নারীর সামাজিক প্রতিবন্ধকতা উত্তরণে সামাজিক শিক্ষণ তত্ত্বের আলোকে দাঙ্গাল চলচ্চিত্রের পর্যালোচনা

“কাল যদি তুমি গোল্ড মেডেল জিতো, তাহলে সেইসকল মেয়েরা তোমার সাথে জিতে যাবে, যাদেরকে ছেলেদের চেয়ে কম যোগ্যতাসম্পন্ন বলে আমাদের সমাজ তাদের জন্য জায়গা নির্ধারণ করে রেখেছে। সমাজের মানুষ মনে করে, শুধুমাত্র গৃহস্থালি, পরিবার, ঘরকান্না, বাচ্চা সামলানোর জন্য মেয়েদের জন্ম। কালকের মোকাবেলা সেইসব মানুষদের বিরুদ্ধে, যারা মেয়েদের ব্যাপারে এমন ছোট ধারণা রাখে।”

নিতেশ তেওয়ারী পরিচালিত দাঙ্গাল চলচ্চিত্রে, গীতা কুমারি ফোগাট কমনওয়েলথ গেমসের ফাইনাল খেলার আগের রাতে তার বাবা মহাবীর সিং ফোগাটের সাথে আলাপচারিতায় উঠে আসা এই লাইনগুলো থেকেই আমি আজকের নিবন্ধ শুরু করছি। সামাজিক শিক্ষণ তত্ত্ব কীভাবে দাঙ্গাল চলচ্চিত্রে নারীর প্রতিবন্ধকতা উত্তরণে সহয়াক হয়েছে, সেটা দেখানোর চেষ্টা করবো।

হারিয়ানার ছোট্ট এক গ্রাম বালালির এক জাট পরিবারের গল্প এই দাঙ্গাল চলচ্চিত্রে উঠে এসেছে। আমির খান অভিনীত এই চলচ্চিত্রটি সামাজিক আন্দোলনের একটি অসাধারণ উদাহরণ। হারিয়ানা ইন্ডিয়ার অন্যতম প্রদেশ, যেখানে নারীদের সামাজিক অবস্থান, সোশ্যাল হায়ারার্কির সবচেয়ে নিম্নস্তরে। এখানে নারীদের শিক্ষার হার, জীবন-যাপন ও অধিকারের স্বাধীনতা আশঙ্কাজনকভাবে কম। সেরকম একটি সমাজের মধ্য থেকে গীতাকে যখন কমনওয়েলথ গেমসের সোনাজয়ীর পডিয়ামে দেখা যায়, তখন এই ঘটনাকে মিরাকল বললেই মানানসই হয়।  মিরাকলের পেছনের গল্পটি একইসাথে একটি সংগ্রামের গল্প এবং একজন নারীর প্রতিবন্ধকতা উত্তরণের গল্প। পাশাপাশি গল্পটি আমার আলোচ্য সামাজিক শিক্ষণ তত্ত্বের উদাহরণিক বয়ানও।

চলচ্চিত্রটি বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে তৈরী হয়েছে। ন্যাশনাল লেভেলের মেডেল-জেতা কুস্তিগীর মহাবীর সিং ফোগাট,  তার দুই মেয়ে গীতা কুমারী ফোগাট ও ববিতা কুমারী ফোগাটকে সমাজের শত বাধার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে কুস্তিগীর হিসেবে গড়ে তোলেন। ২০১০ সালে গীতা দিল্লি কমনওয়েলথ গেমসের আসরে ৫৫ কেজি ক্যাটাগরীতে স্বর্ণ জিতে। এবং, ছোটবোন ববিতা জিতে ৫১ কেজি ক্যাটাগরীতে রূপা। ববিতা ২০১৪ সালে গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে বড়ো বোনের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ৫৫ কেজি ক্যাটাগরীতে স্বর্নপদক পান। ২০১২ সালে গীতা প্রথম ভারতীয় নারী কুস্তিগীর হিসেবে অলিম্পিক গেমসে অংশ নেয়ার যোগ্যতা লাভ করে। বর্তমানে এই দুইবোন মিলে আন্তর্জাতিক কুস্তিতে ২৯ টি পদক জিতেছে। বাবা মহাবীর সিংয়ের এই ব্যতিক্রমী ও সংগ্রামী প্রচেষ্টা অসংখ্য নারীকে তাদের নিজস্ব বাধা অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করে।


