একটি অন্তর্ভেদী অনুসন্ধান..পেশোয়ার এক্সপ্রেস (কৃষণ চন্দর)


বাংলা অনুবাদের প্রচ্ছদ।

এই সংস্করণটি অনুবাদ করেছেন: জাফর আলম। প্রকাশ করেছে সম্ভবতঃ প্রথমা প্রকাশন। (আমি সঠিক বলতে পারছি না বলে দুঃখিত।)
==============================

১৯৪৭ সালের ভারত উপমহাদেশের বিভক্তি,আমাদের অঞ্চলগত এবং নৃতাত্ত্বিক ইতিহাসের একটি রক্তাক্ত অধ্যায়। ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি পৃথক রাষ্ট্র সৃষ্টির নির্মম প্রহসনের দৃশ্যায়ন ছিলো, আগ্রাসী ব্রিটিশের চরম সাম্প্রদায়িক ও প্রতিশোধাত্মক ভেদনীতি অনুসরণের চূড়ান্ত পরিণতি। সেসময়ের মহাদাঙ্গার নির্মোহ ইতিহাস এবং সত্যান্বেষী যৌক্তিক বিচার-বিশ্লেষণ সাম্প্রতিক সময়ের প্রয়াস। দুঃস্বপ্নের সেই দাঙ্গার অনেকাংশই বিধৃত হয়েছে সাহিত্যের অমলিন মলাটে। পেশোয়ার এক্সপ্রেস একটি মাঝারি কলেবরের গল্পগ্রন্থ। সর্বভারতীয় বিখ্যাত লেখক কৃষণ চন্দরের অবিস্মরণীয় একটা সাহিত্যকর্ম। যার প্রতিটি গল্প গড়ে উঠেছে ১৯৪৭-এর দেশ বিভাগজনিত রক্তাক্ত দাঙ্গার ঘটনা তার ভয়াবহ রূপসমেত। সুপাঠ্য বয়ন এবং আকর্ষিক বয়ানে, সুচর্চিত চিত্রায়নের মধ্য দিয়ে। এই গ্রন্থের ভূমিকায় উর্দু কবি আলি সরদার জাফরি সেই রূপটিকে তুলে ধরেছেন ঠিক এইভাবে:

‘আজ পূর্ব পাঞ্জাবে একজন মুসলমানও নেই, পশ্চিম পাঞ্জাবে কোনো শিখ বা হিন্দুকে দেখা যায় না। হাজার বছরের পুরোনো গ্রাম লুট করা হয়েছে, হাজারো হিন্দু, মুসলমান ও শিখ নারী রাস্তায় ও বাজারে প্রকাশ্যে ধর্ষিত হয়েছে। লাখো নিরীহ মানুষ মারা গেছে। এক কোটির মতো মানুষ বাড়িঘর থেকে বাস্তুহারা হয়েছে। বিরান হয়েছে ক্ষেত-খামার, বন্ধ হয়ে গেছে কল-কারখানা । পোড়ানো হয়েছে বইয়ের দোকান। ছাই হয়ে গেছে মূল্যবান দলিলপত্র। ছাত্রশূন্য মক্তব-মাদ্রাসায় উড়ছে নিশাচর পেঁচার দল। বাতাসে লাশের বিশ্রী গন্ধ। সৎকার করার মতো কোথাও কেউ নেই। নদীর পানিতে ভাসছে লাশ। পানিতে অসহ্য দুর্গন্ধ। ইংরেজরা শান্তিপূর্ণভাবে শাসনভার হস্তান্তর করেছিল, অথচ আমার ভাইয়ের রক্তে রঞ্জিত হলো দেশের মাটি। শান্ত ভারতে শুরু হলো গৃহযুদ্ধ। দেহের কোথাও ফোঁড়া হলে তা অস্ত্রোপচার না করলে সারা দেহ বিষাক্ত হতে বাধ্য।’

এখনো জাফরির এই উচ্চারণ কতোটা সত্য, কতোটা প্রাসঙ্গিক, এই উপমহাদেশের কোথাও না কোথাও এখনো, এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও নানারূপে সংঘটিত সাম্প্রদায়িকতার বহিঃপ্রকাশ থেকে তার দিব্য প্রমাণ পাওয়া যায়। এবার একটু ঘুরে আসি পেশোয়ার এক্সপ্রেসের অন্দরমহল থেকে।
পেশোয়ার এক্সপ্রেস-এর সূচনা গল্প ‘উন্মাদ’। গল্পের প্রধাণ চরিত্র দু’টি। একজন লালা বাঁশিরাম ক্ষত্রিয়, অন্যজন ব্রাহ্মণ রামনারায়ণ। মুসলমানদের এলাকায় এ’দুজন হিন্দুর বসবাস। । বর্ণহিন্দুদের মধ্যে যাদের অবস্থান এক ও দুই নম্বরে। এই গল্প আদ্যোপান্ত লেখা হয়েছে উত্তম পুরুষে—‘আমি’, ‘আমরা’ ও ‘আমাদের’ বাচ্যে। লেখকের বয়ানে আমরা জানতে পারছি, বিহারে দাঙ্গা বাধার পর

