কর্ণফুলিতে অপার্থিব সন্ধ্যা এবং একটি চলমান পেইন্টিংয়ের ড্রাফট

কখন কোথাও যাওয়া হবে আমার, এই ব্যাপারটাকে এখনো স্থির করে উঠতে পারি নি। পরিকল্পনা করে কিছু করতে গেলেই ফেঁসে যায় প্ল্যান। তাই, সে চেষ্টা বাদ দিয়ে এখন হুট করে চলে যাওয়ার চেষ্টা করি। তেমন করেই এবার কাপ্তাইয়ে যাওয়া। এবারের উদ্দেশ্য কর্ণফুলীতে কায়াকিং করা এবং সম্ভব হলে কাপ্তাইয়ে টুকটাক ঘুরাঘুরি। আমি, অন্তরা, মনির, মহিমা এবং মেহেদী ভাই ও ভাবীসহ আমরা ছয়জন এয়ারপোর্ট স্টেশন থেকে রাতের তূর্ণা এক্সপ্রেসে উঠে বসলাম চিটাগাং এর উদ্দেশ্যে। পকেটে টাকার অভাব বরাবরের মতোই ছিলো। তারপরও যাওয়া হচ্ছে। ট্রেনে উঠে বেশ অবাক! নতুন ট্রেন। উন্নতমানের সিট। বেশ পরিচ্ছন্ন এবং ঝকঝকে ভাব। এই ভালোলাগা নিয়ে জার্ণি শুরু। আমার বসার জায়গা আলাদা বগিতে। ফলে পিডিএফে বই আর ঘুমের সাহায্য নিয়ে যথাসময়ে চিটাগাং পৌঁছলাম।

নিজামে নাস্তা শেষ করে যখন বের হলাম তখন টুপটাপ বৃষ্টি হচ্ছে। আকাশের মুড অবশ্য ঢাকা থেকেই খারাপ দেখে এসেছি। ভয়ও পাচ্ছি, এমন থাকলে কায়াকিং হবে না ভেবে। এর মধ্য দিয়ে নিউমার্কেট হয়ে বহদ্দারহাট। সেখান থেকে কাপ্তাইয়ের বাস। লিচুবাগান স্টেশনে এসে বাস আর যাবে না। সিএনজি করে জুম প্যানারমা রেস্তোরার সামনে নামলাম। কয়েকগজ দূরেই কাপ্তাই কায়াক ক্লাবের সাইনবোর্ড দেখে থামলাম। রাস্তার ধারে বেশ নীচে দেখা গেলো কিছু কায়াক বেঁধে রাখা আছে। পাশে একটা টেবিল গোটাকয়েক চেয়ার আর অস্থায়ী তেরপল নিয়ে বসে আছেন একজন। তিনি দায়িত্বশীল হবেন বলেই মনে হলো। আমরা আসার আগে অবশ্য চিটাগাংয়ের পরিচিত মুখ জিতুদার সাথে যোগাযোগ করে এসেছিলাম। উনার থাকার কথা থাকলেও উনি ততোক্ষণে এসে পৌঁছুতে পারেন নি। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর আমরা নিয়মমাফিক প্রয়োজনীয় কাজ সেরে লাইফজ্যাকেট পরে কায়াকিং করতে নামলাম। এখানে বলে রাখা ভালো, এটি বাংলাদেশে প্রথম পাবলিক এক্সেসেবল কায়াকিং। কর্ণফুলী নদীর একটা অংশে এর অবস্থান। প্রতিটি কায়াকে ২ জন করে বসা যায়। প্রাথমিক অভিজ্ঞতার জন্য চমৎকার।

কায়াকিংয়ের প্রথম কিছুক্ষণের মধ্যে মোটামুটি চালাতে পারছিলাম। আমি আর অন্তরা এক কায়াকে। মনির আর মহিমা এবং ভাইয়া ও ভাবী অন্য দু’টি কায়াকে। নিজেদের খুশিমতো কখনো দূরে কখনো কাছে, কখনো একসাথে আবার কখনো আলাদা, নানা রকমে কায়াক চালাচ্ছিলাম। কর্ণফুলির পাশ ঘেষে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট ছোট পাহাড়ের সারি আর তাদের আশ্রয়ে বেড়ে উঠা পাহাড়ি গ্রামের জীবন দেখছিলাম। কর্ণফুলির এই অংশে পানির বড়ো একটা জোগান আসে কাপ্তাই লেক থেকে। যেখানে হাজারো স্বপ্নের সলিল সমাধি হয়েছিলো বহুদিন আগে। কাপ্তাই দেখতে যথেষ্ট নয়নাভিরাম। কিন্তু, যখনই আমার মনে হয় এই লেকের প্রতিইঞ্চি ভূমিতে অসংখ্য মানুষের কান্নার জল জমে আছে, এর নির্মাণতান্ডবে হাজারো পরিবার হারিয়েছে তাদের ভিটেমাটি, তখন এই নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের দর্শক হতে আসা নিজের জন্য করুনা হয়। কায়াকিং করতে করতে ভাবনা চলছিলো। আর্টিফিশিয়াল বৈঠা আর মৃদুমন্দ বাতাসে হেলান দিয়ে চলছিলো আমাদের কায়াকও।

