একটি দলছুট শালিকের বিষণ্ন দিনরাত্রি

তখন আমরা গ্রামের বাড়িতে থাকি। বৃষ্টি হচ্ছে কয়েকদিন ধরে একটানা। চারপাশে কাদামাটি মাখামাখি। আমাদের টিনের ঘরের মাটির মেঝে স্যাতস্যাতে হয়ে আছে। দুপুরের ভাত খেতে খেতে আমি দেখছিলাম উঠোনে বসে থাকা মনোযোগী একদল শালিকের দিকে। ছোট্ট ছোট্ট উড়ান দিয়ে তারা মাটি থেকে খুঁটে খাচ্ছিলো কিছু। সম্ভবত পোকা-মাকড়ই হবে।

আমি মায়ের কাছে জানতে চাইলাম, এই শালিকগুলোকে কী শালিক বলে? মা জানালেন, এগুলোর নাম ভাত শালিক। কিছু ধূসররঙা শালিকগুলো চটপট উড়ে বেড়াচ্ছে। এরইমধ্যে কিছুটা দূরে একাকী দাঁড়িয়ে থাকা একটা শালিকের দিকে দৃষ্টি পড়লো। মনে হলো, শালিকটা তার দলবল রেখে একা দাঁড়িয়ে আছে কেনো! মাকে আমার ধরলাম। মা বললেন, এই শালিকটি দলনেতা। তাই, দূরে দাঁড়িয়ে দলের অগ্রগামী সদস্য হিসেবে দলকে রক্ষা করছে। সব শালিকের দলেই নাকি এমন কেউ থাকে। এরা হলো পাহারাদার!

তারপর থেকে আমি নিয়মিত শালিক খুঁজতাম। শালিকের ঝাঁক আমাকে টানতো। সেইবার বৃষ্টির নিয়মিত বর্ষণে ডুবে গিয়েছিলো সব ফসলী মাঠ। পানি থইথই করতো আমাদের চাচার ঘরে। বর্ষা একসময় চলেও গেলো। কিন্তু, আমার মাথায় ঢুকে যাওয়া  দলছুট শালিক আর গেলো না।

ঢাকায় চলে এসেছি ততোদিনে। আমাদের উঠোনের সেই শালিকের কথা তখন আর মনে নেই। শিক্ষিত হওয়ার নিদারুণ চেষ্টায় পড়াশোনায় খুব মন দিয়ে লেগে আছি। ক্লাসে ভালো ছাত্রদের তালিকায় নাম উঠে গেলো। এক্সামে বন্ধুদের একজন নাম্বার বেশি পেয়ে ফার্স্ট হয়ে গেলো। আমাদের সবার তাতে কী ভীষণ মন খারাপ! আস্তে আস্তে দিন যেতে লাগলো। তিনজনের একটা ঘনিষ্ট সার্কেলে আমরা নানা ধরণের দারুনসব কাজ করি। প্রতিষ্ঠানের নিষেধ থাকার পরও ঘন্টার পর ঘন্টা বই পড়ি। রাত কেটে যায় আড্ডা গল্পে বই আলোচনায়।

হঠাৎ আমার দৃষ্টিতে কিছুটা বৈসাদৃশ্য ধরা পড়লো। তিনজনের গ্রুপ ক্রমশঃ ২ জন + ১ জন = ৩ জনে পরিণত হলো। অন্য দু’জনের নিজস্ব গল্প তৈরী হতে থাকলো। আমাদের অখন্ড সময়গুলো খন্ডিত হলো। খুব অভিমান হতো আমার তখন। অন্য আরেকজন সদস্য দখল করলো আমার স্থান। খুব সাধারণ এই ব্যাপারগুলো আমার কাছে তখন ভীষণ অচেনা লাগতো। আমি কোনভাবেই বুঝে উঠতে পারতাম না, কেনো আমাকে সার্কেলের বাইরে বের করে দেয়া হচ্ছিলো। সামাজিক না হওয়ায় হয়তো ওরা আমার উপর বিরক্ত হতো। কিংবা, হতে পারে সার্কেলে আমার দেয়া সময়, কনটেন্ট ইত্যাদি ওদের মনমতো হতো না। এখন এই সময়ে কমিউনিকেশনের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে কিছু ব্যাপার ব্যাখ্যা করতে পারি। বুঝতে পারি, আমাদের ট্রায়াডের  যৌগ ভেঙে ভিন্ন আরেকটা ডায়াডের জন্ম হয়েছিলো। ত্রিপক্ষীয় সম্পর্কের সার্কেল বদলে গিয়ে একটি দ্বিপক্ষীয় ও একটি একপক্ষীয় সার্কেল গড়ে উঠেছিলো। এই সার্কেলের বাইরে অনিচ্ছুক  বের হয়ে যাওয়ার শুরুটা আমার তখন থেকেই হয়তো।

