ক্রিপ্টোগ্রাফি; তথ্য সুরক্ষার কালোত্তোর্ণ মাধ্যম

ক্রিপ্টোগ্রাফি (বা Cryptology; গ্রিক κρυπτός Kryptos, “লুকানো, গোপন” থেকে; যথাক্রমে এবং γράφειν graphein, “লেখা”, বা -λογία -logia, “গবেষণা”,)  সুরক্ষিত যোগাযোগের কৌশল যা তৃতীয় পক্ষের কাছ থেকে তথ্য সুরক্ষিত রাখার নিমিত্তে ব্যবহার করা হয়। ক্রিপ্টোগ্রাফিতে এই তৃতীয়পক্ষ বিবেচিত হয় প্রতিপক্ষ হিসেবে। সাধারণত,  এটা প্রতিপক্ষকে ব্লক করার একধরণের প্রোটোকল নির্মান এবং বিশ্লেষণে সাহায্য করে। এর বিভিন্ন দিক আছে। যেমন , তথ্য গোপনীয়তা, তথ্য অখণ্ডতা, তথ্য নিরাপত্তা ইত্যাদি । মূলত,  কোন তথ্য অন্যের কাছ থেকে গোপন রাখার প্রচেষ্টাই ক্রিপ্টোগ্রাফির মৌলিক কথা। যার জন্য তথ্যটি প্রেরিত কিংবা তথ্যের স্বীকৃত মালিক ব্যতিত এর মূল অর্থ কারো কাছে প্রকাশ না করে তথ্য আদানপ্রদানের জন্যেই এই পদ্ধতির উদ্ভাবন।

সুপ্রাচীন কাল থেকেই তথ্যগুপ্তিলিখনের (cryptography) আদানপ্রদান গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে মানবসভ্যতায়, অনেক সময় ইতিহাসের গতিপথই পরিবর্তন করে দিয়েছে তা। ঐতিহাসিকভাবে লিপিবদ্ধ গুপ্তলিখনের প্রথম উদাহরণটি আমরা পাই প্রাচীন মিশরে, আজ থেকে প্রায় চার হাজার বছর পূর্বে। মিশরে তখন দ্বাদশ রাজবংশের সম্রাট দ্বিতীয় আমেনেমহেতের শাসনামল, তার অধীনে উচ্চ মিশরের মেনেত খুফু নগরীর প্রশাসক ছিলেন দ্বিতীয় খনুমহোতেপ। মৃত্যুর পূর্বে নিজের বংশলতিকা, সমরাভিযান ও অর্জনসমূহ চুনাপাথরের পাহাড়চূড়ায় উৎকীর্ণ করে যান খনুমহোতেপ। সমাধিলিপির বিশ্লেষণে রহস্যজনকভাবে পরিলক্ষিত হয়, বর্ণনার শেষাংশে এসে হায়ারোগ্লিফের চিহ্নগুলো বিভিন্ন জায়গায় পাল্টে দিয়েছে খনুমহোতেপের সুবর্ণিকগণ, সুপরিচিত চিহ্নের পরিবর্তে কম প্রচলিত চিহ্ন ব্যবহার করেছে, লঙ্ঘন করেছে ব্যাকরণবিধির।

সুবর্ণিকগণ কেন কাজটি করেছিলেন, আজ আর সঠিকভাবে জানা যায় না, তবে কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের মতে, খনুমহোতেপের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াসংক্রান্ত বিশেষ এ অনুচ্ছেদটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পাল্টে দেয়া হয়েছে যাতে জনসাধারণের কাছে তা অস্পষ্ট থেকে যায়।

১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মেসোপটেমীয় একটি কীলকলিখন (cuneiform)-ফলকে তথ্যগুপ্তিকরণের (encryption) আরও উৎকর্ষতার প্রমাণ পাওয়া যায়। দজলা নদীর তীরে আবিষ্কৃত ৩ ইঞ্চি x ২ ইঞ্চি মাপের এ ফলকটিতে তৈজসপত্র উজ্জ্বলকরণের একটি সূত্র লুকিয়ে রাখা হয় গুপ্তসংকেতের মাধ্যমে। সূত্রটিতে এমন সব চিহ্ন ব্যবহার করা হয়েছিল বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে যার রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন অর্থ।

৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, হিব্রু লেখকগণ নবী ইয়াহইয়ার বাইবেল গ্রন্থটির অনুলিপি তৈরিতে বর্ণপ্রতিস্থাপন ধরণের এক গুপ্তলিখনপ্রণালী (cipher) অবলম্বন করেন, যা আজকে আতবাশ (atbash) নামে পরিচিত।

তথ্যগুপ্তিকরণের গ্রিক উদাহরণ আমরা পাই হেলেকারন্যাসিসের হিরোডিটাস রচিত ইতিহাস গ্রন্থটিতে, যাতে খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে সংঘটিত গ্রিস ও পারস্যের যুদ্ধবিবাদের ঘটনা বর্ণনা করেন তিনি। পারস্যরাজ জেরেক্স (Xerxes) গ্রিকদের উপর অতর্কিত আক্রমণের জন্য সৈন্যসামন্ত জড়ো করতে থাকেন গোপনে। ঘটনাক্রমে সেসময় পারস্যদেশেই নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছিল ডিমেরাটাস নামে এক গ্রিক। দেশের জনগণ ডিমেরাটাসকে বিতাড়িত করলেও মাতৃভূমির বিপদে উদাসীন থাকতে পারল না সে, কাঠের ফলকে বিপদের কথা বর্ণনা করে তার উপর মোমের প্রলেপ দিয়ে পাঠিয়ে দিল গ্রিসে। পারস্যদেশের চৌকিগুলোতে পাহারাদারগণ সবরকমের তল্লাশি চালিয়ে গেলেও নিরীহ কাঠের ফলকটি তাদের হাত দিয়েই বেরিয়ে চলে গেল গ্রিসে। অভিযানের শুরুতেই সম্রাট জেরেক্সই উল্টো অতর্কিত গ্রিক আক্রমণের মুখোমুখি হয়ে পরাস্ত হন।

হিরোডিটাস আরেকটি ঘটনার বর্ণনা করেন: মাইলেটাস নগরীর স্বৈরশাসক হিসটিয়াইয়ুস তার জামাতা ও উপদেষ্টা অ্যারিস্টাগোরাসকে একটি গোপন সংবাদ প্রেরণের ইচ্ছা পোষণ করেন। এ উদ্দেশ্যে হিসটিয়াইয়ুস তার এক চাকরের মস্তিষ্ক মুণ্ডন করে তাতে সংবাদটি লিখে রাখেন, এবং বেশ কিছুদিন পর চাকরের চুল গজালে তাকে পাঠিয়ে দেন অ্যারিস্টাগোরাসের কাছে। চাকরের চুল পুনরায় মুণ্ডন করে গুপ্তলিপিটি উদ্ধার করেন অ্যারিস্টাগোরাস, এবং তদনুযায়ী পারস্যরাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে দেন দ্রুত।

মূল তথ্যকে পরিবর্তন না করে কেবল শত্রুর নজর থেকে গোপন রাখার এ পদ্ধতিকে বলা হয় স্টেগানোগ্রাফি (steganography)।

কেল্টিক গোত্রসমূহের বিরুদ্ধে পরিচালিত গলের যুদ্ধে জুলিয়াস সিজারের সেনাপতি কুইন্টাস তুলিয়াস সিসেরো শত্রুবেষ্টিত হয়ে যখন আত্মসমর্পণের দিন গুনছিল, দ্রুত এক চিঠি দিয়ে সৈনিক পাঠান সিজার তার কাছে। চিঠিতে রোমান বর্ণগুলো গ্রিক বর্ণ দ্বারা প্রতিস্থাপন করে দেন তিনি, যাতে সৈনিক ধরা পড়লেও শত্রু তার পাঠোদ্ধার করতে না পারে। সিজারের চিঠি পেয়ে মনোবল চাঙা হয় সিসেরো বাহিনীর, এর কিছুদিন পরই সিজার উদ্ধার করে তাদের।