লেখাটি পিডিএফ কপিতে পড়তে ক্লিক করুন


সামাজিক শিক্ষণ তত্ত্বটি প্রধানত আর্লবার্ট বান্দুরা ও ওয়ালটার্স কর্তৃক ১৯৬৩ প্রণীত হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৭ সালে এর বিস্তারিত ব্যাখ্যার দেখা মেলে। এই তত্ত্বকে পর্যবেক্ষণমূলক শিক্ষণ তত্ত্বও বলা হয়ে থাকে। এই প্রক্রিয়ায় ব্যক্তি তার চারপাশ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে । তার এই শিক্ষা কখনো অন্যের আচরণ দেখে হতে পারে। কখনো তার দেখা আচরণের বিপরীতধর্মী আচরণও সে শিখতে পারে। অর্থাৎ, ব্যক্তি সবসময় যা দেখে ও শিখে, সেই রকম আচরণ নাও করতে পারে। এই তত্ত্বের বাস্তবায়নের অনেকগুলো ধরণ আছে। যেমন, কেউ সহিংস আচরণ দেখে তার পারিপার্শিক পরিবেশ বা কনটেক্সটের কারণে সহিংস আচরণ নাও করতে পারে। আবার, সহিংস আচরণ দেখার পরও সামাজিক শ্রেণী ভিন্নতার কারণে সে সহিংস আচরণে উৎসাহী না হয়ে বরং শান্ত আচরণে উদ্বুদ্ধ হতে পারে। শিশুরা তাদের চারপাশের নানা মডেল থেকে শিক্ষা লাভ করে। বাবা-মা, বন্ধু, সহমনোভাবের গ্রুপ, টিভির কোন চরিত্র ইত্যাদি মডেলের অংশ হতে পারে।

আমরা যদি বান্দুরার ১৯৭৭ এ সংযোজিত গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো লক্ষ্য করি, সেখানে দেখতে পাই যে, তিনি বলছেন, ব্যক্তি তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ থেকে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আচরণ শিখে। এবং, ব্যক্তি যে অবস্থা থেকে শিখেছে, সেরকম পরিস্থিতি তৈরী না হলে তার ভেতর থেকে সেই সহিংস আচরণ করার মতো উৎসাহ তৈরী হয় না এবং তাকে সহিংস আচরণে উদ্বুদ্ধও করে না। সহজভাবে বলতে গেলে, ব্যক্তির আচরণের সবটুকুই তার ভেতরকার মানসিক গড়ন অনুযায়ী হয় না। বরং, অনেককিছুই সে তার চারপাশের পরিবেশ থেকে শিখে নেয়। এবং, সেই শিক্ষণ অনুসারে পরিস্থিতির দাবী অনুযায়ী সে তার আচরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। সামাজিক শ্রেণী, ব্যক্তিপার্থক্য, অবস্থা ও অবস্থানের ধরণ ইত্যাদি বিষয়গুলোও একইসাথে তার সেই শিক্ষণ-আচরণে প্রভাব ফেলে।

চলচ্চিত্রের প্রথমে আমরা দেখতে পাই ন্যাশনাল লেভেল কুস্তি খেলোয়ার মহাবীর সিং ফোগাট তার দক্ষতা প্রদর্শন করছে সহকর্মীর সাথে। সেই সিকোয়েন্সে টিভিতে প্রচারিত কুস্তি চ্যাম্পিয়নশিপ দেখে তার হতাশ মনোভাব বুঝতে পারি। একসময় জীবনের তাগিদে তাকে কুস্তি ছেড়ে অফিসের ডেস্ক বেছে নিতে হয়েছিলো। পরের সিকোয়েন্সে দেখি, তার স্ত্রীকে। গর্ভের অনাগত পুত্রসন্তানকে কুস্তিতে নামানোর আকাঙ্ক্ষা ফোগাটের চোখেমুখে। পরপর দুবার মেয়ে হওয়ার পর তার মধ্যে হতাশা দেখা যায়।

