যাদুর শহরে ঝাপসা কম্পোজিশনের একটি বিকেল

ফাল্গুণের ১ম দিন বইমেলায় যাবো বলে বের হয়েছি। টিএসসির কাছাকাছি কোথাও অন্তরার সাথে দেখা হবে। তারপর একসাথে বইমেলায়। নীলক্ষেতের মোড় থেকে উপযুক্ত ভাড়ায় রিকশা না পেয়ে হাঁটছি। চারপাশ জুড়ে রঙ বেরংয়ের পোশাক পড়া মানুষজনের ভিড়। ফাগুণের রঙ হিসেবে ক্যাটক্যাটে হলুদ আমার মোটেও ভালো লাগে না। শৈশবের বিরক্তিকর একঘেয়ে জন্ডিসের কথা মনে পড়ে যায়।

দেখছি আর হাঁটছি। নানা রকম মানুষ আর তাদের হাজারো রকমের ধরণ-ধারণ তুলে নিচ্ছে আমার অভ্যস্ত মস্তিষ্ক। মানুষ আমার বরাবরই আগ্রহের বিষয়। এমন বহুমাত্রিক প্রাণীর সাথে আমার আর কখনো দেখা হবে বলে মনে হয় না। হাঁটতে হাঁটতে আটকে যাওয়া অসংখ্য বিষয়ের মধ্যে বেশ কিছু বৈসাদৃশ্য আমাকে ভাবিয়ে তুলছিলো।

আমি দেখছিলাম, কোন জুটিতে প্রেয়সীর সাথে প্রেমিকের অন্তরঙ্গ দৃশ্য। পাশাপাশি দেখছিলাম, অন্য জুটিতে পরস্পরের সাথে অসুস্থরকমের ঝগড়া/মনমালিণ্য। টুকরো সংলাপ ভেসে আসছিলো। এই! তুমি সেদিন রাতে আমার কল কেটে দিয়েছিলো কেনো! কিংবা, তোমার মতো মানুষের সাথে কী করে যে এতোদিন ধরে সম্পর্ক রেখেছি, জানি না! অথবা, তোমার ফোনে ওই ছেলে এতো কল দেয় কেনো! তোমার সাথে ওর এতো খাতির কিসের!

আমি দেখছিলাম, শুনছিলাম আর হাঁটছিলাম। একটি যাত্রীছাউনিতে পোস্টার দেখলাম, লিভ নো দালিত বিহাইন্ড টাইটেলের। ঠিক সেই পোস্টারের নীচে একজন পথবাসী মানুষ, শতচ্ছিন্ন পোশাক গায়ে বসে আছে রাস্তায়। যাত্রী ছাউনির বসার জায়গায় নাকি তার বসা বারণ! এগিয়ে যেতে যেতে চোখে পড়লো নানকশাহী গুরুদুয়ারার গেইটে লোহার শিখসাইনের তলোয়ারের ফাঁকে গুজে রাখা লাল গোলাপ! একটু পর দেখলাম, একজন পথবাসী লোক রাস্তায় কার্ডবোর্ডের উপর রেখে, হাকিম চত্তরের উচ্ছিষ্ট খাবার খাচ্ছে পরম তৃপ্তিতে। পাশ দিয়ে হাতে হাত রেখে আইসক্রিমে খেয়ে হেঁটে যাচ্ছে সুখি মানুষের দল।

