আরাধ্য জীবন যেখানে বিকল হয়ে পড়ে থাকে

ভোকাট্টা ঘুড়ি কিংবা জলফড়িংয়ের জীবন আমাকে খুব টানে। একবার এক নিরুদ্দেশ যাত্রায় ভীষণ অঁজপাড়া গাঁয়ের এক রেলষ্টেশনে গিয়ে হাজির হয়েছিলাম। ছোট্ট আর নীরব চারদিক। অসংখ্য সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের স্বাক্ষী হয়ে, সারাগায়ে বয়সের ছাপ মেখে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে ছিলো স্টেশনটি। অনেকক্ষন অপেক্ষার পর দেখা মেললো স্টেশন মাষ্টারের। কবে থেকে এই স্টেশনে আছেন, মনে করতে পারলেন না। স্টেশনের মতো তার শরীরজুড়ে প্রবীণতার ছাপ বড়ো বেশি স্পষ্ট হয়ে লেগে ছিলো।

সেদিনের রাতটি কাটিয়েছিলাম স্টেশন মাষ্টারের নড়বড়ে টেবিল আর ঘোলাটে বাল্বের আলোয়, জানালার গরাদহীন টিকেট রুমে। আমার খুব মনে আছে সে রাতটির কথা। কী অদ্ভূত নৈঃশব্দ মেখে দাঁড়িয়ে ছিলো চারপাশ! আমার জীবনের অসংখ্য দিন-রাত্রি সেই দিনের সেই অন্ধকার নৈঃশব্দে ঢেকে যেতে থাকছে। যেইসব দিনগুলোর কোন আদি-অন্ত নেই। কোন স্মৃতি জমা নেই সেইসব দিনগুলোর…সবকিছু শূন্য….তবুও জীবন চলেই যাচ্ছে…

আজকে যে আমি জীবনের এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে ভাবছি, ভালো আছি কিংবা ভালো নেই- সেই আমি কি অন্যপ্রান্তের জীবনকে দেখতে পাই? পাই না। তবুও কেনো ভাবি, ভালো নেই-ভালো আছি-ভালো থাকছি কিংবা থাকছি না।

প্রতিদিন ক্লাসে যাই। জ্যামে পর করে দিই অনায়াসে ৪/৫ ঘন্টা। ঘুমাই রাতভর। পিসিতে বসে ফেসবুকে মুখ গুজে থাকি। কাজ করি। কথা বলি। রাগ করি। বিরক্ত হই। জীবন কি আসলেই এতো বেশি সাধারণ! নাকি, সহজ জীবনে অসারণত্ব আরোপ করে কঠিন করে দিতে চাইছি নিজের বেঁচে থাকার মুহুর্তগুলোকে?

যে আমি ভয় করছি প্রিয়জনের রাগ করার, সেই আমিই কি বিরক্ত হচ্ছি না অন্য মুহুর্তে? আমাকে ভালোবেসে যে মানুষটি আমার পাশে পথ চলছে, তার অতিরিক্ত ভালোবাসা আমার জন্য বহন করা কষ্টকর হয়ে দাঁড়ালেও আমি যাপন করে যাচ্ছি জীবন। তার অনর্থক জেলাসি-ভয়-বিরক্তি আমি বয়ে নিয়ে চলছি। আবার এর উল্টোও হচ্ছে। আমার বিরক্তি-রাগ-অবহেলা তাকে নিতে হচ্ছে। এই নিয়মের ছাঁচ থেকে কেনো আমরা বেরিয়ে আসতে পারি না? কেনো জীবনের সহজ পরিক্রমাকে আঁটসাট বন্ধ বাক্সে আটকে ভাবি, যাক এইবার ভালো থাকা যায়..!

এই যে আমি অন্যদের কথা ভেবে, সমাজের ভয়ে কিংবা প্রচলিত নিয়মের গন্ডিতে আটকে রাখছি নিজেকে,  এটা কি মানসিক উন্নতির পথে বাঁধা নয়? যা করতে ভালো লাগে, তা করতে পারছি না। ইচ্ছা হলেও করছি অনেক কিছুই। নিজেকে সান্তনা দিয়ে বলছি, এটা করা উচিত নয়। এই যে উচিত অনুচিতের অহেতুক নিষেধাজ্ঞা মেনে নিয়ে বেঁচে আছি, এটা কি আমার মানসিক নির্মলতাকে দুষিত করছে না?

এমন হাজারো প্রশ্নের উত্তর নিয়ে হিমশিম খাই প্রতিনিয়ত। ভাবি, শান্তির খোঁজ করতে এসে আমি নিজেই অশান্তি তৈরী করে রাখছি। এই কি সেই পাখির জীবন কিংবা ফড়িয়ের জীবন! যে জীবন আমার আরাধ্য ছিলো!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।