(Hangzhou হানযৌ) বিশ্বের দীর্ঘতম ট্রান্স-ওশেনিক ব্রীজ; স্থাপত্যকলার অবাক নির্মাণ

আমরা এখন বাস করছি গতিশীল এক পৃথিবীতে। পৃথিবী সবসময়ই গতিশীল ছিলো। সময়ের ধাবমান গতিবেগ প্রকৃতিগত নিয়মেই ছাপ ফেলেছে পৃথিবীর পরিবেশ প্রকৃতিতে। একসময় মানুষের টিকে থাকা নির্ভর করতো, তার সাহস, হিংস্রতা, দুর্যোগ সহনের ক্ষমতার উপর নির্ভর করে। এখন সময় পাল্টেছে। প্রকৃতির সাথে সহাবস্থানের সাথে সাথে মানুষ দ্রুত শিখে নিচ্ছে প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণের বিদ্যা। অসম্ভব সব কাজ করছে মানুষ প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে। তেমনই একটি নিদর্শন নিয়ে আজকের এই লেখা। চীনের হানযৌ ( ইংলিশে Hangzhou। সঠিক উচ্চারনের জন্য ক্লিক করুন) ব্রীজ। সভ্যতার এক অপার বিষ্ময়। বিশ্বের দীর্ঘতম ট্রান্স-ওশেনিক ব্রীজ। সাগরের অলঙ্ঘনীয় বাঁধাকে ডিঙিয়ে চীনের দুটি প্রদেশকে সংযুক্ত করেছে এই ব্রীজ। এর নির্মাণ ছিলো দীর্ঘ দশ বছরের নিরবচ্ছিন্ন পরিকল্পনার ফসল

ব্রীজটি ঝুলন্ত তারের উপর নির্মিত একটি সুপারস্ট্রাকচার। যার নির্মাণ এ’কথা প্রমাণ করে যে, মানুষ পৃথিবীতে টিকে থাকার জন্যই এসেছে। যুগে যুগে মানুষের বিবর্তন হয়েছে। পরিবর্তিত হয়েছে সভ্যতা। পূর্ণতা পেয়েছে সামাজিক অবকাঠামো। কিন্তু, মানুষ টিকে থাকছে। আছে। থাকবে। যদিও সর্বময় ক্ষমতা স্রষ্টার। তবুও, সৃষ্টা তার সৃষ্টিকে সুনির্দিষ্ট স্বাধীনতা দিয়েছেন। সেই সীমার মাঝেই মানুষ যোগ্যতম প্রমান করেছে নিজেকে।

ব্রীজটির অবস্থান চীনের পূর্ব উপকূলবর্তী অঞ্চলে। সাগরপাড়ের দুটি শহরের সংযোগমাধ্যম এটি।

ব্রীজটি জিয়াজিং এবং নিংবো ( Jiaxing এবং Ningbo in Zhejiang ইংলিশ উচ্চারন দিয়ে দেয়া হলো ) নামক দুটি প্রদেশের সংযোগ মাধ্যম হিসেবে তৈরী করা হয়েছিলো।
35,673 কিমি (22 মাইল) দৈর্ঘ্যের এই ব্রীজটি বিশ্বের দীর্ঘতম ট্রান্স-ওশেনিক ব্রীজ। চায়না রেলওয়ে ব্রীজ ব্যুরো কোম্পানী লিমিটেড ছিলো ব্রীজটির প্রধান নির্মাণপ্রতিষ্ঠান। প্রধান পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান ছিলো হার্ডসওয়ে এন্ড হ্যানোভার। লেই লিন ইন্টারন্যাশনাল ছিলো প্রধান ডিজাইনার।

২০০৭ সালের ১৪ জুন শেষ হয়েছিলো এর নির্মাণকাজ। ২৬ জুন সাড়ম্বর অনুষ্ঠান এবং মিডিয়া কাভারেজের ভেতর দিয়ে উন্মুক্ত করে দেয়া হয় ব্রীজটি।

তবে, জনসাধারণের জন্য ২০০৮ সালের মে মাসের ১ তারিখ পর্যন্ত ব্রীজে চলা চলের অনুমতি ছিলো না।

তখন চলছিলো এর বাস্তবিক পরীক্ষা নিরীক্ষা। এই ব্রীজ নিংবো এবং সাংহাইয়ের মাঝে দূরুত্ব কমিয়ে আনে ৪০০ কিলোমিটার থেকে ২৮০ কিলোমিটারে। ভ্রমণের সময়ও কমে যায় অনেক।