একদিন গ্রামের এক ছেলেকে ২ বোন মিলে যখন মেরে আসে, তখন ফোগাটের মনে হয়, কেনো শুধু ছেলের জন্য আফসোস করছেন তিনি! তার মেয়েরাইতো তার স্বপ্নপূরণের মাধ্যম হতে পারে! সেই থেকে শুরু হয়ে যায় গীতা ও ববিতার কুস্তি ট্রেনিং। অনিচ্ছা, কঠোর পরিশ্রম, বিরক্তি, বিদ্রোহ সবকিছুই গীতা-ববিতাকে সহ্য করতে হয়। বড়ো চুল নিয়ে কুস্তি খেলা অসুবিধাজনক। তাই গীতার চুল ছোট করে কেটে দেয়া হয় ছেলেদের মতো করে।

চুলকাটার সেই দৃশ্য কিংবা যখন তার প্রতিবেশি সুনীতার বিয়েতে সাধারণ মেয়েদের মতো করে দুইবোন চুড়ি-লিপস্টিক ও ওড়না পড়ে নাচতে দেখা যায়, তখন মনে হয়েছিলো আমার যে, মহাবীর সিং ফোগাটের অধিকার নেই তার মেয়েদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দেয়ার। দু’টি মেয়ের উপর নিজের অপূর্ণ স্বপ্নের ভার তুলে দেয়ার অধিকার তার নেই।

কিন্তু, যখন সুনীতার সাথে গীতা-ববিতার একান্ত আলাপে শুনতে পাই যে, সুনীতা বলছে, গীতা-ববিতার মতো বাবা হলে তার ভালো হতো। তাদের বাবা তাদের জন্য অন্তত ভাবছে। তারা যেনো কিছু হতে পারে, সেজন্য তাদের বাবা মানুষের কথা , সমাজের নিন্দা , কোনকিছুরই তোয়াক্কা করছে না। তখন আমি বুঝতে পারি, এই চলচ্চিত্র শুধু একজন ব্যর্থ বাবার কাহিনী নয়। বরং, প্রান্তিক সমাজের একজন মানুষের ভেতরে একজন স্বপ্নশীল মানুষের গল্প। তার অবিরাম চেষ্টা বয়ান।

 সুনীতা বলছিলো, গীতা-ববিতার বাবা তাদের প্রতিষ্ঠিত দেখার জন্য চুল কেটে দিয়েছে। মেয়েলি পোশাক-আশাক ত্যাগে বাধ্য করছে। কঠিন ট্রেনিং এর ভেতর দিয়ে তাদের নিয়ে যাচ্ছে। তাতে মহাবীর সিংয়ের দোষ দেয়া কি যায়! তিনি তো গীতা-ববিতার জন্যই এসব করছেন। সুনীতার আলাপের শেষ সংলাপটুকুর পরে গীতা-ববিতার যে প্রত্যয়ী চেহারা আমি দেখতে পাই, সেটা থেকে বুঝতে পারি, বান্দুরার সামাজিক শিক্ষণ তত্ত্ব এখানে কাজ করছে। সুনীতার কথা গীতা-ববিতার আচরণে পরিবর্তন আনছে।

পরেরদিন সকালে যখন মহাবীর ঘুম থেকে উঠে বিছানায় মেয়েদের না দেখে বিচলিত হয়ে দেখেন যে, আখড়ায় ট্রেনিং করছে দুইবোন, তখন তিনি অবাক হলেও খুশি হন। সামাজিক শিক্ষণ তাদের উদ্বুদ্ধ করে কিছু করে দেখানোর জন্য। বাবার স্বপ্নকে তাদের নিজেদের স্বপ্ন বলে মনে হতে থাকে।

