জনারণ্যে খুঁজে ফিরি আপনার স্বজন…পথ-লিপি – ১

ছবিটি প্রতিকী। মূল দোকানের ছবি উঠানো সম্ভব হয় নি।

“ঐ মামা, একটা বার্গার দ্যান তো…” “কত হইছে ভাই..” “আরেকটু সস দিয়েন তো..” এটি একটি স্পেশাল বার্গারের দোকানের প্রতিমুহুর্তের কলরব..। স্পেশাল বলছি কেনো জানেন? এখানে বার্গার পাওয়া যায় মাত্র ১২ টাকায়! এই বিশেষ বার্গারের সাথে আপনার দেখা দামী এয়ারকন্ডিশনড দোকানের বার্গারের কোন মিল খুঁজে পাবেন না কখনো। হয়তো কেউ কেউ বলবেন এইসব ছাইপাশ খেলে অসুস্থ হওয়া অনিবার্য। কেউ হয়তো নাক কুচকাবেন..। তবে, বাউন্ডুলে জীবনের এই এক সুবিধা..। ছন্নছাড়া গন্তব্যহীন জীবন…। বন্ধু, ভালোবাসা, সুন্দর নরম বিছানা কিংবা, পরিমিত নিত্যাচার সবকিছুই সেখানে শূণ্যের কোঠায়। শুধুই বেঁচে থাকা…। দোকানের কোন ছাদ নেই। বরং, আছে তারচেয়ে মহান কিছু; মাথার অনেক উপরে সুবিশাল আকাশের সামিয়ানা..। ছোট্ট একটা হ্যাজাক বাতির শো-শো শব্দ..। ফুটপাথের পাশে দাঁড়ানো জীর্ন এই দোকানটি প্রতিদিন বিকালে আসে!! রাতে বাড়ি ফেরে তার মালিকের সাথে ..!! দোকানের পাশ ঘেষে আঁকাবাঁকা চলে গেছে নিলাম্বর সাহা রোড..। নিয়ণের বিবর্ণ আলোয় বর্ণিল পিচের রাস্তায় সুড়কি-উঠা ক্ষত…। আমার বাসার রাস্তা এটাই। প্রতিদিন যেতে যেতে ভাবি, নিলাম্বর সাহা লোকটা কে, খোঁজ নেবো..। আর খোঁজ নেয়া হয় না। এমনই চলছে বহুদিন ধরে..। দোকানের মালিকের নাম রাজা মিয়া..। কেউ রাজা ভাই, কেউ মামা, আবার কেউ শুধু রাজা বলেই ডাকে..। ছোটখাটো মানুষ। গায়ে পুরোনো ময়লা জামা। চোখে মোটা গ্লাসের আদিকালের ফ্রেমের চশমা..। চুপচাপ মানুষ। কথা বলতে খুব একটা পছন্দ করেন না..। হাসেন খুব সুন্দর করে..। সবসময় হাসেন না আমাদের রাজা মিয়া। যখন কেউ রূঢ় আচরন করে তার সাথে, তখনিই কেবল তার অপূর্ব হাসিটার দেখা মেলে। বিকাল থেকে শুরু হয় রাজা মিয়ার কর্মযজ্ঞ।তার ভাষায় ‘ব্যবসাপাতি..’। বাড়ি বরিশালে..। অনেক প্রশ্ন করেও এর বেশি জানতে পারি নি..। সবসময় মাথা ঝুকে থাকে বুকের উপর..। মনে হয় যেনো রাজ্যের সব ব্যর্থতা, জীবনের সকল অপূর্ণতা বহন করতে হচ্ছে তাকে। নূব্জ্য হয়ে বেঁকে যাচ্ছে তার কাঁধ..। কাজের ফাঁকে গভীর দৃষ্টির আড়ালে কোথায় যেনো হারিয়ে যায় তার বর্তমান। আমি ভাবি..। চোখের অতলস্পর্শী অবোধ্য অন্তর্যাত্রার সেই নৈঃশব্দিক পরিভ্রমণের সীমানা খোঁজার সাধ্য আমার হয় না। তবে, আমি খুব বুঝতে পারি, এই হারিয়ে যাওয়ার অন্তরালে কতো শতো হাজারো রংবেরংয়ের লাল-নীল বেদনারা ঘুমিয়ে থাকে..। আমি দেখি তার সুকোমল চোখের অনিঃশেষ উদারতা…। একদিন হঠাৎ বললেন, ‘‘জানেন ভাই, ছোট্ট মেয়েটার অনেক অসুখ..। চিকিৎসা করানোর মতো টাকাও হাতে নাই। কি যে করি..। ’’ চোখটা ছলছল করে ওঠে যেনো ক্ষণিকের জন্য..। আমি পকেটে হাত দিই। রাজা ভাই তার বিখ্যাত সুন্দর হাসিটা আবার জাগিয়ে তুলেন চেহারার সবটুকু জুড়ে..। বলেন, “না ভাই, টাকা লাগবো না..। কারো কাছ থেইকা কিছু নিলে, তারে কিছু দিতেও হয়..। আপনারে আমি কি দিমু কন..? ” উনি আমার কাছ থেকে টাকাটা নেন না..। আমার আঙুলগুলো নোটটা জড়িয়ে চুপচাপ স্থির হয়ে থাকে..। আমি ভাবি, মানুষগুলো এতো বড়ো হয় কি করে…। আকাশের বিশালতা কি করে ধারণ করে বুকের ভেতর..। এতো দুঃখেও কি করে এমন আন্তরিক হাসতে পারে রাজা মিয়ারা…..।

    1. ধন্যবাদ মন্তব্যর জন্য। আমার মনে হয়, আমার লেখার চেয়েও এইসব প্রান্তিক মানুষদের জীবন অনেক বেশি ভাবনাময় এবং অনেক বেশি বিচিত্র। শুধু আমরাই খোঁজ পাই না এইসব সাধারণ কিন্তু শতভাগ সজীবন জীবনের। শুভ কামনা রেখে যাচ্ছি। ভালো থাকুন।

    1. অনেক ধন্যবাদ দাদা। নিজের ডায়েরী লিখেছি। আরও লিখবো। অনেক লেখার প্লট জমা হয়ে আছে মাথায়। সময় হচ্ছে না। দোয়া করবেন। 🙂 ফিরতি শুভ কামনা রইলো আপনার জন্যও।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।