সিজার আরও এক ধরণের প্রতিস্থাপন সাইফার ব্যবহার করতেন বলে জানা যায়। যেখানে চিঠির প্রতি বর্ণকে বর্ণমালায় তার তিন ঘর ডানের বর্ণটি দিয়ে প্রতিস্থাপন করতেন। অর্থাৎ
প্রতিরোধ করো, আমি আসছি এ সংবাদটি সিজার লিখতেন এভাবে
ভষধঊষখফ ঘষখ উলঊ উড়ঞঊ

চতুর্থ শতকে ব্রাহ্মণ পণ্ডিত বাৎসায়ন কামসূত্র নামে বড়দের জন্য যে বইটি রচনা করেন, তাতে মেয়েদের জন্য চৌষট্টি কলা শিক্ষার প্রস্তাব করেন তিনি। রন্ধন, পোশাক পরিধান এবং প্রসাধন প্রস্তুতকরণের মতো সুপরিচিত কলার পাশাপাশি ম্লেচ্ছিত বিকল্প বা গুপ্তলিখন বিদ্যা নামে গূঢ় এক কলা উল্লেখ করেন তিনি, তালিকার ৪৫ নম্বরে, যার দ্বারা নারীরা তাদের গোপন প্রণয়ের কাহিনী নিশ্চিত গোপনীয়তায় সংরক্ষণ করতে পারবে। তার একটি পদ্ধতি হচ্ছে, বর্ণমালার প্রতিটি বর্ণকে দৈবক্রমে অন্য একটি বর্ণের সাথে প্রতিবর্ণ হিসেবে সমন্বিত করা, এবং কাহিনী রচনার সময় মূল বর্ণকে তার প্রতিবর্ণ দিয়ে প্রতিস্থাপিত করে ফেলা।

তাওরাত ও ইঞ্জিলে গূঢ়ার্থ আবিষ্কারের উদ্দেশ্যে ইউরোপের মঠগুলোতে ব্যাপকভাবে গুপ্তলিখনের চর্চা হয় অন্ধকার যুগে। সন্যাসী রজার বেকন, যিনি আরব গ্রন্থসমূহ দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়েছিলেন, গুপ্তলিপির উপর রচনা করেন Epistle on the Secret Works of Art and the
Nullity of Magic। ক্যান্টারবুরি কাহিনী-খ্যাত জিওফ্রে চসার জ্যোতির্বিদ্যার উপর তাঁর একটি গ্রন্থের কয়েকটি অনুচ্ছেদ গুপ্তলিখনের মাধ্যমে প্রকাশ করেন।

রেনেঁসার যুগে বিজ্ঞানের নানা শাখায় নিজেদের ধারণা চুরি হয়ে যাওয়ার ভয়ে থাকতেন আবিষ্কারকগণ, ফলে নিজস্ব গবেষণার প্রাথমিক ফলাফল অনেক সময় তাঁরা প্রকাশ করতেন সংকেতের মাধ্যমে। উদাহরণস্বরূপ, ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে বিজ্ঞানী হুক তাঁর একটি আবিষ্কারকে বর্ণনা করেন এভাবে: ceiiinosssttuv; সংকেতের সমাধানটি তিনি প্রকাশ করেন দেড়যুগ পরে, পূর্বের বর্ণগুলো পুনর্বিন্যস্ত করে: ut tensio, sic vis—সেরকমই প্রসারণ, যেরকম প্রযুক্ত বল, আজকে যা হুকের স্থিতিস্থাপকতা সূত্র নামে পরিচিত।

এছাড়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মেক্সিকোর কাছে পাঠানো জার্মানির জিমারম্যান টেলিগ্রাম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির ব্যবহৃত এনিগমা মেশিনের পাঠোদ্ধার বিশ্বযুদ্ধকে সংক্ষিপ্ত করে ইতিহাসের গতিপথকেই পাল্টে দিয়েছে।

