একজন স্ট্রীট ম্যাজিশিয়ান ও রূপকথার জাদুকরের গল্প

জনারণ্যে খুঁজে ফিরি আপনার স্বজন…পথ-লিপি – ২

”দেহেন ভাই, আমার হাতে কয়ডা কার্ড? তিনডা? আমি দেখতাছি চাইরডা। বাইর কইরা দেহান তো…” এভাবেই ঢাকার নগরকর্তার বাড়ির সামনে, ওসমানী উদ্যানের লাগোয়া ফুটপাথের অনাড়ম্বর আর ধুলোমলিন স্টেজে ম্যাজিক দেখাচ্ছিলেন আমার শৈশবের স্বপ্নের জাদুকর হ্যারি হুডিনী। অবাক হলেন তো? অবাক হবারই কথা। বিশ্বের খ্যাতনামা ম্যাজিশিয়ান হুডিনীর কী প্রয়োজন হলো যে, তিনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে শো করবেন!
আমি আসলে গল্প বলছি। ছোট্ট এক কিশোরের গল্প। অশুদ্ধ বাংলায় কথা বলা এক ছোট্ট ম্যাজিশিয়ানের প্রতিদিনকার গল্প। যে জানে না, ম্যাজিক আমাদের সমাজে মনোরঞ্জনের উপকরণ। সে শুধু জানে, অন্তত কয়েকটা ম্যাজিকের সামগ্রী বিক্রি করতে না পারলে তার ছোট্ট বোনটি রাস্তার সস্তা হোটেলেও খেতে পাবে না।
অফিস ফেরৎ আমি দাঁড়ালাম ম্যাজিক দেখবো বলে। একটি শতচ্ছিন্ন ব্যাগে অল্প কিছু পুরোনো ম্যাজিকের উপকরণ, একটা প্লাস্টিকের বস্তা, একটা এনার্জি বাল্ব, মলিন কিছু ছেড়া পোশাক, ছোট্ট এক বোন নিয়েই তার সংসার। মা আছেন কোথাও কাজে। জানতে চাইলাম কী নাম তোমার? নাম দিয়া কাম কী? ট্যাকা দিবেন নাম কইলে? আমি অন্য প্রশ্ন করলাম। তিন কার্ডের খেলাটা কয় টাকা রাখবা? বললো ৫০ টাকা একদাম। বললাম, কার্ডতো পুরোনো হয়ে গেছে। ঝাঁজের সাথে উত্তর দিলো ছেলেটা, নিলে ন্যান, না নিলে রাস্তা মাপেন ভাই। এতো প্যাচালের তো দরকার নাই।আমার রাগ হওয়া উচিত ছিলো। আমার সমাজ আমাকে শিখিয়েছে, এই শ্রেনীর লোকেরা আমাদের কাছে কিছুই না। ওদের সাথে সবসময় খারাপ ব্যবহার করতে হয়। আমার হয়তো সেটাই করা উচিত ছিলো। পারলাম না। কারণ হয়তো আমি আমার সমাজের ভাষ্যগুলো নিজের ভেতর কখনো নিতে পারি নি।

ছেলেটির চোখে আলোর ঝলক দেখেছি। আমি দেখছিলাম হুডিনীকে। যার ম্যাজিক হয়তো একদিন ইউরোপ-আমেরিকার অনবদ্য সব মঞ্চ মাতাবে। হুডিনী যে স্টেজে শো করতেন, হয়তো সেখানে এই ছেলেটি পারফর্ম করবে।

মুগ্ধতায় ভুলে গিয়েছিলাম বাস্তবতকে। ভুলে গিয়েছিলাম আমার হুডিনীর ঠিকমতো তিনবেলা খাবারই জোটে না। রঙজ্বলা ব্যাগে ছেঁড়া চেইনের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছিলো একটি কোণাভাঙ্গা ক্রেষ্ট। দেখতে চাইলাম।

ছেলেটি বিরক্তি নিয়ে আমার দিকে তাকালো। বললো, আমার বাপজানের এইটা। কাউরে দিতাম না। আমি বুঝিয়ে বলার পর রাজি হলো। দেখলাম, কোন এক জয়নাল আবেদীনকে দেয়া সম্মাননা পদক এটি। এক বিজয় দিবসে জেলা শিল্পকলা একাডেমীতে পারফর্ম করেছিলেন তিনি। সে জন্যই এই সম্মাননা।

