নাম প্রকাশে অনিচ্ছুকের সাথে বেনামী আলাপ

-হ্যালো..
-জ্বী বলুন..
-আমি নীরব বলছি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বলছেন?
-জ্বি বলছি..। 
-আমি কি একটু কথা বলতে পারবো?
-জ্বি বলুন
-আমি আপনাদের সাথে কাজ করতে চাইছি। আরিভার ফান্ডিং নিয়ে। আমি কি পারবো আপনাদের সাথে যুক্ত হতে?
-জ্বি পারবেন। আজকে চলে আসুন শাহবাগে। পাবলিক লাইব্রেরীর সামনে।
-আপনাকে চিনবো কীভাবে? আমি অবশ্য পাঞ্জাবী পড়া থাকবো।
-আমাকে ফোন দিলেই হবে…

এভাবেই কোন এক ব্যস্ত দিনে শাহারিয়ার পারভেজ এর সাথে আমার পরিচয়। সেদিন ছিলো আমার প্রথম অফলাইনে কাজ করা। অনলাইন, রাশি রাশি বই, ভোকাট্টা ঘুড়ি হয়ে উড়ে বেড়ানো, এই নিয়েই আমার জগত সীমাবদ্ধ ছিলো। সেদিন পারভেজ এর হাত ধরে আমি প্রথম বের হই আমার নিজের পৃথিবী ছেড়ে। পলাশীর মোড়ে ফুটপাথে বসে আমরা কথা বলছিলাম। প্রথম চায়ের বিলটা ও দিয়েছিলো। নাফাখুম এর গল্প শুনেছিলাম সেদিন। তারপর ধীরে ধীরে একসাথে পথচলা।

ক্রমেই কীভাবে যেনো আমি বুঝে গেলাম, এই ছেলেটা একটু আলাদা। খুব খোলামেলা..প্রাণবন্ত..। জীবন যেনো তার শতভাগ সজীবতা দিয়ে পাঠিয়েছে ওকে..। আমি ওকে পড়তে পারি..খোলা বইয়ের মতো..। ওর কাছে আমার ঋণ কিংবা কৃতজ্ঞতার কোন শেষ নেই। আমার জীবনের অন্যতম সুন্দর সময়, অন্যতম সুন্দর মানুষদের সাথে পরিচয়, নিজের ছন্নছাড়া জীবনকে গুছিয়ে দেয়ার মতো মানুষের দেখা পাওয়া, অসম্ভব ভালো কিছু মুহুর্ত পেয়ে যাওয়া..সবকিছুর পেছনে ছিলো শাহারিয়ার।

বয়সের চেয়ে অনেক বেশি বড়ো হয়ে যাওয়া আমার দাদাটা আমাদের সবার ভীষণ প্রিয়। সময়ের ব্যস্ততা, জীবনের অনাকাঙ্ক্ষিত প্রয়োজন আমাদের মাঝে দূরত্ব হয়তো তৈরী করে ঠিকই। কিন্তু, তবুও আমরা কাছেই থাকি। আমি জানি, আমার দাদাটা কখনো আমাকে একা ফেলে পথ হাঁটবে না। কারণ, এই সামাজিক জীবনে ওই যে আমাকে হাঁটতে শুরু করিয়েছিলো..।

আজকে পাগলটার জন্মদিন। এতো অভিমানী ও, নিজের কষ্টগুলো কখনোই কাউকে বলতে চায় না। দাদা, আমি তোর অনেক না বলা কথাই আমি বুঝতে পারি। আমরা তোকে অনেক সময়ই হয়তো অজান্তে কষ্ট দিই। তবুও জানিস দাদা, তোকে আমি, আমরা সবাই ভীষণ ভালোবাসি রে। কখনো তোকে সরাসরি বলতে পারি নি। আজকে লিখছি, তুই আমাদের ভীষণ প্রিয় রে। আমি তোদের সবাইকে নিয়ে পথ চলতে চাই রে। শুভ জন্মদিন প্রিয় দাদা। ভালো থাকিস রে। আছি , তোর খুব কাছেই.. । জীবন হোক ভালোবাসায় ভরপুর..। শুভ জন্মদিন 