‘মুসলমানদের ওপর যখন বিপদ ঘনিয়ে আসে, তখন আমাদের রক্ত গরম হয়ে ওঠে। এই শালাদের ঔদ্ধত্য বেড়ে গেছে।…তাই আমি, রশিদ, ফজু মুচি আর গল্লে কুস্তিগির এবং গলির আর আট-দশজন যুবক মিলে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম যে এখানকার হিন্দুদের বিহারের ঘটনার স্বাদ পাওয়া উচিত।’

গল্পের ঘটনাস্থল লাহোর। হিন্দুদের শুরু করা দাঙ্গার পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে এ গল্পের উত্তম পুরুষোক্ত মুসলমানরাও তাদের এলাকার ব্রাহ্মণ রামনারায়ণ এবং লাল বাঁশিরাম ক্ষত্রিয়ের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়। হত্যা করা হয় রামনারায়ণকে। তারপর লুটপাট শেষে যখন মুসলমানরা তাদের নিজেদের এলাকায় আসে তখন শুনতে পায়, হিন্দুরা তাদের বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। হত্যা করা হয়েছে মানুষজনকে এবং এ গল্পের নায়কের স্ত্রীকেও। গল্পের সমাপ্তি আপনাকে তা নির্বাক করে দেবে, এ’কথা নিশ্চিত করে বলে দেয়া যায়। তার বর্ণনাটি এ রকমের:

‘আমরা সবাই লুটপাটের জন্য বেরিয়ে গিয়েছিলাম। কে জানত, এই অসভ্য হামলাকারীরা আমাদের অবর্তমানে নিরস্ত্র মেয়েদের ওপর হামলা চালাবে? আমি শাড়ি, গয়না এবং রুপোর গ্লাস ইত্যাদি আমার বউয়ের সামনে এনে রাখলাম। তার লাশ ছুঁয়ে শপথ নিয়ে বললাম, “আয়েশা, তোমার নামে শপথ করে বলছি, আমি তোমার খুনের বদলা যদি না নিই, তাহলে আমি আমার পিতার সন্তান নই, একটা শুয়োরের বাচ্চা।” এ কথা বলে ছুরি হাতে নিয়ে আমি গলির বাইরে চলে যাই। রশিদ আমার সঙ্গে সঙ্গে আসছিল।’

এই গল্পের পটভূমি, স্থানকাল এবং পরিবেশ-পরিস্থিতি ও পাত্রপাত্রীর আচরণ ও মনস্তত্ত্ব ও অন্তর্বেদনা, যে গভীর শৈল্পিকতায় তুলে ধরেন কৃষণ চন্দর, তার তুলনা মেলা ভার। এখানেই তিনি একক ও অদ্বিতীয়। একই ধরনের শক্তিমত্তার পরিচয় মেলে তাঁর ‘লালবাগ’, ‘অমৃতসর: ভারত বিভাগের আগে’, ‘অমৃতসর: স্বাধীনতার পরে’, ‘পণ্ডিত নেহরু ও জিন্নাহর প্রতি পতিতার খোলা চিঠি’, ‘পেশোয়ার এক্সপ্রেস’‘জ্যাকসন’ শিরোনামের গল্পেও। প্রতিটি গল্পের পটভূমিজুড়ে দাঙ্গা। দাঙ্গার ভয়াবহতা। দাঙ্গায় আতঙ্কিত মানুষ, মানুষের ভেতরে বাস করা হাজারো মানুষের অনির্বচনীয় প্রকাশ। স্থান-কাল-পাত্র ভিন্ন হলেও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার রূপ যে কতটা ভয়াবহ, বীভৎস ও অমানবিক হতে পারে, প্রিয় লেখক কৃষণ চন্দর, এই গ্রন্থভুক্ত প্রতিটি গল্পের প্রতিটি আঁখরে অদ্ভূত, জাত-গল্পকারের অবাক করা শৈল্পিক কারিশমায় জীবন্ত এক দৃশ্যকল্পরূপে গেঁথে দিয়েছেন। আমি পড়ে যেতে থাকি। আবার..আবার..বারবার।

মন্তব্য করুন