ইতিহাসের পাতায় ছড়িয়ে আছে তথ্যগুপ্তিকরণের করুণ উদাহরণও। স্কটল্যান্ডের রাণী মেরি তার প্রটেস্ট্যান্ট চাচাতো বোন প্রথম এলিজাবেথকে ইংল্যান্ডের সিংহাসন থেকে উৎখাতের পরিকল্পনায় ক্যাথলিক যড়যন্ত্রকারীদের সাথে যোগ দেন; গুপ্তলিখনের মাধ্যমে সংবাদ আদানপ্রদান করতে থাকেন তারা। একসময় রাণীর গুপ্তচরদের হস্তগত হয় কিছু সংবাদ এবং প্রচুর পরিশ্রমের পর সেগুলোর মর্মোদ্ধার (decipher) করেন তারা। এলিজাবেথ ও মেরি, একই বিছানায় হেসেখেলে যারা কাটিয়েছিলেন শৈশবের অনেকটা সময়, জীবনকে শেষ পর্যন্ত আবিষ্কার করেছিলেন একেবারেই ভিন্নভাবে। ১৫৮৭ খ্রিস্টাব্দে এলিজাবেথের নির্দেশে শিরশ্ছেদ করা হয় মেরির।

প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতায় Cryptography:

প্রাচীন সভ্যতা গুলোর মধ্যে সর্ব প্রথম Cryptography র প্রমান পাওয়া যায় মিসরীয় সভ্যতায়। ৪৫০০ বছর আগের Hieroglyphs বর্ণমালা মিশরের সভ্যতায় ব্যাবহার করা Cryptography এর দারুণ এক উদাহরণ।

ধারণা করা হয় এটি মিশরীয়দের মধ্যে যোগাযোগ করার জন্য ব্যবহার করা হত । এটাতে জড়িয়ে আছে একধরণের রহস্য যেখানে প্রাচীন মিশরীয়দের জীবন ধারার কথা বলা আছে বলে মনে করা হয় ।

Mesopotamia সভ্যতায় Cryptography:

মেসোপটেমিয়া কাদামাটি থেকে আবিষ্কৃত কিছু ট্যাবলেট এর ছবি নিচে দেয়া হলঃ

ধারণা করা হয় তারা তাদের নিজস্ব ইনফরমেশন গুলো লিখে সবার থেকে গোপন করে রাখার জন্য এরকম কৌশল ব্যাবহার করত। গোপন তথ্যাদির মধ্যে ছিল রান্নার রেসিপি কিংবা এমন কিছু যা তারা তাদের পরবর্তী বংশধরদের জন্য বলে যেতে চাইত। কিন্তু চাইত না অন্য কেও জানুক।

রোমান এবং গ্রীক সভ্যতায় Cryptography:

ইতালির Scytale প্রাচীন একধরণের যন্ত্র বা পদ্ধতি যেটার মাধ্যমে ডাটা এনক্রিপ্ট করা হত । তবে গ্রিক কবি আরহেনিয়াস সবার আগে এটার ব্যবহারের পদ্ধতি জানতেন । এটা প্রায় ২৫০০ বছর আগের কথা। ব্যাপারটা মোটামুটি এরকম ছিলঃ

প্রাচীন গ্রীকেরা তাদের যুদ্ধ ক্ষেত্রে যোগাযোগের জন্য সাইটেল ব্যবহার করতো ।

Sender এবং Receiver এর কাছে একি ব্যসার্ধের একটা দণ্ড থাকতো । কাগজ দণ্ডটার উপর পেঁচিয়ে চিঠি লিখা হত ।

চিঠিটা শুধু একি ব্যাসের দণ্ড ব্যবহার করে পড়া যেত । অন্য কোন দণ্ডের উপর পেঁচিয়ে চিঠিটা পড়া যেত না ।

Skytale

সাইটেলে ইন ক্রিপ্ট করার পদ্ধতির একটা উদাহরণ দেখা যাক-
আসল মেসেজঃ Kill king tomorrow midnight

এনক্রিপ্ট করা মেসেজঃ : ktm ioi lmd lon kri irg noh gwt

কৌশল টা বোঝার জন্য আসা করি নিচের চিত্রটি ভাল কাজে দিবে। এখানে একটি পেন্সিল এর গায়ে একটি ফিতা পেঁচিয়ে তার উপর গোপন কথাটি লেখা হয়েছে। যদি আপনি একি ব্যাসের কোনও পেন্সিলে ফিতাটি আবার না পেঁচান তাহলে কখনই আসল লেখাটি আর পড়া যাবে না।

