বাংলাদেশী ডাকটিকেট..হারানো সময়ের গল্পকথক…

ছোট্ট একটা কৌতুক দিয়ে শুরু করছি। কোন এক মৌখিক পরীক্ষায় পরীক্ষার্থীকে জিজ্ঞেস করা হলো, ভারতবর্ষে কে ঘোড়ার ডাকের প্রচলন করেন? পরীক্ষার্থী উত্তরে বলেছিলো, যে ঘোড়াটি প্রথম ভারতবর্ষে আসে, সেই ঘোড়াটি নিশ্চয়ই!! উপমহাদেশে ঘোড়ার ডাকের প্রবর্তক কে ছিলেন, সেটা নিয়ে ইতিহাসের নীরস তত্ত্ব অনুসন্ধানের অনুসন্ধিৎসা আমার আপাতত হচ্ছে না। আমি বরং ডাকটিকেট নিয়ে কথা বলি। ডাকটিকেট কিংবা ডাকটিকিট যে ভাবেই বলুন ইংরেজীতে এটাকে Philately বলে। ডাকটিকেট বহুদিন ধরেই ডাকব্যবস্থার একটি প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ। এর আকার যতই ছোট, আবেদন কিন্তু ঠিক ততটা ছোট নয়। আর, বিশেষ দিনক্ষণ, ঘটনা কিংবা বিশেষ উপলক্ষে ছাপানো ডাকটিকেটের বাড়তি ক্বদর তো থাকেই। একটি দেশের ইতিহাস, সামাজিকতা, নৃ-তাত্ত্বিক বিবর্তন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অনেক কিছুই ধারণ করে থাকে এই ডাকটিকেট নামের ছোট্ট কাগজখন্ডটি। ডাকের চিঠিপত্রের কোনায় আঠা দিয়ে সাঁটানো রঙীন ছোট চারকোনা (কোন কোন টিকেট অবশ্য ত্রিভূজাকৃতি এবং গোলও হয়ে থাকে) কাগজটিই ডাকটিকেট। ডাকটিকেটের আঙ্গিক এবং মোটিফের থাকে বিভিন্ন রকমফের। টিকেটের উপর সংশ্লিষ্ট দেশের নাম, মুদ্রার নাম, বিখ্যাতদের ছবি কিংবা বিখ্যাত জায়গার ছবি অথবা শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণযোগ্য কোন ঘটনা সংশ্লিষ্ট ছাপচিত্র মুদ্রিত থাকে।

পৃথিবীর প্রথম প্রচলিত ডাকটিকেটের নাম “পেনিব্ল্যাক”।

এর প্রচলন হয় ১৮৪০ সালের ১ মে, ইংল্যান্ডে। কোন কোন তথ্যসূত্রে তারিখটি বলা হয় ৬ মে। ডাকটিকেটটির মূল্য ছিল ১ পেনি এবং রঙ ছিল কালো। তাই এর নাম ছিল পেনিব্ল্যাক। শুধু ইংল্যান্ড নয় বরং পৃথিবীর প্রথম ডাকটিকেট ছিলো এই পেনিব্ল্যাক। এটাতে ইংল্যান্ডের রাণী ভিক্টোরিয়ার চেহারা মুদ্রিত ছিল। এর ডিজাইনার ছিলেন ডাকটিকেটের স্রষ্টা স্যার রোল্যান্ড হিল।

বাংলাদেশের ডাকটিকেট প্রথম প্রকাশিত হয় স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ২৯ শে জুলাই তারিখে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের প্রতি বহির্বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ ও বিভিন্ন বন্ধুভাবাপন্ন দেশের সমর্থন লাভের উদ্দেশ্যে মুজিবনগর সরকার বাংলাদেশে ডাকটিকিট প্রচলন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
তখন বিভিন্ন ধরনের ৮টি ডাকটিকেট প্রকাশ করা হয়েছিল। পিপলস কালচারাল সোসাইটির প্রেসিডেন্ট এনামুল হক-এর তত্বাবধানে ডাকটিকেট ডিজাইন করেছিলেন সংগ্রাহক ও ডিজাইনার বিমান মল্লিক। টিকেটগুলো লন্ডনের আন্তর্জাতিক সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেসে ছাপানো হয়েছিল। টিকেটগুলোতে ১০ পয়সা মূল্যমানের টিকেটে ছিল বাংলাদেশের মানচিত্র, ২০ পয়সা মূল্যমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণহত্যা ছবি, ৫০ পয়সা মূল্যমানের যুদ্ধকালীন সময়ে বাংলাদেশের সাড়ে সাতকোটি জনগনের প্রতীকি ছবি, বাংলাদেলের পতাকার ছবি সংবলিত ডাকটিকেটের মূল্যমান ছিল ১ রূপী,শেকল ভাঙার দৃশ্যের মূল্যমান ছিল ২ রূপী, ১৯৭০ সালের নির্বাচন ও ফলাফলের দৃশ্যের ডাকটিকেটের মূল্যমান ছিল ৩ রূপী, শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি সংবলিত ডাকটিকেট ছিল ৫ রূপী মূল্যমানের এবং বাংলাদেশ সমর্থনে আহ্বান এর মূল্যমান ছিল ১০ রূপী।

আমরা এখন দেখবো, বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া কিছু ডাকটিকেট। যেগুলোর হার্ডকপির দেখা পাওয়া রীতিমতো অসম্ভব ব্যাপার। এক খেয়ালী স্ট্যাম্প সংগ্রাহকের কল্যাণে আমার দেখার সৌভাগ্য হয়েছিলো অনেক দেশের বিরল সৌন্দর্যের ডাকটিকেটের সংগ্রহ। তার মধ্য থেকে বাংলাদেশের অতীব সুন্দর কিছু ডাকটিকেট তুলে ধরছি পাঠকের জন্য। আশা করছি, এই ছোট্ট চারকোণা রঙিন কাগজগুলো আমাদের নিয়ে যাবে সোনালী অতীতে।




















































আজকালকার এই দিনে চিঠির চল উঠেই গেছে। তাই, ডাকটিকেটের ব্যবহার এখন আর তেমন একটা চোখে পড়ে না। তবুও, ডাকটিকেট বেঁচে থাকে ইতিহাস হয়ে। বেঁচে থাকবে আরো বহুদিন। আমাদের জন্য রেখে যাবো অমোচনীয় পদচিহ্ন। সেই ছাপ আমাদের পথ দেখাবে বহুদূরের যাত্রায়। সময়ের গভীর থেকে তুলে আনতে থাকবো আমরা, আমাদের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস…স্বর্নোজ্জ্বল অতীত।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

* ছবির অক্ষরগুলো উপরের ঘরে লিখুন