তীব্র স্রোতধারার মুখে নির্মিত এই ব্রীজ অসংখ্য সব সমস্যা সমাধানের পর তৈরী হয়। সাধারণত ব্রীজের মূল কাঠামোকে সাপোর্ট দেয়ার জন্য ঝুলন্ত তারের ব্রীজগুলোতে কংক্রিটের পিলার ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

কিন্তু, এ’ক্ষেত্রে আর্কিটেকচাররা ব্যবহার করলেন স্টীলের পিলার। যা, একটা অসম্ভবকে সম্ভব করতে অনেকাংশে সহায়তা করেছিলো। এখানের স্রোতের তীব্রতা ছিলো প্রচন্ডরকমের। যার ঢেউ কখনো প্রায় ২৫ ফিট উচ্চতা ছাড়িয়ে যেতো।

সুতীব্র এই স্রোতধারার কারণে বারবার পাল্টেছে ব্রীজের নির্মান প্যাটার্ণ। তৈরী করতে হয়েছে অসংখ্য নতুন পন্থা।


তাই, আর্কিটেকচাররা মনে করলেন, নতুন ধরণের কোন প্রযুক্তির সাহায্য না নিয়ে এই ব্রীজের নির্মাণ অসম্ভব। দীর্ঘস্থায়ী নির্মানের জন্য স্টীল ছিলো সর্বোত্তম ধাতু। যার যথার্থ ব্যবহার করা হয়েছিলো এই ব্রীজের নির্মানযজ্ঞে। এর নির্মানকাজ পরিচালনায় দুটি অতীব ক্ষমতাশীল ক্রেইন ব্যবহার করা হয়েছিলো।


যার একটি বহন করতো প্রায় ২২০০ টন এবং অপরটির বহনক্ষমতা ছিলো প্রায় ৩০০০ টন। বাতাসের গতিবেগও ছিলো এর জন্য একটি অন্যতম বাঁধা।

আইফেল টাওয়ারের স্থপতি গুস্তাভ আইফেল প্রবর্তিত একটি থিওরী এর নির্মাতাদের এই সমস্যা সমাধানে সহায়তা করে।

প্রায় ৭০০ এর উপরে বিশেষজ্ঞের ৯ বছরের অবিরাম প্রচেষ্টায় এই ব্রীজের নকশা তৈরী হয়েছিলো। সাগরের মাঝে প্রচলিত পদ্ধতিতে ব্রীজের অবকাঠামো নির্মাণ প্রায় অসম্ভব ছিলো।

তাই সমাধাণ হিসেবে ব্রীজের প্রতিটি অংশ ডাঙা থেকে নির্মাণ করার পর, নিয়ে আসা হতো কন্সট্রাকশন স্থানে। এতে ব্যবহৃত কেবলের একত্রিত দৈর্ঘ্য প্রায় ৩২.২ কি.মি।

Wang Yong ওয়াং যূন, হাংযুই বে ট্রান্স ওশেনিক ব্রীজ কন্সট্রাকশন কমান্ড পোষ্টের প্রধাণ- তিনি বলেন এখানে ব্রীজ নির্মাণের সিন্ধান্ত ছিলো অনেকটা অসম্ভব।

কারণ, এখানের সাগরিক আবহাওয়া খুব জটিল এবং পৃথিবীর তিনটি বৃহৎ স্রোতধারার একটিতে ছিলো এর অবস্থান।

টাইফুনের প্রভাব ছিলো অত্যন্ত বেশি। এবং এর সমুদ্রতলের ভুত্বক ছিলো নির্মানের প্রতিকূল অবস্থানে। ব্রীজের মাঝামাঝি অবস্থানে প্রায় ১০০০০ বর্গফুটের একটি সার্ভিস সেন্টার আছে।


বৃহদায়তন এই ব্রীজ নির্মাণ মানুষের সামর্থের কথা সগর্বে ঘোষণা করছে। অসীমের সীমা খুঁজবে মানুষ, হয়তো এটাই তার জিনগত বৈশিষ্ট্য। নাহলে, কোথাকার কোন এক লাল গ্রহ, মঙ্গলে প্রাণের চিহ্ন খুঁজবে কেনো মানুষ!