Spartan সৈন্য বাহিনীও এ ধরণের কৌশল তাদের তথ্য যোগাযোগ ব্যাবস্থাকে নিরাপদ রাখার জন্য ব্যবহার করত। আপনারা হয়ত অনেকেই Troy চলচিত্রটি দেখেছেন। সেখানে কিভাবে একটি বিশাল ঘোড়া উপহার দেবার মাধ্যমে তাদের প্রাচীর ভেদ করে শত্রু পক্ষ ভেতরে প্রবেশ করে সেটা নিশ্চয়ই আপনাদের মনে আছে। আমাদের বর্তমান কালের কুখ্যাত Trojan Malware এর মূলনীতি অনেকটা সেরকম ভাবেই কাজ করে। মনে হয় জিনিসটা আমাদের দরকারি। কিন্তু আসলে সেটা একটা মারাত্বক Malware!

গ্রীকরা আরও একটা ক্রিপ্টোগ্রাফির মেথড বানিয়ে ছিলেন। সেটার আবিষ্কারক ছিলেন Polybius । এখন এটাকে আমরা Polybius Square নামে চিনি ।

Polybius Square

এক্ষেত্রে প্রত্যেকটা ইংরেজি অক্ষরগুলকে একটা Square এ সাজানো হয়। তারপর প্রত্যেকটি অক্ষরকে তার Row Number এবং Column Number দিয়ে প্রকাশ করা হয়। যেমন ধরুন উপরের চিত্র অনুসারে G কে প্রকাশ করা হবে 21 দিয়ে যেখানে 2 হল তার Row Number এবং 1 হল তার Column Number. সুতরাং G মানে হল 12.

যেমন “BAT” কে Polybius Square পদ্ধতিতে লিখা হত 22 11 44 .

Caesar cipher:

রোমানরাও ক্রিপ্টোগ্রাফির ব্যবহার করত । তারা যে পদ্ধতি ব্যবহার করত সেটাকে বলা হয় Caesar cipher ।জুলিয়ার সিজা্রের নামে এই মেথড তৈরি করা হয়েছিল। জুলিয়াস সিজার তার সেনা প্রধানদের সাথে যোগাযোগ করার জন্য এ পদ্ধতিটি ব্যবহার করতেন।

Caesar cipher

এই পদ্ধতির আরও একটা নাম আছে। সেটা হল shift cipher। এই পদ্ধতিতে অক্ষর কয়েক ঘর সিফট করা হয় । যার ফলে একটা অক্ষরকে অন্য একটা অক্ষর দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয় । যেমনঃ

Hebrew Scholars দের Cipher:

৫০০-৬০০ BC এর হিব্রু পণ্ডিতেরা আর এক ধরণের সাইফার পদ্ধতি ব্যবহার করতো। সেটাকে সাবস্টিটিউশন সাইফার বলা হয় । এটাকে এটবাস (Atbus) সাইফারও বলা হয় । এটবাস সাইফার পদ্ধতিতে অক্ষরগুলোকে রিভার্স ভাবে প্রকাশ করা হয় । যেমন ইংরেজি A কে Z দিয়ে B কে Y দিয়ে প্রকাশ করা হয়। এভাবে চলতে থাকবে ।

উদাহরনঃ
আসল মেসেজঃ This is a secret message
সাইফার কৃত মেসেজঃ Gsrh rh z hvxivg nvhhztv

মুসলিম সভ্যতায় Cryptography:

আল-কিন্দি নামক একজন মুসলিম বিজ্ঞানী ৮৫০ সালে ক্রিপ্টোগ্রাফি সম্পর্কে একটা বই লিখেন যার নাম Risalah fi Istikhraj al-Mu’amma (Manuscript for the Deciphering Cryptographic Messages)।

আবু ইউসুফ ইয়াকুব ইবনে ইসহাক আল-কিন্দি (৮০১-৮৭৩)

তার কাজ Cryptography কে নতুন এক পর্যায়ে নিয়ে যায় যা পরবর্তী সময়ে probability , statistics এবং বিজ্ঞানের আরও নানা শাখার জন্ম দান করে।