স্বপ্ন মিলে গেলেও সমাজ তার খড়গহস্ত নিয়ে তৈরী থাকে তাদের ঠেকাতে। আমরা দেখি, বিভিন্ন খেলায় আয়োজকরা মেয়ের অংশগ্রহণ করতে দিতে অস্বীকৃতি জানায়। অনেক কুস্তিগীর মেয়েদের সাথে লড়তে অনিচ্ছা প্রকাশ করে। কিন্তু, মহাবীর ও গীতা-ববিতার পথচলা মোটেও দমে যায় না। তারা তাদের যোগ্যতা দিয়ে খেলার সাথে সাথে জিততে থাকে মানুষের মন।

এই যে বিভিন্ন পর্যায়ে মানুষের বাধা, হেয় করার চেষ্টা, মেয়ে হিসেবে অদ্ভূত ও অহেতুক তীব্র ঘৃণা, লাঞ্চনা, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা, এই সবকিছুই পর্যবেক্ষণের উপাদান হয়ে গীতা-ববিতাতে উদ্বুদ্ধ করে, কিছু করে দেখানোর জন্য। এইখানেই চলচ্চিত্র ও সামাজিক শিক্ষণ তত্ত্ব একসাথে মিলেমিশে যায়।

গীতা-ববিতার হারিয়ানা ন্যাশনাল টিমে সিলেক্ট হওয়ার পর স্কুল তাদের সম্মান দেয়। কিন্তু, যখন মহাবীর তার অফিস থেকে মেয়েকে ট্রেনিং এর জন্য প্রস্তুত করানোর নিমিত্তে ২ মাসের ছুটি চান, তখন বস বলে দেয় যে, মেয়ের বিয়ের ব্যাপার হলে ভেবে দেখা যেতো। কিন্তু, এইসব ট্রেনিংয়ের কাজে তাকে ছুটি দেয়া সম্ভব নয়। তখন আমরা বুঝতে পারি যে, যোগ্যাতা থাকার পরেও একজন মেয়েকে সমাজ কতোরকম প্রতিবন্ধকতা তৈরী করে রাখে তার এগিয়ে যাওয়ার পথে।

মেয়ের ট্রেনিংয়ের জন্য যখন মহাবীর ফোগাট তার চাকরী ছেড়ে দিয়ে জমিচাষের মতো কঠিন কাজে নামার সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন, তখন বাবা হিসেবে তাকে বড়ো মানুষ মনে হয়। মেয়েদের জোর করে ছেলের মতো শক্ত করে তোলার নির্মম কাজটুকুর জন্য তাকে আর অপরাধী ভাবতে পারি না। সাব ‍জুনিয়ার চ্যাম্পিয়ণশিপের আগে বাজারের যে মুরগীর দোকানদার স্বল্পদামে ও স্পন্সর চুক্তির মতো একরকম চুক্তিতে মুরগী দিতে দ্বিধা করছিলো, চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর তাকে গীতার ছবির হোর্ডিং, দোকানের বাইরে লাগিয়ে পোজ দিয়ে ছবি তুলতে দেখা যায়। জুনিয়র চ্যাম্য়িণশিপ এবং ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ণশিপে গোল্ড জেতার পরও আমরা তাকে খুশি হয়ে একই কাজ করতে দেখি। এবং, ন্যাশনালের পর এলাকার মানুষ যে মিছিল বের করে গীতার জন্য, সেটাও আমাকে অবাক করার পাশাপাশি আনন্দিতও করে।

এই সাধারণ মুরগী বিক্রেতা কিংবা আমজনতার খুশির প্রকাশকে শুধু সাধারণ খুশি বলে মনে করি না আমি। আমার মনে হয়, এগুলো গীতার যোগ্যতার একধরণের স্বীকৃতিও। যা তাকে কঠিন পরিশ্রম-অধ্যাবসায় ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে অর্জন করতে হয়েছে।