দূরে দেখা যাচ্ছিলো পাহাড়ের তীক্ষ্ণ বাঁক। জেলে নৌকার জাল ফেলা কিংবা পাহাড়ি পাড়ার দৈনন্দিন জীবনধারা নিত্যকার রুটিনে চলছে। কী বিচিত্র আমরা! একইসাথে আমি ভাবছি  কাপ্তাইয়ের দুঃখি মানুষদের কথা। আবার, সেই সাথেই ঢাকা থেকে টাকা খরচ করে দামী স্পোর্টস কায়াকিং করছি কর্ণফুলির জলে! একইসাথে দরদী আমি আবার ভোক্তা টুরিষ্টও আমি!

দেখতে দেখতে ২ ঘন্টার স্লট এবং বাজেট শেষ। উঠে পড়লাম নিয়মমাফিক। এবার খাবারের পালা। বেশ ক্ষুধার্ত আমরা পাশের জুম রেস্তোরায় গেলাম পূর্ব অভিজ্ঞতা অনুযায়ী প্যানারমা ভিউ দেখবো বলে। ঢুকতেই ১০ টাকার টিকেট। অর্ডার করে দোতলায় উঠে খাবারের জন্য অপেক্ষা। দোতলার এই জায়গাটুকু আমার অনেক প্রিয়। এখান থেকে কর্ণফুলির অসাধারণ প্যানারমা ভিউ দেখা যায়। দেখতে দেখতে দুপুরের খাবার খেয়ে কর্ণফুলির পাড়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম। সেইসাথে জিতুদার জন্য অপেক্ষা। তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা অনুসারে আমাদের পরের গন্তব্য কাপ্তাই থেকে আসাম বস্তির রাস্তা হয়ে রাঙামাটি। সেখান থেকে ঢাকা। আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষার শেষে জিতুদা আসলো। ওর মতামত , রাঙামাটি রোডে আমরা যেনো না যাই আজকে । ঝামেলায় পড়বো। কারণ, রমেলের মৃত্যু ও লাশ পোড়ানোর প্রতিবাদে ( রমেল সম্পর্কে জানতে দেখুন ) রাঙামাটিতে জল এবং স্থল সবখানেই হরতাল ডাকা হয়েছে। ফলে, যাতায়াতে ঝামেলা হতে পারে। তাই, জিতুদার সাথে কাপ্তাই কায়াক ক্লাবের পাশে ফ্লোটিং প্যারাডাইস নামের রেস্তোরায় বসলাম সবাই। বারান্দা থেকে উন্মুক্ত কর্ণফুলি, পাহাড়ের বাঁক, শান্ত জলে কায়াকের চলাচল দারুন লাগছিলো।

প্ল্যান পাল্টে যাওয়ায় হাতে অনেকটা অবসর সময়। দাদার প্রস্তাবে আবার কায়াকিংয়ে নামলাম। এবারের আবহাওয়া অন্যরকম। রোদমাখা মেঘজল আর বেশ ধারালো স্রোতের কর্ণফুলি আমাদের স্বাগত জানালো। পরের ১ ঘন্টায় আগের চাইতে কিছুটা বেশি শক্তি খরচ করে কায়াক চালালাম। মাঝে মাঝেই পশলা বৃষ্টি ভিজিয়ে দিচ্ছিলো আমাদের। শেষের দিকে জিতুদার প্ররোচনায় কায়াক রেসে অংশ নিয়ে সর্বশেষ স্থান দখল করে শেষ করলাম কায়াকিং। উঠতে উঠেতই তীব্র বাতাস জানান দিয়ে গেলো ঝড়ের। ফ্লোটিং প্যারাডাইসে যখন সবাই ঢুকলাম, ততোক্ষণে মুষলধারে বৃষ্টি নেমেছে কর্ণফুলি জুড়ে।