সার্কেল ভাঙার কষ্টটা আমাকে যথেষ্ট রকমের ভোগালো। সাইক্রিয়াটিস্টের সাহায্য নিতে হয়েছিলো এই কঠিন দুঃখের বৃত্তটা থেকে মুক্ত হতে। তারপর জীবন তার গতিতে চলতে থেকেছে। আমিও বিভিন্ন ধাপ আর সময়ের শিক্ষার মধ্য দিয়ে বেুঝতে শিখেছি নিজেকে। এবং, আর কখনো আমার সেইসময়কার মতো দারুন সার্কেল গড়ে উঠে নি। যেখানেই গিয়েছি, চারপাশের সবাই নানা কারণে আমার সাথে সম্পর্ক গড়ে নিতো। আমিও খুব দ্রুত মিশে যেতে পারতাম।  হাজারো মানুষের বিশাল সারি আমার লগবইয়ের লাইনে লাইনে ভিড় করে আছে। তারা এসেছে। হারিয়ে গেছে। আমাকে কেউ কখনো সাথে নিতে চায় নি। আমি বুঝে গিয়েছি ততোদিনে, কারো সাথে রাখার মতো দামী কেউ না আমি।

তখন থেকেই নিয়মিত বিরতিতে সরে যেতে চেয়েছি জীবনের প্রাত্যহিকতার হাত থেকে। মা-বাবার সাথে শীতল একটা সম্পর্কের কারণে এই সরে যাওয়ার ব্যাপারটা কখনো উনারা বুঝতে পারেন নি। ফিরে আসার টান কখনো বোধ করতাম না। নানা জায়গায় কখনো পেয়িং গেস্ট, কখনো জায়গীর, কখনো কাজের সহায়তাকারীর ভূমিকায় পার করেছি সময়। জীবনকে হয়তো তখন থেকেই অনেকটা নির্মোহ দৃষ্টিতে দেখতে শিখেছি। এ্যাম্বিশন শূন্য হয়েও যে খুব বেঁচে থাকা সম্ভব, সেটা আমি সেই সময় জেনেছিলাম।

এর মধ্যে হঠাৎ প্রেমে পড়লাম। অন্তরাকে দেখে জীবনকে আবার একটু দেখে নিতে ইচ্ছা হলো। মনো হলো, অনেক হয়েছে। এবার বিশ্রাম নেয়া যায়। বিয়ে করলাম। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম ৭ বছরের বিশাল গ্যাপ মেনে নিয়ে। ভালো থাকতে শুরু করেছি। ওজন নিয়মিত হারে বেড়েছে। ভেবেছি,  আমার নিশ্চিন্ত থাকার সময় শুরু হয়ে গিয়েছে বুঝি। আমি ভালো আছি, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু, অদ্ভূত এক শূন্যতা আমার ভেতরের কোথায় যেনো ঝিঁঝিঁ পোকার ডাকের মতো তীক্ষ্ণশব্দে বেজে যায়। সবগ্রুপ থেকে বের করে দেয়ার সেই পুরনো ব্যাপারগুলো আবার ফেরৎ চলে আসছে!

আমার আশেপাশের বন্ধুরা, যাদের সাথে আমি দিনের সবচে বেশি সময় কাটাই, তাদের চিন্তার ধরণ আমাকে কঠিনভাবে আহত করে। আমার একজন মেয়ে বন্ধু যখন তার জীবনের সবচে সুন্দর সময়টুকু কাটাতে গিয়ে অস্বস্তিতে পড়ে কিংবা অনিরাপদ মনে করে তার চারপাশকে, তখন আমার ভীষণ কষ্ট হয়। এই অনিরাপত্তার জন্য দায়ী আমার আশেপাশের মানুষগুলো, যারা আমার বহুদিনের পরিচিত!

রাজ্যের নানা বিষয় জানার আছে! আড্ডায় আলোচনা হতে পারে এমন হাজারটা অনুষঙ্গ ছড়িয়ে আছে আমাদের চারপাশে। সেসবের পরিবর্তে আড্ডা যখন খুব ন্যারো ওয়েতে  চলতে থাকে ফালতুসব বিষয় নিয়ে, তখন আমি হতাশ হই। আমি হতাশ হই, যখন দেখি একজন সুন্দর পোশাক পড়া, দেখতে-স্মার্ট মানুষটি রাস্তায় হেঁটে যাওয়া একজন মেয়ের শরীর মাপছে পরম আগ্রহে! কিংবা, অহেতুক মন্তব্য ছুঁড়ে দিচ্ছে তার দিকে। একজন বন্ধু হয়েও যখন নানা অজুহাতে উদ্দেশ্যমূলকভাবে নিজের মেয়েবন্ধুর গায়ে হাত রাখছে কোন বন্ধু নামের পার্ভার্টপশু,  তখন আমার রাগে চোখে পানি চলে আসে। আমি লজ্জিত হয়ে সংকোচিত হয়ে যাই। নিজের প্রতিই ঘৃণা লাগে।