ছেলেটি বললো, এই শো করার পর বাপজান আর বাঁচে নাই। অসুখ আছিলো তো। ট্যাকায় কুলায় নাই। হের লাইগা অপারেশনও হইলো না। বাপজান বড়ো জাদুকর আছিল। আমগো অবস্থা তখন মেলা বালা আছিল। পত্যেকদিন বালা-মন্দ খাইতাম। অহন আর হেই অবস্থা নাই। মায় আর আমি মিল­া কোন রহমে চইল­া যায়। বললাম, জাদুকর হতে চাও? বললো, কন কি ভাই! চাইতো। আমি আমার বাপের মতো জাদুকর হইতে চাই। দেশ-বিদেশে খেলা দেখামু। ট্যাকা কামামু। বইনরে পড়ামু। বালা দেইখা একটা বিয়া দিমু। জুয়েল সাবের লাহান নাম হইবো আমার। জিজ্ঞেস করলাম, জুয়েল স্যারের খেলা দেখছো কখনো? বললো, হ ভাই দেখছি। আমগো উস্তাদে ভিডুত কইরা দেখাইছে। এতলা বড়ো ইসটেজ। খালি লাইট আর লাইট এইহান ওহানে। আমিও এমুন হমু একদিন।
আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে শুনছিলাম ছেলেটির স্বপ্নের কথা। দেখছিলাম অনাদরে বেড়ে উঠা স্বপ্নীল এক কিশোরের কথা। যে শৈশব থেকে জীবনের কঠিনতম দিকটিই দেখেছে। তবুও অভাব আর অনাদর তার স্বপ্ন দেখার ক্ষমতাটি নষ্ট করতে পারে নি। কীভাবে পারে এই মানুষগুলো এমন কঠিন অবস্থায়ও স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে? এতো সযতন পরিচর্যার মতো গোপন অন্দর এখনো কীভাবে বেঁচে থাকে ? আমি অবাক হই। আবারও জীবনের কাছে নত স্বীকার করি। আবারও গব বোধ হয় মানুষ হয়ে জন্মেছি বলে।

সন্ধ্যা নামছিলো ধীর পয়ে। রাস্তার ল্যাম্পপোষ্টগুলোতে জ্বলে উঠছিলো নিয়ণের আলো। ছেলেটি একটার পর একটা ম্যাজিক দেখিয়ে চলেছে। জীবনের তাগিদ তাকে বাধ্য করছে শৈশব ছাড়িয়ে আরো বড়ো হয়ে উঠতে। আমি দেখছিলাম অবচেতনে পিতাকে বুকে নিয়ে ম্যাজিক দেখানো কিশোর হুডিনীকে। দেখছিলাম এক ভাইকে, যে তার ছোট্ট বোনের ভালো খাবার, ভালো সংস্থানের জন্য সকাল থেকে রাত অবধি ম্যাজিক দেখিয়ে চলে। যে তার মায়ের জন্য ভালোবাসা জমিয়ে রাখে ম্যাজিকের কার্ডের ভাঁজে ভাঁজে।

আমি জানি, আমাদের সমাজ হয়তো ছেলেটিকে কোনদিন হুডিনী হতে দেবে না। হয়তো বাবার মতো হবার স্বপ্ন আর কখনোই তার পূরণ হবে না। হয়তো খুব ভালো থাকাও আর তার হবে না।

কিন্তু, আমি জানি এটাও। ছেলেটি তার মা, তার ছোট্ট বোনের জন্য যে ভালোবাসা জমিয়ে রাখতে শিখেছে, সেই ভালোবাসা অবশ্যই তার জন্য মঙ্গল বয়ে আনবে। নিশ্চয়ই স্রষ্টা তাকে ভালো রাখবেন । কারণ, এই সুনির্মল স্বার্থহীন ভালোবাসা আছে বলেই হয়তো এখনো আমরা সকালের সূর্যটাকে উঠতে দেখি। হয়তো সেকারণেই এখনো আকাশ বিশ্বস্ত সঙ্গী হয়ে ছাঁয়া দেয় আমাদের। এখনো প্রিয়জনেদের জন্য আমরা ভালোবাসা জমিয়ে রাখি সযতনে।

আমি ফিরছিলাম নিজ গন্তব্যে। ফিরে ফিরে দেখছিলাম হুডিনীকে। মনে এই বিশ্বাস নিয়ে, নিশ্চয়ই আমার হুডিনী একদিন তার নিজের জীবন বদলে ফেলতে পারবে লুকানো কোন ম্যাজিকে। নিশ্চয়ই সে তার মা ও ছোট্ট বোন ফাতেমাকে নিয়ে ভালো থাকবে। নিশ্চয়ই তার সাথে আবার আমার দেখা হয়ে যাবে কোন আলোঝলমলে স্টেজে।

রাত নামছে এই কংক্রিট শহরে। দিনের পর দিন এমন অসংখ্য হুডিনীরা হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের চারপাশ থেকে। যদি এই স্বপ্নগুলোকে পরিচর্যার ক্ষমতা স্রষ্টা আমাকে দিতেন…

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।