ব্রীজের এই সার্ভিস সেন্টার বলা হয় আকাশ এবং ভূমির মধ্যকার স্থান। অপর্থিব রকমের সুন্দর এই জায়গাটাকে পর্যটকেরা এই নামেই ডাকে।


এখানে রয়েছে একটি বিশ্রামাগার, একটি রেস্টুরেন্ট, একটি গ্যাস স্টেশন, একটি হোটেল, একটি কনফারেন্স রুম, এবং একটি জনপ্রিয়তম পর্যটন টাওয়ার।

ব্রীজের মাঝে অবস্থিত পর্যটন টাওয়ারের জনপ্রিয়তা অসম্ভব রকমেরই। সারাবছরই প্রায় ভিড় লেগে থাকে আগ্রহী পর্যটকদের।

এই ব্রীজ যেমন চীনের যোগাযোগ ব্যবস্থার মাইলফলক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। তেমনি চীনের অর্থনীতিতেও এই স্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

আরো বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ব্রীজ রয়েছে চীনে। যেগুলো চীনের আগামীদিনের স্টার হয়ে উঠার ইঙ্গিত বহন করছে।

বেইজিং অলিম্পিকে বার্ড নেষ্ট স্টেডিয়ামের সুপার স্ট্রাকচার অবাক করেছিলো বিশ্ববাসীসহ আর্কিটেকচার সংশ্লিষ্টদের। এমনসব সুপারস্ট্রাকচার নিয়ে এখন সময় কাটছে বর্তমান চীনা প্রজন্মের।

ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি, সাধারণ ছোটখাটো খেলনা থেকে শুরু করে লোকাল মার্কেট ভরে আছে মেইড ই্ন চায়না ট্যাগ লাগানো পণ্যে। এখন বাজারে যতো সস্তাদরের মোবাইল, ইলেক্ট্রনিক খেলনা এবং গ্যাজেট পাওয়া যাচ্ছে, তার অধিকাংশেই এই ট্যাগ পাওয়া যাবে।

বর্তমান পৃথিবীর ইলেক্ট্রিক মার্কেটেও চীনাদের আধিপত্য সমানতালে চলছে। সুপার পাওয়ার আমেরিকার আলোঝলমলে শপিংমল থেকে শুরু করে আমাদের জিঞ্জিরাতেও পাওয়া যাচ্ছে চীনা পন্য। চীন উঠে আসছে প্রথম বিশ্বের কাতারে।

আমরা জনসংখ্যার দোষ দিচ্ছি প্রতিনিয়ত। অথচ, চীন তাদের বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে পরিণত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
কেউ আমাকে চীনপ্রেমী ভাববেন না যেনো। আমি এ’কথা বলছি না যে, চীন সর্বাংশে সফল একটা রাষ্ট্র। কিন্তু, চীনের শ্রমবাজার একটা উন্নতশীল দেশের জন্য শিক্ষনীয় হতে পারে। চীনের বর্তমান প্রতিটি কার্যক্রম এ’কথার আভাস দিচ্ছে যে, চীন হয়ে উঠছে আগামী বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি।

আমাদের এই দেশটাকে আমরা ভীষণ ভালোবাসি। আমরা বর্তমান প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। কিন্তু, দেখেছি মুক্তিযোদ্ধার চোখের জল। দেখেছি যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভারের নির্মাণ কাজ চলা অবস্থায় মানুষের ভোগান্তি। দেখেছি আমাদের অতিজরুরী পদ্মা ব্রীজ নির্মাণ নিয়ে দেশের কর্ণধারদের অর্থনৈতিক লুকোচুরি। মেঘনা ব্রীজ, দাউদকান্দি ব্রীজ নড়বড়ে হয়ে পড়ছে। স্থায়িত্ব হারাচ্ছে যমুনা সেতু। তারপরও আমাদের নেতাদের পাজেরো জীপ, প্রচন্ড জ্যামের এই শহরে, জ্যামহীন নির্বিঘ্নতায় সাইরেন সাঁ সাঁ করে পথ চলছে। তাদের বাড়িতে এসির বাতাসে সুগন্ধি উড়ছে। অথচ, অসংখ্য গ্রাম ডুবে আছে বিদ্যুৎহীন। আমরা এমন বাংলাদেশ তো চাইনি। আমরা চাই, আমাদের প্রিয় এই দেশ একদিন পৃথিবীতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। এই হানযৌ ব্রীজের মতো অসংখ্য সুপারস্ট্রাকচারের সাথে সবুজের মিতালীতে প্রাণবন্ত থাকবে আমাদের প্রিয় এই মাতৃভূমি। আমাদের প্রিয় এই দেশটার ভালো একদিন হবেই। আমরা বর্তমান প্রজন্ম সে চেষ্টাই করছি।

=======================
তথ্য এবং ছবিসূত্রঃ-
১। উইকিপিডিয়া
২। উইকিমিডিয়া
৩। পিপল ডটকম.চায়না
৪। ব্রীজের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট
৫। চাইনিজ নিউজ 163.কম
৬। রোডট্রফিক টেকনোলজি

মন্তব্য করুন