এটা আল-কিন্দির বইয়ের প্রথম পাতা । এই বইয়ের মাধ্যমে তিনি cryptanalysis by frequency analysis নামক নতুন এক ধারনার জন্ম দেন।

গণিতবিদ আল-কিন্দি আরবি গনিতেও দারুণ অবদান রাখেন। তিনি অক্ষরের frequency analysis এর মাধ্যমে বিভিন্ন Cipher কে ভাঙ্গার উপায় দেখান । তিনি তার গানিতিক ও চিকিৎসা দক্ষতা ব্যবহার করে ঔষধের শক্তির একটা স্কেলও প্রনয়ন করেন । আল-কিন্দি তার Risalah fi Istikhraj al-Mu’amma বইয়ে প্রথম cryptanalysis টেকনিক সম্পর্কে আলোচনা করেছেন । সুপ্রাচীনকাল থেকেই তথ্যগুপ্তিবিদ্যার (cryptography) প্রচলন থাকলেও গুপ্তলিপি পাঠোদ্ধারে (cryptanalysis) ভাষাবিজ্ঞান ও পরিসংখ্যান গণিতের সমন্বয়ে প্রথম যুগান্তকারী মৌলিক আবিষ্কারটি সাধন করেন আবু ইউসুফ ইয়াকুব ইবনে ইশহাক ইবনে আল সাব্বাহ ইবনে ইমরান ইবনে ইসমাইল ইবনে আল আশআত ইবনে কায়েস আল কিন্দি। যে অনন্য গ্রন্থটি নিয়ে এ রচনা, নাম তার রিসালা ফী ইসতিখরাজ আল মুয়াম্মা।

ইংরেজি ভাষায় অক্ষরের আপেক্ষিক ফ্রিকোয়েন্সিঃ

তার এই পদ্ধতি অনুযায়ী কোন ভাষার অক্ষরের ফ্রিকোয়েন্সি জানা থাকলে খুব সহজে কোনও cipher কে ভাঙ্গা যেত। যেমন এনক্রিপ্ট করা বাক্যে যে অক্ষরটি সব চেয়ে বেশিবার থাকবে বুঝতে হবে সেটা আসলে সেই ভাষার সব চেয়ে বহুল ব্যবহৃত অক্ষরটি। এভাবে কিছুটা আগালেই Cipher টিকে ভেঙ্গে ফেলা যেত।

রেনেসাঁ সময়ের Cryptography:

রেনেসাঁর সময়ের Cryptography এর সবচেয়ে বড় আবিষ্কার ছিল polyalphabetic cipher. polyalphabetic cipher আবিষ্কার হবার আগ পর্যন্ত মোটামুটি সব গুলো Cipher কেই cryptanalysis by frequency analysis দ্বারা খুব সহজেই ভেঙ্গে ফেলা যেত। ১৪৬৭ সালে polyalphabetic cipher গুলোর সবচেয়ে পরিষ্কার ব্যাখ্যা করেছেন Leon Battista Alberti । এ কারনে তাকে ওয়েস্টার্ন ক্রিপ্টোগ্রাফির জনক বলা হয় ।

Leon Battista Alberti

ইউরোপে, ক্রিপ্টোগ্রাফি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং ধর্মীয় বিপ্লবের কারনে আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে । কিন্তু ইউরোপ এর বাইরে মুসলিমরা তাদের সেই জ্ঞান চর্চাকে হারিয়ে ফেলে। ফলে ইউরোপ এর বাইরে এই চর্চা আর তেমন একটা হয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না।

১৮০০ সাল থেকে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের আগ পর্যন্ত Cryptography ব্যাবহার

আমরা জানি Cryptography একটা বিশাল ইতিহাস আছে । তারপরও ১৯ শ শতকের আগে ক্রিপ্টোগ্রাফির তেমন ভাবে কোনও বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায় নি। এর আগ পর্যন্ত Cryptography ছিল হাতে গনা কিছু কৌশল যার মাধ্যমে কোনও তথ্যকে গোপন রাখার চেষ্টা করা হত । উদাহরনস্বরূপ ১৯ শতকের Auguste Kerckhoffs এর ক্রিপ্টোগ্রাফিক লিখা ।