গীতা-ববিতা ক্রমেই তাদের চারপাশের এইসব স্বীকৃতি থেকেও শিক্ষা লাভ করছিলো। বান্দুরা তার তত্ত্বে বলেছেন, যে আচরণ বা কাজের জন্য ব্যক্তি পুরষ্কৃত হয়, প্রশংসিত হয়, সেসব কাজ অবচেতনেই তার করতে ভালো লাগে। সেই থেকে ধারণা করি, গীতা-ববিতার ক্রমশ উন্নতি কিংবা বাধা পেরোনোর পেছনে সহায়ক শক্তি হিসেবে সামাজিক শিক্ষণ তত্ত্বের কিছুটা হলেও ভূমিকা রয়েছে।

চলচ্চিত্রের মাঝামাঝি সময়ে আমরা দেখি, গীতা ন্যাশনাল স্পোর্টস একাডেমিতে ভর্তি হয়। নতুন কোচের অধীনে নতুন টেকনিক শিখে। নতুন পরিবেশ তার সব সময়কার কঠিন প্রশিক্ষণ ও জোরদার মনোবলকে ক্রমশ দুর্বল করে দেয় নিজের অজান্তে। ছুটিতে বাড়ি ফিরে বাবার সাথে কুস্তির টেকনিক নিয়ে বাক-বিতন্ডা হয়। আখড়াতে বাবার সাথে লড়তে দেখা যায়। বাবার টেকনিকে বিশ্বাস রেখে এতোদূর আসা গীতাকে তখন অপরিচিত লাগে। পরের ম্যাচগুলোতে গীতার হেরে যাওয়াটা নিয়মিত হতে থাকে। গীতাকে চুল বড়ো করতে ও নেলপলিশে হাত রাঙাতে দেখি। যেটা আমার কাছে নতুন মনে হয়। এই সময়গুলোতে পুরনো গীতার সেই অনমনীয় মনোভাব, সাহস, লড়াইয়ের ক্ষীপ্রতা দেখতে পাই না।

অপরদিকে বাবার নিবিড় তত্ত্বাবধানে থাকা স্বল্পসুবিধা নিয়ে কঠোর পরিশ্রমী ববিতার ক্রমশ উন্নতি দেখা যায়। ম্যাচের পর ম্যাচ জিতে চলে সে। গীতার অধঃপতন আমার চোখে কষ্টকর হলেও আমি বুঝতে পারি, বান্দুরা এখানে আছেন। গীতার চারপাশের রঙিন দুনিয়া তাকে বদলে দিচ্ছিলো। বালালি গায়ের সেই কঠোর পরিশ্রমী, স্বপ্নশীল, সমাজের বিরুদ্ধে স্থির দাঁড়িয়ে লড়াই করা গীতা, আর এই শহুরে আয়েশী জীবন ও রঙিন সময়ের হাতছানিতে বিভোর গীতা, মোটেও এক নয়। তার চারপাশ তাকে পরিবর্তিত করছে। সে শিখছে চারপাশ থেকে। সেই অনুসারেই পরিবর্তিত হচ্ছে তার আচরণ। একাডেমির এসিকরা ইনডোর রুম, নরম ম্যাট, নিয়মিত খাবার, আরামের বিছানা পাল্টে দিচ্ছে তার মনের গড়ন। বান্দুরার পর্যবেক্ষণ থিওরীর প্রত্যক্ষ প্রভাব দেখে অবাক হই।

একসময় গীতার পুনরায় বাবার জগতে ফিরে যাওয়া দেখতে পাই। নিজের হাতে নিজের বড়ো হয়ে যাওয়া চুল কাটতে দেখি। কঠোর পরিশ্রম করতে দেখি। একইসাথে দেখি আগের গীতার সেই ম্যাচ জিতে যাওয়ার নিয়মিত দৃশ্য। এই যে গীতার ভুল বুঝতে পারা, অনুধাবন এইসবকিছুর পেছনে পর্যবেক্ষণের গভীর প্রভাব রয়েছে।