পায়ে পায়ে সন্ধ্যা নামছে পাহাড়ি জনপদে। মেঘে মেঘে চারদিক অন্ধকার হয়ে আসছে। আবছায়া আলোয় বিজলির চমক ক্যামেরার ফোকাসের মতো থেকে থেকে জ্বলে উঠছে। সব রঙ মুছে গিয়ে কেবল সাদা-কালো রঙ জেগে থাকছে। কিঞ্চিৎ দিনের শেষ আলো আর মেঘের অন্ধকারের সাথে ধোয়াটে বৃষ্টির ছাঁট, মিলেমিশে তৈরী করছে অদ্ভূত এক রঙ। ইজেলের বহুল প্রতিক্ষিত ব্ল্যাক এন্ড হোয়াইট কালার!  ঝমাঝম বৃষ্টি, পাহাড়ি জনপদ, আপাতশান্ত জলের কর্ণফুলি, ভালো থাকার অভিনয় করা শহুরে আমরা, ফ্লোটিং প্যারাডাইস সবকিছু একাকার হয়ে যায় আমার চোখে। লাভ-ক্ষতির খতিয়ানের উপর গড়ে তোলা আমাদের প্রতিদিনের জীবন, সামাজিক ঠুনকো নামস্বর্বস্ব সম্পর্ক, মেকি হাসি-কান্না, এইসব অনর্থক আবেগের সাথে আজকের এই সন্ধ্যাটুকু কতোটা বেমানান! আমার পশের চেয়ারে বসে থাকা জিতুদা নিজের কাজ ফেলে আমাদের জন্য এখানে এসেছে। এই যে তার আসা, আন্তরিকতা – এর কতোটুকু আমার প্রাপ্য?

রাতের অন্ধকারে বৃষ্টির অঝোর ধারাজল চোখে পড়ছে না। কিন্তু, রিমঝিম শব্দে জানান দিচ্ছে বৈশাখ,  তার সদম্ভ উপস্থিতি। আমি ভাবছি নিজের কথা। ভাবছি আমার চারপাশের তৈরী নিজের জগত নিয়ে। স্বার্থের বাইরে কোন সম্পর্ক কেনো গড়ে উঠে না? কেনো অকারণ কাউকে ভালোবাসা যায় না? সব কিছুতেই কেনো লাভ-ক্ষতির হিসেব কষতে হয় আমাদের..? এই ভাবনার শেষ নেই জানি। তবুও ভাবি। অন্তরার হাসিমুখ, মনিরের হতাশা, জিতুদার সরগরম আওয়াজ, মহিমার চুপচাপ দেখে যাওয়া, ভাবি-ভাইয়ার রোমান্টিসিজম আমাকে স্পর্শ করে যায়। আমি দেখতে থাকি..। সবকিছু একসাথে আটকে যেতে থাকে একটি চলমান পেইন্টিং ফ্রেমে..। নিজের একান্ত অন্দরমহলের গাঢ় হয়ে জমে উঠা একাকীত্ব, ক্রমশঃ প্রগাঢ় হতে থাকে। জনারণ্যে আরো একা হতে থাকি আমি। কর্ণফুলি নদীতে আরো অসংখ্য অপর্থিব সন্ধ্যা নামে। বৃষ্টি হয় এখানে প্রাকৃতিক নিমগ্নতায়। জীবন চলতে থাকে। কাপ্তাইয়ের ফ্লোটিং প্যারাডাইসে রাতের আড্ডা জমে। সে আড্ডায় আমি আর থাকি না..। খামখেয়ালে আঁকা হাজারো পেইন্টিং ড্রাফট নিয়ে দেয়ালের পর দেয়াল সাজাই আমি। অপেক্ষায় থাকি সুমহান মৌনতার..।


## ট্রিপের কোন ছবি আমার কাছে না থাকার কারণে কায়াক ক্লাবের ফেসবুক পেইজ থেকে নেয়া একটি ছবি, পোষ্টের কভারফটো হিসেবে ব্যবহার করেছি। ছবিটি তুলেছেন: Muhammad Belayet Hossain

## কাপ্তাই কায়াক ক্লাবের অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজ: https://www.facebook.com/kaptaikayakclub

  1. অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার এত সুন্দর বর্ণনায় অভিভূত হলাম। এত এত বিচিত্র বর্ণনা পড়ি প্রায়শই। যেন কায়াকিং আসে নতুন ভাবে প্রতিদিন। মনে হয়, এই কাপ্তাইয়ে কায়াকিং আনন্দ যোগাবে সবাইকে প্রতিদিন, চিরদিন।

    1. ধন্যবাদ আমার ব্লগে আসার জন্য। ভালো লেগেছে জেনেও ভালো লাগলো। নিয়মিত আসার আমন্ত্রণ রইলো। ভালো থেকো। শুভ কামনা 🙂

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।