এই যে প্রেমিকের দল সুখে কিংবা ঝগড়ায় মেতে আছে, যাত্রী ছাউনিতে দলিতের পোষ্টারের নীচেই কোন এক পথবাসীর শতচ্ছিন্ন পোশাক কিংবা গুরুদুয়ারার তলোয়ারের  ফাঁকে গোজা লাল গোলাপ অথবা হাকিমের উচ্ছিষ্টে তৃপ্ত কেউ..। টুকরো টুকরো দৃশ্য, তাদের ভিন্ন ভিন্ন কনটেক্সট, প্রতিটি মুহুর্তের পৃথক পৃথক আবেদন, আলাদা করে হয়তো এসবের কোন অর্থই হয় না। প্রতিদিনই এমন অসংখ্য মুহুর্ত তৈরী হয় এই রং মিলান্তির শহরে। কিন্তু, সবগুলো দৃশ্য, তাদের নিজস্ব সংলাপ নিয়ে যখন তৈরী হয় কোন কম্পোজিশন, তখন তাকে কীভাবে বিচার করতে হয়, আমার জানা নেই। আমার কাছে সবসময়ই অসম্ভব মনে হয় এইসব দৃশ্যগুলোকে একত্রে ভাবা। কখনো কখনো মনে হয়, এইসব আসলে নেই কোথাও। শুধু আমিই আছি। দাঁড়িয়ে আছি সময়ের একপ্রান্তে।  মহাকালের ভেলকি আমার সামনে উঠিয়ে আনছে অন্যসময়ের হাজারো মুহুর্ত। যেসব আমি একসাথে একটা বোর্ডে আটকানোর অহেতুক চেষ্টা করছি।

পহেলা ফাল্গুণ, ভালোবাসা দিবস কিংবা হালের ক্রেজ যেকোন দিবস নিয়েই আমার কোন আগ্রহ কাজ করে না। যেসব দিবস আমাকে ছুঁয়ে দেয় সবসময়, সে দিনগুলোও আমি এখন নিজের মতো করে যাপন করি। কারণ, সব দিবসই আমাদের কাছে হয়ে দাঁড়িয়েছে উৎসবের, আনন্দের, অপ্রাসঙ্গিক মাস্তির, হিন্দি গান আর সেজেগুজে বাইরে ঘুরে বেড়ানোর সাথে দামী রেস্তোরায় দিনশেষে চেকইন। আমি নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। ছোটবেলা থেকে চাহিদা ও শখের মধ্যে যেকোন একটাকে বেছে নিতে হয়েছে আমাকে। এই ট্রেন্ডি ফ্যাশনের দিবস পালনের ধারাও্ তাই আমার জন্য না। কিন্তু, এই চারপাশের উৎসবমুখরতায় ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য দৃশ্যের কোলাজ, হাজারো প্রাসঙ্গিক অপ্রাসঙ্গিক সংলাপ, তাদের সম্মিলিত নির্মাণের কম্পোজিশন আমাকে বরাবরই বিস্মিত করে।

আমি চাই এই কম্পোজিশনগুলোর কোন অর্থপূর্ণ বন্ধন তৈরী হোক। ফাগুণের উৎসবমুখর দিনগুলোতে কেউ অহেতুক ঝগড়ায় না জড়াক। প্রেমিক-প্রেমিকারা বিশুদ্ধ থেকে বিশুদ্ধ হয়ে উঠুক ভালোবাসার কষ্টিপাথরের সংস্পর্শে। দলিতরা সত্যিকার অর্থেই আমাদের সমান কাতারে চলে আসুক। হাকিমের উচ্ছিষ্টের পরিবর্তে সেই পথবাসী লোকটিও পেটপুরে খেতে পারুক। দিবসগুলো হয়ে উঠুক সার্থক।

জানি, হয়তো কখনোই আমার চাওয়াগুলো পূর্ণতা পাবে না। তবুও আমি প্রাণপনে চাই, এই যাদুর শহরে কোন আলাদীন আসুক। ঝাপসা কম্পোজিশনগুলো একসাথে করে তাঁর প্রদীপের দৈত্য, তৈরী করুক কোন রূপকথার ছায়াছবি। যেখানের দিনগুলো সবসময় শেষ হবে, অতঃপর তারা সুখে শান্তিতে রহিল’র মধ্য দিয়ে..। জীবন যেখানে কেবলই শোনাবে ভালোথাকার গান..।

————————————

# ছবি কৃতজ্ঞতাঃ OLA JULIUSSEN

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।