সবসময় তীব্র ও প্রমাণসাইজের প্রতিবাদ করতে পারি না বলে একজন কাপুরুষের লজ্জা নিয়ে প্রতিদিন ঘুমোতে যাই। এই অনিরাপত্তার জন্য আমার মতো কিছু হিপোক্রেট নিজেদের দায় এড়াতে পারবো না কখনো। আমার এই হতাশা, ক্ষোভ ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। আমার ছোটবোন কৈশোরে পা দিয়েছে। ওর সামনে আমি কোন্ পৃথিবী হাজির করছি, ভাবলেই ভয় করে। একজন মেয়ে এই সমাজে কী পরিমাণ অনিরাপদ, সে কথা ভাবার সময়, আমাদের মতো হিপোক্রেট পুরুষদের হয় না! এইসব ভাবনা অন্যদের ভাবায় না। ফলে, আমি বরাবরের মতো আবারো সার্কেলের বাইরে নিক্ষিপ্ত হই।

প্রিয় বন্ধুরা বিরক্ত হয়। তাদের কষ্টের ভাগ আমি নিতে পারি না বলে। আমার মা-বোন, স্ত্রী, মেয়ে বন্ধুদের যে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে  পথ চলতে হয়, সেটা যখন বুঝতে শিখেছি, তখন চরমভাবে কোনঠাঁসা বোধ করতাম। এইসব সমস্যার সমাধান করতে পারি না। নিরাপদ পরিবেশ দিতে পারি না তাদের জন্য। আমি যখন এর বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলছি, তখন একঘরে হয়ে যাচ্ছি ক্রমশ..। দলছুট আমার তখন ভয়ানক কষ্ট হয়।

আমি জানি না, কেনো আমার জায়গা কখনো কোন সার্কেলে স্থায়ী হয়ে উঠে না। অজান্তেই স্বীকার করি, নিশ্চয়ই দোষ আমারই। নাহলে সব সার্কেল থেকে আমাকে বাইরে ছিটকে পড়তে হবে কেনো…! ইদানিং আমার সেই ছোটবেলার বৃষ্টিস্নাত উঠোনে, একলা দাঁড়ানো শালিকের কথা খুব মনে পড়ে। এখন আমি ভাবি, সেই শালিকটা আসলে দলছুট একটা পাখি। তাকে কখনো দলে নেয়া হয় না। দিনের পর দিন সার্কেলের একজন হওয়ার আশা ও চেষ্টায় কেটে যায় সময়। আশা কখনোই পুরণ হয় না। নিজেকে আজকাল সেই দলছুট শালিকের মতো মনে হয়। যার কখনোই কোন সার্কেল হবে না। শুধু চলতে থাকবে ছিটকে পড়ার পালা।

তবুও আমি শিড়দাঁড়া উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে চাই। চাই আমার প্রিয়জনদের জন্য একটা নিরাপদ পরিবেশ গড়ে দিতে। যেখানে আমার মা-বোন, স্ত্রী, প্রিয় বন্ধু কেউ আর অনিরাপদ মনে করবে না নিজেকে। যেখানে ছেলে বন্ধুরা মেয়ে বন্ধুদের জন্য নিরাপত্তার চাদর হয়ে ঘিরে রাখবে সবসময়। তাদের হাসিগুলো কখনোই নৃপুংশক কোন অ-মানুষের বিষাক্ত নিঃশ্বাসে দুষিত হবে না। এই দূষিত বাতাস আমি রুখে দিবোই।

দলছুট হয়ে পড়ার কষ্টটুকু প্রকাশের সাধ্য আমার শব্দের নেই। এই অভিজ্ঞতা যেনো আমার শত্রুরও না হয়। তাই, পাবো না জেনেও প্রাণপণে কামনা করি, সৃষ্টা যেনো আমার প্রিয়জনদের সার্কেলে আমার জন্য ছোট্ট হলেও একটু জায়গা বরাদ্দ রাখেন।

ভীষণ মন খারাপের দিন-রাত কাটছে আজকাল। একজন মানুষের ক্রমান্বয়ে খোলসে বন্দি হওয়ার এইসব দিনরাত্রি চরম বিষণ্নতার। দলছুট শালিকের মতো আহত হৃদয়ের ক্ষত ভোলার অহেতুক চেষ্টায় অগোছালো এই নোট লিখলাম। আবারো কোন সার্কেল থেকে ছিটকে পড়ার সময়ে না হয় পড়ে দেখব!

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।