(দেরী করে উইশ করার জন্য স্যরি রে। আমার এখানে নেটের বেহাল দশা। জানিসই তো.. )

উপরের অংশটুকু জুলাই ০৯, ২০১৪ , রাত ১২:৫৪ তে লেখা। ২০১৭ সাল চলছে এখন। এবারের জন্মদিনেও আমি উইশ করতে পারি নি সময়মতো। আশা রাখি, বরাবরের মতো ক্ষমা করবি। আমার নেটের বেহাল দশা এখন নেই। কতোকিছু পাল্টে গেছে এই সময়ের ব্যপ্তিতে। সেই যে সেদিন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুকের হাত ধরে আমি বেরিয়ে পড়েছিলাম আমার নিজের গৃহবন্দী জগত ছেড়ে, তারপর এখনো চলছে পথচলা। পরিচিত হয়েছি সশরীরে, অসংখ্য অনলাইন পরিচিতদের সাথে নতুন করে। জীবনের উল্লেখযোগ্য চ্যাপ্টারগুলোতে নতুন অনুষঙ্গ যুক্ত হয়েছে। বেড়েছে নিত্যদিনকার ব্যস্ততা। শাহরিয়ারের সাথে আড্ডার সময় বের হয় না। কিন্তু, শাহরিয়ার রূপকথার শাহজাদার মতো তার জাদু ছড়িয়েই যাচ্ছে। সেদিনের সেই  কমবয়সী ছেলেটার সাথে পলাশীর ফুটপাথে বসে গল্প করার মুহুর্ত আমার খুব মনে পড়ে।

জীবন আমাদের টেনে নিয়ে যেতে থাকে বৃহৎ জীবনের পথে। সেখান থেকে ফিরে থাকবার কোন উপায়ই নেই। আমার মাঝে মাঝেই মনে হয়, কী এমন ক্ষতি হতো, যদি জীবন আটকে থাকতো কোন নির্দিষ্ট সময়ে..। এখন আমাদের চারপাশে বড়ো অস্থির সময় চলছে। এতো এতো বৈচিত্র, এতো এতো কনটেন্ট যে, আমরা তাল হারিয়ে ফেলছি। হৃদ্যতার দেখা এখন মেলে শুধু কাস্টোমার কেয়ার কর্মীর মেকি হাসিতে। এই ব্যস্ততা আমাকে কষ্ট দেয়। আমিতো কখনো চাই নি, এমন জীবন..।

সেই বিকেলে আমরা যে আরিভার জন্য ডোনেশন/ফান্ড জোগাড়ের যুদ্ধে নেমেছিলাম, সেই আরিভা এখন ভালো আছে। বয়স বেড়ে নিশ্চয়ই এখন মিষ্টি বাবু হয়ে গিয়েছে। মা-বাবা-প্রিয়জনদের নিয়ে কাটছে আরিভার সময়। ভালো লাগে ভাবতে..।

শাহারিয়ার তার সবটুকু সরলতা সঙ্গী করে অচিনপুরের কোন রাজ্যের রাজা হয়ে কাটিয়ে দিক জীবন। খোলা বইয়ের মতো পড়তে পারা পারভেজ যেনো কখনোই পাল্টে না যায়। এই জাদুর শহর যেনো ওকে ভুলিয়ে দিতে না পারে ওর শেকড়ের টান। ভালো থাকুক শাহজাদা পারভেজ..। ভালো থাকুক আমাদের প্রিয় জিজি..।

ছবি:  বান্দরবানের কোন এক পাড়ার টংয়ে বসা শাহারিয়ার। ওর ফেসবুক থেকে পাওয়া।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।