কায়কোবাদের ‘আজান’ : কবিতার মোড়কে জাগরণের আবাহন

যমুনার তীরবর্তী ছোট্ট একটি গ্রাম রসপাল। প্রায় ১৩২ বছরের পুরনো ভগ্নপ্রায় মসজিদের ছাঁয়াঢাকা বারান্দায়, বহুকাল আগে লেখা হয়েছিলো একটি অনন্য জাগরণী কবিতা। কবিতাটির নাম ‘আজান’। লিখেছিলেন কায়কোবাদ নামে পরিচিত কাজেম আল কোরায়শী নামক ক্ষনজন্মা এক কবি।

‘‘কে অই শুনালো মোরে
আজানের ধ্বণি
মর্মে মর্মে সেই সুর বাজিল কি সুমধুর
আকুল হইলো প্রাণ বাজিল ধমণী
কি মধুর আজানের ধ্বণি!’’

কবিতাটি নিয়ে কিছু বলার পূর্বে, কবিতা সম্পর্কে মহাকবি কায়কোবাদের মূল্যায়ন জেনে নিতে পারি আমরা। ‘কবিতা প্রাণের জিনিস। সহজ, স্বাভাবিক। প্রাণের উপরেই ইহা ক্রিয়া করে। হৃদয়রূপ কষ্টিপাথরে ইহা যাচাই করিয়া লইতে হয়।’ আমরা মনে করি, কবিতা হচ্ছে এক অনিঃশেষ শব্দযাত্রা। মানবীয় বোধের প্রগাঢ় অনুভব ও তার প্রকৃষ্ট শিল্পায়ন। সৈয়দ আলী আহসানের ভাষ্য মতে, ‘কবিতা হলো জলস্রোতের মতো একটি সর্বক্ষণের ভাব ও শব্দের ক্রমগতি’। প্রচলিত কবিতার সংজ্ঞায়নের সাথে কায়কোবাদের কবিতা মূল্যায়নের ভিন্নতা লক্ষ্যনীয়। কায়কোবাদ তার কবিতায় আবেগ আর ভাবের সোনালী অন্তর্জালে নির্মাণ করেন অন্তর্জাগতিক এক পরিশুদ্ধ বৃত্তায়ন। আর, প্রচলিত সংজ্ঞা কবিতাকে চিহ্নিত করছে ভাব এবং শব্দের ক্রমগতির এক অবিরাম অভিধায়। হয়তো মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যর কারণেই কায়কোবাদের কবিতা শব্দকে ছাড়িয়ে হয়ে উঠে ভাবের প্রকৃষ্ট বাহন। আজান কবিতায় আমরা তারই প্রকাশ দেখি। কবির নিজস্ব বয়ানে শুনে নিতে পারি একটি পংক্তি।

‘‘নদী ও পাখীর তানে তারি প্রতিধ্বনি!
ভ্রমরের গুণগানে, সেই সুর আসে কানে
কি এক আবেশে মুগ্ধ
নিখিল ধরনী!
ভূধরে সাগরে জলে নির্ঝরিণী কল কলে
আমি যেন শুনি সেই আজানের ধ্বনি।’’

এখানে কবিতার বিষয়ভৈবব, ভাবপ্রাচুর্য, শব্দব্দপ্রকরণের সুসংহত মলাটে আত্মমগ্ন একাগ্রতায় সমর্পিত না হয়ে বরং তার অন্তর্গত ব্যঞ্জনা, উচ্চকিত কলোরোলে আমাদের মনোজগতে অমোচনীয় নকশা এঁকে দিয়ে যায়।
পাঠক, আপনার অনুভূতিপ্রবন মনটিকে ভাসিয়ে দিন প্রাণের মুক্ত আকাশে। বহুকাল পূর্বে শব্দের আশ্রয়ে কবির ছড়িয়ে যাওয়া নৈঃশব্দিক অন্তর্জগতে সন্ধান মেলছি কি কবির ভক্তহৃদয়ের? যদি আপনার হৃদয় পেয়ে থাকে সেই অনির্বচনীয় অপার্থিব সুরের সন্ধান, তাহলে ধরে নিন আপনার আত্মা আজও বেঁচে আছে। যে হৃদয় স্রষ্টার আহ্বান শুনতে পায়, সে হৃদয় অনির্বাণ এক জগতের সন্ধান জেনে গেছে, এ’কথা সুনিশ্চিত। আজান মুসলমানদের একটি ধর্মীয় অনুষঙ্গ বিশেষ। আজানের বিস্ময়কর একটি কারিশমা হচ্ছে, প্রতিমুহুর্তে পৃথিবীর কোথাও না কোথাও মুয়াজ্জিনের কন্ঠে ধ্বণিত হতে থাকে এই স্বর্গীয় শব্দগুচ্ছ।