Edgar Allan Poe

Edgar Allan Poe ১৮৪০ সালের দিকে systematic method ব্যাবহার করে Cipher ভাংতে পারতেন। তিনি তার এই দক্ষতার কথা জানিয়ে Philadelphia paper Alexander’s Weekly (Express) Messenger একটি বিজ্ঞপ্তি দেন। জানামতে তার কাছে আসা প্রায় বেশিরভাগ Cipherই তিনি ভাংতে পেরেছিলেন!

প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের সময় Admiralty’s Room 40 জার্মানদের নৌ কোড ভেঙ্গে যুদ্ধের সময় এক বিরাট ভুমিকা পালন করে । ১৯১৭ সালে গিলবার্ট ভেরনাম টেলিটাইপ নামে একটা Cipher প্রস্তাবনা করেন । যেটাতে একটা Key নির্ধারণ করা হয়। Key টিকে Plain Text এর প্রতি অক্ষরের সাথে মিশ্রিত করে Cipher Text উৎপন্ন করা হয়। এটা মুলত Electro Mechanical Device এর মাধ্যমে তৈরি করা Cipher এর প্রথম উদাহরণ।

দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময়ের Cryptography ব্যাবহার:

দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় Electro Mechanical Cipher গুলোর ব্যাবহার ছিল ব্যাপক । যেখানে মেশিন গুলো ম্যানুয়ালি নিয়ন্ত্রণ করা হত ।

এটা Enigma machine যেটা দ্বারা জার্মানরা তাদের মেসেজ এন-ক্রিপ্ট করে পাঠিয়ে দিত ।

Allied cipher মেশিন দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় ব্রিটিশরা ব্যাবহার করতো । আর আমেরিকা ব্যাবহার করতো SIGABA মেশিন । দুইটাই Electro Mechanical ।

মার্কিনীরা যুদ্ধে এম-২০৯ আর এম-৯৪ মেশিন ব্যাবহার করতো । ব্রিটিশ এজেন্টরা তাদের সাইফার গুলোকে কবিতা আকারে সাজিয়ে নিত যেখানে কবিতার মধ্যেই কোড এন-ক্রিপ্ট ও ডি-ক্রিপ্ট করার key দেয়া হত ।

Sigaba মেশিন

আধুনিক Cryptography:

দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর Cryptography আর cryptanalysis উপর আরও বেশী গানিতিক বিশ্লেষণ এবং গবেষণা শুরু করা হয়।কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের দ্রুত প্রসারের কারণে এই যোগাযোগ মাধ্যমটিকে নিরাপদ রাখাটা জরুরী হয়ে পরে । আর সেখানেই আসলে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে Cryptography প্রভাব বিস্তার শুরু করতে থাকে।

Claude Shannon

আধুনিক Cryptography এর পেছনে যাদের অবদান সবচেয়ে বেশী তাদের একজন হলেন Claude Shannon । তাকে তার বিশেষ অবদানের জন্য গাণিতিক Cryptography এর জনক বলা হয়।

আধুনিক ক্রিপ্টোগ্রাফি ব্যবহৃত হচ্ছে গণিতের বিভিন্ন ডিসিপ্লিন , কম্পিউটার বিজ্ঞান, এবং তড়িৎ প্রকৌশল এ। ক্রিপ্টোগ্রাফি অ্যাপ্লিকেশন এটিএম কার্ড, কম্পিউটার পাসওয়ার্ডগুলি, এবং ইলেকট্রনিক কমার্স এর নির্মাণ এবং নিরাপত্তাক্ষেত্রেও অন্তর্ভুক্ত। বিভিন্ন ধরণের স্পর্শকাতর সামরিক স্থাপনা, অস্ত্র, তথ্যাদির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং এসপিওনাজ বা আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা তৎপরতার ক্ষেত্রগুলোতে ক্রিপ্টোগ্রাফির ব্যবহার সুবিদিত..।

মন্তব্য করুন