একটি দৃশ্যে আমাদের আলোচিত সেই মুরগীর দোকানদারকে দেখি তার দুই মেয়েকে সাথে নিয়ে গীতার খেলা দেখতে আসছে। তাদের মধ্যে একটি মেয়ে গীতার জন্য প্রসাদ নিয়ে এসেছে। কারণ, কালকে ফাইনাল। গীতা দিদিকেতো জিততেই হবে! এই যে মেয়ে দুটোর মধ্যে গীতার প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা এটাই পর্যবেক্ষণের মধ্য দিয়ে শিক্ষায় রূপ নেবে। মেয়ে দুটোর ভবিষ্যতের স্বপ্নকে হয়তো পাল্টে দিবে। সামজিক শিক্ষণ তত্ত্ব এই ছোট মেয়েদুটোর অজান্তেই তাদের আচরণকে, তাদের ভাবনাকে প্রভাবিত করছে।

আমাদের মুরগীর দোকানদার, চলচ্চিত্রের বিশাল ক্যানভাসে খুব ছোট এবং নগণ্য মনে হলেও আমার কাছে তাকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। মনে হয়, সমাজের যে শ্রেণী থেকে মহাবীর সিং, গীতা-ববিতা উঠে এসেছে, সেই সমাজের প্রতিনিধিত্ব করছে মুরগীর দোকানদার- সামীর ভাই। এই যে গীতাকে, একজন নারীকে সম্মান দেয়া, মেনে নেয়া, তার যোগ্যতা স্বীকার করা এই সবকিছুই সামীর ভাইয়ের মধ্য দিয়ে পুরো সমাজই যেনো কাজগুলো করছে। গীতাকে অন্যঅর্থে একটি মেয়েকে বড়ো হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে। যেটা হারিয়ানার সেই সমাজে অসম্ভব কাজ ছিলো।

মানুষের আচরণের এই পরিবর্তনও সামাজিক শিক্ষণ তত্ত্বেরই বহিঃপ্রকাশ। তারা তাদের প্রথাবদ্ধ ধারণার বাইরে আচরণ করতে শিখছে। গীতা তাদের পরোক্ষ প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে। অবচেতনেই তারা মেনে নিচ্ছে যে, মেয়েরাও পারে। হয়তো সচেতনভাবে তারা এটা স্বীকার করার সাহস রাখে না কিংবা ইচ্ছাও রাখে না। তবুও তাদের আচরণে পরিবর্তিত হচ্ছে। বান্দুরা এটাই বলতে চেয়েছেন বলে আমি মনে করি।

ফাইনাল ম্যাচের আগের রাতে বাবার সাথে গীতার আলাপচারিতার একটি অংশ আমি প্রথমেই উল্লেখ করেছি। নারীদের যে অবস্থানে হারিয়ানার সমাজ রাখতে চায়, সেই অবস্থান বা ভাবনা শুধু হারিয়ানার নয়। আমাদের দেশেও এই ভাবনা সমাজের মধ্যকার বেশিরভাগ মানুষের। গীতা-ববিতা তাদের যোগ্যতা দিয়ে স্বীকৃত আদায় করে নিয়েছে। আমাদের সমাজেও অসংখ্য যোগ্যতাসম্পন্ন নারীরা একইভাবে প্রমাণ করছে, নারী কোন অংশেই পুরুষের তুলনায় ছোট নয়। এবং, ঘরদোর-সংসার, সন্তান জন্ম ও প্রতিপালনের জন্যই কেবল নারীর জন্ম হয় নি। এই কাজগুলোতে সমানভাবে পুরুষেরও অংশগ্রহণ থাকতে হবে।

চলচ্চিত্রটি হারিয়ানার একটি পরিবারের গল্প বলার মধ্য দিয়ে আমাদের বলে যায়, জোরপূর্বক দমিয়ে রাখা নারীদের জয়কাহিনী। সামাজিক শিক্ষণ তত্ত্বের পাশাপাশি পরিবারের পজিটিভ বা সম্মতি ও সহায়ক মনোভাব আমাদের সমাজের নারীদের এগিয়ে যাওয়ার পথকে সুগম ও সহজ করে তুলতে পারে। বান্দুরার তত্ত্ব প্রমাণের সাথে সাথে নারীর ক্ষমতায়নে সচেতনতা, সামাজিক মর্যাদার উন্নয়নে সোচ্চার হওয়ার শিক্ষা দেয় আমির খানের দাঙ্গাল চলচ্চিত্র। একটি এন্টারটেইনিং কনটেন্ট হওয়ার সাথে সাথে মুভিটি হয়ে উঠেছে সামাজিক পরিবর্তন বা সোশ্যাল রেভুলেশনের একটি অনুষঙ্গ।