“‘লাইলাহা ইল্লাল্লাহ, মোহাম্মদ রাছুলুল্লাহ’
মোয়াজ্জিন মিনারে উঠে
ফুকারে যখন।”

সেই আজানের ধ্বনি যখন কবির ‘মর্মে বাজিয়া উঠে সুমধুর’, তখন আমাদের সংশয়ী মন চিন্তিত হয়। ভাবনা জাগে, ‘কি করিয়া একটি শব্দগুচ্ছ মর্মে বাজিয়া ধমণি আকুল করিয়া’ তোলে! ‘ভক্তির তুফান উঠাইয়া’ কবি ছুটে চলেন মসজিদ পানে। সংশয়বাদী আমরাও সহযাত্রী হই কবির।

‘‘নদী ও পাখীর তানে
তারি প্রতিধ্বনি!
ভ্রমরের গুণগানে, সেই সুর আসে কানে
কি এক আবেশে মুগ্ধ
নিখিল ধরনী!’’

‘নদী ও পাখির তান’ কিংবা ‘ভ্রমরের গুনগান’ অথবা ‘ভূধরে সাগরে জলে, নির্ঝরণী কলকলে’ সবখানে বেজে উঠতে থাকে আজানের ধ্বনি। আমরা অবাক হই কবির এই বর্ণনায়। কবি আমাদের নিয়ে চলেন কালহীন এক পরিভ্রমণে। নতুন বীক্ষণ, সুচারু অন্তর্বয়ান আর তীব্র হৃদয়াবেগে কবি এঁকে চলেন নব-নতুন ভাবনার জলছবি।

‘‘ঊষা যবে ফুল সাজে
আসে ধরাধামে!
বিশ্বপতি পূজা তরে শেফালী ঝরিয়া পড়ে’’

প্রভাতিয়া সুনির্মল ফ্রেমে প্রতিভাত হয় কবির ভক্তহৃদয়ের অনুপম শ্রদ্ধাঞ্জলি আর তার ভাবনার স্বর্গীয় টেক্সচার। শেফালির পবিত্র শুভ্রতায় অবগাহন করে ভোরের ধরাধাম। পরিশুদ্ধ হয়ে উঠে আমাদের আজন্ম পরিচিত প্রকৃতি…।

‘‘মোয়াজ্জিন উচ্চৈস্বরে, দাঁড়ায়ে মিনার প’রে
কি সুধা ছড়িয়ে দেয়
ঊষার আজানে।’’

যে সূধার সন্ধানে মানবহৃদয় বহুকাল অবধি অনিশ্চিত ঘুরে ফিরছে, সেই সূধার সন্ধান আমরা পেয়ে যাই ‘আজান’ কবিতায়..। মুয়াজ্জিনের কন্ঠে বেজে উঠা সেই অপার্থিব কল্যানী আহ্বান আমাদের হৃদয়পুরের গহীন অন্দরে অনুরণিত হয়। আমরা ভেতর থেকে খাঁটি হয়ে উঠবার কঠোর তপস্যায় নিমগ্ন হই। কায়কোবাদের মন ভোরের আজান শুনে জেগে উঠেছিলো। আজকের কবিমন কেনো জাগে না? কায়কোবাদের ‘আজান’ প্রতীকায়নের শৈলী-প্রকরণে, ব্যতিক্রমী ফ্রেমে তুলে ধরে কবিতার জমিনকে। ‘আজান’ হয়ে উঠে পৌরানিক মিথের ফিনিক্স পাখি। আমাদের জাতীয় সত্ত্বার পূনর্জাগরণী আবাহন। ঘনঘোর অন্ধকার রাতের শেষে সোনালী ভোরের আশা জাগানিয়া গান। এই গান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আসছে নতুন ভোর। ‘সুবহুল জাদীদ’। এখনই তৈরী হতে হবে..। ‘‘যেতে হবে বহুপথ..ঘুমিয়ে পড়ার আগে..।’’

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

* ছবির অক্ষরগুলো উপরের ঘরে লিখুন