বিক ফ্লেভার। শুরু করলাম সাইক্লিং। নতুন জগতে সেইসব পাহাড়ের মানুষদের সাথেই দেখা হয়ে যেতে থাকলো।

জানলাম তেনজিং, হিলারী, মেসনার, ভিশ্চার্স, স্কট ফিশার, বুক্রেভসহ আরো অসংখ্য রূপকথার মানুষদের। চাঁদের পাহাড়ের সেই অভিযাত্রীর কথা আবার এসে হাজির হলো মনের আঙিনায়। আট হাজারী পর্বত, এভালেঞ্জ, ক্যারাবিনার, ক্রাম্পন, বেসক্যাম্প , ফিগার অফ এইট ইত্যকার নতুন শব্দ ভরে দিচ্ছিলো আমার ভান্ডার। অজান্তেই আবারো ভালোবাসতে শুরু করেছি পাহাড়কে। চাঁদের পাহাড় আবার ফিরে এসেছে আমার মাথার ভেতর। মনে হচ্ছে, পাহাড়ি ট্রেইলের সোঁদা মাটির ঘ্রাণ পাচ্ছি আমি..। আমি এবার যেতে চাই দূর পাহাড়ের পথে..।

পাহাড়ের সুউচ্চ চূড়ায় দাঁড়িয়ে মেঘ ছুঁয়ে দেখার অনুভূতি আমি জানতে চাই। বারবার ব্যর্থতার পরও কেনো একজন অভিযাত্রী আবার ফিরে আসেন এই দুর্গম পাহাড়ে, আমি বুঝতে চাই। আমি শুনতে চাই পাহাড়ের আবিষ্ট নীরবতার ভাঁজে ভাঁজে আটকে থাকা জীবনের অপার্থিব সুর। যে নেশা সারা পৃথিবীর সব পর্বতারোহীকে বারবার টেনে আনে মৃত্যু আর জীবনের এই সীমানায়। যে নেশায় সজল ভাইয়েরা হারিয়ে গেছেন। মুগ্ধ ভাইয়েরা ঘুমিয়ে পড়েছেন পাহাড়ের ভালোবাসা নিয়ে..।

অসংখ্য বছর ধরে অটল দাঁড়িয়ে থাকা ছোটবেলায় শোনা কবিতার মতো মৌন মহান এই পাহাড়কে আমি ভালোবাসতে চাই। আমি চাই, পাহাড় আমাকে আরোহনের অনুমতি দিক। প্রিয় বন্ধুর মতো এই যন্ত্রনার নাগরিক সময়ে আমাকে আগলে রাখুক। আমি ভরপেট খেয়ে নিয়ে শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়তে চাই পাহাড়ের কার্ণিশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কোন এক জুমঘরে। ছোটবেলার মতো আমি দেখতে চাই আমার চারপাশকে পাখির চোখে..। হয়তো সে কারণেই আমি ট্রেকিংয়ে আগ্রহী…। হয়তো..।

### ট্রাভেলার্স অব বাংলাদেশের একটি ট্রেকিং ইভেন্টের জন্য কৈফিয়ত হিসেবে লেখা হয়েছিলো। “আপনি কেন ট্রেকিং করতে আগ্রহী” এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে দেখলাম, আকারে বৃহৎ হয়ে যাচ্ছে। তাই, নোট হিসেবে তুলে রাখছি।

# লিরিক কৃতজ্ঞতা: অরুন কুমার চক্রবর্তী
# ছবি কৃতজ্ঞতা: discovery-bd থেকে নেয়া। মূল ফটোগ্রাফার খুঁজে পাই নি

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।