পরিচালক নিতেশ তেওয়ারীকে ধন্যবাদ এমন একটি মাস্টারপিসের জন্য। মহাবীর সিং ফোগাটের ভূমিকায় অনবদ্য অভিনয় করেছেন আমির খান। এই মুভিটির সঠিক চিত্রায়নের স্বার্থে তিনি ২২ কেজি ওজন বাড়িয়েছেন। একজন রাগী, বিরক্তিকর একইসাথে স্নেহশীল ট্রাডিশনাল বাবা হিসেবে তাকে চমৎকার মানিয়ে গেছে। মায়ের চরিত্রে শাকসি তানওয়ারও ভালো অভিনয় করেছেন। গীতার ও ববিতার চরিত্র রূপদান করেছেন ফাতিমা সানা শেখ ও যারা ওয়াসিম। তাদের অনবদ্য অভিনয় নিয়ে কিছু বলার নেই। গীতা-ববিতার কাজিনের চরিত্রে অভিনয় করা অপারশাক্তি খুরানার কমেডিধর্মী উপস্থাপনা বাড়তি সাবলিলতা যুক্ত করেছে।

চলচ্চিত্রের টেকনিক্যাল বিষয়াদি আমাদের আলোচনার মৌলিক অংশ না হওয়ায় সেসব এড়িয়ে গিয়েছি। কাটখোট্টা সমালোচনার চেয়ে সামাজিক বাধা উত্তরণের ক্ষেত্রে নারীর অবস্থানিক ধরণ তুলে ধরায় মনোযোগী হতে চেষ্টা করেছি। আর্লবার্ট বান্দুরার সামাজিক শিক্ষণ তত্ত্বের প্রায়োগিক উদাহরণ দেখানোর মধ্য দিয়ে দাঙ্গাল চলচ্চিত্রের পর্যালোচনা করার প্রয়াস, আমার মতো শিক্ষানবিশের জন্য সাহসী কাজ বলা যায়। নিবন্ধের সীমিত কলেবরে সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি ভালোকিছু বিষয় তুলে ধরার।

সমাজে নারীদের চলার পথ সহজ হোক। প্রতিবন্ধকতা উত্তরণে সহযোগী কিংবা সহযাত্রী হিসেবে মহাবীর সিং ফোগাটের মতো মানুষেরা এগিয়ে আসুক। নারী-পুরুষের সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক সামাজিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত হোক।

তথ্যসূত্রঃ

১. এল ডি ফ্লায়ার, মেলভিন/জে বল-রোকেশ, স্যান্ড্রা (১৯৯৩)। গণযোগাযোগ তত্ত্বাবলী। ঢাকা। বাংলা একাডেমি।
২. ভাট, রোহিত (২৭/০৭/২০১৭)। হিন্দুস্থান টাইমস । নতুন দিল্লী, ইন্ডিয়া।
৩. চ্যাটার্জি, শৈবাল (১৩/০১/২০১৭)। এন.ডি. টিভি । নতুন দিল্লী, ইন্ডিয়া।
৪. গুপ্তা, শুভ্রা (২৪/১২/২০১৬)। দ্যা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস । নইদা, ইন্ডিয়া।
৫. জোশি, নাম্রাতা (২২/১২/২০১৬)। দ্যা হিন্দু । চেন্নাই, ইন্ডিয়া।
৬. আইয়ার, মিনা (২৫/০১/২০১৭)। ইন্ডিয়া টাইমস । হারিয়ানা, ইন্ডিয়া।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।